শওকত আলীর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

. ১৪:২৯ , ফেব্রুয়ারি ১২ , ২০১৮

আজ থেকে ২৫ বছর আগের অর্থাৎ ২৫ আষাঢ় ১৩৯৯ বঙ্গাব্দে একটি দৈনিকে সাহিত্য পাতার জন্য বরণ্য কথাশিল্পী  শওকত আলী দ্বিতীয় বারের মতো বাংলাদেশের সবচে’ বৃহৎ অঙ্কের ফিলিপস পুরস্কার পেলেন। লক্ষ টাকার সম্মানিত এ লেখকের একজন পাঠক হিসেবে আমি গর্বিত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এবারের পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস ‘উত্তরের খেপ’ এখনো পড়া হয়নি। দক্ষিণায়নের দিন উপন্যাস ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলো  ১৯৮৬ সালে। শওকত আলী এ ছাড়াও বাংলা একাডেমি পুরস্কার, হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার, অজিত গুহ স্মৃতি পুরস্কার অর্জন করেছেন। শওকত আলী কোনো জনপ্রিয় লেখক নন। আমার বিশ্বাস, তাঁর পাঠকসংখ্যাও সীমিত। আমাদের কথাসাহিত্য দু’টি শ্রেণিতে বিভক্ত। শওকত আলী যে ধারার লেখক, সে ধরনের লেখা স্বাভাবিকভাবেই জনপ্রিয়তার বাইরে। আর সে জন্য এখনো তার গ্রন্থকারে অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি রয়েছে প্রায় ডজন খানেক। শুধু শওকত আলীর নয়, হাসান আজিজুল হক, মাহমুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এঁদেরও একাধিক পাণ্ডুলিপি পড়ে আছে। তারপরও শওকত আলীর ২৭/২৮টি বই বেরিয়েছে। তাঁর প্রথম উপন্যাস পিঙ্গল আকাশ প্রকাশ পায় ১৯৬৪ সালে। আর দ্বিতীয় গ্রন্থ, প্রথম গল্পের বই উন্মূল বাসনা বের হয় ১৯৬৮ সালে। তার পর দীর্ঘ দশ বছর পর ১৯৭৮ সালে বেরুলো যাত্রা। লেখালেখির এই দীর্ঘ বিরতির কারণ অজ্ঞাত। তবুও ভালো, পুনরায় তিনি ফিরে এসেছেন এবং যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। প্রথম গ্রন্থ পিঙ্গল আকাশ সম্পর্কে তার ব্যক্তি তিনি অভিমত হচ্ছে, সে লেখায় আবেগ-উচ্ছ্বাস ছিলো প্রচুর। ফলে এখন কাঁচা মনে হয়। জীবনের গভীরতা আমি সেভাবে স্পর্শ করতে পারিনি বলে ধারণা। তবে ওই গ্রন্থে একটি নতুন জিনিস ছিলো, প্রকৃতি ও পরিবেশ মানুষের মনে কীভাবে প্রভাব বিস্তার করে। ( বি.দ্র. সাপ্তাহিক বিচিত্রা  ১০ জানুয়ারি ১৯৮৭ সংখ্যা, ঢাকা।) —সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

শওকত আলীর লেখার ধার ও ধারণা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার আছে বলে মনে হয় না। কারণ, বাঙালির স্বরূপ অন্বেষণ তাঁর রচনাকে নতুন মাত্রা প্রদান করেছে। শেকড় যেমন মাটির গভীর থেকে নির্যাস সংগ্রহ করে, তেমনি তিনিও জীবনের ভেতর থেকে মানুষের ভেতরের মানুষকে তুলে আনেন খনিজ রত্নের মতো। নগরায়ণ তাঁকে তেমন নাড়া দেয় না; তিনি গ্রামীণ প্রেক্ষাপট তথা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কথাই বার বার উপস্থাপন করেছেন, তাদের অস্তিত্বের ভেতরেই আবিষ্কার করতে চেয়েছেন জীবনের রহস্যকে। উন্মুল বাসনায় দিনাজপুরের সাঁওতাল সমাজের তথা গ্রামীণ মানুষের ক্ষুধা, যন্ত্রণা ও যৌবনের কথা আছে। যুদ্ধের কথা আছে যাত্রায়। একাত্তরের ২৫ মার্চে পাকবাহিনীর হাত থেকে পালিয়ে যাওয়া বিপন্ন মানুষদের নিয়ে এ তাঁর এক অসাধারণ নির্মাণশৈলী। ইতিহাসাশ্রিত উপন্যাস ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ ইখতিয়ারউদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর সময়কাল চিত্রায়ন করেছেন স্বর্ণশিল্পীদের দৃষ্টিতে। সেই সঙ্গে ভাষাব্যবহারেও নিরীক্ষা করেছেন। 

