শানু

শাখাওয়াৎ নয়ন ১৩:৩০ , জানুয়ারি ০২ , ২০১৮

তিন-চার দিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে! মাঝরাতে একটু ক্ষান্ত দিয়েছে। মনে হচ্ছিল সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। থামবেই না। ভরা পূর্ণিমা। নদীতে বান ডেকেছে। ডুবে যাচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। চারদিকে শুধু পানি। থই থই অবস্থা। গ্রামের বাড়িগুলো যেন একেকটা দ্বীপ। সামনের কাঁচা রাস্তাটা এবারও ডুবেছে। একগলা পানিতে ঠায় দাঁড়িয়ে এনজিওদের দুই সারি শিশু, মেহগনিগাছ। হালকা শীত শীত ভাব। এ সময় সাধারণত শীত পড়ে না। বৃষ্টির কারণে পড়েছে। কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি। চোখে এক ফোঁটা ঘুম নেই। শ্রাবণ মাসের আরো দু-এক দিন বাকি। স্বপ্নার গাছটায় পেয়ারা ধরেছে। খুউব। রাতভর গাছটায় চলে নিশাচর বাদুরের উৎসব। খালের পানিতে ছপ ছপ আওয়াজ তুলছে ব্যাঙ। এখনো রাত পোহাতে কিছুটা বাকি। একটু পরই হয়তো ফজরের আজান হবে। হঠাৎ কান্নার শব্দ। শানুর মতো করে কাঁদছে। হুঁ, শানুই কাঁদছে। আমার ঘরের একেবারে কাছে এসে কাঁদছে। কী করুণ কান্না! কফ জড়ানো ভাঙা গলায় মা ডাকলেন —

বশির, শব্দ পাইছস?

হুঁ, পাইছি। শানু না?

হুঁ, শানুই। শানু আইছে। ওঠ।

তড়িঘড়ি করে দরজা খুললাম। আবছা অন্ধকারে শানুর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। মা হারিকেন নিয়ে এলেন। আব্বা পেছনে। শীর্ণকায় শানু ভেজা গায়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা স্তম্ভিত। পরস্পরের দিকে তাকালাম। মা ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আব্বা চুপচাপ। আমার বুকের মধ্যে হুঁ হুঁ করে উঠল। সত্যিই কি শানু? নাকি...। দুহাতে চোখ ঘষলাম। কিন্তু শানুই তো। মা খেতে দিলেন। সে কিছুই খেল না। বাঁশঝাড়ের দিকে পা বাড়াল। আমরা পেছন পেছন যাচ্ছি।

শানুর জন্ম অনীল স্যারের বাড়িতে। স্বপ্না প্রাইভেট পড়তে গিয়ে একদিন ব্যাগে করে নিয়ে এল। খুব ছোট্ট। মাত্র এক মাস বয়স। মুখের কাছে, শরীরে সাদা-কালো রঙের মিশ্রণ। বাম কানটা জন্মগতভাবেই একটু কাটা। এটাই তার পরিচয় চিহ্ন। দেখতে বেশ সুন্দর। গোল গোল বড় বড় চোখ। একটু আদর করলেই মাথা নিচু করে চোখ আধবোজা করে রাখে। শানুকে নিয়ে স্বপ্নার চিন্তার কোনো অন্ত নেই। সারাক্ষণ শুধু শানু আর শানু। কী যে ব্যস্ততা! যাকে পায় তাকেই বলে, শানু নাকি তার সঙ্গে কথা বলেছে। মায়ের জিজ্ঞাসা — 

ক্যামনে কতা কইল?

কেন, মিউ মিউ করেছে দুবার।

এ কথা জানতে স্বপ্নার জগতের কেউ বাকি নেই। গল্পে গল্পে সবাই অতিষ্ঠ। প্রথম কয়েক দিন শানুর অনেক নাম ছিল। স্বপ্না সকালে এক নাম দেয় তো বিকেলে আরেক নাম। কোনো নামেই স্থির থাকতে পারে না। শেষমেশ মা বললেন —

স্বপ্নার মাইয়ার নাম শানু। এই বিলাইয়ের মা, এই নাম আর বদলাবি না।

তারপর আর বদলায়নি। মেয়েকে ছাড়া স্বপ্না খায়ও না, ঘুমায়ও না। দেখতে দেখতে স্বপ্নার মেয়ে বড় হয়েছে। স্বপ্না আর শানুর সম্পর্ক উপচিয়ে আমাদের মধ্যেও এসে পড়েছে। যদিও শুরুতে আমি আর মা একদম পছন্দ করতাম না। কিন্তু পছন্দ না করে কি উপায় আছে? এ এক অন্য রকম প্রাণী। মাঝে মাঝে ভাবি, এর কাছ থেকেও অনেক কিছু শেখার আছে। ভালোবাসা আদায় করার কৌশলটা এরা খুব ভালো জানে। কী অসম্ভব ক্ষমতা! এই ক্ষমতাটা আল্লাহ পাক ওদের ভালোই দিয়েছেন। মায়ের মেজাজ তো সব সময় বিগড়েই থাকে। মাত্র পনেরো দিনে তাকেও ম্যানেজ করে ফেলেছে। মাঝে মাঝে মায়ের কোলের মধ্যে গিয়ে ঘুমায়। কেমন মায়া জাগানিয়া ভাব করে চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে! অথচ গত আড়াইটা বছর ধরে বিথির মন পাওয়ার জন্য কী না করেছি? ফলাফল কী? যত দিন যায় ততই খারাপ। আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে জিজ্ঞেস করত

কেমন আছেন বশির ভাই?

