ছেলেবেলার গল্প

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ১৪:৪৩ , মে ১৩ , ২০১৮

১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি আমার জন্ম, সিলেটে। মাঘ মাসের ৪ তারিখ। হাড়কাঁপানো শীতকাল চলছিল। মাঘের আবহাওয়ায় খুব বেশি বৈচিত্র্য থাকে না। যা থাকে তা কুয়াশা আর শীত। আমি যেদিন জন্মেছিলাম সেদিন খুব শীত পড়েছিল। তাই আমি কিছুটা শীতকাতুরে। কিন্তু আমার মা আমাকে জোর করে প্রতিদিন গোসলে পাঠাতেন। তাতে আমার আলস্যের প্রতি একটা দুর্বলতা রয়ে গেছে ছোটবেলা থেকেই। একটি কথা সিলেটের কিছু গ্রামে প্রচলিত আছে—‘শীতে যার জন্ম, সে হয় নিষ্কম্ম’। এই কথাটি আমি স্বীকার করি। আমার জন্ম হয়েছে শীতে এবং আমি একটু অলস প্রকৃতিরই।

আমাদের সময়টা ছিল অসাধারণ। প্রত্যেকেরই হয়তো বাল্যকাল অসাধারণ হয়। আমার বাল্যকাল অসাধারণ বলার কারণ হচ্ছে, সময়টা ছিল খুব মানবিক। আমি যে পাড়ায় জন্মেছি, বড় হয়েছি, সেই পাড়াতে মুসলমান পরিবারের সংখ্যা ছিল হাতেগোনার মতো। মুসলমান পরিবার থেকে বেশি ছিল হিন্দু পরিবার। তার থেকে বেশি ছিল মণিপুরি। আমাদের পাড়াটির নাম ছিল মণিপুরি রাজবাড়ি। এই অঞ্চলটি নিয়ে একটি জনশ্রুতি আছে, অবশ্য এটি শুধু জনশ্রুতিই নয়, ইতিহাসেও এর উপস্থিতি আছে। তা হলো, ব্রিটিশদের হাত থেকে বাঁচার জন্য মণিপুরি রাজা এখানে পালিয়ে এসেছিলেন। তিনি এখানে তার আস্তানা গেড়েছিলেন। এ জন্য এখানে একটি রাজবাড়ি দাঁড়িয়ে যায়। ১৮৯৬ সালে একটি বিশাল ভূমিকম্প হয়েছিল সিলেটে। এর ফলে রাজবাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার ভগ্নাংশ অনেক জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ইতিহাস আমার বিষয় নয়, ইতিহাসের অনেক তথ্যে অনেক সময় ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে। কিন্তু এই ইতিহাসটি আমাকে আমার নিজের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়।

এই যে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় হওয়া, তিনটি চারটি সংস্কৃতির সংস্পর্শ ছোটবেলা থেকেই পাওয়া; এটি পরবর্তী সময়ে আমাকে জীবন গড়ে দিয়েছিল।

ছোটবেলা থেকেই জন্মদিন এলে আমরা উদগ্রীব হয়ে থাকতাম উপহারের জন্য। আমাদের জন্মদিনে বই দেওয়ার চল ছিল বেশি। মাঝে মধ্যে শার্ট বা অন্যকিছু পেতাম। তবে বই-ই বেশি দেওয়া হতো। এটা শুধু আমাদের বাড়িতেই নয়, আমরা যখন স্কুলে পড়েছি, দেখেছি—প্রতিটি বাড়িতেই জন্মদিন এলে শিশুরা বেশিরভাগ সময়ে বই উপহার পেত।  

এর মূল কারণ হচ্ছে, ওই সময়ে বিনোদনের আর কোনও মাধ্যম ছিল না। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন আমাদের বাসায় বইয়ের পাশাপাশি ছিল একটি রেডিও। কিন্তু রেডিও তো সবসময় শুনতে পারা যেতো না। প্রথমত সবখানে বিদ্যুৎ ছিল না। আমাদের বাড়িতে বড় একটি রেডিও ছিল, যেটি গমগম করে শব্দ করতো। বাবা যখন বাসায় থাকতেন, সেই রেডিওটি থাকতো বাবার অধিকারে। তিনি আকাশবাণীতে উচ্চাঙ্গসংগীতের অনুষ্ঠান শুনতেন, কিংবা কখনও খবর। ওই সময় আমাদের কল্পনাতেই আসতো না যে বাবাকে গিয়ে বলবো—আমি এখন রেডিও শুনবো। তখন তো সন্ধ্যার পর খেলা হতো না। রেডিওতে  ক্রিকেট খেলার ধারাবিবরণী শোনানো হতো। ইংরেজিতে। দিনের বেলা বলে সেটি শুনতে পেতাম। এখনও অনেক ধারাভাষ্যকারের নাম মনে আছে। যাই হোক, সেই সময়টা ছিল বিচিত্র।

