কানাডিয়ান সাহিত্য এবং একদিনের বইমেলা

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল ২৩:৩৫ , ডিসেম্বর ৩০ , ২০১৭

ক.

বিভিন্ন দেশের সাহিত্য সম্পর্কে আমরা যেভাবে অবগত, সেই তুলনায় কানাডিয়ান সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের পরিচয় অনেকটা কম। তবে ২০০৪ সালে এলিস মুনরো সাহিত্যে নোবেল অর্জনের পর পাঠকের দৃষ্টি এখন কানাডার দিকে। এবার কানাডিয়ান লেখিকা মার্গারেট অ্যাটউড নোবেল পাবার তালিকায় ছিলেন। মজার ব্যাপার- সবাইকে চমকে দিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে কাজুও ইশিগুরো এই পুরস্কার অর্জন করলেন এবং তিনিই বললেন, ‘I apologize to Margaret Atwood that it’s not her getting this prize. I genuinely thought she would win it very soon. I never for a moment thought I would. I always thought it would be Margaret Atwood very soon; and I still think that, I still hope that’। (দ্রঃ ডেইলি দ্য গ্লোব এন্ড মেইল, ০৫ অক্টোবর, ২০১৭, কানাডা।)
এছাড়াও সাক্ষাৎকারে ইশিগুরো কানাডিয়ান কবি, গীতিকার এবং সংগীতশিল্পী লিওনার্ড কোয়েনের কাছে ঋণ প্রকাশ করে ইশিগুরো আরো বলেছেন, আমার লেখালেখিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে, তাঁর সংগীতের। আমার বেড়ে ওঠা ও লেখার জগতে আসার পেছনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কোয়েন।...আমি যে লেখক হতে পেরেছি সেজন্য আমি লিওনার্ড কোয়েন এবং বব ডিলানদের কাছে ঋণী।

কাজুও ইশিগুরোর এই দু’টি বক্তব্য থেকে কানাডিয়ান শিল্প-সাহিত্য এবং সংগীত সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পাওয়া যায়। প্রথমত, মার্গারেট অ্যাটউড সম্পর্কে তাঁর প্রত্যাশা এবং লিওনার্ড কোয়েনের দ্বারা অনুপ্রাণিত ও ঋণ প্রকাশ।

সবাই জানেন, এলিস মুনরো কানাডার প্রথম সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী। এখানে একটি অনালোচিত তথ্য তুলে ধরতে চাই, তাঁর আগেও একজন কানাডিয়ান সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। কিন্তু তা তালিকায় নেই। ১৯৭৬ সালে সাহিত্যে নোবেল অর্জনকারী আমেরিকান সাউল বেলো কানাডার বংশোদ্ভূত লেখক। তাঁর জন্ম ক্যুইবেকের লেসিনে হলেও তিনি শৈশব থেকে শিকাগোয় বেড়ে উঠেন। ফলে কানাডার ভাগ্যে তা জুটেনি, স্থলে স্থান পায় যুক্তরাষ্ট্র।

কানাডায় এমন জনপ্রিয় কবি, গীতিকার, গায়ক আছেন, যার মৃত্যুশোকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোও কাঁদলেন। তিনি হচ্ছেন লেখক, গায়ক, গীতিকার, সুরকার এবং অভিনেতা খ্যাতিমান গর্ডন এডগার ডাউনি। তিনি গত ১৭ অক্টোবর মস্তিষ্কের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মরণে জাস্টিন অশ্রুভেজা কন্ঠে বলেন, আজ সারাদেশ গর্ড ডোনি জন্য দুঃখ প্রকাশ করছে। ডোনি তার লেখায় এবং গানের মাধ্যমে কানাডার জন্য অনেক কিছু করেছেন। ডোনি শুন্য কানাডা ভাবতে কষ্ট হয়!

কানাডা শিল্প সাহিত্যের জন্য নানা ধরণের সরকারি এবং বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং পুরস্কার রয়েছে। রয়েছে রাজসভার কবির মতো দ্যা পার্লামেন্টারি পয়েট লরিয়েট। ইংল্যান্ডের মতো সরকারি পদে অধিষ্ঠিত ‘দ্যা পার্লামেন্টারি পয়েট লরিয়েট’ শুধুই সম্মানজনক পদ নয়; রয়েছে সাংবিধানিকভাবে কিছু দায়িত্ব। দুই বছর মেয়াদী এই কবিসভায় লেখক মিশেল প্লিও-এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন কবি জর্জ এলিয়ট ক্লার্ক।

কানাডায় দুই ধরনের লেখক রয়েছেন। মূলধারার লেখক এবং ভিন্ন সংস্কৃতির ধারার অভিবাসী লেখক। ফলে ভিন্ন ভাষার অভিবাসী লেখকেরা আড়ালেই থেকে যাচ্ছেন। তবে নতুন প্রজন্মের অভিবাসী লেখকেরা এখন মূলধারায় যুক্ত হচ্ছেন।

 

খ.

