‘ধূলি সারগাম’ থেকে

তুষার কবির ১৪:১৩ , ফেব্রুয়ারি ১০ , ২০১৮

ডেরা

এই অরণ্যের সরুপথে
হারানো পায়ের ছাপ ধরে
হেঁটে যেতে যেতে
হঠাৎ পেলাম দেখা সেই নিঝুম ডেরার—
পাতার পোশাকে যার মাঝে বসে আছে
ডাগর চোখের এক বনদেবী!

ডেরার ভেতর ঢুকতেই
বনদেবী আমাকে দেখিয়ে দিল
ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা
নর্তকমূর্তির সারি সারি মুখ—
শ্বেতপায়রার রক্তাভ পালক
আর তিয়াসার ফেনাপাত্র!
পাতার কাঁচুলি খুলে
বনদেবী আমাকে বুঝিয়ে দিল
টানটান বুকের ইশারা!

চকিতেই যেনবা আমার জেগে উঠল বোধ—
নির্বাণের আভা—
ডেরার ভেতর যেন জ্বলে উঠল
জমে থাকা লুকোনো প্রতিভা—
আদিম বনদেবীর কাছ থেকেই
যেনবা পেয়ে গেলাম
জগতের যত জ্ঞান—জ্যোতির্ময় রত্মবিভা!

দরজা

দরজার নামফলকের মাঝে চাপা পড়ে থাকে
হারানো প্রেমিকাদের নাম!

দরজার কাঠ থেকে জেগে ওঠে কান্না
ধাতব চেরাই শব্দ—
হু হু আর্তনাদ—বিলাপ ও নৈঃশব্দ্য!
দরজার আড়াল থেকেই জেগে ওঠে
যত জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস!

জানি এ দরজার ওপাশেই ঘটেছিল
যত পাপ ও প্রহেলিকা—
মোহ ও মায়া—মধু ও মাধুকরী
সব ভিড় করেছিল এ দরজার ওপারেই।

তোমার শরীর জুড়ে
কীটদষ্ট চুম্বনের ছাপ—
যা আমি সযত্নে এঁকেছিলাম
সমূহ ভূগোল জুড়ে;  
তাও ঘটেছিল এ দরজার আড়ালেই!

দরজার ওপাশে এখনো দেখি
সটান দাঁড়িয়ে আছে কেউ—
যার রাতচেরা দীর্ঘশ্বাসগুলো
এখনো ভাসতে থাকে কার্নিশের ছায়াভ্রমে!

সান্ধ্যগান

সরাইখানার সান্ধ্যগান ঢের শোনা হল
এই গোধূলির ধূলিওড়া পথে—
ময়ূরীর মনোলগ শুনে শুনে
কেটে গেল কুঠুরির রক্তস্বর ভোর!

দূরের বেহালা ধ্বনি যেন আজ
আছড়ে পড়ল এই ঘুমঘোর সরোবরে—
ফেলে দেয়া সারগামে শুধু যেন
বাজতে থাকল অন্ধ নর্তকীর কান্না!

শ্বেতপায়রার পালকের নিচে
দ্যাখো আমি ঠায় বসে আছি—তার ফাঁক দিয়ে
উঁকি দেয় রক্তাভ মাংসের আভা—
তার ডানা চিরে দ্যাখো হানা দেয়
মদ, মধু আর ধাঁধা!

কার্নিশের ছায়াভ্রমে লেখা হল
এই সান্ধ্যগান—ডাকিনীর ডাকবাক্সে জড়ো হল
যত মনোব্যথা—পাখসাটে মৃদুশব্দে
কোথাও বা বাজতে থাকল শুধু
বিষাদের দাহগাথা!

সান্ধ্যভাষ

দোয়েলের সান্ধ্যভাষে
উড়ে আসে
যত পাতার প্রতিভা—

ভ্রমরের ভাঁজপত্রে
লেখা হয় দূরের লেফাফা—

তোমার না বলা কথা
জড়ো হতে হতে
খুলে যায় সুরের কুয়াশা—

যার ভাঁজে ভাঁজে
শুধু গাঁথা আছে
রক্তস্বর হরণ তিয়াসা!

 

তলিয়ে যাবার আগে

তলিয়ে যাবার আগে
তুমি দেখে নাও জগতের রূপবিভা—
চালতা ফুলের গান
আর ডাহুকের সান্ধ্যভাষা—

 

কিছুটা ডুবন্ত মুখে আরো দেখে নাও
নদীতীরে রূপার কলস—
শব্দ করে ওঠা মাটির ঢেলায়
ঘুরপাক খেতে থাকা যুবতীর জলকান্না—
তলিয়ে যাবার আগে
জলের শব্দের মত
তুমি কথা বলে ওঠো!

 

তলিয়ে যাবার আগে তুমি শুনে নাও
বৈঠা ও গলুইয়ের স্বর—
কঞ্চির ওপর চুপ বসে থাকা মাছরাঙা
কাচপোকা আর শৈবালের ডুবশব্দ।

 

তলিয়ে যাবার আগে তুমি গেয়ে ওঠো
জল ও জঙ্গলের গান ।




একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে তুষার কবিরের কবিতার বই ‘ধূলি সারগাম’। পাণ্ডুলিপি থেকে পাঁচটি কবিতা পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

//জেডএস//

x