এখন তা-ও করে না, বরং এমনভাবে তাকায় যে আমি দুনিয়া থেকে নাই হয়ে যাই। খুউব অসহায় লাগে। কিন্তু এই সামান্য একটা বিড়াল কত অল্প দিনে আমাদের পরিবারের একজন হয়ে গেল! কিছু বুঝতেই পারলাম না। আমরা সবাই শানুর খোঁজখবর নিই, শানুও আমাদের চোখে চোখে রাখে। আব্বা চিঠিতে স্বপ্নাকে শানুর কথা জিজ্ঞেস করে। আরো কত কী! আমরা যেমন পড়ালেখায় ব্যস্ত, তেমনি শানুরও অনেক কাজ। সে-ও ব্যস্ত। বেশ কিছু দায়িত্ব একেবারে নিজের মনে করে পালন করে। মুরগির খাবার পাখিকে খেতে দেয় না, এই ব্যাপারটায় শানু যেমন খুব সিরিয়াস, তেমনি ইঁদুরের ব্যাপারেও। ইঁদুর সাম্রাজ্যের পুরোপুরি পতন সে একাই ঘটিয়েছে। এ কারণে মা খুবই কৃতজ্ঞ। ইঁদুর দমনে মা কত কিছু করেছে! ওষুধ দিয়েছে, তাতে একটা ইঁদুরও মরেনি। উল্টো সেই ওষুধ খেয়ে পাঁচ-ছয়টা মুরগির বাচ্চা মরল। কেঁচিকল পেতেছে। ইঁদুর তো ধরা পড়েইনি, খামোখা খায়রুনের মায়ের পা কেটেছে। কিছুতেই কিছু হয়নি।

মা লোকজনের সঙ্গে আজকাল শানুর স্বভাবচরিত্রেরও তারিফ করে। যেমন কোনো খাবারে সে মুখ দেয় না। খাবারের জন্য ভদ্রভাবে অপেক্ষা করে। ক্ষুধা লাগলে মিউ মিউ করে খাবার চায়। আমরা কোথাও গেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে পিছু পিছু কিছুদূর এসে এগিয়ে দিয়ে যায়। যখন ফিরে আসি,  তখনো এগিয়ে নিতে বাড়ি থেকে বের হয়। শানু অনেক খবরও দেয়। যেমন শানু ওজু করলে (হাত-পা চাটলে) বাড়িতে মেহমান আসে। প্রথম প্রথম বিশ্বাসই করিনি। যত্তসব কুসংস্কার! কিন্তু স্বপ্না প্রমাণ করে দেখিয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপার। একদিন স্বপ্না এসে বলে —

জানিস দাদা, শানু মাছের কাঁটা খেতে খুব পছন্দ করে কিন্তু কাঁটাওয়ালা গাছের নিচ দিয়ে হাঁটে না।

তাই নাকি? আর কী করে?

বাঁশঝাড়ের নিচেও যায় না। ওর পায়ের তলা নরম তো।

স্বপ্নার কাছে এগুলো ‘ইউরেকা’ টাইপের বিরাট বিরাট আবিষ্কার। বেচারা ছোট মানুষ, পাছে দুঃখ পাবে, তাই হাসিও না। কিছুদিন পরপরই শানুকে নিয়ে নতুন নতুন গল্প। এরপর একদিন বলা শুরু করল —

শানু সাঁকো পার হতে পারে না। ভয় পায়। পানি খুব অপছন্দ। পানির ধারেকাছেও যায় না।

ভালোই কাটছে শানু আর স্বপ্নার জীবন। কিন্তু ঝামেলাটা তৈরি করেছে স্বাস্থ্যকর্মী বিলকিস আপা। টিকা দিতে এসে নানান পরামর্শও দিয়ে যান। একেক সময় একেক পরামর্শ। পানি বিশুদ্ধকরণ, খাওয়ার স্যালাইন, প্রসূতি মায়েদের স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, আরো কত কী! একবার তার পরিবার পরিকল্পনার পরামর্শে মৌলভিরা খুব খেপে গেল। তারপর অনেক দিন উত্তর ব্রাহ্মন্দী গ্রামে আর আসতে পারেনি। শুনেছি, চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেন-দরবারে সেই ঝামেলা মিটেছে। একবারের পরামর্শ গেল শানুর বিপক্ষে। না, শুধু শানুর বিপক্ষেই নয় স্বপ্নারও বিপক্ষে —

বিড়ালের লালা মানুষের পেটে গেলে আর রক্ষা নাই। ভয়ংকর রোগ ডিপথেরিয়া হয়।

মায়ের মাথায় পড়ল বাজ। এত বড় বিপদ তো ঘরে রাখা যায় না। সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো আজই বিড়াল বিদায় করতে হবে। স্বপ্না কিছুতেই বুঝতে চায় না। কিন্তু মায়ের এক কথা, কিছুতেই বিড়াল রাখা যাবে না। মা শানুকে ডাকছেন —

আয় আয় শানু, আয়...।

শানু কখনো অবাধ্য হয় না। ডাকলেই আসে। কিন্তু তখন আর আসে না। মায়ের হাতে একটা চটের বস্তা। কে জানে? কিছু বুঝতে পেরেছে কি না। খানিকটা দূরে ঘাপটি মেরে বসে আছে। সন্দেহের চোখে অপলক তাকিয়ে আছে। মা এগোয় তো শানু দূরে যায়। শানুকে ধরা অত সহজ নয়। অবশেষে সে ধরা পড়ল দুপুরে খাওয়ার সময়। বেচারি বিশ্বাস করে খেতে এসেছিল। শানুকে বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে বস্তার মুখ বেঁধে রাখা হয়েছে। শানু কাঁদছে মিউ...মিউ...মিউ...।

কাঁদছে স্বপ্নাও। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে। দুপুরে খায়নি। দরজা বন্ধ করে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। আমাকে শুধু বলেছে —

দাদা তুই শানুকে ফেলবি না।

ফেলব কীভাবে? নির্দোষ একটা প্রাণী! বস্তাবন্দি দেখেই তো খারাপ লাগছে। কী ছোট্ট বাচ্চাটা এসেছিল! কী মায়া মায়া চোখ! কত আদরে আগমন আর কী নিষ্ঠুর বস্তাবন্দি নির্বাসন! আহারে...! একটা বিড়ালের জন্য এত খারাপ লাগতে পারে, আগে কখনো ভাবিনি। মাকে কিছু না বলে বিষণ্ন মনে কুলপুদ্দি বাজারে চলে গেলাম। আড্ডায় মন বসছে না। আবার বাড়িতেও যাওয়া যাবে না। বাড়িতে গেলেই মা শানুকে দূরে কোথাও ফেলে আসতে বলবেন। তাই মনের মধ্যে খারাপ লাগা নিয়েই বসে থাকলাম। রাত নয়টার পর বাড়ি ফিরছি। মা নিশ্চয় শানুকে ফেলতে পারেননি। কে ফেলবে। এতক্ষণে হয়তো স্বপ্না দরজা খুলেছে, শানুকে আদর করছে। কিন্তু না। পাশের বাড়ির সাদেককে দিয়ে মা শানুকে দশ মাইল দূরে চরমুগুরিয়া হাটে ফেলে দিয়ে এসেছে। যাতায়াত খরচ দিয়েছে চল্লিশ টাকা। আজ হাটবার। গরু-ছাগলের বিরাট হাট।