শওকত আলীর একটি উপন্যাস থেকে আরেকটি উপন্যাসের দূরত্ব যথেষ্ট। ভিন্ন প্রেক্ষাপট, ভিন্ন আঙ্গিক ভিন্ন চরিত্রে সমৃদ্ধ। কিন্তু দক্ষিণায়নের দিন, কুলায় কালরাতে এবং পূর্বদিন পূর্বরাত্রি এই উপন্যাস তিনটি প্রকৃতপক্ষে অবিভাজ্য। রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে এ তিনটি ভিন্নমাত্রা বহন করে। তাঁর প্রায় সব ক’টি গল্প-উপন্যাসেই মধ্যবিত্ত জীবনের ক্ষেত্র বিসৃত। ওয়ারিশ, শরিফ, সম্বল— এ গ্রামের মধ্যবিত্ত মানুষের চিন্তা-চেতনা-চরিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। এতে শুধু জীবনের ভাঙনকেই তুলে ধরেননি। অতীত এবং বর্তমানকে ভেঙে ভেঙে এবং জুড়ে জুড়ে কাহিনি অগ্রসর হয়েছে— ওয়ারিশ তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জীবনকে যেমন ভেঙেছেন, সময় যেমন ভেঙেছেন, তেমনি তিনি ফর্মও ভেঙেছেন। তারপর দিক পালটিয়ে নতুন বাঁক নিয়ে শুরু করেছেন— লেলিহান সাধ’এ। ‘গন্তব্য অতঃপর’ এবং ‘শুন হে লখিন্দর’ গল্প-উপন্যাসের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, ‘ভালোবাসা কারে কয়’ ব্যতিক্রমধর্মী প্রেমের উপন্যাস। তাঁর একমাত্র প্রেমের উপন্যাসটি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এটা একেবারে নির্ভেজাল প্রেম নিয়ে উপন্যাস হয়নি। তবে তিনি তরুণদের নয়, বৃদ্ধালোকের প্রেম নিয়ে উপন্যাস লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। 

শওকত আলী নিজেও স্বীকার করেন, তাঁর লেখায় কখনো কিছুটা মানিক, বিভূতি অথবা তারাশঙ্কর, সমরেশ বসুর প্রভাব পড়ে। কারণ, এঁরা তাঁর প্রিয় লেখক। এঁদের জীবনদর্শনের সঙ্গে তাঁর জীবনদর্শনের সঙ্গে তাঁর জীবনদর্শনের সাদৃশ্য প্রচুর। মজার ব্যাপার, শওকত আলী চৈত্র মেঘ নামে একবার একটি গল্প লিখেছেন। একেবারে কাকতালীয়ভাবে তার কিছুটা সমরেশ বসুর অকাল বসন্ত গল্পের সঙ্গে মিলে যায়, পরে তিনি চৈত্র মেঘ কোনো গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত করেননি। 

১৯৩৬ সালে ১২ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের রায়গঞ্জে শওকত আলীর জন্ম। বাবা খোরশেদ আলী সরকার কংগ্রেসের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়ে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। শওকত আলীও বাবার মতো কিছুটা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। জেল খাটেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন এবং এখন তিনি বাংলাদেশ সংগীত মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ।

