দশ বছরের ছেলেটি কিন্তু গাইড

শাকিলা রণক ১৪:৫৭ , ফেব্রুয়ারি ১১ , ২০১৮

noname

পাঠক, কিছুটা কি অবাক হওয়ার মতো বিষয়। আবার না ও। কেননা আমাদের দেশে শিশুশ্রম কোনো নতুন ব্যাপার না।  তাই ১০ বছরের একটি ছেলে রোজগার করবে এটা যেন স্বাভাবিক। কিন্তু গাইড! এটা আশ্চর্যের। বেশিক্ষণ আর আঁধারে রাখছি না। কেননা আমি পড়ার আনন্দ ছেদ ঘটাতে চাই না। আমি সিলেট ঘুরে এসেছি।  কয়েক দিন সেখানে ছিলাম। যতগুলো দর্শনীয় স্থান আছে চেষ্টা করেছি দেখার। শ্রীমঙ্গলে অনেক দর্শনীয় স্থানের মধ্যে ন্যাশনাল টি এস্টেট অন্যতম। আমরা সকালের দিকে পৌঁছলাম। গাড়ি থেকে নামতেই ১০/১১ বছরের একটা ছেলে এগিয়ে আসে। আমার সঙ্গে মেয়ে ও আমার স্বামী ।  আমি জিজ্ঞেস করলাম, কি চাও?  ছেলেটি উজ্জ্বল চোখ আর ব্যক্তিত্বের আচ্ছাদনে উত্তর দিল, " আমি একজন গাইড, আমি সব ঘুরিয়ে দেখাব।" আমরা প্রথমে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। তারপর  ওকে সঙ্গে নিলাম।  ছেলেটি ছোটোখাটো, শ্যামলা গায়ের রং, কোকড়া চুল আর সদা হাসি মুখ। ছেলেটি বলল,  আমার নাম অন্তর। আমি অনেক দিন ধরে গাইড।

পাঠক নিশ্চয়ই ভাবছেন, এতটুকু ছেলেকে কেন গাইড হিসেবে নিলাম?  আসলে ওই জায়গায় গাইডের প্রয়োজন ছিল না।  অনেক পর্যটক, কেউ গ্রাহ্য করছে না।  কিন্তু ছেলেটির সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছিলো ওর প্রয়োজন আছে। তাই ওকে একটু সাহায্য করার জন্য ওকে সঙ্গে নিয়েছি।  ছেলেটির পিছু পিছু আমরা হাঁটছি। অন্তর পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছে, কিন্তু ওপার বাংলার টান। আমি জিজ্ঞেস করলাম তোমার বাড়ি কোথায়? ছেলেটি জানাল কলকাতায়। পথ চলতে চলতে তার কত কথা,  যেন শেষ ই হয় না। বলে চলেছে — ম্যাডাম, এটা মা চা গাছ! আমি অবাক হওয়ার ভাব নিলাম তাই !(আসলে বই পড়া আমার নেশা, তাই সব তথ্যই মোটামুটি আমার জানা।)







তবুও অবাক হচ্ছি যদি ওর ভালো লাগে।  এরপর চা বাগানের ঘের ধরে কিছু লেমন গ্রাসের গাছ দেখতে পেলাম।  আমি তো জানিই।  তাই পাতা ছিড়ে গন্ধ নিতে যাবার আগেই অন্তর বাবু চেঁচিয়ে উঠল, এটা লেমন গ্রাস ওই যে স্যুপে খান! আমি হেসে ফেললাম।  অবাক হবার ভান করলাম। ও বলেই চলল,  এটা লাগানো হয় যাতে পোকামাকড় গাছের ক্ষতি না করে।  এরপর সে বড় কিছু গাছ দেখিয়ে বলল, এগুলো শ্যাডো টি। চা গাছ। আসলে ওর মুখে পরিষ্কার বাংলায় শুদ্ধ উচ্চারণের কথাগুলো শুনে মন ভরে যাচ্ছিল। শহরের শিক্ষিত পরিবারে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েরাও আজকাল শুদ্ধ বাংলার উচ্চারণে লজ্জিত বোধ করে।