 

মাদারীপুরের অত্র অঞ্চলে এত বড় হাট আর নেই। হাটের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ। গিজ গিজ করে। এমন কোনো হাটবার নেই যে ওখানে দু-চারজন শিশু হারায় না। সাদেক বলেছে, যখন শানুকে ফেলেছে তখনো নাকি শিশু হারানোর মাইকিং চলছিল। বস্তার মুখ খোলার পরও নাকি শানু বের হচ্ছিল না। মিউ মিউ করে কাঁদছিল। বস্তা উঁচু করে ঝাড়া দিয়েছে, তা-ও পড়ে না। খামচি দিয়ে ধরে ঝুলেছিল। অনেক চেষ্টায় ফেলতে হয়েছে। শানু নাকি তার পরও সাদেকের পেছন পেছন আসতে চেষ্টা করেছিল। সে এমন একটা আঁধলা ইট মেরেছে যে, শানু অনেকক্ষণ ব্যথায় আর নড়াচড়া করতে পারেনি। মা শুনে বেশ খুশি। সাদেককে কাতল মাছের মাথা দিয়ে ভাত খাইয়েছে। এত বড় একটা উপকার করেছে, কিন্তু স্বপ্না সারা রাত একটুও ঘুমায়নি। এত দিনের মায়া, সহজে কি কাটে? রাত পোহানোর আগেই শানু এসে মিউ...মিউ...মিউ...। আমাদের ঘুম ভাঙাল। সবার আগে শুনতে পেল স্বপ্না। শুনেই বিরাট চিৎকারে আশপাশের বাড়ির মানুষেরও ঘুম ভাঙিয়ে দিল —

শানু এসেছে...শানু...।

হুড়মুড়িয়ে ছুটে বের হলো। ইশ্ কী মমতা! কী টান! স্বপ্না কাঁদছে। কী আনন্দ! স্বপ্নার এত আনন্দ জীবনেও দেখিনি। ভোর হয়েছে। স্বপ্না স্কুলে গেল না। সারা দিন শানুর সঙ্গে কত কথাবার্তা! শানু মায়ের কাছ থেকে একটু দূরে দূরে থাকছে। চোখ তুলে তাকায় না। শানু ফিরে আসায় স্বপ্না যেমন খুশি, মায়ের মেজাজ তেমনই খারাপ। মায়ের ধারণা, সাদেক কাজটা ঠিকমতো করেনি। এই বদ বাজার করতে দিলেও যেমন চুরি করে, তেমনি এই কাজেও ফাঁকি দিয়েছে। একে বিশ্বাস করা ঠিক হয়নি। যে হাটে মানুষ হারিয়ে যায়, সেখান থেকে বিড়াল ফিরে আসে কীভাবে? বিড়ালের কাছে কি ঠিকানা আছে? নাকি কথা বলতে পারে? সপ্তাহ দুয়েক পর একদিন হঠাৎ দেখি শানু বাড়িতে নেই। আমি ছিলাম কলেজে, স্বপ্না স্কুলে। স্বপ্না যথারীতি কান্নাকাটি শুরু করল। তারপর অনশন। আমার মেজাজটাও খারাপ হলো। এত বাড়াবাড়ি ভালো লাগে? খারাপ লাগছে। খুউব। কিন্তু মায়ের মুখের ওপর কিছু বলতে পারছি না। আমি আসলে কাউকেই শক্ত করে কিছু বলতে পারি না। যখন ঠিক করি কিছু একটা বলব, তখন হার্টবিট খুব বেড়ে যায়। নিজের কানে ধড়ফড়ানির শব্দ পাই। জানতে পারলাম, মা এসকেন খাঁর ছেলে নুরুকে দিয়ে শানুকে ফাইস্যাতলী হাটে ফেলে দিয়ে এসেছে। আগেরবার ফেলেছিল উত্তরে। এবার দক্ষিণে।

 

কাজও হলো। মা সফল। এবার আর রাত পোহানোর আগেই শানু ফিরে এল না। আসবে কী করে। ফাইস্যাতলী অনেক চড়াই-উতরাইয়ের জায়গা। পথে পথে হাট-বাজার, খালই আছে দশ-পনেরোটি। শানু খাল পার হবে কী করে? শানু তো সাঁকো পার হতে পারে না। তার পরও একটা ক্ষীণ আশা ছিল। শানু হয়তো আসবে। তিন-চার দিন পার হয়ে গেল শানু আসেনি। স্বপ্না খাওয়াদাওয়া, লেখাপড়া ছেড়েছে তো ছেড়েছেই। শুক্রবার। বেলা দুপুর। সূর্য মাথার ওপরে। ফজেল মুন্সী আজান দিয়েছেন। জুম্মার নামাজের উদ্দেশ্যে সাঁকো পার হয়ে রাস্তায় উঠেছি। এ সময় রহিম ফরায়েজীর সঙ্গে দেখা —

