জুননু রাইনের আশ্চর্য ডুব

রেজাউদ্দিন স্টালিন ১২:২৮ , ফেব্রুয়ারি ০৯ , ২০১৮

আমি জুননু রাইনসহ নতুন প্রজন্মের সৎ কবিদের কবিতা নিয়মিত খুঁজে খুঁজে পাঠ করি। হঠাৎ হঠাৎ দৈনিকের সাহিত্য পাতায় ওর কবিতা পাই। নিবিষ্ট চিত্তে পাঠ করি। আমি যেখানে ভালো কবিতা পাই গো-গ্রাসে পড়ে ফেলি। ভালো লাইন পেলে মনে রাখার চেষ্টা করি। কিছুদিন আগে জুননুর একটা কবিতা কোনো দৈনিকের পাতায় দেখে পড়লাম। পড়লাম দু’তিনবার। বিষয় নতুন কৌতূহলোদ্দীপক লাইন-
'একদিন ঘরের মধ্যের পাহাড়ে তোমাকে দেখব
বুকের মধ্যে তোমাকে দেখব প্রিয় বাঘ
একদিন তোমার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বো
মৃত্যুর শান্ত পুকুরের আশ্চর্য ডুব



সেই থেকে আমি বয়ে বেড়াব পাহাড়
পাখিহীন গহীন শ্বাপদ বন্য অশ্রু।'
এক বিপন্ন ভালোবাসা। একুশ শতকের চেতনা একজন কবির হাতে অনুপস্থিত বাস্তবতা এবং অতি বাস্তবতাকে কিভাবে মিলিয়ে দেয়, কিভাবে পাঠককে নতুন এক অনাস্বাদিত জগতের দিকে টেনে নিয়ে যায়, তা অবাক করার মতো।
‘বুকের মধ্যে তোমাকে দেখবো প্রিয় বাঘ
একদিন তোমার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়বো’

দুই দুর্নিবার চিত্রকল্প এবং উৎপ্রেক্ষার নতুন সারৎসার নিয়ে আমাদের বাধ্য করে বিষ্মিত হতে। জুননু রাইনের কণ্ঠস্বর তার সমকালের অন্যদের চেয়ে আলাদা। খুব গভীর আর অন্তস্রোতের মতো মনোজগতে ধাক্কা দিতে থাকে। ‘এয়া’ এই নামটি তার সিরিজ কবিতার উপজীব্য। এই ‘এয়া’ কবির প্রিয়তমা। কিন্তু ‘এয়া’ বাংলা কবিতার সুনীলের নীরা, নেরুদার যোশি, দান্তের বিয়াত্রিস নয়। বরং এ এক রক্তমাংসের নারী- একই সঙ্গে ধরা ও অধরা। এই দ্বৈততা আমাদের নিয়ে যায় নিঃসঙ্গ উপত্যকায় যেখানে ‘মৃত্যু শান্ত পুকুরের আশ্চর্য ডুব’।

এই আশ্চর্য মৃত্যু অমোঘ, এর মধ্যে সামষ্টিক প্রেমের আত্মবিসর্জনের গন্ধ আছে। হঠাৎ মনে হচ্ছে মহাত্মন যিশুকে শুইয়ে দেয়া হয়েছে, ক্রুশে পেকের ঠোকা হচ্ছে- তিনি নির্বিকার অন্যদিকে, দুই অপরাধীর তাকে পেরেকবিদ্ধ করার সময় বন্যজন্তুর মতো চিৎকার। এ যেন কবিদের যুগযুগান্তের সমাহরণ। যিশুর রক্তের দায়ভাগ যেমন নিয়েছিল বিপথগামী জনতা। বংশপরম্পরায় সেই রক্তের দায় নিচ্ছে পৃথিবী। কবির এই সমাঘ্রাণ অসীম সময়ের শান্ত পুকুরে আশ্চর্য অন্তর্ধান। আমি কবিতাটি একটি প্রথম শ্রেণীর কবিতার মর্যাদা দিতে প্রস্তুত।

