ডায়রি

এমরান কবির ১০:২৯ , ফেব্রুয়ারি ০৯ , ২০১৮

রাত বারোটা বাজতে বেশিক্ষণ বাকি নেই আর। পরী কখনো অন্যমনস্কভাবে কখনো দ্রুত ডায়রির পাতা উল্টাচ্ছে। আজ জুলাই মাসের চার তারিখ।এখটু পরই চার সংখ্যাটা পাঁচ হয়ে যাবে। পরী চায় তার আগেই কিছু লিখতে। বারোটা বাজার কিছুক্ষণ আগে কিছু না লিখলে হয়তোবা আজ আর লেখাই হবে না। সে-রকম কিছু হোক পরী সেটা কিছুতেই চায় না।

প্রতিদিন তো ডায়রি লেখা হয় না! তবে বাদ যাওয়ার সংখ্যাটা একেবারেই কম। আসলে প্রতিদিন লেখার মতো পর্যাপ্ত উপাদানও তো থাকে না। আমাদের জীবন কি এতই ঘটনা বহুল? অবশ্য বিখ্যাত ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলে অন্য কথা। মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা কোনো যুবতীর প্রতিদিন ডায়রি লেখার মতো উপাদান আর কীই বা থাকতে পারে।

তার বয়সী কোনো মেয়ের প্রধান উপাদান তো প্রেমই হওয়ার কথা। অন্য পুরুষের ইশারা ইঙ্গিত কিংবা প্রেমিকের সঙ্গে ভালোবাসার কথাগুলো, মান অভিমান কিংবা না বলা কথাগুলো লিখে লিখে ডায়রি ভরানোর কথা। পরীর এরকম কোনো পুরুষ নেই। তবে হঠাৎ হঠাৎ মনের ভেতরে উঁকি দেয়া অনেক ভালোবাসার কথা সে লেখে। তার প্রতিদিনের নিঃসঙ্গতার কথা, মাকে নিয়ে অনুভূতির কথা, না-দেখা বাবার সঙ্গে গোপনে বলা কথা— এসবই লেখে সে। লিখে নিজেই অবাক হয়। আরে! এ কথা কীভাবে লিখলাম আমি!

যে-দিন তার কোনো কিছু লেখার থাকে না কিংবা লেখার জন্য মুডও পায় না, সে-দিন অন্যমনস্ক হয়ে এক পাতা দুপাতা করে ওল্টায়। পুরোনো দিনের কথাগুলো পড়তে থাকে। কী যে মজা লাগে তার। সে দেখে মানুষ একজনই অথচ একেক দিনের অনুভূতি কেমন আলাদা। অবশ্য এটাই হবার কথা। কারণ একজন মানুষ তো প্রতিদিন একই রকম কাজ করে না কিংবা একই রকম অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যায় না।  মানুষ তো আর কবরের ফলক নয় যে প্রতিদিন তাকে একই চেহারায় দেখা যাবে। মানুষের ফিটনেসও তো প্রতিদিন একই রকম থাকে না। তাহলে তার প্রতিদিনের অনুভূতি একই রকম হবে কেন? বছরান্তে সেই অনুভূতির পরিবর্তন তো অনিবার্যই।

এসব ভেবে পরী একা একা হাসল।

কিন্তু তার তো আজ কিছু লিখতেই হবে। এবং তা এখুনি। এখুনি না লিখলে আজ আর লেখাই হবে না। তার বুক শেলফের একটা অংশ শুধু ডায়রি। এবং সাল অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে সাজানো। সে খুব যত্ন করে ডায়রিগুলো বের করে খাটে গিয়ে বসে। বালিশে হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসে সবচেয়ে পুরোনো ডায়রির আজকের তারিখ বের করে পড়ে। এত অবাক লাগে তখন! পরী দেখে কয়েক বছর আগের এই দিনে সে কী করেছিল, কী ভেবেছিল। তারপর লেখার মতো যদি কিছু না থাকে তাহলে আগের বছরের ভাবনাগুলো নিয়েই সে কিছু লেখে। আজও মনে হয় সেটাই করতে হবে।

চেয়ার ছেড়ে উঠে বিছানায় বালিশটা হেলান দিয়ে রাখলো সে। শেলফের কাছে এসে যখনই সবচেয়ে পুরোনো ডায়রিতে হাত রাখলো তখনই দরজায় নক করল কেউ একজন।

কেউ একজন বলতে তার মা। মা-ই তার একমাত্র একজন। আর আছে ডায়রিগুলো। কত যে আপন এরা! মা মেয়ের সংসারে আর কেউ নেই। না ভালোবাসার। না অন্যকিছুর। দুই রুমের এই ফ্ল্যাটে এগুলো নিয়েই তাদের সংসার। পরীর ঘরের দরোজা সব সময় খোলাই থাকে। তবু মা যদি মেয়ের রুমে আসতে চায় নক করবে। তেমনি মেয়ে যদি মায়ের রুমে যেতে চায় সেও তাই করবে। এরকম কার্টেসি ও ম্যানারিজম শিখে শিখে বড় হয়েছে পরী।

দুই জনের এই ছোট্ট পৃথিবীতে এরকম সৌজন্যের প্রয়োজন আছে বলে মনে করে না পরী। সে মাকে বহুবার বলেছে, দেখ মা এগুলোর প্রয়োজন নেই। মোটে তো আমরা দু’জন। তাও এইসব সৌজন্য করতে হবে?