আসসালামু আলাইকুম।

ওয়ালাইকুম আসসালাম।

হঠাৎ দেখি শানু আসছে। মুখ ভার। ক্লান্ত শরীর। শানুকে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছি। শানু দাঁড়াল না। এমনকি তাকালও না। সুন্দরভাবে সাঁকো পার হয়ে বাড়িতে গেল। কিন্তু শানু তো সাঁকো পার হতে পারত না। শিখল কী করে? সাঁকো পার হতে শেখা কি এত সহজ? ছোটবেলায় সাঁকো থেকে পড়ে গাল কেটে গিয়েছিল। সেই কাটা দাগ আমার সঙ্গে দিনে দিনে বড় হচ্ছে। নামাজে পুরোপুরি মন দিতে পারছি না। খুতবার কথা কিছুই কানে গেল না। মোনাজাতে ঘুরেফিরে শানুর কথাই মনে পড়ছে। স্বপ্নার সব রাগ, দুঃখ মুহূর্তেই হাওয়া। মুখে হাসি। চলছে আদর-আপ্যায়ন। যথারীতি স্কুল কামাই। কয়েক দিন কেটে গেল। শানু এবার আমার কাছেও খুব একটা আসছে না। কিন্তু প্রায়ই দূর থেকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকে। তাকানোর মধ্যে একটা অন্য রকম ব্যাপার আছে। মনে হয় কিছু একটা বলতে চায় —

তোমরা আমাকে ফেলে দিচ্ছ কেন? আমি তোমাদের কী ক্ষতি করেছি? তোমরা কি একবারও ভেবে দেখেছ, আমি তো কত বাড়িতেই যেতে পারতাম! কিন্তু তার পরও তোমাদের কাছে কেন ফিরে ফিরে আসি?

শানুর বিষয়ে নানান কিছু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। সপ্তাহখানেক পর আব্বা বাড়িতে এলেন। সামনে ঈদ। কত জামাকাপড়! স্বপ্নার হাসি আরো প্রশস্ত হলো। আব্বা বাড়ি আসায় ঈদের আগেই ঈদ শুরু। স্বপ্না শানুর জামাকাপড়ের ব্যাপারে চিন্তিত। একটা প্রায় নতুন ওড়না কেটে শানুর জামা বানাতে গিয়ে মায়ের হাতে ধরা। যারপরনাই ধরনের বকাঝকা খেল। আব্বা বললেন —

থাক। ছোট মানুষ। আর বকাঝকা কোরো না। শখ হয়েছে...।

কিন্তু মা সহজে ছেড়ে দেয়ার মানুষ নন। দুই দিনের মাথায় আব্বাকে কি-তে কী বুঝিয়েছেন, কে জানে? হঠাৎ করে আব্বাও শানুর বিপক্ষে। ভাবছি, আব্বার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলব। আর চুপ থাকা যায় না। আব্বা গেছেন বাজারে, কুলপুদ্দি। অপেক্ষা করছি। কিছু কথাও ঠিক করলাম। যেভাবেই হোক শানুকে আর ফেলতে দেব না। শানু কী করেছে? একটা নিরীহ প্রাণীর উপর এত অত্যাচার কেন? আব্বা পেপার হাতে বাজার থেকে এলেন। বরাবরের দৃশ্য। একটা ইংরেজি পেপার এনে আমাকে বলা হবে —

বশির, এতে শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে। এই আর্টিকেলটা পড়ে আমাকে বুঝিয়ে বলবে, আজ রাতে।

যন্ত্রণা আর কারে বলে! না পড়ে নিস্তার নেই। কিন্তু আজকের পেপারটা বাংলা। আব্বা একটা কলাম দেখিয়ে পড়তে বললেন। পড়লাম। বিড়াল-কুকুর দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে এমন কয়েকটি রোগব্যাধি-বিষয়ক নিবন্ধ। লেখাটি পড়ে নিশ্চুপ হয়ে গেলাম। স্বপ্নাকেও পড়তে বললেন কিন্তু সে পড়া তো দূরের কথা ছুঁয়েও দেখল না। সাফ জানিয়ে দিল, আবার যদি শানুকে ফেলা হয়, সে সহ্য করবে না।

এত ছোট্ট এক বালিকার ওজর-আপত্তি কে পাত্তা দেয়? কেউই পাত্তা দিল না। বিড়াল ফেলার ব্যাপারে আব্বা খোঁজখবর করতে লাগলেন। কতজন কত রকমের বুদ্ধি দিল! উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হচ্ছে ১. বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে বিড়ালকে অনেক সময় পর্যন্ত ঘোরাতে হবে, যাতে দিক ঠিক রাখতে না পারে। ২. ফেলার আগে পানিতে চুবিয়ে ফেলতে হবে, তাহলে গা শুকাতেই অর্ধেক বেলা কেটে যাবে। তখন আর পথ মনে রাখতে পারবে না। ৩. নদীপথে ভাটিতে দূরে গিয়ে ওপারে ফেলে আসতে হবে। তাহলে আর আসতে পারবে না। বিড়াল পানিতে নামতে চায় না। তা ছাড়া নদী পার হবে কীভাবে? নদীপথ মনে রাখারও উপায় নেই। আব্বা শেষেরটাকেই বেশি জুতসই মনে করলেন। কিন্তু মায়ের কথা খাড়াদাড়া —

তুমি জানো না, এই বিলাই আবারো আইয়া পড়ব। তুমি সবকিছুই করো।

আব্বা সারা জীবন মায়ের কোনো কথাকেই খুব একটা পাত্তা দেননি। মায়ের মুখে এমন কথা উদাহরণসহ শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। তা নিয়ে মায়ের দুঃখের সীমা নেই। কিন্তু শানুর ক্ষেত্রে মা যা যা বললেন, আব্বা তার চেয়ে বেশিই করলেন। সিদ্ধান্ত হলো, ট্রলারে আঁড়িয়াল খাঁর ভাটিতে গিয়ে রাজারচরে শানুকে ফেলে আসা হবে। যেমন চিন্তা তেমন কর্ম। আমাকেও সঙ্গে যেতে হলো। আব্বার মুখের ওপর এ্যাঁ উঁ শব্দ করারও সাহস পেলাম না। সারাটা পথ শানু একটুও কাঁদল না। ফেলানোর আগে পানিতে চোবানো, বস্তাবন্দি বিড়ালকে চরকির মতো ঘোরানোসহ সবকিছুই করা হলো। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছি। কাছে যেতে ইচ্ছে করছে না। মনটা খারাপ। নিজের অজান্তেই শানুর দিকে তাকালাম। ভেজা গায়ে শানুকে অন্য রকম লাগছে। পালক ছাড়ানো পাখির মতো। শীতে থরথর করে কাঁপছে। নত মুখ। চোখ বন্ধ করে গুটিশুটি মেরে বসে আছে। টুঁ শব্দটিও করছে না।

