কমনওয়েলথ পুরস্কার প্রাপ্ত ছোটগল্প

মমতাজ বেগম ০৬:৫১ , জানুয়ারি ১২ , ২০১৮

এবারের ঢাকা লিটফেস্টে প্রকাশিত হয়েছে উদীয়মান কথাসাহিত্যিক সুরাইয়া ফারজানা হাসানের রূপান্তরিত গল্পগ্রন্থ ‘কমনওয়েলথ পুরস্কারপ্রাপ্ত ছোটগল্প’। ভ্রমণ ও অনুবাদ সাহিত্যের মাধ্যমে ইতোমধ্যে তিনি পাঠকের মনে আগ্রহ সৃষ্টি করেছেন। বইটিতে সুরাইয়া ফারজানা হাসান ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কমনওয়েলথ পুরস্কারপ্রাপ্ত মোট ষোলটি ছোটগল্প রূপান্তর করেছেন।

রূপান্তরিত ছোটগল্পগুলোর ওপর আলোচনার শুরুতেই— ‘কমনওয়েলথ পুরস্কারপ্রাপ্ত ছোটগল্প’ বিষয়টা কি— তা নিয়ে পাঠকের মনে এক বিশেষ ঔৎসুক্য জাগবে। সেক্ষেত্রে বইটির ফ্ল্যাপে কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারের পরিচিতি তথা বৃত্তান্ত জানতে পাওয়া যায়। কমনওয়েলথ ছোটগল্প পুরস্কারের লক্ষ্য মূলতঃ কমনওয়েলথভুক্ত  দেশগুলোর কথাসাহিত্যকে বিশ্বদরবারে উপস্থাপন করা। এসব দেশের নবাগত লেখকদের বিশেষ অনুপ্রেরণা দান ও বিশ্বসাহিত্যে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে কমনওয়েলথ রাইটার্স ইনিশিয়েটিভ প্রবর্তন করেছে। এর আওতায় ২০১২ সাল থেকে এশিয়া, আফ্রিকা, কানাডা ও ইউরোপ, ক্যারিবীয় এবং প্রশান্তমহাসাগরীয়— এই পাঁচটি অঞ্চল থেকে সেরা ছোটগল্প নির্বাচন করে পুরস্কৃত করা হয়। এখানে উল্লেখ্য, প্রতিবছর নির্বাচিত ছোটগল্পের মধ্য থেকে একটিকে সেরা ছোটগল্প ও অন্য চারটিকে আঞ্চলিক ছোটগল্প হিসেবে পুরস্কার প্রদান করা হয়।

এবার ফিরে যাই, সুরাইয়া ফারজানা হাসানের রূপান্তরিত ছোটগল্পগুলোতে। গল্পগুলো বিশ্বের বিভিন্নপ্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সমসাময়িক ঘটনা, ইস্যু, জনগোষ্ঠী ও তাদের মনস্তত্ত্ব থেকে শুরু করে সূদুর অতীতের ঘটনাপ্রবাহ উঠে এসেছে। এ কারণে গল্পগুলোর বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে নান্দনিক বৈচিত্র্যের সমারোহ পাঠককে আকৃষ্ট করবে।

বইটির প্রথম গল্প আফ্রিকা অঞ্চলের পুরস্কারপ্রাপ্ত নাইজেরীয় লেখক— আকওয়েকি এমেজির ‘হু ইজ লাইক গড’। গল্পটিতে সদ্য যৌবনে পা দেয়া যুবক অনিয়েদিকাচির স্নায়ুর বিপথগামীতার পাশাপাশি তার মায়ের সমকামীতার শঙ্কার বিষয়টি উঠে এসেছে। নাইজেরীয় ইগবো ও তামিল গোত্রের লেখক আকওয়েকি মূলত নিয়মভাঙার গল্প লেখেন— যেগুলি মানবতার আদর্শবাদী ভাবগুলোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। গল্পটিতে তারই প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়।