মা বলে, সবকিছু অনুশীলনের ব্যাপার। অনুশীলন যদি ঘর থেকে না শুরু হয় তাহলে তার ঘাটতি থেকেই যায়। অবচেতন মনে হলেও তার ছাপ পড়ে বাহিরে গিয়ে। তখন মানুষ নেতিবাচক ধারণা করে।

মা’র কথা হয়তোবা ঠিক। কিন্তু এসব কথার মধ্যে কি মাস্টারি মাস্টারি ভাব আছে? পরী খানিকটা ধন্দে পড়ে যায়। আবার ভাবে মাস্টারি ভাব থাকলেই বা কী। বিশ বাইশ বছর মাস্টারি করলে কথার ভেতর একটু মাস্টারি ভাব তো আসতেই পারে।

পরী একটু বিরক্তই হয়েছে। একেতো আজ কিছু লিখতে পারছে না। তার ওপর আবার দরোজায় নক। শুধু তারিখটুকুতেই একটু ঘষামাজা করেছে। ০৪ জুলাই ১৯৯৭।

তার প্রিয় ডায়রিগুলো হাতে নিতে যাচ্ছে, তার একান্ত পৃথিবীর সঙ্গে সে একটা একাত্ম হতে চাচ্ছে ঠিক সে-সময়ই মা এলো। তার মানে আজ সব শেষ। লেখা তো হলোই না পুরোনো দিনের কথাগুলোও পড়া হবে না। একটু পরে এলে কী হতো!

পরী পুরোনো ডায়রির মলাট থেকে হাত সরালো। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, এসো মা।

মা ভেতরে প্রবেশ করলেন। চেয়ার ছেড়ে  পরী খাটে গিয়ে বসল।

মা চেয়ারে বসলেন। তার হাতে ডায়রির মতো কিছু একটা। ডায়রি হতে পারে, পুরোনো কোনো বইও হতে পারে। সে-দিকে পরী খুব বেশি মনোযোগ দিতে পারলো না। কারণ মা তার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছেন যেন পরীকে কোনো দিন দেখেননি অথবা বহুদিন পর দেখছেন।

মা’র এভাবে তাকিয়ে থাকা দেখে পরী এবার লজ্জা পেলো। এই রাতে সে একটু সাজ গোছ করে। চুলটা আঁচড়িয়ে বেঁধে ফেলে। সামনের দিকে রাউন্ড হয়ে ফুলে থাকে চুলগুলো। চোখে একটু কাজল। দুই ভ্রুর মাঝখানে একটা ছোট্ট গোল টিপ। মুখে হালকা মেকাপ।

মা কিছু বললেন না। চেয়ার ছেড়ে উঠে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ ও বেদনা মিশ্রিত বিহ্বল কণ্ঠে বললেন, শুভ জন্মদিন মামুনি।

মায়ের বুকের ভেতর থেকেই পরী এবার সম্বিত ফিরে পেল। তার মানে বারোটা বেজে গেছে! তাহলে মা তো একটুও ভুল করেনি। আমি খামাখা একটু বিরক্ত হয়েছি। নিজের ভেতরে খানিকটা অপরাধবোধ কাজ করছে এখন। পরীর মনে পড়লো প্রতি বছর এই সময়ে মা এভাবেই উইশ করেন।

কিন্তু একটা বিষয় তার কাছে এখনো অমীমাংসিত। সেটা হলো সাধারণত জন্মদিনে উইশ করার সময় সবার কন্ঠেই থাকে আনন্দের ঝরনাধারা। অথচ মা যতবার তাকে উইশ করেন ততবারই যেন আনন্দের সঙ্গে একটা বেদনার ধারাও থাকে।

পরীকে ছেড়ে দিয়ে মা আবার চেয়ারে বসলেন। পরী বলল, মা, তোমার হাতে ওটা কী।

মা বললেন, ডায়রি।

পরী এবার খানিকটা আনন্দিত হলো।  তাহলে মা’ও ডায়রি লেখেন! খুব মজার ব্যাপার তো। এবার অনেক মজা হবে। দুজনের ভাবনাগুলো মিলিয়ে পড়া যাবে। তাৎক্ষণিক একটা প্রশ্নের উত্তরও খেলে যায় পরীর মাথার ভেতরে। মাঝে মাঝে ভাবত সে এই ডায়রি লেখার অভ্যাসটা তার ভেতরে কীভাবে এলো। মা যখন স্কুলে যেত তখন একাকী সময় কাটানোর জন্য সে প্রথমে খাতায় এটা সেটা লিখত। এটা দেখে মা ডায়রি কিনে দিলো। সেই থেকে শুরু। যেন নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলে নিজেকে হালকা করা। আজ পরীর মনে হলো তার এ বিষয়টা নেহায়েত পরিস্থিতিগত নয়, কিছুটা জেনেটিকও বটে।

পরী এখন খুব উচ্ছ্বসিত। তার চোখে আনন্দের ঝিলিক। পরী আনন্দিত হলে তার চোখ দুটো কেমন  খুব উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। চোখের তারাগুলোও কথা বলে ওঠে যেন। এখানে কোনো ভনিতা নেই।

পরী আনন্দে খাট থেকে নেমে এলো। বলল, তোমার ডায়রি! তুমিও ডায়রি লেখ!

পরী যখন খুব আনন্দিত অথবা বিস্মিত হয় তখন একই সঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন করে। বিস্ময়মাখা সে-সব প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতেও তার ধৈর্য খুব কম থাকে।

মা খুব ধীর স্থির এখন। তার ভেতরে কিছুক্ষণ আগেও আনন্দের হালকা একটা ধারা লক্ষ করেছিল পরী। এখন গম্ভীরতা। পরী ভাবল হঠাৎ বেদনা ভর করাতেই হয়তোবা মা এমন গম্ভীর হয়ে গেলেন।

মা বললেন, ‘না । এটা আমার ডায়রি নয়।’

উচ্ছ্বাস কমে গিয়ে এক ধরনের স্থিরতা এসে ভর করলো পরীর ভেতরে। একটা বাড়তি কৌতুহলও।

‘তাহলে কার!’ মুহূর্তে পরীর সকল উচ্ছ্বাস, স্থিরতা ও কৌতুহল বিস্ময়ে পরিণত হলো।

মা’র চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। ঠোঁট কেঁপে উঠল একটু। তবে মা যে কথাটি বললেন তাতে পরীর নিজস্ব পৃথিবীসহ জাগতিক পৃথিবীটাও কেঁপে উঠল যেন। মা বললেন, ‘ডায়রিটা তোমার বাবার।’

পরী নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। মা কী বলছে এসব! বাবার ডায়রি! বাবার ডায়রি আসবে কোত্থেকে! বাবা তো সেই একাত্তরেই শহীদ হয়েছেন। আর এতদিন এ ডায়রি কোথায় ছিল! মা তো এতদিন কত কথাই বলেছেন। কত গল্পই-না করেছেন। জীবন খুঁড়ে খুঁড়ে আনা অভিজ্ঞতার সঞ্চয় ঢেলে দিয়েছেন। যেন জীবনে ঠেকতে না হয় মেয়েটার। কিন্তু এ কথা কেন এতদিন বলেননি মা!