বিকট জোরে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ফটফট শব্দ করে ট্রলার ছাড়ল। শানু চমকে উঠল। ট্রলার চলছে উজানে। শানু আস্তে আস্তে পানির একেবারে কাছে এসে গভীর বিস্ময়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকল...।

এই চরে এখন শানু আর কিছু মহিষ ছাড়া কিছুই নেই। ঘরবাড়ি ছাউনি নেই। কারা যেন পাট, ধনচে বুনেছে। আষাঢ় মাসের শুরু। বৃষ্টির দিন। শানু কোথায় যাবে? কী খাবে? নানান কিছু মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্ষাকালের উন্মত্ত প্রশস্ত আঁড়িয়াল খাঁ নদ। এপার থেকে ওপার ধু-ধু। পাড় ভাঙছে। কত মানুষ ঠিকানা হারাচ্ছে। পানি কেটে কেটে ট্রলার যতই দূরে যাচ্ছে, ততই যেন শানু আমার কাছাকাছি চলে আসছে। অন্য রকম এক কষ্ট বুকের মধ্যে ঢেউয়ের মতো ফুলে ফুলে উঠছে। কষ্টে ডুবে যাচ্ছি। এ কোন অনুভূতি? একবার মনে হচ্ছে জিজ্ঞেস করি —

আব্বা, তোমরা এত নিষ্ঠুর কেন?

কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। বাড়িতে ফিরে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করল না। স্বপ্না সবার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করেছে আগেই। সারা দিন সে কিছু খায়নি। আমিও খেতে পারলাম না। রাতে স্বপ্নার জ্বর এল। ভীষণ জ্বর। একশো তিন ডিগ্রি। শেষ রাতে স্বপ্নার জ্বর আরো বাড়ল। জ্বরের ঘোরেই কয়েকবার শানুর কথা জিজ্ঞেস করল। সকালে জ্বরের চোটে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। চৌধুরী ক্লিনিকে নিয়ে গেলাম। মাদারীপুরের সবচেয়ে বড় ডাক্তার আলী আকবর সাহেব কয়েক দিন চিকিৎসা করলেন। ভালোর কোনো লক্ষণ না দেখে ঢাকায় পাঠিয়ে দিলেন, তারপর এই প্রফেসর থেকে ওই প্রফেসর। সবার কথা মোটামুটি একই রকম —

ওই ওষুধগুলো আর খাওয়াবেন না। আরো আগে আসেননি কেন? আপনারা আসেন মরার আগে আগে। আপাতত এই ওষুধগুলো চলবে। টেস্টের রেজাল্ট আসুক তারপর...।

এক ডাক্তার আরেক ডাক্তারের চিকিৎসাকে ভুল বলছেন। টেস্টের পর টেস্ট চলছে। এদিকে টাকাপয়সারও টানাটানি শুরু হয়েছে। অন্যদিকে ধারদেনা পেতেও কষ্ট। মায়ের গয়নাগুলো গেছে প্রথম চোটেই। বর্ষাকালে গ্রামে ধারকর্জ পাওয়াও কঠিন। পানির নিচের জমি কেউ বন্ধক নিতে চায় না। নিলেও কম টাকা, নানান শর্ত দেয়। উপায় কী? তাতেই রাজি। কিন্তু স্বপ্নার অবস্থার কোনো উন্নতি হচ্ছে না। ডাক্তাররা কোনো রোগই ধরতে পারছেন না। শুধু বলেন মানসিক রোগ।

ঢাকা মেডিক্যালের প্রফেসর ডা. ইকবাল হোসেন সাহেব মাদ্রাজে রেফার করলেন। স্বপ্নাকে মাদ্রাজে নেয়া হলো। দাড়িওয়ালা এক ডাক্তার। ভারি লেন্সের গোল কাচের রিমলেস চশমা পরেন। দেখতে বেশ পরহেজগার ধরনের। দেখলেই মনে হয় খাঁটি মুসলিম। কিন্তু নাম শুভদ্বীপ ব্যানার্জি। বাঙালি। বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। কেমব্রিজের নামকরা মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ছাত্রাবস্থায়ই ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে পরপর তিনটি রিসার্চ পেপার ছাপা হয়েছে। তাঁকে নিয়ে দুনিয়াজুড়ে হইচই। ইউরোপ-আমেরিকায় কত বড় বড় চাকরির অফার! কিন্তু তাঁর মুখে কথা একটাই, ‘বন্দে মাতরম’। ভূ-ভারত ছাড়া দুনিয়ার কোথাও কাজ করবেন না। ভীষণ সিলেকটিভ। ফেল কেস হাতে নেন না। অযথা রোগীদের পয়সা নষ্ট করার বদনাম তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে এখনো ছুঁতে পারেনি। তিনি স্বপ্নাকে দেখে এবং ফাইল ঘেঁটে সুন্দর বাংলায় বললেন —

চিন্তা করবেন না। একবার যেহেতু এসেই পড়েছেন আর চিন্তার কিছু নেই।

ডাক্তারের কথায় সত্যিই ভালো লাগল। বোনটার দিকে তাকাতে পারি না। এত রূপবতী একটা মেয়ে! মাত্র কয়েক মাসে একেবারে কঙ্কাল হয়ে গেছে! শুভদ্বীপ ব্যানার্জির চিকিৎসায় দিন চারেকের মাথায় স্বপ্না একটু ভালো হয়ে উঠছে। আমাদের খুশির কোনো সীমা নেই। মা-বাবা চরম হিন্দুবিদ্বেষী। সারা জীবন হিন্দুদের ‘মালাউন’ বলে গালি দিতে শুনেছি। দাদা তো হিন্দুদের দোকানের মিষ্টিও খেতেন না। তিনি পীর ছাহেব দুদু মিয়ার সাক্ষাৎ মুরিদ ছিলেন। সাত দিন সাত রাত কবরের মধ্যে গিয়ে ‘এতেকাফ’ ইবাদত করেছেন। কিন্তু তখন আমরা পারলে হিন্দু ডাক্তার শুভদ্বীপ ব্যানার্জির জন্য দোয়া করি। মা-ই বলেছেন দোয়া করতে। তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করতে। স্বপ্না তখনো স্যালাইনের ওপর। কিছু খেতে পারে না। খাওয়ালেই বমি করে। ঘুমের ওষুধ চলছে। বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়েই থাকে। গতকাল রাতে ঘুমের মধ্যে দু-একটা কথা বলেছে। যেমন —