এরপরে অস্ট্রেলীয় লেখক ন্যাট নিউম্যানের ‘দ্য ডেথ অব মার্গারেট রো’ গল্পটিতে গ্রিনডট নামের এক ছিমছাম নিরিবিলি শহরের একজন রহস্যাবৃত বয়স্ক ভদ্রলোক—হাভিলাহ্ ব্রাউনের লৈঙ্গিক সংকটের গুপ্ত সত্য প্রকাশ পেয়ে যায় আচম্বিতে; যা পাঠকে চমকে দেবে। আপন সহোদরা মার্গারেট রোর মৃত্যুরপরও তাদের সম্পর্ক নিয়ে লুকোচুরি ও গ্লানি পাঠককে বিম্মিত করবে।

ভারতীয় লেখিকা আনুশকা যশরাজের ‘ড্রয়িং লেসন’ গল্পটিতে একজন উচ্চশিক্ষিত মাঝবয়সী নারী মইরার মাতৃত্বজনিত হতাশা; ও স্বামীর প্রতারণার কারণে সৃষ্ট মনোদৈহিক সংকট দেখানো হয়েছে— যা কি না সময়ভেদে সমকাম রূপে প্রকাশিত। পাশাপাশি তার ড্রয়িং শিক্ষক, প্রবীণ নারী ফ্লোরা ভবানির জীবন সংগ্রাম, টানাপড়েনের আঁচও পাওয়া যায় গল্পটিতে । 

যুক্তরাজ্যের লেখিকা ট্রেসি ফেলসের ‘দ্য নেমিং অব মথস’ গল্পটিতে মৃত্যুপথ যাত্রী নারী মিস বেথানের প্রাপ্ত বয়স্ক দত্তক পুত্র বুদ্ধিপ্রতিবন্ধি এ্যডামের ইহুদি পরিচয়জনিত ভালনারিবিলিটি উঠে এসেছে। এদিকে ওদের হাউজ কিপার ইতালির বোলগনা অঞ্চল হতে আগত যুক্তরাজ্যের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাণিতত্ত্ব বিষয়ে পিএইচডি গবেষক সোফিয়াও যুদ্ধের কারণে ভালনারিবিলিটির সম্মুখীন। তবে এমন দুঃসময়েও চলেছে আভিবাসী সোফিয়া আর অসহায় এ্যাডামের খেলাচ্ছলে মথের নামকরণ।

ক্যারিবীয় লেখক ইনগ্রিড পারসাউদের ‘সুইট সপ’ গল্পটিতে ত্রিনিদাদের এক যুবকের অনন্যোপায় হয়ে আপন জন্মদাতাকে চকোলেট খাওয়ানোর মাধ্যমে মৃত্যুর দুয়ারে ঠেলে দেয়ার এক মিষ্টি ভেজা কষ্ট দেখতে পাই। ভিক্টর নামের যুবকটি তার মার সঙ্গে সম্পর্কছিন্নকারী বাবা রেগিকে চিকিৎসকের নিষেধ স্বত্ত্বেও চুপিচুপি এন্তার চকোলেট খাইয়েছে। বাবার নির্মম পরিণতির জন্য নিজেকে দ্বায়ী ভেবে— সে তাকে পরিণত করেছে অস্বাস্থ্যকর চকোলেট পণ্যের এক অনিয়ন্ত্রিত বাজারে।   

দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক ফারাজ মাহোমেদের ‘দ্য পিজিওন’ গল্পটিতে একব্যাক্তির দুর্ঘটনায় আহত মুমূর্ষু বন্ধু নাথানের প্রেমিকা জেসমিনের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কজনিত মানসিক টানাপড়েন উঠে এসেছে। জেসমিন আর তার এই অবৈধ প্রেমের সম্পর্কের একমাত্র সাক্ষী এক পায়রা। গল্পের শেষ পর্যায়ে পায়রাটার প্রাণ বায়ু বের হয়ে যেতে দেখি। লেখকের ভাষায়— তার চোখ বন্ধ, ঠোঁট শক্ত করে আঁটা— যেন কোনো গোপন কথা বের না হয়ে যায়। তবে পাঠকের মনে শেষ পর্যন্ত স্বস্তি ফিরে আসে— বন্ধু নাথান আর জেসমিনের সম্পর্কটা আবার পুনরুজ্জীবিত হতে দেখে। ওরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