আজ জন্মদিনের এই আনন্দময় মুহূর্তে বাবার ডায়রির অনুপ্রবেশ তার সবকিছু এলোমেলো করে দিলো। তার ভেতরে শত কোটি প্রশ্নের জন্ম দিলো। তারপর কোনোদিন  না-দেখা বাবার কথা খুব বেশি মনে পড়ালো। পরীর মনো হলো তার না দেখা বাবাও যেন আজ তাকে জড়িয়ে ধরে বলছে, ‘শুভ জন্মদিন মামুনি।’

পরীর চোখের সামনে মা ঝাপসা হতে থাকলেন। মা’র হাতে (হয়তো) একদা হালকা নীল, এখন খুব বিবর্ণ ডায়রিটাও ঝাপসা হতে থাকলো।

 

দুই

পরী কান্না করতে পারে শব্দ ছাড়াই। কীভাবে কীভাবে যেন এই অভ্যাসটা হয়ে গেছে তার। শুধু নিচের ঠোঁটটা একটু বাঁকা হয়ে যাবে। তারপর চোখ দিয়ে পানি পড়ে অঝোর ধারায়। মাঝে মাঝে শরীরটা কেঁপে উঠবে। এটুকুই। হয়তোবা শৈশব কৈশরের অভিমানী কষ্টগুলো মাকে বুঝতে না দেয়ার ইচ্ছা থেকেই অভ্যাসটির জন্ম। আজ মায়ের কাছে এরকম একটি কথা শুনে পরীর ভেতরের সকল চাঞ্চল্য কোথায় যেন দূর হয়ে গেল! সারা শরীর অবশ হতে থাকলো। মাকে ছেড়ে দিয়ে সে দাঁড়িয়েই ছিল। মার মুখে বাবার ডায়রির কথা শুনে সে খাটে বসে পড়েছিল। ডায়রির দিকে তাকানোর পর যখন চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো তখন সে শুয়ে পড়ছে। তারপর চোখ দিয়ে অঝোর ধারার পানি।

মায়ের ওপর একটা অভিমান চলে এলো পরীর। এতদিন এই কথাটি মা গোপন করলেন কীভাবে? কীভাবে পারলেন। বাবার এরকম একটি স্মৃতি এতদিন মায়ের কাছে ছিল! সে জানতেও পারেনি!

প্রতি বছর অক্টোবর মাসের ০৭ তারিখে মা একটি কাজ করেন। গভীর রাতে মা পরীকে ডেকে তুলতেন। ছোটবেলায় বিষয়টি বুঝতে না পারলেও আস্তে আস্তে সব কিছু বুঝে ফেলে পরী। জ্ঞান বুদ্ধি হবার পর থেকে পরীও ওই রাতটির জন্য অপেক্ষা করে।

বহু পুরোনো একটি ট্রাঙ্ক বের করেন মা। নীল খয়েরি ও কাঁঠালি রঙের স্ট্রাইপ করা ওই ট্রাঙ্কটির বয়স যে অনেক তা বুঝা যায় এর ফিকে হয়ে যাওয়া রং দেখে, বিভিন্ন জায়গা থেকে রং উঠে যাওয়া দেখে। কালো ছোট্ট একটা তালা দিয়ে আটকানো থাকে। মা চাবি বের করে তালাটি খুলেন। টাক করে ছ্ট্টো একটা শব্দ হয়। মা ট্রাঙ্কটি উন্মুক্ত করেন। ন্যাপথালিনের গন্ধ অতিক্রম করে অন্য একটা সুবাস এসে লাগে পরীর নাকে। বুক ভরে সে গন্ধটি নিযে নেয় পরি। পরী কোনো কিছুতেই হাত দেয় না। গুটি মেরে বসে থেকে মাকে সঙ্গ দেয়। ট্রাঙ্কের ভেতরে হাত দিয়ে মা প্রথমে একটা রুমাল বের করেন। ভাঁজ খুলে নিজে দেখেন, পরীকে দেখান। আলতো করে মা হাত ছোঁয়ানোর পর পরী ছোঁয়। পরী জানে এটা বাবা-মা’র বিয়ের স্মৃতি। বাবা মা’র একটিমাত্র ছবিই আছে তাদের সংগ্রহে। সেটি বিয়ের। বাবা রুমাল দিয়ে ঠোঁট ঢেকে রেখেছেন। মা কখনো বলেনি এই রুমালের কথা। কিন্তু পরী ছবি দেখে বুঝে নিয়েছে এটা সেই রুমাল।

মা রুমালটি আগের মতো ভাঁজ করে রাখেন। তারপর বের করেন একটি নীল রঙের চাদর। সেটারও ভাঁজ খোলেন। মমতার স্পর্শ বুলিয়ে দেন মা মেয়ে। তারপর বের করেন একটা লাল শাড়ী। পরী বুঝতে পারে এটা বিয়ের শাড়ী। এই শাড়িটি রাখার পর যে কাপড়টি তিনি বের করবেন সেটাও পরীর মুখস্থ হয়ে গেছে এতদিনে। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া হাফ হাতা এক হাওয়াই শার্ট। মা এটার ভাঁজ খুলবেন না। সরাসরি বুকে চেপে ধরবেন। ওই অবস্থাতেই পরীকেও বুকে টেনে নেবেন। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া এক হাফ হাতা হাওয়াই শার্টকে ঘিরে দেখা যাবে মা মেয়ে একাত্ম হয়ে আছে। তখন তাদের ভেতরে একটাই ভাষা বিনিময় হচ্ছে। ভাষাটির নাম চোখের পানি।

