বইপড়ার গল্প বই কেড়ে নিলে আমি নিঃস্ব—অসহায় হয়ে যাবো

আহমাদ মোস্তফা কামাল ১৪:৪০ , মে ০৬ , ২০১৮

একজন লেখকের সার্বক্ষণিক সঙ্গী বই। নিজেকে সৃজনমুখর করতে বইয়ের বিকল্প নেই। বইয়ের স্পর্শ, গন্ধ ও অক্ষর-সমুদ্র সবসময়ই আন্দোলিত করে লেখককে। বাংলা ট্রিবিউন সাহিত্য বিভাগের লিখিত প্রশ্নে আমরা শুনতে চেয়েছি এ সময়ের পড়ুয়া লেখকের বইপড়ার গল্প। 

বাংলা ট্রিবিউন : আপনার পড়া প্রথম বইয়ের নাম মনে আছে? বইটি কীভাবে পেলেন? প্রচ্ছদ বা ভিতরের পৃষ্ঠাগুলো কেমন, পড়ার অনুভূতি কেমন—ইত্যাদি গল্প শুনতে চাই।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : বেশ ছোটবেলা থেকেই বই পড়তাম, মনে পড়ে। অত ছোটবেলায় কোত্থেকে বই পড়ার নেশা জন্মেছিল, বলতে পারবো না। তখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি, স্কুলের পাঠ্যপুস্তক ছাড়া অন্য বই খুব একটা দেখিও না চোখে। মানে, বাড়িতে যা বইটই ছিল, সবই বড়দের। ওগুলোতে দাঁত বসানোর মতো যথেষ্ট শক্তি তখনো হয়ে ওঠেনি আমার। ফলে বই মানেই ছোটদের বই, প্রধানত রূপকথা। ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ কিংবা আরো কিছু ভূতপ্রেতের গল্প ততদিনে পড়া হয়ে গিয়েছিল, তখন হাতে এলো ‘রুশদেশের উপকথা’ নামক এক অপূর্ব-সুন্দর রূপকথার বই। প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গিয়েছিল বইটি। যতদূর মনে পড়ে, হার্ডকভারের প্রচ্ছদে ইভান আর তার নেকড়ের ছবি ছিল। আরো কিছু থাকতে পারে, মনে নেই। ভেতরের পৃষ্ঠাগুলো ছিল গ্লসি-অফসেট পেপারের, বেশ চকচকে। কী সুন্দর কাগজ, ঝকঝকে ছাপা, গল্পের সঙ্গে সুন্দর সুন্দর কত ছবি, ভালো না লেগে উপায় আছে? এর আগে কখনো এমন বই তো দেখিইনি! কীভাবে সেটা বাড়ি পর্যন্ত এসেছিল, কে এনে দিয়েছিলেন, তা আর মনে পড়ে না।

আমার মেজভাই রুশ সাহিত্যের ভক্ত ছিলেন, তাঁর কাছে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া থেকে প্রকাশিত অনেক বাংলা বই ছিল, সম্ভবত তাঁর হাত ধরেই বইটি বাড়িতে এসেছিল। বইটি পাওয়ার পর নাওয়া-খাওয়া ভুলার মতো অবস্থা হলো আমার, সেটি হয়ে উঠলো আমার নিত্যসঙ্গী। বেশ কয়েকবার বইটি পড়েছি আমি। পড়ার অনুভূতি যে রোমাঞ্চকর ছিল তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ঠাকুরমার ঝুলির মতো ওটাও রূপকথার বই, তবে মানুষগুলো একেবারেই অচেনা। যে বরফঢাকা দেশটির গল্প ওটাতে ছিল, সেটিও অচেনা। ঠাকুরমার ঝুলি পড়তে গিয়ে যেমন কাউকে কাউকে প্রায় চেনা মানুষের আদলে ভাবতে পেরেছি, এই বই থেকে তা পারা যাচ্ছে না। এই অচেনা মানুষগুলো কী কী করছে সেই কৌতূহলে আমি প্রায় উত্তেজনায় কাঁপছি। বলাবাহুল্য, মানুষগুলো অচেনা হলেও তারা যে সত্যি মানুষ তা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহই ছিল না। ঠাকুরমার ঝুলির সব মানুষকেও সত্যি বলে মনে হতো আমার। এবং রূপকথায় যেমনটি থাকে, মানুষ ছাড়াও অন্য প্রাণীরা—এমনকি বৃক্ষরাও—কথাটথা বলতে পারে, আমার সেটাকেও সত্যি বলেই মনে হতো। তো, ওই রুশদেশের উপকথার ইভান নামের রাজপুত্রটিই আমার ছোটবেলার নায়ক হয়ে ওঠে। আমার প্রথম নায়ক। বলাবাহুল্য, ইভানের সঙ্গে আমার কোনো মিলই ছিল না, নিজেকে ইভানের জায়গায় কল্পনা করাও ছিল অসম্ভব। কারণ ওই বরফের দেশে, স্লেজগাড়ির দেশে যা যা ঘটে তা আমার দূর কল্পনাতেও ধরা পড়তো না। তবু ইভানকে এত ভালো লেগেছিল কেন? কেন বারবার পড়েছিলাম ইভানের গল্পগুলো? মনে পড়ে না।