আয় আয় শানু। আয়...কী খাবি, মাছ? নাকি দুধ? আচ্ছা ঠিক আছে...দুটোই পাবি।

ঘুম থেকে উঠেই বলে —

দাদা, মাছ, দুধ এনে দে। শানু খাবে...। শানুর খুব ক্ষুধা লেগেছে।

 

মাদ্রাজ অচেনা শহর। কোথায় পাব কাঁচা মাছ? শানু তো কাঁচা মাছ খেতেই বেশি পছন্দ করত। কিন্তু কাঁচা মাছ নিয়ে কি হাসপাতালে যাওয়া যায়? এক রেস্টুরেন্ট থেকে রান্না করা মাছ আর দুধের ব্যবস্থা করলাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা। স্বপ্না গভীর ঘুমে। কোথায় শানু আর কীসের খাওয়া-দাওয়া? এসব রোগীর মন রক্ষা আরকি...। চলে গেলাম হোটেলে। খুব ভোরে মায়ের ফোনে ঘুম ভাঙল —

তোর বাপেরে লইয়া হাসপাতালে আয়। এহনই...।

মায়ের চেহারা বেশ গম্ভীর। কপাল কোচকানো। ভীষণ চিন্তিত। বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়েছে নিশ্চয়। কিন্তু মায়ের এই মূর্তি অবশ্য নতুন কিছু না। সামান্যতেই এসব করেন। আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। মা বললেন —

দ্যাখ তো খাওনগুলা গ্যালো কই?

এটা কী ধরনের কথা? কই যাবে? সাইড টেবিলে তাকালাম। আধোয়া থালা-বাটি। খালি। স্বপ্নার সঙ্গে তো মা-ই ছিলেন —

রাতে কেবিনে কেউ এসেছিল?

না।

দরজা খোলা ছিল না বন্ধ?

বন্ধ ছিল। তোরা আসার আগ পর্যন্ত বন্ধই ছিল।

তাহলে খাবার যাবে কোথায়?

জিজ্ঞেস করলাম —

আপনি খেয়েছন?

এইডা কী কইলি? মুই নিজে খাইয়া এই বিয়ানে তোগো ফোন কইরা আনমু? মোর বাপে মোরে কিছু খাওয়ায় নাই?

না। মানে এমনিই বললাম। ঘুমের চোখে হয়তো খেয়েছেন, এখন মনে করতে পারছেন না। আপনি রাগ করছেন কেন?

রাগ অইমু না তো খুশি অইমু? তুই তো দেহি তোর বাপের মতন কতা কছ। মোর অইছে মরণজ্বালা। মোর কতা কেউই বিশ্বাস যায় না। প্যাডের পুলাও না।

কিন্তু খেল কে?

হেই জন্যই তো তোমাগো আইতে কইছি। এইডা তোমরা বুঝো না?

আব্বা থামতে বললেন। তিনি সবকিছু ভালো করে দেখছেন। হাতের ঈশারায় থালা-বাটিতে চেটে চেটে খাওয়ার স্পষ্ট দাগ দেখালেন। মা খেলে না হয় প্লেট চেটে খাবেন কিন্তু এই ছোট্ট বাটিতে তো মুখ ঢুকবে না। একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। ঘটনাটা কী? একটু পরে মা স্বপ্নার বিছানায় এবং থালা-বাটির পাশে বিড়ালের সাদাকালো পশম আবিষ্কার করলেন। আব্বার কথা —

না না। বিড়ালটিড়াল কিছু না। ওগুলো রোগীদের চুল।

ঠিক বুঝতে পারছি না। মানুষের চুল তো এত পাতলা হওয়ার কথা না। আবার বৃদ্ধ রোগীদের চুল হওয়ার সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারো না কারো চুল এ রকম হতেই পারে। নাকি সত্যিই কোনো বিড়াল এসেছিল? মাদ্রাজের এই হাসপাতালে বিড়াল আসা কি সম্ভব? আসতেও পারে। বিড়াল সব দেশেই আছে। আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালগুলো তো বিড়াল-কুকুরের অভয়ারণ্য। সব ধরনের বিড়ালই আছে। রোগীদের যে খাদ্য দেয়া হয়, সেটা অতি দরিদ্র রোগী ছাড়া কেউ খেতে পারে না। অন্যদেরটা বিড়াল-কুকরেই খায়। স্বপ্না চোখ খুলেছে। বেলা বাড়ছে। স্বপ্না বলল —

দাদা। শানু এসেছিল। ওকে খাইয়েছি। আমার কাছে বসে কেঁদেছে। মা, তুমি শুনতে পাওনি?

মা আসলে শুনতে পাননি। কিন্তু কী বলবেন বুঝতে পারছেন না। মনের মধ্যে খটকা লেগে গেছে। মায়ের মনে হচ্ছে শানু ঠিকই এসেছিল। কিন্তু আড়িয়াল খাঁর পাড়ের সেই রাজারচর থেকে যে শানু উত্তর ব্রাহ্মন্দী আসতে পারল না, সে মাদ্রাজে আসবে কী করে? দুপুরে এক ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করলাম —

এই হাসপাতালে কি কোনো বিড়াল আছে?

আমার কথা শুনে ডাক্তার হাসলেন। রসিকতা করে উল্টো জিজ্ঞেস করলেন —

কেন, তুমি কি দু-একটা দেখেছ?

না। তা দেখিনি। কিন্তু...