পরী জানে এটাই তার বাবার সর্বশেষ স্মৃতি। মা বলেছেন। বাবা যে-দিন রাতে সর্বশেষ এসেছিলেন বাড়িতে তখন এই শার্টটিই তাঁর গায়ে ছিল। খুব ময়লা হয়ে যাওয়াতে ওটা মা রেখে দিয়েছিলেন। ময়লা ধোয়া হয়েছে ঠিকই। কিন্তু শার্টের মানুষটি ফিরে আসেনি।

মা আর কিছু বের করবেন না। শার্টটি আগের জায়গায় রেখে দেবেন। তারপর একে এক সবগুলো কাপড় রেখে দিয়ে তালা দিয়ে ট্রাঙ্কটিকে আগের জায়গায় রেখে দেবেন। তারপর একসঙ্গে ঘুমুতে যাবেন।

একসময় মা দুইটা শার্ট বের করতেন। এখন একটা করেন। কারণ একটা শার্ট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মা এটা নিয়ে খোঁজাখুঁজি করেননি। কারণ মা জানেন এই শার্টটা হারিয়ে যায়নি। শার্টটা পরীর কাছে আছে। মেয়েটা বাবাকে পায়নি। বাবার একটা শার্ট পেয়েছে শুধু। এই সুখটুকু কেড়ে নিতে চাননি মা।

মা উঠে এলেন। মেয়ের কাছে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলালেন। চোখের পানি মুছে দিলেন। অন্য সময়ে পরী উঠে মাকে জড়িয়ে ধরতো। আজ তা করলো না। শুয়েই থাকলো। মা ডায়রিটা পরীর হাতে তুলে দিলেন। কিছু বললেন না।

পরী ডায়রিটা নিয়ে বুকে শক্ত করে চেপে ধরলো। একটু সরালো না। কিছু বলল না।

 

তিন

লাইট নেভানো হয়েছে। মা ঘুমের ভান করে শুয়ে আছেন। পরী এখনো ডায়রিটা বুকে চেপে আছে। এখন কান্না লাগছে না আর। কারণ বাবার গায়ের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। পরী বিস্মিত হচ্ছে শার্টে পাওয়া বাবার গন্ধের সঙ্গে ডায়রি থেকে পাওয়া গন্ধের অপূর্ব মিল। এটা কোনোভাবেই মানসিক বিভ্রম হতে পারে না। শার্ট তো কাপড়ের তৈরি। ডায়রি কাগজের। পুরোনো জিনিসের এক ধরনের  গড়পড়তা গন্ধ থাকে। কিন্তু কাপড় এবং কাগজের গন্ধ আলাদা হবেই। পরী সুক্ষ্মভাবে অনুভব করলো যে শার্টে পাওয়া গন্ধটিই ডায়রি থেকে আসছে। আহা! বাবা!

পরী বাবার চেহারাটা মনে করার চেষ্টা করলো। লম্বা টিকানো নাক। গভীর মায়াবী চোখ। উঁচু কপাল। নাকের পাশে কালো তিল। বাবার চুল কেমন ছিল পরী জানে না। কারণ বিয়ের ছবিতে চুল ঢাকা থাকে টুপিতে। ঠোঁট ঢাকা থাকে রুমালে। ওই একটি ছবিই বাবার সকল রূপ নিয়ে এসেছে তার জীবনে। ছবিতে দেখা এই অবয়বের মানুষটির সঙ্গেই তার কথা হয়। মা এ কথা জানেন না। মাকে এ কথা জানানো যাবে না। এটা একান্তই তার ও বাবার ব্যপার। কিন্তু বাবা এতো এতো কথা বলেন কিন্তু ডায়রির কথা একদিনও বলেননি কেন!

পরী পাশ ফিরে শুলো। ডায়রিটা বুক থেকে নামালো না তবুও।

খুব সকালে ঘুম ভেঙে যায় মায়ের। মা উঠলেন। পরী তখনও ঘুমাচ্ছে। বুকের উপরে তখনও ডায়রিটা। এক হাত ডায়রির উপরে। আহা পরী! মায়ের বুকটা আরেকবার হাহাকার করে উঠলো। বিছানা ছেড়ে উঠতেই মায়ের হাত টেনে ধরলো পরী। ও মা! মেয়েটা তাহলে জেগেই ছিল! ঘুমায়নি!

পরী মাকে বুকের ভেতরে টেনে নিলো। মাথাটা বুকের উপরে রেখে চেপে ধরে থাকলো কিছুক্ষণ। মেয়ের বুকে মাথা রেখেই মা বললেন, ‘ঘুমাওনি?’

‘ঘুমিয়েছিলাম। তুমি ওঠার সময় জাগা পেয়েছি।’

‘মা, একটা জিনিস লক্ষ করেছো?’

‘কী?’