মজার ব্যাপার, সমরেশ বসুর গল্পের সঙ্গে যেমন তার গল্পটি মিলে গিয়েছিলো, তেমনি ১৯৬১ সালে আরো একটি কাকতালী ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি তার স্ত্রীকে নিয়ে। তাঁর স্ত্রীর নামও শওকত। তবে আলী নয়, আরা। অর্থাৎ শওকত আরা। শওকত ভাইকে তাঁর বাসায় ২৪৬৫৬৪ এবং কলেজে ৫০৭৬৯৭’এ ফোন করে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে কোথাও পেলাম না। তারপর ২৬.০৬.৯২ তারিখ রাতে ফোন করলেন একটি দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। দু’দিনের মধ্যে শওকত আলীর একটা ইন্টারভিউ করে দিতে হবে আগামী সপ্তাহের সাময়িকীর জন্যে। পরদিন হঠাৎ করে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে শওকত আলীর সঙ্গে দেখা। বললাম, সাক্ষাৎকারের কথা। তিনি বললেন, এই মুহূর্তে নয়, পরে। তারপর চললো দীর্ঘ আড্ডা ও সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা। এতে মাঝেমধ্যে কথাশিল্পী মঞ্জু সরকার এবং কখনো কবি মাহবুব বারীও বিচ্ছিন্নভাবে অংশ নেন। অনানুষ্ঠানিক এই কথোপকথন পাঠকদের কাছে উপস্থাপন করছি। শওকত ভাই, আমাকে ক্ষমা করবেন।

আমি : আপনি আরেক বার ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার পেলে একটা রেকর্ড হবে। 

মাহবুব বারী : হেট্রিকের রেকর্ড। কিন্তু ফিলিপস নাকি এবার থেকেই পুরস্কার দেয়া বন্ধ করে দিচ্ছে?

শওকত আলী : বন্ধ করে দেয়াটা ঠিক কাজ হবে না।

মাহবুব বারী : তাইতো শুনছি।

আমি : শওকত ভাই তাহলে আপনাকে দিয়েই শুরু হয়েছিলো আর আপনাকে দিয়েই শেষ হতে যাচ্ছে।

শওকত আলী : বোধ হয় এটা ঠিক না।

আমি : পুরস্কার আর দেয়া হবে না, এ সম্পর্কে আপনি কি কিছুই জানেন না?

শওকত আলী : না। আমি কিছুই জানি না। উত্তরের খেপ- এর খবরও জানতাম না। কে বই জমা দিয়েছে, তাও বলতে পারবো না।

আমি : বইটি বের করেছে কোন প্রকাশক?

শওকত আলী : বিদ্যাপ্রকাশ।

আমি : তাহলে খোকা ভাই-ই জমা দিয়েছে।

মাহবুব বারী : শওকত ভাই, আপনার উত্তর-দক্ষিণ শেষ হলো। এবার পূর্ব-পশ্চিমের পালা। 

আমি : সুনীল বাবু তো তা শেষ করেছে। 

মাহবুব বারী : দক্ষিণায়ন-এর পর উত্তরের খেপ চমৎকার নাম। 

আমি : কথ্য আঞ্চলিকে খেপ শব্দটাকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন।

শওকত আলী : প্রথমে নাম রেখেছিলাম উত্তরের যাত্রা। ট্রিপ- এর বাংলা ‘যাত্রা’ হলেও, এখানে তা ভালো লাগছিলো না। এবং অর্থপূর্ণও মনে হচ্ছিল না। পরে ‘যাত্রা’ বাদ দিয়ে ‘খেপ’  লাগিয়ে দিলাম, উত্তরের খেপ। 

আমি : বইটা পড়া হয়নি।

শওকত আলী : একটা লোক ওপার থেকে চলে এসেছে। তার নানান সমস্যা। তারমধ্যে এক অবাঙালী মেয়েকে বিয়ে করেছে। লোকটা বাস চালায়। যাত্রী নিয়ে দিনাজপুর যাচ্ছে। তার এই যাত্রাটাই ট্রিপ।

মাহবুব বারী : আপনার আগের উপন্যাসেও দিনাজপুর এসেছে। 

শওকত আলী : বহু দিন পরে আবার এলো।

আমি : দ্বিতীয়বারের মতো পুরস্কার ঘোষণাটা বিভিন্ন মহলে বেশ সমালোচিত হচ্ছে।

মাহবুব বারী : দৈনিক বাংলা ভবনে তো চারবার এই পুরস্কার গেলো।

আমি : সেটা বড় কথা না। বিচারকেরা বিচ্ছিন্নভাবে মতামত দেন, তারপর বিবেচনা করা হয়। শুনেছি, ‘দক্ষিণায়নের দিন’ এর পর আবার একই ব্যক্তির উত্তরের খেপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিলো। কিন্তু তাদের নীতিমালায় আছে, একবার এক লেখক পুরস্কার পেলে, তিনি আর তিন বছরের মধ্যে পুরস্কার পাবেন না। 

মাহবুব বারী : তাহলে তো অসুবিধে নেই। দক্ষিণায়ন পেয়েছিলো কত সালে?