শোনো, কোনো কিন্তু নেই। এখানে একটা তেলাপোকাও নেই। যদি দেখাতে পারো। তুমি পুরস্কার পাবে। চাকরি যাবে অনেকের।

ডাক্তারের সাফ কথা। কিন্তু কথাটা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারলাম না। এদিক-ওদিক নজর রাখছি। কিন্তু সত্যিই কোনো তেলাপোকা তো দূরে থাক, একটা পিঁপড়াও চোখে পড়ল না। ওষুধের পাশাপাশি এখন শানুর খাবারও কিনতে হয়। নইলে স্বপ্না বিগড়ে যায়। আজ পঞ্চম দিন। হোটেলের মালিক আমাকে মোটামুটি চিনে ফেলেছেন। কপালে চন্দন ফোঁটা মুখে বিরাট হাসি। দেখলেই বলেন —

কী দাদা, দুধ আর মাছ লাগবে তো, বসুন আনিয়ে দিচ্ছি।

 

প্রতিদিনই নাকি শানু এসে মাছ-দুধ খেয়ে যাচ্ছে। গত পরশু থেকে মা-ও নাকি শানুকে দেখছেন। কান্নাও শুনেছেন। মা সম্ভবত এসব এমনিতেই বলছেন। বিশ্বাসযোগ্য কিছু না। তিনি মানসিকভাবে ঘটনার সংক্রমণের শিকার। আব্বা ডা. ব্যানার্জিকে ঘটনাটি খুলে বললেন। ডাক্তার সাহেব স্বপ্নার কেবিনে এসে প্রতিটি জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। থালা-বাটিও দেখলেন। তেমন কোনো কথা বলছেন না। একটা স্কেল দিয়ে বাটির গভীরতা মাপলেন। থালা-বাটি এবং লোমগুলো পরীক্ষা করার জন্য নিয়ে গেলেন। আমি আর আব্বা তাঁর পেছন পেছন গেলাম। তিনি আব্বাকে বললেন —

খাবার আপনার স্ত্রী কিংবা কন্যা দুজনের যে কেউই খেতে পারে।

আমি বললাম —

সেটা কী করে সম্ভব? বাটির মধ্যে তো তাদের মুখই ঢুকবে না। চেটে খাবে কী করে?

খাওয়ার জন্য তো মুখ ঢোকানোর দরকার নেই, বাবা। জিভ দিয়েও তো খাওয়া যায়। মানুষের জিভ চার ইঞ্চি লম্বা। কারো কারো জিভ আরো লম্বা থাকে। আমি মেপে দেখেছি, বাটির গভীরতা সাড়ে চার ইঞ্চি।

ডাক্তারের যুক্তির কাছে বোকা হয়ে গেলাম। তারপর তিনি বললেন —

শুনুন। অনেক কিছুই সম্ভব। থালা-বাটিতে তো মুখের লালা লেগে আছে। এগুলোর টেস্ট করা হোক। দেখবেন, সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। আর লোমগুলোকেও ডিএনএ টেস্টে পাঠাচ্ছি। অপেক্ষা করুন।

আমরা অপেক্ষায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় লাগবে দুদিন। দ্বিধাদ্বন্দ্বে শানুর জন্য খাবার কেনা হলো না। স্বপ্না যখনই জাগে তখনই বলে —

শানুর খাবার দেও নাই কেন? ও ক্ষুধায় কষ্ট পাইতাছে না? তোমরা এ রকম করলে কি শানু বাঁচব?

টেস্টের রেজাল্ট হাতে নিয়ে ডাক্তার ব্যানার্জি স্বপ্নাকে দেখতে এলেন। ডাক্তারের চেহারা ভাবলেশহীন। কিছুই বুঝতে পারছি না। এ এক রহস্য। ডাক্তারদের চেহারা দেখে রোগীর অবস্থা বোঝা কঠিন। এরা সুখে-দুঃখে সব সময় একই চেহারায় থাকতে পারেন। কীভাবে পারেন, কে জানে? কেবিন থেকে বের হওয়ার সময় তিনি আব্বাকে ডাকলেন। আমিও সঙ্গে গেলাম। তিনি বললেন —

ঘটনাটা অন্য রকম। টেস্টের রেজাল্ট পজিটিভ।

আব্বা বললেন —

মানে কী?

মানে সবকিছুতেই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বিড়াল এসেছিল, বিড়ালই খাবার খেয়েছে।

বলেন কী? শানু এসেছিল?

শানু কি না বলতে পারব না, তবে বিড়াল এসেছিল।

এখন কী করব?

কিছু একটা তো অবশ্যই করব। জানেন দাদা, সাড়ে নয় হাজার বছর আগেও প্রাচীন মিসরে মানুষের গৃহে বিড়াল বাস করত। মানুষের এত দীর্ঘদিনের বন্ধু, প্রাণিজগতে আর একটিও নাই। তাজ্জব ব্যাপার!

ব্যাপার তাজ্জব হোক আর যা-ই হোক, এই বিড়ালবিষয়ক জ্ঞান দিয়ে কী করব? আমরা এসেছি চিকিৎসার জন্য, বিড়ালবিষয়ক জ্ঞানের জন্য নয়। কথাটা বলি কী করে? একপর্যায়ে বলেই ফেললাম —

আমাদের এখন কী করা উচিত?

হ্যাঁ। আসছি সেই কথায়। এত অধৈর্য হচ্ছ কেন, বাবা? আমরা বিড়ালটিকে দেখব। সম্ভব হলে বিড়ালটিকে ধরব।

কীভাবে দেখব?

আজ রাতে বিড়ালকে আবার খাবার দিন। আমি কাঁচা মাছ আর দুধের ব্যবস্থা করছি।

তিনি আরো কিছু ব্যবস্থা করলেন। কেবিনে ভিডিও ক্যামেরা বসালেন। আলো জ্বালিয়ে পর্দা ফাঁকা করে রাখা হলো। ডাক্তারের সঙ্গে আমরা পাশের রুম থেকে পর্যবেক্ষণ করছি। রাত বাড়ছে। আমাদের উৎকণ্ঠাও বাড়ছে। সারাটা রাত কেটে গেল কিন্তু কিছুই দেখা গেল না। কিছু অচিন পাখির ডাকে ভোর হলো। আমরা স্বপ্নার কেবিনের দরজায় নক করছি। মায়ের কোনো সাড়াশব্দ নেই। বেশ কয়েকবার ডাকার পর দরজা খুললেন। কেবিনে খাবার নেই। আগের মতোই চেটেপুটে খেয়েছে। স্বপ্না ঘুমোচ্ছে। ডাক্তার ভিডিও রেকর্ড কয়েকবার চেক করলেন। কিছুই পাওয়া গেল না। ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে সবকিছু দেখছেন। থালা-বাটির পাশে কিছু লোম পাওয়া গেল। পরপর তিন রাত একই ঘটনা। শানু কিংবা কোনো বিড়ালের দেখা পাওয়া গেল না। কিন্তু ডাক্তার ব্যানার্জি সহজে ছেড়ে দেয়ার মানুষ নন। পরীক্ষা অব্যাহত রাখলেন। চতুর্থ ও পঞ্চম রাতে বিড়াল খাবার খায়নি। ডাক্তার বাবু বেশ চিন্তিত। পেশাগত দক্ষতায়ও চিন্তার ছাপ লুকাতে পারছেন না। স্বপ্না বেশ ক্ষিপ্তভাবে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল —

আপনি শানুকে মারতে চান কেন?