‘বাবার ডায়রি থেকে একটা গন্ধ আসছে। বাবার গায়ের গন্ধ।’

মা পরীর বুক থেকে মাথা তুললেন। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বের হয়ে এলো তাঁর বুক চিড়ে। মা মেয়ে দুজনেই উঠে বসলো। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর পরী বলল, ‘মা, যাও, নামাজ পড়ো।’

 

চার

পরী এখনও ডায়রিটা খোলেনি। ডায়রিটা বুকে চেপে ধরে আছে অনেক্ষণ। মলাটে হাত বুলিয়েছে। গন্ধ শুঁকেছে। চুমু খেয়েছে। ভেবে রেখেছে ডায়রিটা সে এখন পড়বে না। কোনো এক খুশির মুহূর্ত থেকে পড়া শুরু করবে। তার আগে জানতে হবে মা কেন এতদিন এই ডায়রিটার কথা গোপন রেখেছিলেন। এত বড় একটি বিষয় মা গোপন রাখলেন কী করে! প্রথমে রাগ লেগেছিল। পরে মনে হয়েছে জীবন-সংগ্রামী এই মানুষটি এমনি এমনি এটা গোপন করেননি। কোনো না কোনো কারণ ছিলোই। রাজধানীর বুকে খুব কঠিন সংগ্রাম করে করে টিকে থাকা এই মানুষটির এক মেয়ে ছাড়া তেমন কোনো আত্মীয় স্বজন নেই। থাকলেও যোগাযোগ নেই। কে কোথায় আছে তাও জানা নেই। থাকলে তো আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আসা যাওয়ার পর্বটি চালু থাকতো। এমনকি ছোটবেলা থেকে দেখে দেখে অভ্যস্ত পরীও কিছু জিজ্ঞেস করেনি। শুধু জেনেছে একাত্তর সালে তার বাবা স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। এটুকুই। এর বেশি কিছু তার জানা হয়নি।

মা এসে বললেন, ‘তোমাকে কিছু কথা বলা দরকার।’

এ কথা শুনে পরী তার দীর্ঘ আঁখি পল্লব মেলে মায়ের দিকে তাকালো। মা বললেন, ‘তুমি নিশ্চয় ভাবছো এতদিন এই ডায়রিটার কথা তোমার কাছে গোপন করেছি কেন? তাই না?’

পরী মাথা নিচু করল। মনের কথা বলে দিলে মায়ের সামনে এমনই করে পরী।

‘আসলে আমি গোপন করিনি। তোমাকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বলতে চেয়েছি। এখন সে-সময় এসেছে বলে আমি মনে করছি। সব সময় সব বয়সে সব কথা বলা যায় না। আজ তোমার বয়স পঁচিশ হয়েছে। অনেক কিছুই বুঝতে শিখেছো। অনেক কিছুই মেনে নেয়ার সামর্থও হয়েছে। আমিও এতদিন অনেক কিছু একা একা বয়ে চলেছি। আমি চাই তুমি আজ থেকে সেগুলোর অংশীদার হবে।’

পরী তার গোলাকার মুখটি তুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, ‘মা!’

মা বলা শুরু করলেন, ‘তুমি জানো, তোমার জন্ম ঢাকায়। কিন্তু জানো না তোমার দেশের বাড়ি কোথায়। আই মিন বাবার বাড়ি। তোমার বাবার বাড়ি বগুড়ায়। বগুড়া শহর থেকে আট-নয় কিলোমিটার দূরে গোকুল ইউনিয়নে অবস্থিত রামশহর নামক গ্রামটিই তোমার গ্রামের বাড়ি। এ গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবার বিখ্যাত সুফী ডাক্তার ক্বাহরুল্লাহ পীর সাহেব তোমার পূর্ব পুরুষ। এই পরিবারেরই ছেলে জিল্লুর রহমান জলিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার দুইবছর আগে তাঁর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। যুদ্ধ শুরু হলে তোমার বাবাসহ এই পরিবারের তিন সন্তান সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তোমার চাচা মাকসুদুর রহমান এবং সম্পর্কে ফুপাত ভাই তোফাজ্জল হোসেন জিন্নাহ। ওই এলাকার মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত গোকুল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তসলিম উদ্দীন-এর সঙ্গে পীরবাড়ীর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। দূরত্ব ছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তোর বাবাসহ পীর বাড়ির কয়েকজন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। বিষয়টা তারা ভালো ভাবে গ্রহণ করেনি। এলাকার প্রভাবশালী হলেও আমরা একটু ভয়ে ভয়েই থাকতাম। এরই মধ্যে একটা মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল।’

পরী বলল, ‘কী দুর্ঘটনা মা? বাবা...পরী শেষ করতে পারল না।

‘বিষয়টি তোমার বাবার নয়। তিনি তখন ভারতে ছিলেন। দ্বিতীয় দফা প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন। যাবার আগে তিনজনই এসেছিলেন দেখা করতে। ওইদিন না এলে আমার জীবনের গতিপ্রবাহটাও বদলে যেত। কারণ ওই রাতে তোমার বাবা আমাকে একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস উপহার দেয়। সেদিনই আমাদের শেষ দেখা।

তোমার বাবা চলে যাবার মাস দেড়েক পরের ঘটনা। সেদিন ছিল ১৩ নভেম্বর, ২৬ কার্তিক। রোজার মাস ছিল। সেহেরি খাওয়ার জন্য আমরা সবাই উঠেছি। পীর বাড়ির শরিকানা ছিল অনেক। তোমার দাদারা ছিলেন ছয় ভাই। তাদেরও পরিবার ছিল। বিশাল বাড়ি। একই বাড়ি হলেও শরীকানারা আলাদা আলাদা খেত। ঠিক যৌথ পরিবার ছিলো না। পীর বাড়ির সবাই সেহেরি খাওয়ার জন্য উঠেছে। তখন দরোজায় কড়া নাড়ার শব্দ। আমরা ভেবেছি তোমার বাবাসহ যারা যুদ্ধে গিয়েছে তারা এসেছে। বাড়ির কাজের মেয়েকে দরজা খুলতে বলা হলো। তারপরই ভারি বুটের শব্দে কেঁপে উঠলো পুরো পীরবাড়ী। প্রথমেই তারা এসে তোমার এক দাদা হাবিবুর রহমানকে পিছমোড়া দিয়ে বেঁধে ফেলল। এটা দেখে তোমার আরেক দাদা তবিবুর রহমান প্রাচীর টপকে পালাতে চাইলো। এক পাক সেনা তাকে লক্ষ করে গুলি করল। প্রাচীরের ওপাশে ধপাশ করে একটা শব্দ হলো। ভয়ে যে যার মতো দরোজা আটকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। গদীনশীন পীর তোমার দাদা মৌলভী বেলায়েত হোসেন তখন সেহেরি খাচ্ছিলেন। ভারি বুটের শব্দ, কয়েকটি গুলি, পিছমোড়া দিয়ে তার এক ভাইকে বেঁধে নির্যাতন এসব দেখে তিনি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে দোয়া দরুদ পড়তে লাগলেন। এ অবস্থা দেখে তোমার দাদি এবং আমি তাঁকে পালিয়ে যাবার কথা বললাম। তিনি রাজি হলেন না। তিনি পায়চারী করতে লাগলেন। আর বলতে লাগলেন, ‘ওরা তো হবি ভাইকে বেঁধে ফেলেছে। এখন কী করি!’