এদিকে ‘ঈল’ গল্পটিতে নিউজিল্যান্ডের লেখিকা স্তেফানি সেড্ডন শিশুকিশোরদের নদীর জলে বিশালাকৃতির ঈল মাছ ধরা ও পরবর্তীতে মৃতমাছটি খেতে গিয়ে মনোবেদনা অভিনব ভাবে তুলে ধরেছেন। গল্পের প্রটাগনিস্ট সাত বছর বয়সী ছোট্ট আর্চি তার বড়ভাই টেড আর প্রতিবেশি যমজ প্যাট্রিক আর আর্থারের সঙ্গে ওদের গ্রামের শেষপ্রান্তের নদীতীরে মাছ ধরতে যায়। নদীতে আর্চি সন্ধান পায় বিশালাকৃতির এক দানব ঈলমাছের যা অনেক কষ্টে শিকার করে ও আর ওর সঙ্গীরা বাড়িতে বয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু হায়, মৃত ঈলমাছের রান্নাকরা টুকরা পাতে নিয়ে ছোট্ট আর্চির মনটা কেঁদে উঠে, সমস্ত বীরত্বভাব উবে যায়।

ভারতীয় লেখক পরাশর কুলকার্নির ‘কাউ এন্ড কোম্পানি’ গল্পে ইংরেজ আমলে ভারতবর্ষে গরু সংক্রান্ত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উন্মাদনা হাস্য কৌতুকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। গল্পের সময়কাল উনিশ শতকের প্রথমদিকে ভারতের মুম্বাই শহর— যখন চার চারজন করিৎকর্মা কর্মচারী হন্যে হয়ে একটি বিশেষ গরু খুঁজে বেড়াচ্ছে, যাকে কিনা তাদের কোম্পানির চ্যুয়িংগামের বিজ্ঞাপন দৃশ্যে দেখা যাবে। আর বিজ্ঞাপনের ক্যাপশন হবে— ‘গো মাতার উপহার, গো মায়ের ভালোবাসার চ্যুয়িংগাম’। এমন অদ্ভুতুরে বিজ্ঞাপন পরিকল্পনার কারণ জিজ্ঞেস করলেন কোম্পানির বড়কর্তা— থম্পসন সাহেব। উত্তরে ছোটকর্তা ম্যানেজার বাবু পেস্তঞ্জি মশায় বললেন— ‘আমার ওপর ভরসা রাখুন স্যার। অনেক ভেবেচিন্তে দেখলাম, আমজনতার কাছে আমাদের পণ্য জনপ্রিয় করার সহজ পন্থা হলো গরুর সাথে আমাদের পন্যাটি জুড়ে দেয়া। ভেবে দেখুন একবার, গরু সারাদিন চিবোয় (জাবর কাটে)। আর হিন্দু মাত্রেই গরু ভালোবাসে। আমরা যদি বিজ্ঞাপনচিত্রে গরু ব্যবহার করি, তাবে তারা অবশ্যই আমাদের চ্যুয়িংগামও ভালোবাসবে।’ এরকম হাস্যরসাত্মক বিষয় দিয়ে গল্পটি ঠাসা— যেগুলো পড়ে একজন পাঠক প্রানখুলে হাসতে পারবে।  

ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর লেখক ল্যান্স ডৌরিচের ‘ইথেলবার্ট এন্ড দ্য ফ্রি চিজ’ গল্পটিতে হাইতির এক নামকরা পনির কোম্পানির এক সাধাসিধে, একনিষ্ঠ ও কঠোর পরিশ্রমী প্যাকেজিং ফোরম্যানকে ঘিরে গড়ে উঠা নির্মম হাস্য পরিহাস মনকে নাড়া দেবে। ইথেলবার্ট জি স্যান্ডিফোর্ড নাকি এই মুহূর্তে পৃথিবীর সেরা সুখী মানব, কারণ দীর্ঘ ষোলটি বছর পর তাকে প্যাকেজিং ফোরম্যান পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। এ রকম করুণ হাস্যরসের মাধ্যমে গল্পের কাহিনি এগোয়; আর সমাপ্তি ঘটে— কোম্পানির উৎপাদিত পনির প্যাকেটজাত করে অতিরিক্ত অংশটুকু চুরির দায়ে ইথেলবার্টের দোষী স্যাব্যস্ত হওয়ার মাধ্যমে।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র ফিজির লেখক মেরি রোকনাদ্রাভুর ‘ফেমিশ ঈল’ গল্পটিতে ভারত থেকে আগত এক অভিবাসী পরিবারের গবেষক সন্তানের শতবর্ষ পূর্বে তাদের শেকড় অর্থাৎ পূর্বপুরষ নারীর রহস্যময় জীবন বৃত্তান্ত খুঁজে বের করার প্রয়াস দেখা যায়। সারাজীবন তার বাবা একটিমাত্র জিনিসেরই খোঁজ করেছেন— তা হলো একজন নারীর জীবন বৃত্তান্ত; পুরাতন ফটোগ্রাফে যার অবয়ব অষ্পষ্টভাবে দেখা যায়। সে নারী ভেলেম্মা কিশোরী অবস্থায় ভারতবর্ষের কলকাতার আশেপাশের এক তীর্থস্থান হতে অপহৃত হয়ে জাহাজে করে ফিজিতে পৌছায়। তার বিড়ম্বিত জীবনে বহু পুরুষের আগমন ঘটে, যাদের মধ্য থেকে একজনের সঙ্গেই গাটছড়া বাঁধে। সে আর কেউ নয়, গবেষকের প্রপিতামহ নারায়না। ফিজির জাতীয় যাদুঘরের সব সরকারি ও ব্যক্তিগত নথি ঘেটে সে প্রকৃত কাহিনি উন্মোচন করে মৃত্যুপথযাত্রী বাবার কাছে ফিরে আসে। তার বাবার চোখে সে ও তার ভাই বোনেরা এক একজন ক্ষুধার্ত বানমাছ, যাদের জন্য আঁধার কালো মেঘ অপেক্ষা করছে; যারা এই পরবাস ফিজিতেই গাড়বে তাদের শক্ত আবাসস্থল। 

নাইজেরীয় বংশোদ্ভুত যুক্তরাজ্যের লেখিকা লেসলি নন্কা আরিমাহ্র ‘লাইট’ গল্পটিতে মায়ের অনুপস্থিতিতে একজন বাবার কিশোরী কন্যাকে আকড়ে ধরে থাকা ও পরবর্তিতে তাকে হারানোর বেদনা; আর কন্যাটির অগ্নিস্ফূলিঙ্গের মতো স্বভাবের নিভে যাওয়ার আশঙ্কাকে তুলে ধরা হয়েছে। এনেবেলি ওকওয়ারা যখন তার কন্যাটিকে সুদূর আমেরিকায় অবস্থানরত তার স্ত্রীর কাছে পাঠাতে বাধ্য হয়, তখন সে সত্যিই জানতো না বাইরের এই মস্ত দুনিয়া কীভাবে তার ছোট্ট কন্যাটিকে গ্রাস করে সম্পূর্ণ অন্তঃসারশুন্য করে আবার তার কাছে ফেরেত পাঠাবে।