মাধবপুর টি এস্টেটটা পুরোটাই পাহাড় আর চা গাছে পরিপূর্ণ। দূর থেকে মনে হয় সবুজ পাহাড়। এই পাহাড় চারপাশে আর মধ্যখানে সমতল একটা গোলাকৃতির লেক। নাম মাধবপুর লেক।  এ লেকটি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায় কেননা গাঢ় বেগুনি শাপলায় পরিপূর্ণ।  আমরা অনেকটা মাটির খাজকাটা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসেছি। তাই খানিকটা ক্লান্ত। বসলাম চা গাছের পাশে। একটু হালকা খাবারও খেলাম সবাই মিলে। শীতকালে রোদ উপভোগ্য কিন্তু এতটা উপরে উঠার পর রোদে খুব গরম লাগছিলো। অন্তর কে কাছে ডাকলাম কোলের উপর ডায়রি খোলা।


ওকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি পড়াশোনা কর? বলল, জ্বী। তাহলে এখানে কাজ করো কীভাবে?  ছেলেটি বলল, কি করব?  কত রাত না খেয়ে বিছানায় যাই! আমার মা চা পাতা তুলে একবারে কম পক্ষে ২৩ কেজি চা পাতা তুলতে হয়,  আর এর জন্য পারিশ্রমিক পায় ৮৫ টাকা।





















অন্তর জানাল, যদি এর চেয়ে কম হয় চা পাতা তোলা হয় পারিশ্রমিক জোটে না। কি কষ্ট ফুটে উঠল ছেলেটার চোখে মুখে বোঝানো যাবে না? আমারও বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ছেলেটি বলছে "বাবা যে কাজ করে, তাতে এতগুলো ভাইবোন নিয়ে সংসার চলে না। আমরা বেশির ভাগ সময়ই রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।” ও বলতেই থাকে...

আমি চশমা খুলে চোখ মুছি। ছেলেটি খেয়ালও করে না।  একটা দশ বছরের বাচ্চা সোফায় বসে টিভি দেখে আর মায়ের মাখানো ভাত খায়। তারাও বই এর বোঝা পিঠে নিয়ে স্কুলে যায়— ভবিষৎ গড়ার জন্য। কিন্তু এই ছেলেটি কোন আশায় অনবরত কথা বলে। পাহাড় বেয়ে উপরে উঠছে আবার নিচে নামছে। এখানে ওর কোনো ভবিষৎ আছে আমি তা বুঝতে পারলাম না।  ছোট ছোট প্রয়োজন কিংবা ছোট ভাই বোনদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এই দশ বছরের ছেলেটির অক্লান্ত পরিশ্রম সত্যি আমাকে অবাক করে!

এবার ফেরার পালা— হাঁটতে শুরু করলাম মনটা খুব ভারী হয়ে আছে। নামতে নামতে ভাবছি, পাহাড়ের মানুষ মানেই পরিশ্রমী, শহরে একথা শুনেছি। বই পড়ার দরুণ অনেক কিছু আমি জানিও। পাহাড়ের মানুষের জীবিকার লড়াই, বেঁচে থাকার লড়াই; সমতলের মানুষদের চেয়ে খানিকটা আলাদা। ওদের সামান্য পানীয় জলের জন্য অনেক পথ উঁচুতে উঠতে হয় আবার নামতে হয়! আর এখন নিজ চোখে এই ছেলেটির পরিশ্রমের চেষ্টায় আমি যেন আরও জানলাম ওদের কথা।

গাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম।  যেহেতু ঘুরতে এসেছি তাই খুব একটা টাকা সঙ্গে নেই ।  তারপরও যতটুকু পারলাম ছেলেটিকে সাহায্য করলাম।  মন তবুও তৃপ্তি পেল না।  ইশ, ওর জন্য যদি কিছু করতে পারতাম?
গাড়ি ছাড়বে সবাই উঠে বসলে আমি ছেলেটির মাথায় হাত রাখলাম। অন্তরের পুরো মুখটা জুড়ে হাসি। যেন যুদ্ধ শেষে জয়ী বীর! হ্যাঁ পাঠক যুদ্ধ-ই বটে! আমাদের কাছে না হলেও ওর কাছে বেঁচে থাকবার জন্য এটুকু যুদ্ধের চেয়ে কম নয়। গাড়িটা ছেড়ে দিল। পেছনে রয়ে গেল সেই ন্যাশনাল টি এস্টেট  আর দশ বছরের গাইড ছেলেটি। আমি খুব একটা সাহায্য সেদিন ওই ছেলেটিকে করতে পারিনি ঠিকই কিন্তু মনে মনে ভেবেছিলাম ঢাকায় ফিরে ছেলেটিকে নিয়ে লিখব।  অন্তত সবাই জানতে পারবে একজন ছেলের কথা। এমন আরও কত অন্তর জীবিকার তাগিদে নিজেদের শৈশব জলাঞ্জলি দিচ্ছে তা কে জানে?

 

//জেডএস//

x