বইপড়ার গল্প মহাভারত, একমাত্র মহাভারত বারবার

হামীম কামরুল হক ১৩:৫৯ , মে ০২ , ২০১৮

একজন লেখকের সার্বক্ষণিক সঙ্গী বই। নিজেকে সৃজনমুখর করতে বইয়ের বিকল্প নেই। বইয়ের স্পর্শ, গন্ধ ও অক্ষর-সমুদ্র সবসময়ই আন্দোলিত করে লেখককে। বাংলা ট্রিবিউন সাহিত্য বিভাগের লিখিত প্রশ্নে আমরা শুনতে চেয়েছি এ সময়ের পড়ুয়া লেখকের বইপড়ার গল্প। 

বাংলা ট্রিবিউন : আপনার পড়া প্রথম বইয়ের নাম মনে আছে? বইটি কীভাবে পেলেন? প্রচ্ছদ বা ভিতরের পৃষ্ঠাগুলো কেমন, পড়ার অনুভূতি কেমন—ইত্যাদি গল্প শুনতে চাই।

হামীম কামরুল হক : সম্ভবত ‘ঠাকুরমার ঝুলি’। তখন চট্টগ্রামে থাকি। মা-বাবার সঙ্গে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট যাকে বলে বিপনী বিতান, সেখানে হয় কারেন্ট বুক সেন্টার বা উজালা বুক ডিপো—কোনো একটা দোকান থেকে আমার বায়নার জন্য বাবা কিনে দিয়েছিলেন। প্রচ্ছদে ছিল সেই রাক্ষসের ছবির পাশে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া রাজকন্যা ও রাজপুত্রের ছবি। ভেতরের পৃষ্ঠাগুলি নিউজপ্রিন্টের। আর সে বই তো রুদ্ধশ্বাসে পড়ার বই। ছোটবেলার পড়া রূপকথা দিয়েই শুরু।

 

বাংলা ট্রিবিউন : সর্বশেষ কী বই পড়লেন—বইটির পাঠ অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

হামীম কামরুল হক : সেই দিক থেকে এখন পর্যন্ত সর্বশেষ পড়া স্মরণীয় বই ‘মবিডিক’। ‘মবিডিক’ পড়ার অনুভূতি অল্প কথা বলা মুশকিল। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সেই বই-ই প্রকৃত বই যে বই পড়লে মনে হয় বই পড়ছি না। ‘মবিডিক’ পড়তে গিয়ে অন্য এক জগতে ঢুকে পড়েছিলাম। যতক্ষণ বই হাতে ততক্ষণ এর কথক ইসমাইলের সঙ্গে ছিলাম। তার শব্দরেখা ধরে সমুদ্র, তিমি আর ক্যাপ্টেন আহাবের সর্বনাশা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিলাম। তবে কুইকওয়েগ নামের আদিবাসী চরিত্রটি সত্যিই শুরুতে মুগ্ধ করেছিল।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কিনে রেখেছেন, পড়া হয়নি কিন্তু পড়ার জন্য ভেতরে এক ধরণের চাপ অনুভব করেন—এমন বই সম্পর্কে জানতে চাই।

হামীম কামরুল হক : অসংখ্য বই আছে। এর প্রথমেই রাখি—রবীন্দ্ররচনাবলী—পুরো পড়ার চাপ বোধ করি। রামায়ণ মহাভারত এবং এ দুটো বই নিয়ে নানান আলোচনা সমালোচনার যে শখানেক বই সংগ্রহে আছে সেসব পড়ার চাপ বোধ করি। বলতে কি আমার কাছে থাকা সমস্ত ক্ল্যাসিক বই যেগুলি পড়া হয়নি সেগুলি পড়ার চাপ বোধকরি। নতুন করে পড়তে চাই বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র, প্রমথ চৌধুরী থেকে শুরু করে বিভূতি, তারাশঙ্কর, মানিক, সতীনাথ, সমরেশ বসু, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, অমিয়ভূষণ, কমলকুমার, সৈয়দ হক, শওকত আলী, হাসান, ইলিয়াস, মাহমুদুল হক, কায়েস আহমদ থেকে সত্তর আশি নব্বই শূন্যদশকের কত কত লেখকের লেখা; সঙ্গে মার্সেল প্রুস্ত, টমাস মান, ফ্রানৎস কাফকা, রবার্ট মুসিল থেকে শুরু করে গুন্টার গ্রাস, জোসে সারামাগো, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, নাগিব মাহফুজ, সালমান রুশদি, ওরহান পামুক থেকে হারুকি মুরাকামি—আরো কত কত লেখকর পড়ার চাপ অনুভব করি। সমস্ত প্রধান অপ্রধান ভাষার সেরা সেরা কবির কবিতা পড়তে চাই। জোসেফ ক্যাম্পবেল, অলিভার সাকস, রিচার্ড ডকিন্স, রিচার্ড ফাইনম্যানদের মতো ভাবুক চিন্তক বিজ্ঞানীদেরও কত বই যে জমে আছে। জমে আছে সার্ত্রে, কামু, হেবারমাস, ফুকো, দেরিদা, লাকাঁসহ আর কত লেখকের বই।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কোন কোন বইটি পড়ার আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু সংগ্রহে নেই?