সাহিত্যচর্চা বা গ্রন্থ পাঠের জন্য কানাডিয়ান লাইব্রেরির ভুমিকা অসাধারণ! আমি অটোয়ায় অল্প কিছুদিন অর্লিন্স লাইব্রেরিতে কাজ করেছি। সেই স্বর্গীয় পরিবেশ আর বিরল অভিজ্ঞতা এখনো আমাকে আলোড়িত করে। যেমন, আপনি অমুক বই পড়তে চান, লাইব্রেরিকে জানালে তারা সেই বইটি জোগাড় করে আপনাকে ফোনে জানিয়ে দিবে!

কানাডায় এসে গ্রন্থ বিষয়ক অনেক নতুন নতুন বিষয় দেখেছি। টরন্টোতে দেখেছি, ওয়ার্ল্ড’স বিগেস্ট বুকস্টোর। টরন্টোর ডাউন টাউনে ইটন সেন্টারের পাশে কুইন্স স্ট্রিট আর ডান্ডাস-বে’র ইন্টার সেকশনের ২০ এডোয়ার্ড স্ট্রিটে ছিলো ৬৪,০০০ বর্গফুটের তিন তলা বিশিষ্ট বিশাল বইয়ের দোকান। ১৯৮০ সালে পহেলা নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত এই বৃহৎ বইয়ের দোকানটি বিলুপ্ত হয় ২০১৪ সালের ৩০ মার্চ। সেই স্থানে এখন নির্মিত হয়েছে বিশাল প্রাসাদ!

একইভাবে চোখের সামনে বিলুপ্ত হয়ে গেলো ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কানাডার অন্যতম বইয়ের দোকান চ্যাপ্টার। আর তা বিলীন হয়ে গেছে ইনডেগোর ভেতর। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ইনডেগোর সমগ্র কানাডায় ছোট বড় ২১৬টি শাখা রয়েছে। সেখানে ৬ হাজার ২০০ লোক কাজ করে। দুঃখের বিষয়, ইনডেগোর বইয়ের ২০ ভাগ স্থান দখল করেছে নিত্য উপহার সামগ্রী! ভাবলে মন খারাপ হয়ে যায়। আবার মন ভালো হয়ে যায়, যখন টরন্টোর ফুটপাতে হাঁটছি, হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চমকে গিয়ে থমকে দাঁড়াই। দেখি, কোথাও গাছের উপর, কোথাও দেয়ালে কবুতরের খোপের মতো ছোট ছোট ঘর, চমৎকার ডিজাইনের কাঠের বাক্স। সামনে কাঁচের পাল্লা। নান্দনিক ফ্রি লাইব্রেরি। তাতে লেখা 'Take a Book, Leave a Book।' ভেতরে থরে থরে সাজানো বই আর বই। পাল্লায় কোনো তালাচাবির ব্যবস্থা নেই। কোনো একটি বই পছন্দ হলে তা বাড়ি নিয়ে যান। পড়ুন এবং ইচ্ছে হলে ফেরৎ দিয়ে যান। আর যদি তা নিজের সংগ্রহে রাখতে চান তো রাখুন। আবার চাইলে আপনার সংগ্রহের কোনো বই যা আপনি অন্যকে পড়তে দিতে চান, রেখে আসুন পাহারাদার বা তালাচাবি ছাড়া এ ক্ষুদে লাইব্রেরিতে।