শওকত আলী : ১৯৮৬ তে। আমি চাই, তরুণেরা পুরস্কার পাক। কিন্তু তারা শেকড়ের কাছে যেতে রাজি নয়। তারা শুধু শহর নিয়েই আছে। শহরের জীবন নিয়ে ইউরোপ আমেরিকায় প্রচুর লেখা হয়েছে। তাদের শহরের জীবনের কাছে আমাদের নাগরিক জীবন কিছুই না। এই নগরে কী আছে। সাধারণ মানুষকে জানতে হলে, দেখতে হলে শহরের বাইরে যেতে হবে।

আমি : সাবের গত বছর ফিলিপস পেয়েছে।

মাহবুব বারী : শওকত ভাই, পুরস্কারের টাকার সঙ্গে নিশ্চয় একটা কালার টিভি পাবেন?

শওকত আলী : না। টিভি পায়, যারা বিচারকমণ্ডলীতে থাকেন সম্ভবত তাদেরকে ছোট সাদাকালো টিভি কিংবা ফিলিপসের অন্যান্য সামগ্রী দেয়া হয়।

মাহবুব বারী : পুরস্কার পাবার পর কেমন লাগছে?

শওকত আলী : ভালো লাগছে। এক সঙ্গে এতগুলো টাকা কাজে লাগানো যাবে। আর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া  দৈনিক বাংলায় বলেছি।

আমি : সাবেরের সীমাবদ্ধ পড়েছেন?

শওকত আলী : পড়েছি।

আমি : কী মনে হয়েছে?

শওকত আলী : তোমার কী মনে হয়েছে?

আমি : গত বছর কুমিল্লা যাবার সময় ভাবলাম, সার্কিট হাউসে রাত কাটাবো। ‘সীমাবদ্ধ’ নিয়ে যাই। মনোযোগ দিয়ে পড়বো। পড়েছি। পড়তে পড়তে প্রথমে আবার পেছনে ফিরে এসেছি। কিছুক্ষণ পর প্যারা বাদ দিয়ে জাম্প করে পড়েছি। জানি না, সেই সময় পড়ার মোড়টা কেমন ছিলো!

শওকত আলী : কেন ভালো লাগেনি?

আমি : আপনার কেমন লেগেছে?

শওকত আলী : নগরজীবনের বাইরে, প্রকৃতির সঙ্গে মানুসের যে একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে, তা ভালো লেগেছে। 

আমি : কিন্তু কিছু কিছু বিষয় হালকা মনে হয়েছে।

শওকত আলী : যেমন?

আমি : যেমন, মেয়েটি যেভাবে দুষ্টু লোকদের পাল্লা থেকে পালিয়ে এলো কিংবা শরীর খারাপের ‘ঠুনকো ছুতা’য় সতীত্ব রক্ষা করলো, তা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। মনে হয়েছে খুবই হালকা ব্যাপার।

শওকত আলী : আমি তোমার সঙ্গে আংশিক একমত। তারপরও বিজ্ঞ বিচারকদের বিবেচনায় সে বছর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসেবে মনোনীত হয়েছে। 

আমি : সেখানে হুমায়ূন ভাইয়ের বইও প্রতিযোগিতা করেছে। কিন্তু সাবের আমাদের বন্ধু বলেই তাঁর কাছে প্রত্যাশা বেশি।

[মাহবুব বারী চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পর এলেন মঞ্জু সরকার।]

 শওকত আলী : হুমায়ূনের ওই দুটোই শ্রেষ্ঠ। শঙ্খনীল কারাগার আর নন্দিত নরকে। শুরুতেই যে চমৎকার জিনিসটি ছিলো, তা আর পরবর্তীতে তার উপন্যাসে পাইনি। আমি শঙ্খনীল আলোচনা করেছি। সেখানে পিতা-পুত্র-কন্যা কিভাবে প্রার্থণার মতো কারাগারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তা গ্রিক মিথের কথা মনে করিয়ে দেয়।