চীনের প্রথম পারমাণবিক প্ল্যান্ট ‘ফ্যাক্টরি ২২১’এ কর্মরত এক ভূতত্ত্ববিদ ও তার স্ত্রীর বিরহব্যথা; ভূতত্ত্ববিদের গুপ্ত কর্মকাণ্ড আর করুণ জীবনাবসান— ব্রিটিশ লেখক জোনাথন টেল এর ‘দ্য হিউম্যান ফনোগ্রাফ’ গল্পটির উপজীব্য। ইয়ান আর তার ভূতত্ত্ববিদ স্বামী লিংয়ের (ছদ্মনাম) দাম্পত্য জীবন চীনের পরমাণু শক্তি অর্জনের পথে অসংখ্য বলীদানের একটি দৃষ্টান্ত মাত্র। চীনের কুয়িংহাই প্রদেশের পারমাণবিক প্ল্যান্টে তাদের গোপন একঘেয়ে পরাধীন জীবনে কিছুটা মুক্তির স্বাদ এনে দেয় তার স্বামীর সহকারী চৌদ্রাক। চৌদ্রাক কুয়িংহাই প্রদেশে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির লোকগীতি তাদের একটানা গেয়ে শোনাতো— যার জন্য ইয়ানের স্বামী তাকে ‘হিউম্যান ফনোগ্রাফ’ অর্থাৎ মনুষ্য গ্রামোফোন বলে ডাকতো।    

ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর লেখক কেভিন জ্যারেড হোসেইনের ‘দ্য কিং অব সেটেলমেন্ট-৪’ গল্পটিতে এক কুখ্যাত গুন্ডারাজের সন্ত্রাস আর বিভিষীকা ছড়ানোর কাহিনি। ত্রিনিদাদের সেটেলমেন্ট-৪ এলাকাটি কুখ্যাত এক মাস্তানের হাতে জিম্মি যে নিজেকে রাজা বলে দাবী করে। এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার জন্য মাঝে মাঝে নৃসংস কিছু ঘটনার জন্ম দেয়, যার লক্ষ্যবস্তু সাধারণত ফ্রেডরিক ফস্টারের মতো চালচুলোহীন বখাটে ও উঠতি বয়সের যুবক। এলাকার কিয়স্কতে জড়ো হওয়া এক দঙ্গল কিশোর, যুবকদের সামনে সে ফাঁস দিয়ে ফস্টারের প্রিয় কুকুরটি মেরে ফেলে। তবে, ত্রিনিদাদের এসব ঘটনা নিত্য বলে সংবাদপত্রে এগুলোর ঠাই হয় না; এমনকি পুলিশের কাছে তাদের পরিতোষিকের তুলনায় ঘটনাগুলি নিতান্ত তুচ্ছ বলে মনে হয়; আর এলাকার লোকেরাতো এসব প্রসঙ্গ রীতিমত এড়িয়ে চলে। তবে, এই সেটেলমেন্ট-৪ এ এমনও কিশোর আছে যে বিজ্ঞানের বই হাতে আজেবাজে ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা পেটায়, দেশের শিক্ষার অব্যবস্থা দেখে মনে মনে ফুঁসে উঠে, প্রতিবাদ না করলেও এসব অরাজক অবস্থার সমাধান খুঁজে ফেরে।     

অপরদিকে ভারতীয় লেখক সিদ্ধার্থ গিগোর ‘দ্য আমব্রেলা ম্যান’ গল্পটিতে এক শরণার্থী শিবিরের বয়স্ক বন্দীর ছাড়া পাওয়া; আর অনিশ্চিত গন্তব্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার কাহিনি। সুবোধ আর শান্ত টাইপের লোকটি বন্দিশিবিরে একমাত্র ব্যক্তি যে রোজ রাস্তায় কিছুক্ষণ হাটাহাটি করার বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। বৃষ্টির প্রতীক্ষায় থাকা লোকটির হাতে সবসময় শোভা পায় একটি হলুদ লাল ডোরাকাটা ছাতা— যা তার অতীব গর্বের ধন। বৃষ্টি এসেছিলো সেই রাতে, যার পরদিন তার জীবনের ছাড়া পাওয়ার অন্তিমক্ষণ। দ্বিধা মিশ্রিত মনে সে ছাতা মাথায় বেড়িয়ে পড়ে অনিশ্চিতের পথে।