তোমার এক কাকা ছিল। জাহিদুর রহমান মুকুল। তখন ক্লাস এইটে পড়ত। খুব মেধাবী ছিল। দরোজা বন্ধই ছিল। বাহিরের কোলাহল শুনে সে তার বালক সুলভ চঞ্চলতায় দরোজা ফাঁক করে একটু। তাতে একটু শব্দ হয়। তখনই এক পাকসেনা দরোজা বরাবর গুলি করে। গুলির শব্দে ভীত হয়ে মুকুল মাটিতে পড়ে যায়। তখনও মুকুল গুলিবিদ্ধ হয়নি। গুলিটি ঘরের দরোজায় বিদ্ধ হয়। মুকুল ভয়ে তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁপতে থাকে। তিনি তখন মুকুলসহ আমাকে নিয়ে খাটের নিচে চলে যান। তোমার দাদা তখন খুব প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। তিনি অস্থির হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যান। পাকসেনাদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, আমরা নির্দোষ। আমাদের কেন ধরা হবে। আমাদেরকে ছেড়ে দেয়া হোক। তখন এক পাক সেনার নির্দেশে অন্যরা এসে তাঁকেও বেঁধে ফেলে। মুকুলকে আমরা ধরেছিলাম। কিন্তু বাবার বাহিরে যাওয়া দেখে বের হয়ে আসে। আমি তখন আসতে চেয়েছিলাম। তোর দাদি আমাকে আটকে রেখেছিলেন। সম্ভ্রম হারানোর ভয়ে। মুকুল তার বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। পাকসেনারা তাকেও বেঁধে ফেলে। তোর আরেক দাদা লালু। লালুর ঘরের দরোজা তখনও বন্ধ ছিল। অনেক ধাক্কাধাক্কি করার পরও সে বাহিরে না আসায় পাক হানাদাররা রাজাকারদের সহায়তায় ঘরের দরোজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে। ভয়ে তিনি বিছানায় ঘুমের ভান করে পড়ে থাকেন। ঘর তল্লাশি করা হয়। খুঁজে পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর একটি ছবি এবং একটি বড় ছোড়া। পাকসেনারা সেই ছোরা দিয়েই খোঁচাতে শুরু করে লালুকে। লালুর গগনবিদারী চিৎকারে গ্রামবাসীরা জেগে ওঠে। আহত রক্তাক্ত লালুকে এনে বসানো হয় বাড়ির অন্যান্যদের সঙ্গে। পীর বাড়ির যে-সকল পুরুষ বাড়িতে বর্তমান ছিল একে একে সবাইকে বন্দী করা হয়। মজিবর, হায়দার, বুলু ও মকসেদকে অন্যবাড়ি থেকে ধরে আনা হয়। তোমার আরেক দাদা ছিলেন। দবির উদ্দিন । তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। সবাই তাকে দবির পণ্ডিত বলে ডাকতেন। উনার টাইফয়েড হয়েছিল। তাঁকেও বেঁধে ফেলা হলো। এভাবে পীর বাড়ির সাতজনসহ এগারোজনকে লাইনে দাঁড় করানো হলো। পীর সাহেব তাদেরকে অনুনয় করলেন, আমাকে একটু তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে দেয়া হোক। ওরা দিলো না। সবাইকে যখন বাঁধা হয়ে গেছে তখন তিনি আবার বললেন, আমাকে ফজরের নামাজটা পড়তে দেয়া হোক। এ কথা শুনে কাজের মেয়ে সেদিকে যাচ্ছিল। মনে হয় সে অজুর পানি দেবার কথা ভাবছিল। পাকসেনাদের একজন মেয়েটির পায়ে গুলি করলো। উপুড় হয়ে পড়ে থাকলো কাজের মেয়েটি। আর গগনবিদরী চিৎকার পৌঁছে গেল সবার কানে। তার একটু পরেই গর্জে উঠল পাকসেনাদের সব কটি রাইফেল। কী যে ভয়ঙ্কর শব্দ! আর চিৎকার!

আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। জ্ঞান ফেরার পর দেখি আঙিনায় এগারোটি লাশের সারি। বাড়িতে হাজার হাজার লোক। আমি আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’

পরীর গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে ঢোক গিলছে বারবার। মাকে বলল, ‘তারপর...

‘তারপর থেকেই আমি অসুস্থ হতে থাকি। আমাকে ডাক্তার দেখানো হয়। সুস্থ হয়ে উঠি না। তোমার নানা তখনও বেঁচে ছিলেন। তিনি আমাকে ঢাকায় আনলেন চিকিৎসা করানোর জন্য। খবর এলো তোমার বাবা শহীদ হয়েছেন। পীর বাড়ি থেকে যুদ্ধে গিয়েছিল তিনজন। ফিরে এলো দুইজন। আমি জোর করে আবার শ্বশুরবাড়ি গেলাম। কিন্তু আবার অসুস্থ হয়ে পড়লাম। ডাক্তার বলল, এখানে আমাকে আনা যাবে না। কারণ ওই ভয়ঙ্কর ঘটনা চোখের সামনে ঘটাতে মানসিকভাবে চরম ক্ষতিগস্থ হয়েছি আমি। এজন্য ওখানে গেলেই আমার সব ঘটনা চোখের সামনে চলে আসে। এরই মধ্যে আমি টের পেয়েছি আমার শরীরে তোমার অস্তিত্ব।