আমি : মঞ্জু ভাই, আমরা এবারের ফিলিপস পুরস্কার নিয়ে কথা বলছি।

মঞ্জু সরকার : আমি এ সংবাদ শুনলাম গতকাল। কারণ টিভিও দেখা হয়নি, পত্রিকাও পড়া হয়নি।

আমি : সাবেরের সীমাবদ্ধ’এ মেয়েটির নগ্ন হয়ে করাটা কিছুটা ‘বাণিজ্য’ মনে হয়েছে। শালীন মনে হয়নি। 

শওকত আলী : প্রকৃতির কাছে গেলে মানুষ নগ্নতাকে ভিন্নভাবে দেখে।

আমি : বছর কয়েক আগে, আপনার একটা গল্প পড়েছিলাম। একজন চোর চুরি করতে গিয়ে গ্রামের গোল বেড়া দেয়া প্রশ্রাবখানার পাশে আটকে পড়ে।

তখন তিন জা প্রাকৃতিক কাজ সারতে আসে। চোরটি লক্ষ্য করে শুনছে, তিন রমণীর প্রশ্রাবের শব্দ তিন রকমের। সেখানে কিছু অশালীন মনে হয়নি। বরং লেখকের তীক্ষ্ম অনুভূতির দক্ষতায় পাওয়া গেছে।

শওকত আলী : গল্পটার নাম অচেনা। সংবাদে বেরিয়েছিলো। সেখানে আরো একটি বিষয় আছে, তা সমালোচকের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। ওই চোরটি একসময় মহাজনের লোক ছিলো। তারপর পরিস্থিতির কারণে চুরি করতে বাধ্য হয়। চুরি করার সময় তার সাবেক সহকর্মীরা অর্থাৎ অন্যান্য চাকর বাকরেরা তাঁকে দেখে চিনতে পেরেও অস্বীকার করে। এখানে শ্রেণীগত পক্ষপাতটি সমালোচকদের চোখ এড়িয়ে গেছে। 

আমি : মিলনের কালাকাল, টোপ, নদী উপাখ্যান, ভূমিকা, রাজাকারতন্ত্র গ্রন্থগুলো কিন্তু অন্যরকম। যদিও তা সেইভাবে আলোচিত হয়নি।

শওকত আলী : সব বই আমার পড়া হয়নি। তবে এসব বিষয় নিয়ে মিলনের সাথে আলোচনা করেছি। বলেছি, বর্ণনার পাশাপাশি সংলাপেও আঞ্চলিক শব্দ ব্যবহার করা দরকার।

আমি : মিলন বিক্রমপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। আমাদের লেখকেরা নগরে বাস করে কাজেই গ্রামের বিষয়গুলো কীভাবে আনবে? সেই পাট পচানোর গন্ধ, কাঁচা খড়ের গ্রাণ। ধান শুকানোর মৌ বাতাস। 

শওকত আলী : সেজন্যে লেখককে গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। নিবিড় সম্পর্ক থাকতে হবে।

আমি : মঞ্জু সরকারের পক্ষে তো আর ছুটি নিয়ে মাসের পর মাস গ্রামে পড়ে থাকা সম্ভব নয়। 

শওকত আলী : সে জন্যই আমাদের সাহিত্যে মূলতঃ কোনো উত্তরণ ঘটেনি। আমাদের অনেক পরে জাপানি সাহিত্য, মধ্যপ্রাচ্যের সাহিত্য অনেক এগিয়ে গেছে এবং বিশ্বে তা গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করছে। 

আমি : এর কারণ কি?

শওকত আলী : অনেক কারণ আছে। তার মধ্যে অনুবাদের সমস্যাটাও কম নয়। তুমি তো প্রবাসী লেখকদের নিয়ে কাজ করছো, সূচিপত্র বের করেছো, তোমার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে, তাদের বলো, বাংলা সাহিত্য অনুবাদ করতে। তবে নির্বাচিত লেখা।

আমি : লন্ডনের দ্বিতীয় বৃহৎ (পেঙ্গুইনের পরে যার স্থান) প্রকাশনী শওকত ওসমানের জননী ইংরেজি সংস্করণ বের করছে।

শওকত আলী : এটা অবশ্যই সুসংবাদ। জননী খুবই ভালো বই। আমি আলোচনা লিখেছিলাম। 

মঞ্জু সরকার : অনুবাদ কে করছেন?.