হামীম কামরুল হক : জর্জ পেরেকের ‘লাইফ অ্যা ইউজার্স ম্যানুয়াল’ সংগ্রহ করেছি, তাঁর অন্য সব বই পড়তে চাই। কিন্তু  আদৌ সেসব জোগাড় করা হবে কিনা জানি না। বাসুদেব দাশগুপ্তের রচনাসংগ্রহের দ্বিতীয় খণ্ড, হয়ত প্রকাশিত হয়নি।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কোন বইটি সবচেয়ে প্রিয়, বারবার পড়তে চান? কেন?

হামীম কামরুল হক : মহাভারত, একমাত্র মহাভারত বারবার।  কারণ মহভারতের চেয়ে চিরন্তন ও আধুনিক লেখা আর কিছু হতে পারে কিনা জানি না। 

 

বাংলা ট্রিবিউন : কোন বইটি আপনার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে? কী করেছিলেন?

হামীম কামরুল হক : বই যদি কুপ্রভাব ফেলে তবে প্রকৃত পাঠক সেই কু থেকেও সুফল আদায় করতে পারেন। কোনো প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাচেতনার বইপত্র থেকেও বোঝা যায় নিজের পাঠক হিসেবে অবস্থান কতটা দুর্বল বা কতটা পরিপক্ব।

 

বাংলা ট্রিবিউন : নির্জন দ্বীপে একজন মাত্র লেখকের বই নিয়ে যেতে বললে, কোন লেখককে বেছে নেবেন, কেন?

হামীম কামরুল হক : কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস। সদ্য তরুণ বয়সে সেখানে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠেছিল নিকোলাই গোগলের ‘রচনা সপ্তক’। বিশেষ করে করে তাঁর উপন্যাস ‘তারাস বুলবা’ ও গল্প ‘ওভারকোট’ মাতিয়ে রেখেছিল অনেক দিন। তখন ভাবতাম দ্বীপান্তরে বা জেলে গেলে এই ‘রচনা সপ্তক’ই হবে সঙ্গী।

 

বাংলা ট্রিবিউন : বই না পড়ে আপনি বাঁচতে পারবেন কিনা? কেন?

হামীম কামরুল হক : বেশি দিন মনে হয় পারব না। এটা ইতিমধ্যে পরীক্ষাও করে দেখিছি—বই না পড়ে দিন কাটাতে কেমন লাগে। মনে হচ্ছিল দম আটকে আসছে। একদিনের বেশি থাকতে পারিনি।

 

বাংলা ট্রিবিউন : অন্যকে কোন বইটি পড়ার পরামর্শ দেবেন, কেন?

হামীম কামরুল হক : মহাভারত। কারণ সত্যিই এ বই জীবনের মর্ম, বেঁচে থাকার ধর্ম এবং ইচ্ছা-অনিচ্ছার ঠেকাঠুকিতে জেগে ওঠা প্রজ্ঞার দিকে মানুষকে বারবার নিয়ে যেতে পারে। এর রসবোধ, শিল্পবোধ এবং জীবনবোধের তুলনা চলে না জগতের কোনো বইয়ের সঙ্গে।

 

বাংলা ট্রিবিউন : আপনার লেখা কোন বইটিকে আপনি বেশি গুরুত্ব দেন, কেন?

হামীম কামরুল হক : একটি বইকেও না। কারণ তেমন কোনো বই আমি এখনও লিখে উঠতে পারিনি।


 

আরও পড়ুন—

বই এক বিকল্প পৃথিবীর জন্ম দেয় আমার ভেতর

//জেডএস//

x