ডাক্তার সাহেব বাবাকে বুঝালেন, এই ঘটনার অভিঘাত থেকে দূরে আসতে অনেক সময় লাগবে। ততদিন ওখানে না যাওয়াই ভালো। এরকম শারীরিক মানসিক অসুস্থতার মধ্যেই তোমার জন্ম হলো। বাবাই ছিলেন আমার ওই সময়ের সবকিছু। ধীরে ধীরে তুমি বড় হতে থাকলে। বাবা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আমিও আর শ্বশুরবাড়ী গেলাম না। ওই দুঃসহ স্মৃতি হয়তোবা আমাকে অতটা অসুস্থ করে দিতো না যদি না তোমার বাবা শহীদ হতেন। আমার আর কী থাকে বলো। আমার আর যাওয়া হলো না।’

মা এখন শব্দ করে কাঁদতে শুরু করেছেন। পরী এসে মাকে জড়িয়ে ধরলো। মা অনেকক্ষণ ধরে শব্দ করে কাঁদলেন। পরী তাঁর কান্না একটুও থামানোর চেষ্টা করলো না।

মা একটু স্বাভাবিক হয়ে উঠলে পরী জিজ্ঞেস করলো, ‘পাক সেনারা এভাবে সবাইকে চিনলো কীভাবে?’

‘স্থানীয় দুই রাজাকার চিনিয়ে দিয়েছে। একজন মতি রাজাকার, যে ছিল তসলিম উদ্দিন পাঁড়ের ছেলে। আরেকজন তাহের মওলানা। যুদ্ধচলাকালীন তসলিম উদ্দিনকে মেরে ফেলা হয়। ওরা সন্দেহ করেছিল এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পীরবাড়ীর জোগসাজশ আছে। দেশ স্বাধীন হলে মুক্তিযোদ্ধারা মতি রাজাকারকে মেরে ফেলে।’

‘কিন্তু তুমি একবারও গেলে না আর? একবারও না!’

‘যাইনি ভয়ে।’

‘কীসের ভয়?’

‘আবার অসুস্থ হয়ে যাবার ভয়ে। আমি অসুস্থ হয়ে গেলে তোমাকে কে দেখবে।’

‘কিন্তু আমার বাবার বাড়ি থেকে তোমার কোনো খোঁজ করল না কেউ?’

‘খোঁজ রেখেছে। কয়েক দফা বাসা চেঞ্জ করার পর তারা মনে হয় ঠিকানা পায়নি। আমিও ঠিকানা জানাইনি।’

‘মা, আমি যদি ওখানে যেতে চাই তুমি রাগ করবে?’

মা কিছু বললেন না। শুধু পরীকে জরিয়ে ধরলেন।

 

পাঁচ

বগুড়ার চারমাথায় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেলো। এস আর ট্রাভেলসের বাস থেকে নেমে মা মেয়ে দুজনই বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো। মা দেখলেন কত বদলে গেছে সবকিছু। আর পরীর কাছে তো সবকিছুই নতুন। একটা রিকসা ঠিক করল তারা। রংপুর বিশ্বরোড থেকে গোকুলের দিকে যেতে শুরু করেছে তাদের রিকসা। একটু যাবার পরই মা মেয়েকে একটা স্কুলের নেমপ্লেটের দিকে ইশারা করল। পরী পড়ল তসলিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়। পরী অবাক হয়ে বলল, মা! উনি না স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন? তাহলে এখনও তার নামে স্কুল থাকে কীভাবে?

মা বললেন, ‘পঁচাত্তরের পর থেকে তো ওরাই ক্ষমতায় ছিলো। নাম বদলাবে কীভাবে।’

একটু পরই মা ডানদিকে ইশারা করলেন। বেহুলার বাসরঘর। পরীর এসবের দিকে একটুও মন নেই। একজন স্বাধীনতা বিরোধীর নামে স্কুলের নামকরণ তার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো। তার ওপর চলে এসেছে তার বাবার গ্রামের কাছাকাছি। বাবার কত পদচারণা ছিল এইসব এলাকায়। কিছুক্ষণ পরই পরীর নাকে এসে লাগলো বাবার শার্ট ও ডায়রি থেকে আসা গন্ধ। পরী বলল, ‘মা, আমরা কি খুব কাছাকাছি চলে এসেছি!’

মা কিছু বলার আগেই রিকসাওয়ালা বলল, ‘হ। আর মিনিট পাঁচেক পরই পীরবাড়ী এসে পড়বে। কিন্তু আপনারা কে কইলেন না তো। আমি এই এলাকার সবাইকে চিনি।’

পরী মায়ের হাতে একটি মৃদু চাপ দিলো। আস্তে আস্তে বলল, ‘মা, বাবার গায়ের সেই গন্ধ।’

মা চুপ করে রইলেন।

বাড়ির সামনে এসে রিকসা থামলো। বিশাল গেটে বড় বড় অক্ষরে লেখা আল্লামা সুফী ডাক্তার ক্বাহরুল্লাহ (রহ.) এর দরগা শরীফ।

তখন বিকেল ও সন্ধ্যার মাঝামাঝি সময়। পীর বাড়ির বারান্দায় এক বৃদ্ধা মহিলা বসে আছেন। মা রিকসা থেকে নেমে সোজা সেই মহিলার কাছে গেলেন। মহিলা তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে আছেন। মা গিয়ে মহিলার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলেন। তারপর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। মহিলা খুব অবাক হয়ে বলতে লাগলো কে তুমি? কে তুমি? জড়িয়ে ধরা অবস্থাতেই খুব অবাক হয়ে মহিলা পরীকে দেখতে থাকলেন। তারপর চিৎকার করে বললেন, ‘এই মেয়ে তুমি কে? তোমাকে এত চেনা লাগে কেন? তুমি দেখতে আমার জলিলের মতো কেন?’