‘এয়া’- গিলগামেস মহাকাব্যের শান্তির দেবতা। ব্যবিলনীয় সুমেরীয় সভ্যতার এই মহাকাব্য অসুর বনিপালের গ্রন্থগার থেকে পাওয়া গিয়েছিল। এটিই সম্ভবত পৃথিবীর প্রথম মহাকাব্য। এই মহাকাব্যে আছে উৎনা পিসতিমের মতো এক মহাত্মা, আছে প্লাবন এবং অমরত্বের বর প্রার্থনা এবং গিলগানেশ আর এনকুদু দুই বীরের মল্লযুদ্ধ। একটা জাদু বাস্তবতার জগৎ। অসাধারণ আর এই মহাকাব্যের দ্যুতিময় প্রভাময়ী দেবতা যার হাতে শান্তি ও কল্যাণ নিহিত। তার নামকেই জুননু বেছে নিয়েছেন প্রিয়তমার নাম হিসেবে। কিন্তু প্রায় এই এক শতকের পুঁজিবাদী সভ্যতায় এসে সবকিছু দেখছে হিংস্রতায় ভরা, কোথাও পুষ্পের প্রস্ফুটন নেই- এক বিমানবিক বিভিশিখা উদগিরীত হচ্ছে সময়ের কণঠনালী থেকে গ্রীক পুরাণের সেই কিমিরার অগ্নিশাসময়তা। আর ‘এয়া’র চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে ভয়ঙ্কর অশ্রুকণা যার রূপ পাখিহীন গহীন শ্বাপদ বন্য অশ্রু। ‘এয়া সিরিজের ৩৬টি কবিতা। ‘এয়া’ শিরোনামেই জুননু রাইনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। তার শিরোনামের মতোই ‘অপেক্ষারা দাঁড়িয়ে আছে'। হয়তো পাঠকরা দাঁড়িয়ে আছে তার কবিতা পাঠের অপেক্ষায়।

'অপেক্ষারা দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে আমার জন্য

এক ঝুড়ি ক্লান্তির ঝরা ফুল নিয়ে'

একজন কবির সময় এমনই হন্তারক এমনই বিবমিষায় ভরা। 'সারি বেঁধে ঘেরাও করার প্রস্তুতি নিচ্ছে' কবিকেই জবাব দিতে হবে- কেন এই নৃশংস সময় সুসময় আসতে এই আলসতা কেন? ‘রাজার রাজ্যে সাদা সাদা মেঘের কেশরে মৃত্যুর তুষার।' মেঘের কেশর এই উৎপ্রেক্ষা আমাদের চোখের মধ্যে ‘স্মৃতির হাহাকার' ছড়িয়ে দেয়। জগৎকে 'অদৃশ্য হুমকি'র মধ্যে ফেলে দেয়। যেখানে অন্যায় অবিচার ক্রস ফায়ার গুম খুন আর হত্যা সেখানেই জুননু রাইনের কল্যাণকামী প্রিয়তমা- ‘এয়া’র অধিষ্ঠান। আমরা জানি উপনিবেশোত্তর সাহিত্য ভাবনার সামনে এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে নিরুপনিবেশীকরণ সম্পর্কিত জটিল সমস্যাবলী, অন্যদিকে পৃথিবীময় আধিপত্যবাদীদের নতুন উপনিবেশ স্থাপনের নিষ্ঠুরতার  কৃৎ কৌশল। জুননু রাইন এই নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সজাগ সতর্ক। হোমিও ভাবা যাকে বলেছেন Poignat proximity of the in complete project of decolani“ation to the dispossessed subjects of golobalisation একজন সমাজমনস্ক কবিকে ভাবনায় রাখতে হয় প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর নতুন অপপ্রকল্প সম্পর্কে। নিশ্চয় কবি জুননু রাইন তা জানেন- এবং তিনি তার ব্যর্থতাগুলোর গভীর সফলতা কবিতায় যখন বলেন, ‘আমার ব্যর্থতাকে কর্পোরেট রোবট ভাঁজ করে রাখে অদৃশ্য সিন্দুকে। যে সিন্দুকের তালা দেখা যায় না। চাবি হয় না।' তখন আমরা নিঃসন্দেহ হই হ্যাঁ কবি অতন্দ্র, সাংস্কৃতির শেকড়ের সাথে তার যোগ নিবিড়। কিন্তু লাতিন লেখকরা উত্তর উপনিবেশিক সময়ে এক্কেবারে নতুন অর্থাৎ (Novissami) শব্দবন্ধে আত্মপ্রকাশের ব্যাকুলতা দেখাচ্ছেন। এসি মূলত: টেস্টামেন্টের অর্থে ব্যবহার করার ধারনায় প্রোথিত। এসি এমন এক অভিব্যক্তি যা বিশ এবং একুশ শতকের বিশ্বময় সংঘবদ্ধ করার প্রয়াস। কিন্তু এই অভিব্যক্তিকে আমরা সমর্থন করি না এটা এক সমসাময়িক ইতিহাস যা সে অ-ইতিহাস থেকে স্বতন্ত্র- সাম্রাজ্যবাদী বুদ্ধিজীবী কর্তৃক লিখিত, কল্পিত ও বমিকৃত এবং তা অবশ্যই হলিউডি উদ্ভট সংস্কৃতি যা বিশ্বময় কথিত ও বিক্রীত।

