রফিক আজাদের ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’

মুহম্মদ মুহসিন ১১:৫৮ , ফেব্রুয়ারি ১৪ , ২০১৮

noname

রফিক আজাদ দেশের অন্যতম নামী কবি। কবি হিসেবে তাঁর স্বীকৃতি রয়েছে অনেক সম্মাননায় ও পুরস্কারে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে জাতীয় সম্মাননার দুই বিশেষ নাম— বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদক— দুইই তিনি লাভ করেছেন। এছাড়াও বেসরকারি তরফে লাভ করেছেন ‘আলাওল পুরস্কার’, লেখক শিবির প্রবর্তিত ‘হুমায়ূন কবির স্মৃতি পুরস্কার’, কবি আহসান হাবীব পুরস্কার’ — ইত্যাদি এমন অনেক পুরস্কার ও  সম্মাননা।‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ তাঁর বহুল পঠিত কাব্যগ্রন্থের একটি। গ্রন্থটির অন্তত দুটি কবিতা  ‘তুমি : বিশ বছর আগে ও পরে’ এবং নাম-কবিতা ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বহুল আবৃত্তিতে অনুরণিত। শেষ কবিতাটি এমনকি বর্তমান দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্যের পাঠ্যসূচিরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এই গ্রন্থ লিখিত ও প্রকাশিত হওয়ার সময়কাল পর্যন্ত বাংলা কবিতায় অর্জিত শৈলী ও শিল্পমানের নিরিখে এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো কি শিল্পোত্তীর্ণ ছিল? এমন একটি প্রশ্ন নিয়ে অগ্রসর হলে ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ গ্রন্থটি আমার মতো অনেককেই হতাশ করতে পারে বলে আমার ধারণা।

এ কথা অনেকেই অনেকবার বলেছেন যে, দেশ বিভাগোত্তর বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব বাংলা) বাংলা কবিতা বেশ কিছুদিন  বিভিন্নরকম অসফল নিরীক্ষার পরে ষাট ও সত্তরের দশকের কবিদের হাতে একটি নতুন পথের দিশা পেয়েছিল। সে নতুন পথের পরিচয়ে বলা যায় কয়েকটি নিয়মিত কারিগরির কথা : ক. ভাববস্তুর কেন্দ্রিক প্রকাশ-রূপ কোনো ধ্রুবপদকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করার কৌশল, খ. স্লোগানের মতো করে মূল অভিব্যক্তিটির পুনরাবৃত্তি, গ. কোনো অনুভবকে ঘনীভবনের লক্ষ্যে উক্ত অনুভব-সম্পৃক্ত বস্তুপুঞ্জের তালিকা বয়ন, ঘ. কবিতার যেকোনো উচ্চমার্গীয় ভাব-অনুভবকে আটপৌরে কথার বয়ানে নামিয়ে আনা ইত্যাদি। খোন্দকার আশরাফ হোসেন তাঁর ‘লিভারপুল কবিকুল’ প্রবন্ধে একটু বেশি উদোম করিয়েই দেখিয়েছেন আমাদের সত্তরের দশকের নতুন পথের দিশারী কবিকুল কীভাবে তাঁদের এই সকল কারিগরির জন্য ষাটের দশকের লিভারপুলের কবিদের মধ্য থেকে বিশেষ করে এ্যাড্রিয়ান হেনরি, ব্রায়ান প্যাটেন এবং রজার ম্যাকগাফের কাছে কতটা ঋণী। ষাটের দশকে Penguin Modern Poets সিরিজের ১০ নং ভল্যুমে লিভারপুল কবিদের কাব্যনমুনা The Mersey Sound শিরোনামে প্রকাশিত হলে, শোনা যায়, ঢাকার কবিকুলের চোখের নাকি নিঁদ চলে গিয়েছিল। সেই কবিকুলের মধ্যে শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ প্রমুখের সঙ্গে রফিক আজাদও ছিলেন।