 

বাংলা ট্রিবিউন : সর্বশেষ কী বই পড়লেন—বইটির পাঠ অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : একসঙ্গে একাধিক বই পড়ি আমি। নতুন প্রকাশিত বই যেমন পড়ি, তেমনই পড়ি পুরোনো কোনো ভালো লাগা বই, হয়তো আগে বেশ মুগ্ধ হয়েছিলাম, আবার পড়তে ভালো লাগছে—এ রকম বই। এবারের বইমেলা থেকে তরুণ প্রজন্মের লেখকদের অনেকগুলো বই কিনেছি, সেগুলো পড়তে শুরু করেছি। পড়া শেষ হওয়ার আগে পাঠ-অভিজ্ঞতার কথা বলা যাবে না।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কিনে রেখেছেন, পড়া হয়নি কিন্তু পড়ার জন্য ভেতরে এক ধরনের চাপ অনুভব করেন—এমন বই সম্পর্কে জানতে চাই।

আহমাদ মোস্তফা কামাল : অনেক বই। বিশেষ করে বিশ্বসাহিত্যের বিখ্যাত কিছু উপন্যাস। যেমন ইউলিসিস। বহু বছর ধরে বইটি পড়ার তালিকায় আছে, কিন্তু পড়া হয়ে উঠছে না। বিশ্বব্যাপী এত আলোচিত একটা উপন্যাস না পড়ে মরে যাওয়া ঠিক হবে না, এই ধরনের চাপ অনুভব করি আজকাল।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কোন কোন বই পড়ার আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু সংগ্রহে নেই?

আহমাদ মোস্তফা কামাল : আমি নানা ধরনের বই পড়ি। একটা বই পড়তে পড়তে আরেকটা বইয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। সংগ্রহে না থাকলে সেই আগ্রহটি বেড়েই চলে। একটা উদাহরণ দিই। নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী লিওন লেডারম্যানের একটা বই আছে ‘দ্য গড পার্টিকেল : ইফ দ্য ইউনিভার্স ইজ দ্য আন্সার, হোয়াট ইজ দ্য কোয়েশ্চেন?’ এই বইটির একটা মাত্র অধ্যায় পড়ার সুযোগ হয়েছিল। এত ভালো লেগেছিল যে, এক সহকর্মী লন্ডনে যাওয়ার সময় বইটি আনার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। তিনি এনেছেন ঠিকই কিন্তু ওই বইটি নয়, একই লেখকের লেখা ভিন্ন একটি বই। বুভুক্ষের মতো অপেক্ষা করছি বইটি পাওয়ার জন্য। পাচ্ছি না। আরেকটি বইয়ের কথা বলি। অঁতোয়ান দ্য স্যাঁৎ-একজ্যুপেরির (Antoine de Saint-Exupéry) দ্য লিটল প্রিন্স আমার খুব প্রিয় উপন্যাস। তো এই লেখক সম্বন্ধে জানতে গিয়েই বেরিয়ে এলো আরেকটি বইয়ের নাম। তাঁর স্ত্রী কনসিউলো দ্য স্যাঁৎ—একজ্যুপেরির লেখা আত্মজীবনী গ্রন্থ ‘দ্য টেল অফ দ্য রোজ’। বইটি পড়ার তীব্র আগ্রহ হচ্ছে। কারণ, একজ্যুপেরিকে আমার ভীষণ রহস্যময় এক লেখক মনে হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভাষায় অনূদিত, আলোচিত-সমাদৃত-বিক্রিত উপন্যাসটি লিখে তিনি তো হারিয়ে গিয়েছিলেন অল্প বয়সেই। তাঁর নিজের কোনো আত্মজীবনী নেই, কনসিউলো’র বই থেকে হয়তো তাঁর ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যাবে। কী লিখেছেন কনসিউলো তাঁর সম্বন্ধে? দারুণ কৌতূহল হয়। কিন্তু এসব বই তো সহজে পাওয়ার উপায় নেই।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কোন বইটি সবচেয়ে প্রিয়, বারবার পড়তে চান? কেন?