এখন এই একুশ শতকের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে নিজস্ব শেকড়ের যে শক্তি তাকে অনুসন্ধান নবায়ন এবং প্রয়োগের সামর্থ্যই কবিকে মহিনান্বিত করতে পারে। জুননু রাইন সেই শক্তির দ্বৈপায়ন করতে সপ্রচেষ্ট। সত্য প্রকাশে নির্ভীক এবং শিল্পের নির্মেদ কোষ্ঠিবয়নে অকপট ‘আমি আজরাঈল দেখিনি প্রভু, ক্রসফায়ার দেখেছি’। এ এক ওঙ্কার রাষ্ট্রের এক বিনাশী প্রক্রিয়া। মানবতার বিরুদ্ধে এক নতুন অগ্রহনীয় প্রকৌশল। বিশ্বায়ন কি হত্যার কৌশলকে স্বীকৃতি দেয়, নবায়ন করে? কিংবা যখন উগ্রমৌলবাদী শক্তি ধর্মের নামে বিশ্বজিৎকে হত্যা করে তখন ‘বিশ্বজিৎ কবিতায় কবি বলেন- আমার জানালার পাশে/একটি অমর মৃত্যু হাসে’। প্রগতিশীর শক্তির মৃত্যু মুছে যায় না ফিনিক্স পাখির মতো ভষ্মস্তূপ থেকে তার সমুত্থিত হয়। আমাদের কালে কবিতার একটা প্যাটার্ন দাঁড়িয়ে গেছে কিন্তু আমরা যারা কবিতার একনিষ্ঠ পাঠক তারা একটা নতুন আঙ্গিকের জন্য অপেক্ষা করি। একথা বিশ্বাস করি বিষয় আঙ্গিক বদলে দেয় কিন্তু কবিরও থাকতে হয় বিশ্ববীক্ষা। রবীন্দ্রনাথ সেই কবির জন্য কান পেতে থাকতেন যার জন্ম মাটির কাছাকাছি। সব অগ্রজ কবিই কামনা করেন তার উত্তরাধিকার। নিজের অসম্পূর্ণতাকে সম্পূর্ণরূপে পেতে। নতুন প্রজন্মের কাঁধে তার অনেক দায়ভার। জুননু রাইন তার প্রজন্মের শক্তিমান কবি। তার অনেক দায়ভার আছে। আমি জানি ধীরাগ্রহে এক দীর্ঘপথ যাত্রায় সে ক্লান্ত হবে না বরং নবতর কাব্যকৌশল আয়ত্ত করে পথ হাঁটবে। তার এই যাত্রা অনিঃশেষ হোক সের্গেই লুইস বোরহেস যেমন বলেন, my name is some one and amy one I wolk sololily like one who comes from so far away He does not except to arrive.

 

//জেডএস//

x