রফিক আজাদ তাঁর কবিতায় কাব্য-কারিগরির অংশ হিসেবে স্লোগানের মতো মূল অভিব্যক্তির পুনরাবৃত্তি করেছেন, উদ্দিষ্ট অনুভবের সঙ্গে সম্পৃক্ত বস্তুপুঞ্জের তালিকা বয়ন করেছেন, কেন্দ্রিক ভাববস্তুর সঙ্গে সহগামী রূপে চয়িত কোনো ধ্রুবপদ বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হাজির করেছেন এবং তাঁর উচ্চ-অনুচ্চ সকল মানবিক অনুভবকে একেবারে আটপৌরে সকাল-বিকালের ভাষায় বয়নের চেষ্টা করেছেন। অবশ্যই এর মানে এই নয় যে, কারিগরিগত এ জাতীয় অনুকৃতি বা অমৌলিকতার দায়ে দুষ্টু হিসেবে রফিক আজাদের কবিতা শিল্পে অনুত্তীর্ণ ও পাঠের আবেদনে নিষ্প্রভ। খোন্দকার আশরাফ হোসেনই উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে লিভারপুল কবিকুলের কাছ থেকে ধার করা শৈলী ও কারিগরি রপ্ত করে বাংলা ভাষায় বেশ কিছু অমর কবিতা রচিত হয়েছে। উদাহরণে তিনি বলেছেন রজার ম্যাকগাফের What You Are এর শৈলীর অনুকৃতিতে সৃষ্ট শামসুর রাহমানের  ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার কথা; কিংবা এ্যাড্রিয়ান হেনরির Don’t worry Everything is going to be All Right কবিতার শৈলীতে সৃষ্ট শহীদ কাদরীর ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’র কথা। এই বড় উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে শৈলীর অনুকৃতি শিল্পকে নিষ্প্রভ করে দেয় না। অনুকৃতির পরেও কবির জন্য থেকে যায় স্পেস যেখানে ঘোষিত হবে তাঁর সৃষ্টিশীলতার জোর এবং যেখানে মূর্ত হয়ে উঠবে কবির কাব্যিক ভাবনাগুলো পাঠকের আস্বাদন উপযোগী রূপে। ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’র কবিতাগুলোয় অনুকৃতির দুর্বলতা ছাপিয়ে কবির সেই জোর কি আমরা অনুভব করি? 

খোন্দকার আশরাফ হোসেন তাঁর প্রবন্ধে প্রদত্ত অনুকৃতির উদাহরণগুলোয় রফিক আজাদকেও উদ্ধৃত করেছেন। এ্যাড্রিয়ান হেনরির  to Love is ... কবিতার অনুকরণে সৃষ্ট রফিক আজাদের  ‘ভালোবাসার সংজ্ঞা’ কবিতাটি প্রবন্ধে উদ্ধৃত হয়েছে। আমরা দেখে নিতে পারি রফিক আজাদ এখানে অনুকৃতির বাইরে তাঁর মৌলিকতার জোর প্রকাশের কোনো সুযোগ নিয়েছেন কিনা এবং সেখানে তিনি কতটা সার্থক হয়েছেন। কবিতাটি উদ্ধৃত করা যেতে পারে :