রেডিও-ই ছিল বলতে গেলে একমাত্র বিনোদন মাধ্যম। তবে তা ছিল সীমাবদ্ধ। কিন্তু বই ছিল সবসময়ের জন্য। চাইলেই যেকোনও সময় বই পড়তে পারতাম। আমি যে শহরে বড় হয়েছি, সেখানে চারটি বড় লাইব্রেরি ছিল। লাইব্রেরিগুলোতে আমার প্রবেশাধিকারও ছিল। সেখানে শিশু-কিশোরদের অংশ থেকে আমরা বই নিয়ে পড়তাম। একটি ব্রাহ্মসমাজ লাইব্রেরি ছিল। সেই লাইব্রেরিটি ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথকে আমি ওখানে পেয়েছি। কল্পনা করা যায়!

তবে স্কুলেও গ্রন্থাগার ছিল। সেখানেও অনেক লেখককে আবিষ্কার করেছি। আমার খুব সৌভাগ্য যে আমি এমন একটি স্কুলে পড়েছি যেখান থেকে অনেক কিছু শিখেছি, পেয়েছি। এই স্কুলটি সিলেট জেলা স্কুল। আমাদের ইংরেজির দুজন শিক্ষক ছিলেন। হামিদ আলী স্যার ছিলেন, তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে ইংরেজির প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন জনৈক বল সাহেবের অধীনে। স্যার খুব গর্ব করে বলতেন, আমি বল সাহেবের ছাত্র। ইংরেজির উচ্চারণ সঠিক না হলে তিনি পেনসিল দিয়ে কপালে গুঁতো দিতেন আর মারতেন। এটি আমার এক বড় স্মৃতি। অনেক ভুলভাল উচ্চারণ করে অনেক মার খেয়েছি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে শিখেছিও। আমার ইংরেজি উচ্চারণের ভিত্তিটি গড়ে দিয়েছিলেন হামিদ আলী স্যার।

চেরাগ আলী স্যার ছিলেন আমাদের আরেক শিক্ষক। তিনি ছিলেন ছিমছাম একজন মানুষ, ফর্সা রং, সবসময় সুবেশী, ইংরেজিতে যাকে বলে স্টাইলিশ। তিনি দুর্দান্ত ইংরেজি বলতেন এবং লিখতে উৎসাহ দিতেন। স্যারের কাছ থেকে আমি ইংরেজি পড়ার আগ্রহ পেয়েছি।

আমাদের বাংলা পড়াতেন নাসিরুদ্দিন আহমেদ স্যার। বিখ্যাত অভিনেতা ইনাম আহমেদ, যিনি খল চরিত্রে অভিনয় করে নাম করেছিলেন, তাঁর ছেলে মারুফ আমার বন্ধু। ইনাম আহমেদের ছোট ভাই ছিলেন নাসিরুদ্দিন আহমেদ। এই স্যার একটি বই লিখেছিলেন, যার নাম—‘আটলান্টিকের ওপার হতে’। তিনি আমেরিকা ঘুরে এসে দুর্দান্ত এই ভ্রমণগ্রন্থটি লিখেছিলেন। একজন শিক্ষক, স্কুলে গিয়ে আমরা যার ক্লাস করছি, তিনি একইসঙ্গে আবার লেখকও। এ রকম একজন স্যার পাওয়া আমাদের জন্য ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। এমন একটি স্কুলে পড়াও অনেক বড় কিছু। এখান থেকেই সাহিত্যের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।

তবে আমি সাহিত্যের প্রতি যে কারণে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হয়েছি, তার মূল কারণ আমার মা। আমার মায়ের আপন মামা সৈয়দ মুজতবা আলী। আমার নানি সৈয়দা হবিবুন্নেসাও কবিতা লিখতেন। তার ৫০টা কবিতা নিয়ে একটি সংকলন বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে। সৈয়দ মুজতবা আলীরা তিন ভাই ছিলেন, মুজতবা আলীর আগে ছিলেন সৈয়দ মর্তুজা আলী, আর সবার বড় ছিলেন সৈয়দ মুস্তফা আলী। নানিরা ছিলেন পাঁচ বোন। আমার নানি ছিলেন তাঁদের মধ্যে বড়, সৈয়দ মুজতবা আলীর পিঠাপিঠি। তাদের দুজনের মধ্যে খুবই অন্তরঙ্গতা ছিল। ফলে আমার নানি যে সাহিত্য রচনায় উৎসাহী হয়েছিলেন, তার মূল কারণ হয়তো তাঁর এই ভাই। আমার জানা হয়নি, কারণ আমার বয়স যখন চার, তিনি দেহরক্ষা করেন। নানির কাছ থেকে সাহিত্যপ্রীতির কিছুটা আমার মা পেয়েছিলেন। মায়ের হাতের লেখা ছিল রাবীন্দ্রিক। এত সুন্দর হাতের লেখা আমি খুব কম মানুষের দেখেছি।