আমি : কবীর স্যার। কবীর চৌধুরী।

শওকত আলী : মিলনের আরো একটি লেখা ভালো লেগেছে। বিক্রমপুরের ভাষায় লেখা।

আমি : সন্তান প্রসব হবার দৃশ্য দেখার জন্যে এক কিশোরের কৌতূহল মিলন একটি গল্পে চমৎকারভাবে এনেছে।

শওকত আলী : আমারও একটি গল্প আছে। একটা গাইয়ের বাছুর হচ্ছে। তার মালিক এক মহিলা। প্রসব যন্ত্রণার সময় সে গাভীটিকে নিজ মেয়ের মতো আদর করছে। এক সময় সে মহিলা নিজের প্রসব যন্ত্রণার কথা মিলিয়ে একাত্ববোধ করে। 

আমি : এ ধরনের লেখা অনুবাদ হওয়া উচিৎ।

শওকত আলী : মঞ্জুর ‘নগ্ন আগন্তুক’ও অনুবাদ হবার মতো ছোট উপন্যাস।

আমি : মঞ্জু ভাই, নগ্ন আগন্তুক নিয়ে যে সিনেমা হবার কথা ছিলো, তার কাজ কদ্দুর।

শওকত আলী : জানি না। এখনো মুক্তি পায়নি।

আমি : কি যেন নাম?

শওকত আলী : একাই একশ। তা, দুলাল, তোমার নতুন কোনো বই বেরুলো?

আমি : বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাঁরা গল্প কবিতা ছড়া গান লিখেছেন এবং তাঁর নামানুসারে যা আছে এইসব নিয়ে একটি তথ্যবহুল বই অনিন্দ্যে মুদ্রনের কাজ চলছে। আচ্ছা শওকত ভাই, শেখ মুজিবকে নিয়ে আপনার কোনো লেখা আছে? 

শওকত আলী : হ্যাঁ আছে। ‘যাত্রা’য় আছে। 

আমি : মঞ্জু ভাই, সাহিত্যের শুভ্র কাফনে শেখ মুজিব বইটি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতভাবে আপনার একটি গল্পের কথা বার বার মনে পড়ছে। 

মঞ্জু সরকার : কোন গল্পটি?

আমি : জিয়াউর রহমানকে নিয়ে লেখা প্রিয় দেশবাসী যে গল্পটি দেশের কোন কাগজে ছাপেনি।

শওকত আলী : মঞ্জু, কোন গল্পটি?

মঞ্জু সরকার : ‘প্রিয় দেশবাসী’। ছাপা হয়েছিলো কলকাতার একটি কাগজে। 

আমি : জিয়ার ভণ্ডামীর ন্মীর চিত্র আছে গল্পটিতে। জিয়াকে নিয়ে আরো দুটো গল্প আছে।

শওকত আলী : তাই? আমার জানা ছিলোনা।

আমি : জ্বী। একটা লিখেছেন আল মাহমুদ। অন্যটি হায়াত হোসেন। হায়াত হোসেনের গল্পটি খুবই চমৎকার। কর্নেল তাহের হত্যার পর ক্ষমতাগ্রহণকারী জিয়ার অনুশোচনা এবং অপরাধবোধের ওপর সাইকোলজিকেল গল্প। 

শওকত আলী : শেখ মুজিবকে নিয়ে এমনকি জিয়াউর রহমানকে নিয়েও গল্প লেখা হয়েছে, কিন্তু মওলানা ভাসানীকে নিয়ে লেখা হয়নি।

আমি : শামসুর রহমান কবিতা লিখেছেন।

শওকত আলী : ওই একটিই। আরো প্রচুর লেখা উচিত ছিলো।

আমি : আপনি কি শেখ মুজিব আর ভাসানীর অবস্থানকে এক করে দেখেন? শেখ মুজিব হচ্ছেন স্বাধীনতার স্থপতি এবং বাঙালী জাতীয়...

শওকত আলী : ভাসানীর কাগমারীর ভাষণের বিষয় নিয়েও গল্প লেখা যেত। 

আমি : সেটা কি স্বাধীনতার ডাক?

শওকত আলী : না ঠিক তা নয়। তবে তার মধ্যে অন্তর্নিহিত ব্যাপার ছিলো। 

আমি : আপনি কি লিখবেন?