ভালোবাসা মানে                 দুজনের পাগলামি

        পরস্পরকে হৃদয়ের কাছে টানা

ভালোবাসা মানে                  জীবনের ঝুঁকি নেয়া

        বিরহ-বালুতে খালি পায়ে হাটাহাটি

ভালোবাসা মানে                  একে অপরের প্রতি

         খুব করে ঝুঁকে থাকা   

ভালোবাসা মানে           ব্যাপক বৃষ্টি, বৃষ্টির একটানা

        ভিতরে বাহিরে দুজনের হেঁটে যাওয়া

কবিতাটি এ্যাড্রিয়ান হেনরির সংশ্লিষ্ট কবিতার কারিগরি অনুযায়ী একটি ধ্রুবপদকে ব্যবহার করছে। ধ্রুবপদটি এ্যাড্রিয়ান হেনরির ধ্রুবপদের একেবারে অনুরূপ। হেনরি বলছেন Love is আর রফিক আজাদ বলছেন ‘ভালোবাসা মানে’। পার্থক্য কিছুই না। তারপরও রফিক আজাদের কবিতাটিতে হেনরির কবিতার উচ্চতা অর্জিত হয়নি যেমনটা অর্জিত হয়েছে শহীদ কাদরীর ‘প্রিয়তমা, তোমাকে অভিবাদন’ কবিতায়। এই অসাফল্যের মূলে মৌলিকতা হারানোর দায়ই একমাত্র কারণ নয়। কারিগরিগত মৌলিকতা শহীদ কাদরীর কবিতাটিতেও নেই। তারপরও সেখানে ধ্রুবপদের সহগামী করে যে তুলনাচিত্র এবং উপমাচিত্রগুলো বয়ন করা হয়েছে সেগুলোতে অনুভবকে তাড়িত করার যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। উপমার অভাবনীয়তা সেখানে পাঠকের অনুভবকে নাড়িয়ে দেয়। যুদ্ধবিরোধী ভাবনাকে প্রেম ও প্রিয়তমার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে মহৎ অনুভবের কাব্যিকীকরণের উচ্চতর কাব্যিক প্রয়াস সেখানে রয়েছে। অপরদিকে রফিক আজাদের ‘ভালোবাসার সংজ্ঞা’য় আটপৌরে ও দৈনন্দিন সংসর্গের বস্তুনিচয়কে ভালোবাসার অনুভবের অনুষঙ্গী করে তুলে সে-সকল বস্তুর উপমায় ভালোবাসার সংজ্ঞা সাজানোর যে প্রয়াস রয়েছে তাতে সংশ্লিষ্ট বস্তুসমূহের জড় ও নিরেট অস্তিত্ব ছাড়িয়ে উপমারা একটুও আলো ছড়ায় না; বরং বস্তুর ভার অনুভবকে আরো ভারী করে তোলে এবং ভালোবাসার বোধটুকুও অকাব্যিকতার ভার থেকে প্রয়োজনমতো মুক্ত হতে পারে না। ভালোবাসাকে ‘পাগলামি’, ‘পরস্পরকে হৃদয়ের কাছে টানা’, ‘একে অপরের প্রতি খুব করে ঝুকে থাকা’ ইত্যাদি বহুল ব্যবহৃত বর্ণনায় ও চিত্রে এ কবিতায় তিনি বর্ণনা করেছেন। এই বর্ণনা ও চিত্র পাঠককে কাব্যিক গীতলতাও দেয় না, আবার উপমার অভাবনীয়তায় তাক লাগিয়েও দেয় না। ফলে তা প্রায়-কবিতার মতো এক বর্ণনা হয়েই শুধু পড়ে থাকে।

এই ধারায় কবিতার ভাববস্তুর কেন্দ্রিক প্রকাশ-রূপ কোনো ধ্রুবপদকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করার কৌশল এবং কোনো অনুভবকে ঘনীভবনের লক্ষ্যে উক্ত অনুভব-সম্পৃক্ত বস্তুপুঞ্জের তালিকা বয়নের কৌশলে নির্মিত হয়েছে  ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’র অনেক কবিতা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়  ‘তুমি চাও’, ‘পিছনে ফেলে আসি’, ‘স্পর্শের পুরাণ’, ‘মধ্যরাতে শোকগাঁথা’, ‘আমার কৈশোর’, ‘এমন কাউকে খুঁজি’,  ‘ঘড়ির কাঁটার মতো’, ‘শিকড়েরা’,  ‘ভালোবাসি’,  ‘এই রাতে’, ‘শব্দবন্দী’, ‘যদি ভালোবাসা পাই’, ‘চ’লে যাবো সুতার ওপারে’, ‘একটি শব্দের জন্য’, ‘মানুষ দেখি’, ‘নারী: কবির অভিধান’ ইত্যাদি আরও কতিপয় কবিতা। আমার অনুভবের কাছে সত্য হলো এই যে, এই সবগুলো কবিতায়ই রফিক আজাদ তাঁর ‘ ‘ভালোবাসার সংজ্ঞা’ কবিতার মতো অনুভব-সম্পৃক্ত বস্তুপুঞ্জের তালিকা বয়নের কৌশল  ও অনেক ক্ষেত্রে ভাববস্তুর কেন্দ্রিক প্রকাশ-রূপ কোনো ধ্রুবপদকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করার কৌশল দেদার ব্যবহার করেছেন। কিন্তু মৌলিকতা হারানোর এই ঘটনার বিনিময়ে রফিক আজাদের অর্জন খুব সামান্য। এই কবিতাগুলোর কোনোটিতেই তিনি পাঠককে কাব্যিক আবেশে মুগ্ধ করতে পারেননি কিংবা অচিন্ত্যনীয় কোনো ভাবনা বা অনুভবের অভিনবত্বে পাঠকের অনুভবটি নাড়িয়ে দিতে পারেননি, এমনকি পারেননি উপমার উজ্জ্বলতায় পাঠকের অনুভবরাজ্যকে আলোকিত করতে।