সিংগাপুরের লেখিকা সারা এডাম অংয়ের ‘আ ডে ইন দ্য ডেথ’ গল্পটিতে উনিশ’শ একুশ সালের প্রেক্ষাপটে চীন থেকে সিংগাপুরে আগত একজন আফিমসেবী কুলির হতাশাজনিত আত্মহত্যা ও সমকালীন খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযুদ্ধ ও সমাজ, রাজনীতি তুলে ধরা হয়েছে। লিম ওহ্ কিই যখন অভুক্ত অবস্থায় একটুরা ঝুটা রশি গলায় পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ে; তখনও কেউ জানে না কেন সে মৃত্যুর এই পথ বেছে নিয়েছে— শুধুমাত্র সহানুভূতি পাওয়ার আশায়, নাকি অন্য কোন সুলভ পথ তার খোলা ছিলো না। তবে সমাজের কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তিই বোধকরি লিম ওহ্ কিই’র মৃত্যু নিয়ে ভাবে না। অথচ এখন থেকে ঊনআশি বছর পর, দু’ হাজার সালে নতুন শতাব্দীর আগমন সিংগাপুরের নেতারা যখন কঠোর পরিশ্রমী নরনারীদের সম্মান সহকারে স্মরণ করবে এই ঐশ্বর্যশালী শহুরে রাষ্ট্র গঠনে তাদেও বিশেষ অবদানের জন্য, তখন সে আর বেঁচে রইবে না তা শোনার জন্য ।

বইটির সবশেষ গল্প— উগান্ডার লেখক জেনিফার নান্সুবুগা মাকুম্বির ‘লেটস টেল দ্য স্টোরি প্রোপারলি’। গল্পটিতে ব্রিটেনে অভিবাসী একজন শিক্ষিত উগান্ডান নারীর স্বামীর আকস্মিক জীবনবসানের পর স্ত্রীর প্রতি তার নির্মম প্রতারণার প্রকৃত গল্পটি উন্মোচিত হয়ে পড়ে। স্বামীর মৃত্যুর পরে শোকাতুরা ননাম জানতে পারে তার উপার্জনের টাকা আর বিশ্বাসের বিনিময়ে স্বামী কায়িতা তার সঙ্গে অবিশ্বস্ততার নির্মম খেলাটা খেলেছে। স্বামী তার অগোচরে প্রাক্তন স্ত্রী-র সঙ্গে সম্পর্কটা চালিয়ে গেছে। তবে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, সেও চায় তার জীবনের গল্পটা সঠিকভাবে বলা হোক।

সবশেষে বলা যায়, লেখক সুরাইয়া ফারজানা হাসান পাঠককে সরাসরি অনুবাদের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দিতে— গল্পগুলো অত্যন্ত স্মার্ট, ঝরঝরে ও প্রাঞ্জল ভাষায় নিজস্ব ঢঙ্গে রূপান্তর করেছেন— যা পড়ে পাঠক বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ও জনগোষ্ঠির মনন, সংস্কৃতি, অভিঘাত, প্রত্যাশা, হতাশা ইত্যাদির সঙ্গে একাত্মবোধ করবে।

কমনওয়েলথ পুরস্কার প্রাপ্ত ছোটগল্প;  রূপান্তর : সুরাইরা ফারজানা হাসান;  প্রকাশক : গল্পকার; প্রচ্ছদ : আজমাইন; প্রকাশ : ঢাকা লিটফেস্ট, ২০১৭; মূল্য : ৩৬০ টাকা।

 

 

//জেডএস//

x