এবার মহিলাও কাঁদতে শুরু করলেন। মা মহিলাকে ছেড়ে দিলেন। বৃদ্ধা মহিলা, খুব অবাক হয়ে বললেন, ‘জলি! বউ মা! তুমি এতদিন পর! এই মেয়েটা...

মা, বললেন, ‘আম্মা, এই মেয়েটা আপনাদের সন্তান।’

বৃদ্ধা মহিলা এসে পরীকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল।

ইতিমধ্যে পীরবাড়িতে হই চই পড়ে গেছে। সবাই এসে তাদেরকে পরম যত্নে ভেতরে নিয়ে গেল। বৃদ্ধা মহিলা আমেনা বেগম পরীর দাদি। জলি বেগমের শ্বাশুড়ি। দীর্ঘদিন পর পুত্রবধু আর নাতনিকে পেয়ে তিনিসহ সবাই খুব আবেগাপ্লুত। আমিনা বেগম তাদেরকে নিয়ে গেলেন পারিবারিক কবরস্থানে। পরীর হাত ধরে থাকলেন সারাক্ষণ। আঙুল তুলে একটা কবর দেখিয়ে বললেন, এটা তোমার বাবার কবর। জলি বেগম খুব অবাক হলেন। শাশুড়িকে বললেন, ‘মা, এটা তো দেখি নতুন...।’

আমেনা বেগম বললেন, আমরা যা শুনেছিলাম সেটা ছিল ভুল। জলিল শহীদ হয় নাই। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিল। সবাই ভেবেছিল সে মারা গেছে। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সে বাড়ি ফিরেছিল। আমরা তাকে পেয়ে অনেক হারানোর মাঝে একটু সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছিলাম। কিন্তু সে ভাবতে শুরু করেছিল তার জন্যই এতবড় হৃদয় বিদারক ঘটনার জন্ম। নিজের ভেতরে এক ধরনের অপরাধবোধ ধরে বসেছিল। তারমধ্যে তুমিও ছিলে না। তোমার সঙ্গে যোগাযোগও ছিল না। একদিন সে নিখোঁজ হয়ে যায়। আমরা অনেক খোঁজাখুঁজি করি। পাই না। প্রায় বিশ বছর পর সে ফিরে আসে। বলে, সে আবার ভারতে চলে গিয়েছিল। অসুস্থ হয়ে দীর্ঘদিন একটা হাসপাতালে ছিল। স্মৃতি শক্তি ছিল না। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও তাকে ফেরত পাঠাতে পারেনি। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর তার স্মৃতিশক্তি ফিরে এলে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয় । কিন্তু সে পুরোপুরি সুস্থ ছিলো না। বারান্দায় যেখানে আমি বসেছিলাম ঠিক ওই জায়গাতে বসে থাকতো। আর বলত, দেখো মা একদিন জলি ফিরে আসবে। সঙ্গে আমার মেয়ে পরী। আমি চলে গেলে তুমি এখানেই বসে থেকো। ওরা এসে তোমাকে না পেলে ফিরে যাবে। ওরা ফিরে গেলে আমার খুব কষ্ট হবে।’

আমেনা বেগম একটু থেমে আবার বলা শুরু করলেন, ‘তারপর জলিল খুব অসুস্থ হয়ে গেলো। যতক্ষণ জ্ঞান ছিল ততক্ষণই এই একই কথা বলত। এরপর পনেরো দিন আগে চলে গেল একেবারে।’

মা মেয়ে দু’জনই কবরে হাত রাখলো। তাদের চোখের কয়েক ফোঁটা পানি কবরের দুয়েকটি ক্ষুদ্র মাটি-বিন্দুকে ভিজিয়ে দিলো।

 

ছয়

রাতে পরী বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ আগেই কারেন্ট চলে গেছে। কারেন্ট চলে যাবার পরই পুরো পরিবেশটাই চেঞ্জ হয়ে গেলো। এমনিতেই গ্রামকে এত কাছে থেকে কখনোই পরীর দেখা হয়নি। পীর বাড়ির কবরস্থান এমনভাবে করা যে বাহির-বারান্দা থেকে সহজেই দেখা যায়। পরী বারান্দা থেকে বাবার কবর দেখার চেষ্টা করল। মা এসে পরীর গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন।

পরী বলল,  ‘মা, দেখেছো হালকা জোসনা উঠেছে!’

মা বললেন, ‘হ্যাঁ।’

‘মা, দেখো, বাবার কবরেও জোসনার আলো পড়েছে। দেখো বাঁশপাতারা বাবার কবরে কেমন মানচিত্র এঁকে দিয়েছে। মা, তুমি কি বুঝতে পারছো ওটা কিসের মানচিত্র!’

মা চুপ করে আছেন। পরী আবার বলল, ‘মা, জোসনার আলো বাবাকে আদর করে দিচ্ছে, তাই না? বাঁশপাতারা যে মানচিত্র এঁকেছে, সেটাও বাবাকে আদর করে দিচ্ছে। তাই না?’

পরী চুপ করে থাকলো। পরী চুপ করে থাকা মানে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলা।

পরী বারান্দা থেকে নামল। জোসনার ধবধবে আলোয় তাকে সত্যি সত্যে পরীর মতো মনে হলো। বাবার ডায়রিটা চাঁদের আলোয় ধরলো সে। ডায়রির নীল বোতামে হাত রাখলো। মা দেখলেন, বোতামটি খোলার সঙ্গে সঙ্গে ডায়রির গা থেকে তীব্র নীল আলো বের হয়ে এলো। পরী ডায়রি খুলতে গিয়ে খুলল না। মা বারান্দা থেকে নেমে এসে ডায়রির নীল বোতামের দিকে চেয়ে রইলেন। পরী বলল, মা, তুমি এই ডায়রি কীভাবে পেলে। সেটা তো বললে না?

মা বললেন, সে আরেক কাহিনি।

 

//জেডএস//

x