অবশ্য লিভারপুলের কবিদের কাছ থেকে ধার করা কারিগরিতে সাজানো এই কবিতাগুলোর অন্তত দুটোয় আমি রফিক আজাদের নিজস্বতার কিছু আলোর আভাস দেখেছি। একটি কবিতার নাম ‘দুঃখ/কষ্ট’। কবিতাটিতে পাখির উড়ে যাওয়া আর পাখির উড়ে যাওয়ার পরে তার পালক পড়ে থাকার চিত্রকে ভালোবাসার মানুষটি চলে যাওয়ার পরে পড়ে থাকা দুঃখের সঙ্গে তুলনা করে অনুষঙ্গী বস্তুসমূহের একটি বুনন উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে এখানে বস্তুর তালিকা বয়নের চেয়ে চিত্রে চিত্রে তুলনার মধ্য দিয়ে একটি স্পন্দন ও গীতলতা নির্মাণের প্রয়াসে কবি অধিকতর যতœশীল। সে প্রয়াস অনেক সার্থকভাবে কবিতাটিকে সমাপ্তির পথে নিয়ে আসে এবং করুণার অনুভবের এক শৈল্পিক বিমোক্ষণ ঘটায় যখন কবি  উচ্চারণ করেন— ‘উচ্চারিত তোমার শব্দের বড় ভুল মানে করে/ আজো আমি ‘দুঃখ’- এই দুঃখজনক শব্দের সাথে/ ভাগ করে নিই রাতে আমার বালিশ’। এমন আরেকটি উদাহরণে বলা যায় ‘একটি শব্দের জন্যে’ কবিতাটির নাম। এ কবিতাটিতে প্রচুর পুনরুক্তি থাকলেও প্রতিটি পুনরুক্তি অধিকতর তীব্রতায় অনুভবের ঘনীভবনে পারঙ্গম। এ কারণেই পুনরুক্তির অমৌলিক আঙ্গিক কবিতাটিকে খুব নিষ্প্রভ করে না। ভালোবাসার অনুষঙ্গী অনেক চিত্র বয়ানের প্রতিভাদীপ্তিতে কবির নিজস্বতা ও যোগ্যতা ঘোষণা করে।