আহমাদ মোস্তফা কামাল : একটি নয়, একাধিক বই।  জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়ি; একটু আগে দ্য লিটল প্রিন্স-এর কথা বললাম, সেটি বারবার পড়ি; শঙ্খ ঘোষের গদ্যসংগ্রহ, বিশেষ করে তাঁর ‘জার্নাল’ অনেকবার পড়েছি; মানিকের পুতুল নাচের ইতিকথা কয়েকবার পড়েছি; বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী, মাহমুদুল হকের কালো বরফ এবং জীবন আমার বোন একাধিকবার পড়েছি; জোসেফ ক্যাম্পবেলের মিথের শক্তিও বারবার পড়ার মতো বই। ক’টার নাম বলবো? বারবার এগুলো পড়ি, কারণ একেকটি ভালো বই পড়ার অভিজ্ঞতা একেকটি নতুন জন্মের মতো। বইটি পড়ার আগে যে মানুষটি ছিলাম আমি, পড়ার পর আর সে মানুষটি থাকি না। কোথাও একটা গভীর পরিবর্তন ঘটে যায়।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কোন বইটি আপনার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে? কী করেছিলেন?

আহমাদ মোস্তফা কামাল : কোনো বই-ই তেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হয় না। আমি সর্বভূক পাঠক। একসময় সব বই-ই পড়তাম। এখন যে বই পড়তে ভালো লাগে না, পড়ি না। নিজের ওপর এত টর্চার করার তো কোনো মানে নেই। জগতে কত অসামান্য বই পড়ে আছে!

 

বাংলা ট্রিবিউন : নির্জন দ্বীপে একজন মাত্র লেখকের বই নিয়ে যেতে বললে, কোন লেখককে বেছে নেবেন, কেন?

আহমাদ মোস্তফা কামাল :  এ রকম কোনো অপশন আমি মানবো না। যত প্রিয় বইই হোক না কেন, আমি একজন লেখককে নিয়ে থাকতে রাজি নই আমি। তবে স্বল্প সময়ের জন্য কোথাও ছুটি কাটাতে গেলে ওপরে যে বইগুলোর কথা বললাম সেগুলো ফের পড়ার জন্য।

 

বাংলা ট্রিবিউন : বই না পড়ে আপনি বাঁচতে পারবেন কিনা? কেন?

আহমাদ মোস্তফা কামাল : হয়তো বাঁচবো। জীবন তো কোনোভাবেই থেমে থাকে না। তবে আমার কাছ থেকে বই কেড়ে নিলে আমি একবারেই নিঃস্ব-অসহায় হয়ে যাবো। আনন্দ ও উৎসব বলতে কোনো কিছু থাকবে না আমার জীবনে।

 

বাংলা ট্রিবিউন : অন্যকে কোন বইটি পড়ার পরামর্শ দেবেন, কেন?

আহমাদ মোস্তফা কামাল : এ বিষয়ে আমার কোনো পরামর্শ নেই। আমি নিজে সব ধরনের বই পড়ি। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যই আমাকে বিভিন্ন ধরনের বইয়ের কাছে নিয়ে যায়। সম্ভবত সব পাঠকই তাই করেন। তাদের কোনো পরামর্শের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।

 

বাংলা ট্রিবিউন : আপনার লেখা কোন বইটিকে আপনি বেশি গুরুত্ব দেন, কেন?

আহমাদ মোস্তফা কামাল : এই প্রশ্নটি আমার জন্য খুব কঠিন হয়ে গেল। যা লিখেছি ভালোবেসেই তো লিখেছি। পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছি গভীর যত্ন করে। এই লেখাগুলোর গুরুত্ব হয়তো অন্যের কাছে নেই কিন্তু আমার নিজের কাছে তো গুরুত্বপূর্ণ। একেকটা বইয়ের সঙ্গে কত স্মৃতি, কত আনন্দ-বেদনা, কত অশ্রু “ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠার কথকতা! কোনটাকে বেশি গুরুত্ব দেবো আর কোনটাকে কম, বলুন? যখন জীবন দুর্বহ হয়ে ওঠে তখন বইগুলোর দিকে তাকিয়ে কিছুটা সান্ত্বনা পাই, মনে হয় একেবারে বৃথা কাটাইনি সময়টা। এই তো, এটুকুই।


আরও পড়ুন—
মহাভারত, একমাত্র মহাভারত বারবার

//জেডএস//

x