আবার কখনো মুগ্ধ হই, খোলা আকাশের নিচে টরন্টোর ডাউন টাউনের হারবার ফ্রন্টে মন মাতানো লেকের পাড়ে Word on The Street শীর্ষক দিনব্যাপী জমজমাট বইমেলা দেখে! যে মেলা অনুষ্ঠিত হয় প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের শেষ রোববার। লেখকদের সাথে নৌবিহার, বাইরে মঞ্চে তরুণ কবিদের কবিতা পাঠ, ভেতরে সেমিনার, নাটক, টক শো, সেরা লেখক বা সেরা বই পুরস্কার, লেখক-পাঠক-প্রকাশকের আড্ডা, খ্যাতিমান লেখকদের অটোগ্রাফ, ফ্রি বই, হ্রাসকৃত মূল্যে ভালো ভালো বইসহ নানান রকম আয়োজনে সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে চমৎকার উৎসব- ওয়ার্ড অন দ্য স্ট্রিট।
বামে সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালএতে অংশ নেয় নামীদামী সংস্থা। যেমন কানাডিয়ান লেখক সমিতি, কানাডিয়ান বুক ইনফরমেশন সেন্টার, কানাডিয়ান বুক পাবলিশার্স, কানাডিয়ান গ্রন্থবিক্রেতা এসোসিয়েশন, কানাডিয়ান চিলড্রেনস্ বুক সেন্টার, ফ্রিল্যান্স এডিটরস অ্যাসোসিয়েশন, কানাডিয়ান লাইব্রেরি এসোসিয়েশন, ম্যাগাজিন প্রকাশনা এসোসিয়েশন, লিটারেসি ফাউন্ডেশন, কানাডিয়ান পয়েট এসোসিয়েশন, লিটারেচার প্রেস গ্রুপ, অন্টারিও লিটারেসি এসোসিয়েশন, সাময়িকপত্র রাইটার্স এসোসিয়েশন, কানাডিয়ান নাট্যকার এসোসিয়েশন, কানাডিয়ান রাইটার্স ইউনিয়ন প্রভৃতি।
বইমেলায় লেখক এবং প্রকাশদের জন্য নানা ধরনের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। আর কানাডিয়ান ইভেন্ট ইন্ডাস্ট্রি এই বইমেলাকে ২০১২ সালে ‘শ্রেষ্ঠ ফেস্টিভাল’ স্টার পুরস্কারের মর্যাদায় জাতীয় মনোনয়ন দিয়েছে।
অনুষ্ঠানে নানা ধরণের পুরস্কার দেয়া হয়। যেমন দশ জনের সম্পাদিত ‘এনি আদার ওয়ে’ টরন্টো বুক এওয়ার্ড ২০১৭ লাভ করে। আবার তরুণদের গল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান বিজয়ী হন এলহাম এম আলী, তার ‘দ্য নাইট এ পাওয়ারফুল’ গল্পের জন্য।
ওয়ার্ড অন দ্য স্ট্রিট বইমেলা ১৯৮৯ সালে শুরু হলেও তা আনুষ্ঠানিক ভাবে উদ্বোধন করা হয় ১৯৯০ সালে। শুধু টরন্টোতে নয়; পরে ছড়িয়ে পরে কানাডার হ্যালিফেক্স, সাসকাচোয়ান, লেথব্রিজেও। এতে অংশ নেয় মূলধারার লেখক এবং নামীদামী সংস্থা। গতবারের মতো এবারও ২৫ সেপ্টেম্বর ছড়ালেখক বাদল ঘোষকে নিয়ে ছুটির দিনটা মহানন্দে কাটলো টরন্টোর ওয়ার্ড অন দ্য স্ট্রিটে। পরিচয়, কথোপকথন এবং আড্ডা হলো পয়েট লরিয়েট কবি এবং কথাশিল্পী অ্যান মাইকেলস, এমাজনের বেস্ট সেলার ঔপন্যাসিক ফ্রান্স ইটানি, ভ্যাংকুভারের গভর্নর জেনারেল পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ডাভিড চারিএন্ডি, ডাভিড সুজুকি, ইয়ান হানিংটন, রনি সেক্সমিথ, টেরি ফেলিস, পিটার উনোইন, এমা ডংগি, ক্যানিসিয়া লুব্রিন, জয়া এডজিক, সিভি২ পয়েটট্রি ম্যগাজিনের সম্পাদক ও কবি হান্নাহ গ্রিনের সাথে।

অ্যান মাইকেলস সম্পর্কে ভ্যাংকুভার সান লিখেছেন: ‘If she never writes another word, Anne Michaels is one finest poets this country has produced’.

অ্যান মাইকেলের সাথে কথা হলো। তাঁর সদ্য প্রকাশিত All We Saw কবিতার বইটা দেখিয়ে জানতে চাইলাম, তুমি গদ্য পদ্য দু’টোই লিখো। কোনটা তোমার ক্ষেত্র বলে মনে করো? খুব মিষ্টি করে হাসলেন। জবাব যেনো দ্বৈত নাগরিকদের মতো এ রকম, গদ্য আমার চামেলি, পদ্য আমার জুঁই/কাকে রেখে কাকে ছুঁই!

 

//জেডএস//

x