অবশ্য গ্রন্থটির সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতা দুটোর কারিগরি লিভারপুল কবিকুলের কাছ থেকে ধার করা নয়। একটি ‘তুমি : বিশ বছর আগে ও পরে’ এবং অপরটি গ্রন্থের নাম-কবিতা  ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’। ‘তুমি : বিশ বছর আগে ও পরে’ কবিতাটি বহন করে কাব্যধারায় অতি পুরাতন এক গাল্পিক আঙ্গিক। এ আঙ্গিকে কবিতাটি উদ্দিষ্ট অনুভব উদ্রেকের লক্ষে প্রথমে একটি গল্প বলে এবং গল্পটি শেষ করে সেই গল্পনিঃসৃত এক চিন্তাগাঢ় কিংবা অনুভব-গাঢ় উচ্চারণ দিয়ে। মধুসূদন দত্তের ‘রসাল ও স্বর্ণলতিকা’ কবিতাটি এ আঙ্গিকের এক ধ্রুব উদাহরণ। সেখানে প্রথমে একটি আমগাছ ও সেই গাছকে পেঁচিয়ে বেড়ে ওঠা একটি স্বর্ণলতার একটি গল্প প্রথমে বলা হয়। আত্মগৌরবে গরীয়ান দৃঢ় শিকড় ও কাণ্ডের আমগাছ স্বর্ণলতাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছে কারণ স্বর্ণলতার নাই কোনো শিকড় বা মূল এবং তার কাণ্ডটিও কোনো রকম দৃঢ়তা ধারণ করে না। স্বর্ণলতার দীনতা এভাবে তাচ্ছিল্য করার মধ্যেই হঠাৎ ঝড় উঠলো এবং ঝড়ে  ‘মহাঘাতে মড়মড়ি রসাল ভূতলে পড়ি/ হারাইলা আয়ুসহ দর্প বনস্থলে’। গল্পের যখন এখানে শেষ তখন কবি উচ্চারণ করেন এ গল্প থেকে নিসৃঃত আপ্তবাক্য—‘উচ্চশির যদি তুমি কুলমান ধনে/ করিও না ঘৃণা তবু নিচশির জনে’। এই আঙ্গিকেরই একটি নবতর প্রয়োগ করলেন রফিক আজাদ তাঁর এই কবিতায়। এখানেও কবি একটি গল্প বললেন। কবিতাটিতে প্রথমে কবি তাঁর কৈশোরের কোনো নারী বন্ধুর গল্প শোনোলেন। কবির নারী বন্ধু প্রমথ চৌধুরীকে প্রথম চৌধুরী উচ্চারণ করত, ‘জনৈক’কে উচ্চারণ করতো জৈনিক’, সাধু-চলিতের মিশ্রণ তার ভাষায় সর্বদা লেগে থাকত। কবি বিশ বছর পরে সেই নারী বন্ধুর সাক্ষাৎ পেলেন কোনো এক সভার বক্তা রূপে। কবি দেখলেন প্রগতি ও উন্নতির ধারাবাহিকতায় তাঁর বিশ বছর আগের চেনা বন্ধুটির সেই সকল চেনা ভুলগুলো একটিও আর তার সঙ্গে নেই, সেগুলো তার থেকে চলে গিয়ে সরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে দূর অতীতের কোনো এক গহ্বরে। গল্পের এই কাহিনি থেকেই কবি উপসংহারে বের করে আনেন এক অভিনব অনুভবের উচ্চারণ—‘এতো সুন্দর, স্পষ্ট ও নির্ভুল উচ্চারণে তোমার বক্তব্য রাখলে,  শুনে অবাক ও ব্যথিত হলুম! আমার বুকের মধ্যে জেঁকে-বসা একটি পাথর বিশ বছর পরে নিঃশব্দে নেমে গেল।’ মধুসূদন তার কবিতার উপসংহার ঘটিয়েছিলেন পঞ্চতন্ত্রীয় গল্পের ধারায় উপদেশের উচ্চারণ দিয়ে, কাঠামো তেমন রেখেই রফিক আজাদ সেই উপসংহার টেনেছেন উপদেশের পরিবর্তে তীব্র আবেগের ও অনুভবের এক উচ্চারণ দিয়ে। গাঢ় ও গভীর সে উচ্চারণ অসাধারণ যৌগ্যতায় মোক্ষণ ঘটায় এক তীব্র প্রেমানুভবের। বিশ বছর ধরে লালন-করা গোপন গভীর প্রেম এক মুহূর্তে অপসৃত হয়ে যায় এবং লুকিয়ে যায় সেই দূর গহ্বরে যেখানে লুকিয়েছে তার প্রেমের নারীটির সেই সহানুভূতি-আর্দ্র ভুলগুলো। উপসংহারের এই সফলতা কবিতাটিকে সফল করে তোলে। ফলে এর আঙ্গিকগত অমৌলিকতা ছাপিয়েও রফিক আজাদ তাঁর যোগ্যতার পরিচয় দিতে সমর্থ হন।  