শওকত আলী : নাহ্। আসলে যে শেখ মুজিবকে আমরা দেখেছি, সে শেখ মুজিবকে পাইনি। সিক্সটিজের মাঝামাঝি নবাবপুরে অনেকগুলো লোকের মাঝে লম্বা হ্যাংলা পাতলা শেখ মুজিব। সঙ্গে কর্মী। এক ভাঙা গাড়ির সামনে ভাঙা পা নিয়ে একটা লোক চিৎকার করছে, দেখে নেবো। দেখা হবে, ওই পার্লামেন্টে দেখা হবে। লোকটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নেতা টি আর খান। এ দৃশ্যটি এখনো মনে পড়ে। আমি আর ন্যাপের সাইফুল ইসলাম ওদিক দিয়ে যাচ্ছি। সাইফুলকে ডেকে শেখ মুজিব জিগ্যেস করলেন, ও কে? আমার পরিচয় পেয়ে বললেন, জগন্নাথের বাংলা টিচার? এরাই তো বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করবে। সেই মুজিব আর মুজিব ছিলেন না।

আমি : শওকত ভাই, কবিতা পড়েন? কবি ও কবিতা সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?

শওকত আলী : এখানে কবিতা নিয়ে অনেক কাজ কাজ হয়েছে। পঞ্চাশ দশক থেকে দীর্ঘ একটি ধারাবাহিকতাও রয়েছে। কিন্তু গল্পের ক্ষেত্রে তা নেই। ষাটের পর সত্তর আশি নব্বই-এ সে সড়ক তৈরি হয়নি।

আমি : কার কার কবিতা পড়েন?

শওকত আলী : আমি সময় পেলেই কবিতা পড়ি। মাঝেমধ্যে লিখিও

আমি : শুধু শামসুর রহমান, আল মাহমুদ...

শওকত আলী : না। তরুণদের কবিতাও পড়ি। তবে শামসুর একটি পর্যায়ে পৌঁছেছেন। গন্তব্যে গেছেন।

আমি : আল মাহমুদ?

শওকত আলী : আল মাহমুদও।

আমি : নির্মলেন্দু গুণ?

শওকত আলী : নির্মলেন্দু গুণ এখনো সে প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারেনি। যেভাবে শামসুর রাহমান আসাদের শার্ট লিখে জনগণের মধ্যে পৌঁছে গেছেন।

আমি : হুলিয়া কবিতাও তো বিখ্যাত কিংবা শেখ মুজিব নিয়ে কবিতাগুলো।

শওকত আলী : আমি গুণের কবিতা নিয়মিত পড়ি। কিন্তু এখনো সেই পর্যায় যায়নি।

আমি :  তরুণদের কবিতা সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?

শওকত আলী : এদের ‘নতুন কবিতা’ আমি পড়ি। ভালো লাগে। এরা রহস্যটাকে আরো সুন্দর করে প্রকাশ করে।

আমি :  রহস্যটাকে সুন্দরভাবে প্রকাশ ঠিক বুঝতে পারলাম না, শওকত ভাই। 

শওকত আলী : ধরো, ‘ভয়’ শব্দটাকে তারা আর ‘ভয়’ বলছে না। বলছে ‘তুমি’। এ ‘তুমি’ করে সম্বোধনটাই চমৎকার। 

আমি : হ্যাঁ, তাই হচ্ছে। ‘ভয়’ কে তারা বলছে ‘তুমি’  কিংবা ‘আপনি’। এভাবেই কবিতায় ‘ভয়’ও প্রেমিকা হয়ে উঠছে।

শওকত আলী : হ্যাঁ, ঠিক বলেছো।

আমি : এটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

শওকত আলী : বললাম তো ভালো। ‘ভয়’ যখন ‘তুমি’ হয়ে ওঠে, তখন কবিতা আরো বেশি আকর্ষণীয় এবং রহস্যময় এবং আবেদনীয় হয়ে উঠে। নতুন মাত্রা পায়।

আমি : দুর্বোধ্যতার অভিযোগকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

শওকত আলী : তা তো আছেই। তারপরও ‘ভয়’ যখন ‘তুমি’ তে পরিণত হয়, তখন তাতে একটা স্টাইল এবং একটা স্টান্ট দু’টোই থাকে। 

 

শওকত আলীর আলোকচিত্র ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত

 

//জেডএস//

x