তিনি চমকে উঠলেন। কোনোমতে নিজেকে সামলে বললেন —

না, না। মারতে চাইব কেন?

স্বপ্না শীতল গলায় বলল —

আপনি খাবারে বিষ মিশিয়ে রেখেছেন, শানু আমাকে বলেছে।

ডাক্তার শুভদ্বীপ ব্যানার্জি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে এতখানি অপ্রস্তুত কখনো হননি। আজ একটা বাচ্চা মেয়ের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারছেন না। মা একবার স্বপ্নার দিকে একবার ডাক্তারের দিকে তাকালেন। সম্ভবত তিনি ব্যাপারটি জানতেন। ডাক্তার ব্যানার্জি চুপচাপ কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন। নিজের রুমে ঢুকে একটু ধাতস্থ হয়ে তিনি বললেন —

দেখুন, পৃথিবীর সব রহস্যের তো কিনারা করা যায় না। আমরা কটাই বা ভেদ করতে পারি, বলুন? সৃষ্টিকর্তা তাঁর হাতেই অনেক কিছু রেখে দিয়েছেন। আপনারা বরং বাড়ি চলে যান। বিড়ালটিকে খুঁজে বের করুন। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন। আপনার মেয়ে ভালো হয়ে যাবে।

বাড়িতে ফেরার পরদিনই ট্রলারভর্তি লোকজন নিয়ে রাজারচরে গেলাম। মা-ও সঙ্গে গেলেন। রাজারচর বদলে গেছে। এখন অন্য রকম। পাট, ধনচে বড় হয়েছে। মানুষসমান উঁচু বড় বড় পাট, ধনচের মধ্যে বিড়াল তো দূরের কথা, গরু-মহিষও খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রতিটি খেতে লাইন ধরে ধরে খোঁজা হচ্ছে। তৃতীয়বার গিয়ে বিড়াল সাইজের একটা কঙ্কাল পাওয়া গেল। কিন্তু স্বপ্নাকে বলা হলো না। নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের প্রাণিবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. খালেদ সাহেব কঙ্কাল নিয়ে ভালো রকম গবেষণা চালিয়ে কয়েক দিন পর বললেন —

কঙ্কালটার চোখের কোটরের সাইজ দেখে বিড়ালই ভেবেছিলাম। কিন্তু ওটা আসলে খাটাশের কঙ্কাল। বিড়ালের থেকে একটু উঁচু এবং বড়।

তাহলে শানু? কোথাও আছে হয়তো...। স্বপ্নার কাছে শানুর একটা ছবি ছিল। সেই ছবি হাট-বাজারে মানুষের হাতে হাতে বিলি করলাম। দেয়ালে দেয়ালে, গাছের সঙ্গে পোস্টার লাগিয়েছি। কারো না কারো চোখে পড়বেই। আমরা প্রতীক্ষায়...। মা সেই কবে থেকে রোজা রাখছেন! নিজে কোরআন খতম দিচ্ছেন, হাফেজি মাদ্রাসায়ও টাকা দিয়েছেন। নফল নামাজ, এতিম খাওয়ানো, আয়না চালান কিছুই বাদ নেই। আর কী করব? শানুকে পেলেই স্বপ্না ভালো হয়ে যাবে। যেসব আত্মীয় আগে স্বপ্না আর শানুকে নিয়ে হাসাহাসি করতেন, তাঁরাও এখন দোয়া করছেন। আশপাশের মসজিদে শিন্নি দেওয়া হলো। স্বপ্নার রোগমুক্তির জন্য দোয়া-খায়েরের আয়োজন করছি, কিন্তু স্বপ্নার শরীরটা আবার খারাপ হচ্ছে। দ্রুত। আশপাশের গ্রামের এমন মানুষ নাই যে স্বপ্নাকে দেখতে আসেনি। প্রতিদিন প্রচুর মানুষ আসে। কেউই চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না।

অনীল স্যার একদিন ভোরবেলা ঠাকুর পূজা দিয়েই চলে এসেছেন। স্বপ্নাকে দেখে তাঁর নির্মলার কথা মনে পড়ল। তাঁর একমাত্র মেয়ে নির্মলা, স্বপ্নার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। বখাটেদের উৎপাতে গত বছর আত্মহত্যা করেছে। স্যার স্বপ্নার পাশে বসে নীরবে কিছুক্ষণ কাঁদলেন।

আগামী পরশু শানুকে ফেলে আসার তিন মাস হবে। এই তিন মাস যে কীভাবে গেছে, তা কি বলে শেষ করা যাবে? যাবে না। শুধু তিন মাস সময়ই যায়নি, আরো কত কিছু যে গেছে! স্বপ্নাও চলে গেছে চার দিন হলো। কিন্তু আজ এই সুবেহ সাদিকে শানু ফিরে এসেছে। বাঁশঝাড়ের নিচে স্বপ্নার কবরের পাশেই আমাদের ভোর হলো। মা শানুকে কাছে ডাকলেন। সে এল না। স্বপ্নার কবরের চারপাশটায় বেশ কয়েকবার ঘোরাঘুরি করল। কবরের মাথার পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকল। মিউ মিউ করে কাঁদল। তারপর শানু নিরবে অথৈ পানিতে নেমে গেল...।

//জেডএস//

x