কিন্তু এ যোগ্যতাও এমন সফলতায় জেগে ওঠেনি গ্রন্থের নাম কবিতা ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’য়, যদিও শিল্পোত্তীর্ণ কবিতা বিবেচনা করেই ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কবিতাটি এখন দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্যের সিলেবাসভুক্ত। ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ মূলত চুনিয়া নামক একটি গ্রামের বর্ণনা।‘চুনিয়া’ গ্রামটিকে কবি গ্রিক আদর্শিক ও রোমান্টিক উপত্যকা আর্কেডিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং কাব্যিকভাবে দাবি করেছেন যে, এই আদর্শিক গ্রামটি দাঁড়াবে বর্তমান সভ্যতার সকল হানাহানি আর রাহাজানির বিরুদ্ধে। ভাবনাটি কাব্যিক ও রোমান্টিক। কিন্তু কবিতার কলেবরে সেই কাব্যিকতা ও রোমান্টিকতাকে ধারণ করার আয়োজনে দৃষ্টিগ্রাহ্যরকমের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এ কথা অনস্বীকার্য যে বস্তুনির্দেশক (referential) ভাষা কাব্যিকতা ও রোমান্টিকতা ধারণের ভাষা নয়, কাব্যিকতা ও রোমান্টিকতা ধারণের জন্য ভাষাকে হতে হবে অনুভূতি-উদ্দীপক (evocative)। কিন্তু এই অনস্বীকার্যকে অগ্রাহ্য করে সচেতনে কিংবা অসচেতনে রফিক আজাদ এই কবিতার কলেবর নির্মাণ করেছেন বস্তুনির্দেশক ভাষার প্রাধান্যে। বস্তুনির্দেশক ভাষায় শব্দের আয়তন আর অর্থের আয়তন সমান থাকে। শব্দরা সেখানে অভিধানের অর্থের চেয়ে উঁচুতে উঠে বচন থেকে অনির্বচনীয়তায় পৌঁছাতে পারে না। যে ভাষা বা যে বয়ান অনির্বচনীয়তায় পৌঁছাতে পারে না সে বয়ানকে কবিতা বলা কঠিন। এই কঠিন কথাটি  ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কবিতার জন্য অনেকখানি প্রযোজ্য। এখানকার ভাষা ও বয়ান অকাব্যিক রকমের বস্তুনির্দেশক। ‘চুনিয়া একটি গ্রাম, ছোট্ট কিন্তু ভেতরে ভেতরে/ খুব শক্তিশালী/ মারণাস্ত্রময় সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে/ মধ্যরাতে চুনিয়া নীরব/ . . . চুনিয়া কখনো কোনো হিংস্রতা দ্যাখেনি/ . . . চুনিয়া শুশ্রƒষা জানে,/ চুনিয়া ব্যান্ডে বাঁধে, চুনিয়া সান্ত্বনা শুধু-/ চুনিয়া কখনো জানি কাউকেই আঘাত করে না/ চুনিয়া সবুজ খুব, শান্তিপ্রিয়...’ –  এই ভাষা খবরের কাগজের ভাষার মতো শুধু খবর বলে যায়। কবিতা এভাবে খবর বলে অনুভব জাগানোর বস্তু নয়। এ কবিতার সাফল্য যেটুকু তা শুধু কবির কাব্য-ভাবনার চমৎকারিত্বের মধ্যে নিহিত—  অর্থাৎ একটি আদিবাসী গ্রামকে সভ্যতার হানাহানির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়ার সাহসী ভাবনার মধ্যে নিহিত। পরে কবিতার ভাষা সেই কাব্য-ভাবনার জন্য যে শরীর জুগিয়েছে তা বরং ভাবনাটিকে তার অতি উচ্চতা থেকে অনেকখানি নামিয়ে এনেছে। রফিক আজাদের মতো একজন যশস্বী ও ওজস্বী কবির হাতে খবরের কাগজীয় এই ভাষার আয়োজন খুব মানানসই নয়।

রফিক আজাদের কবিতার আলোচনায় এতক্ষণ ধরে আমি যা বললাম তার নেহায়েত কোনো মূল্য না থাকার পক্ষে একটি জ্বলজ্যান্ত ঘটনা আছে। সেটি সম্ভবত এই শেষ লগ্নে এসে বলে দেয়া প্রয়োজন যাতে রফিক আজাদের পাঠকরা আমার এসব কথাকে কোনোভবে আমলে না নেন। আমি হলাম কবিতার এমন একজন পাঠক যে বিশ বছর ধরে পড়েও বুঝে উঠতে পারছে না যে জগদ্বিখ্যাত কবি উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসের The Red Wheelbarrow/ so much depends/ upon/ a red wheel/ barrow/ glazed with rain/ water/ beside the white/ chickens’. কিংবা ‘This Is Just To Say/ I have eaten/ the plums/ that were in/ the icebox/ and which/ you were probably/ saving/ for breakfast/ Forgive me/ they were delicious/ so sweet/ and so cold’ কী যৌগ্যতায় কবিতা হলো। জগদ্বিখ্যাত সব কবিতা, তার ওপর আবার আলোচনা লিখেছেন জগদ্বিখ্যাত সব অধ্যাপক ও আলোচকরা। সেই সব  পড়েও যে-পাঠক প্রশ্ন করে ‘সেগুলো কীভাবে কবিতা হলো’— কবিতা বিষয়ে তার এলেম দেয়ার হক আসে কোত্থেকে? সুতরাং তার এই আলোচনাকে কোনোরকম পাত্তা না দিলেই সেটি হবে রফিক আজাদের জন্য তথা সাহিত্যের জন্য মঙ্গল।  

রফিক আজাদের আলোকচিত্র ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত

 

//জেডএস//

x