আমার মা অসম্ভব পড়ুয়া মানুষ ছিলেন। আমার এখন মনে হয়, আমার মা খুবই উত্তরাধুনিক মানুষ ছিলেন। বাবা চাকরি করতেন শিক্ষা বিভাগে। সেই সূত্রে তিনি বাংলাদেশের নানান জায়গায় কাজ করে বেড়াতেন। খুলনা, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় তিনি বদলি হতেন। কিন্তু আমরা থাকতাম সিলেটে। আমার জন্মের কিছু বছর পর, ১৯৫৬ সালে আমরা চলে গিয়েছিলাম কুমিল্লায়। বাবার চাকরিসূত্রে। আমার মা আমার জন্মের পাঁচ বছর আগে থেকে সিলেট সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষকা ছিলেন। মা-ও কুমিল্লা বদলি হয়েছিলেন ওই সময়। কুমিল্লার ওই স্কুলটির নাম বোধহয় ফয়জুন্নেসা গার্লস স্কুল। ওখানে চার বছর আমরা ছিলাম। মা ছিলেন শিক্ষক, বাবা শিক্ষা অফিসার। ফলে ওই চারটা বছর শুধু আমরা একটানা বাবা ও মাকে পেয়েছি। এরপর বাবা আবার বদলি হয়ে গেলেন অন্য জায়গায়, মা বদলি হয়ে সিলেট ফিরে এলেন।       

১৯৬০ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ আমার ইন্টারমিডিয়েট শেষ হওয়া পর্যন্ত বাবা ঢাকা আর দুয়েক জেলায় কাজ করেছেন। আর আমি মায়ের অধীনে বড় হয়েছি। ওই সময়ে জীবনের পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেছি। সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরে সাহিত্যের জন্য একটি যে স্থান তৈরি হয়েছে, সেটি ছিল মা-প্রভাবিত। মায়ের কাছে আমাদের স্বাধীনতা এমন ছিল যে পড়াশোনা নিয়ে তিনি কখনও বকতেন না। স্কুলের পড়া করেছি নাকি করিনি—এসব বিষয় নিয়ে তিনি মাথা ঘামাতেন না। মা ছিলেন একজন নিবিষ্ট পাঠক। স্কুলে যেতেন সকালে। বিকাল চারটার মধ্যে বাসায় ফিরে আসতেন। ফিরে এসে কিছু মুখে দিয়ে বই নিয়ে ওই যে বিছানায় শুয়ে পড়লেন, পৃথিবীর আর কোনও খবর তার কানে পৌঁছাতো না। তিনি বই পড়ছেন আর এদিকে আমরা কী করে বেড়াচ্ছি, সেটা নিয়ে তার কোনও খেয়াল ছিল না। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত আমাদের তিনি খুঁজেও বেড়াতেন না। তবে আমরা সবাই সূর্যাস্ত আইন মানতাম। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতাম, রাত আটটা-নয়টার মধ্যে রাতের খাওয়া শেষ হতো। মা সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা দিয়ে আমাদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি কাজ উদ্ধার করে নিতেন। কাজের মানুষও তার কাছ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা পেতেন। আমরা যা খেতাম, তারা তাই-ই খেতেন। ফলে বাসায় এক ধরনের সমাজতান্ত্রিক পরিবেশ ছিল।

বাবা ছিলেন কড়া মেজাজের মানুষ। তবে আমাদের অনেক কিছু হাতে ধরে শিখিয়েছেন। স্কুলের পিয়ন থেকে রিকশাওয়ালা, সবাইকে আপনি বলতেন। আমাদের তিন আলমারি বই ছিল। বাবার সংগ্রহের বই ছিল বেশি। বাবা আরবি সাহিত্যে পড়াশোনা করেছেন। ফার্সি ও ইংরেজিতেও তাঁর দুর্দান্ত দখল ছিল। তিনি সিলেটের তরুণ লেখকদের উৎসাহ দিতেন, তাদের লেখা পড়ে মন্তব্য করতেন। এখনও আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আমার বাবাকে স্মরণ করেন তার পাণ্ডিত্যের কারণে। ডিএইচ লরেন্স থেকে শুরু করে বাবার কিছু দুর্দান্ত ইংরেজি বইয়ের সংগ্রহ ছিল, সেগুলো এখনও আমার কাছে আছে। বাবা শিক্ষক ছিলেন, সত্যিকার অর্থেই শিক্ষক ছিলেন। আমি ছেলেবেলাতেই তার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে অনেক বই পেয়েছিলাম। এটা আমার জন্য একটি বড় পাওয়া।

আমি প্রথম গল্প লিখি ১৯৬১ সালে, আদিষ্ট হয়ে—বাবার আদেশে। তিনি সে সময় ময়মনসিংহে শিক্ষা বিভাগে চাকরি করতেন। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে একটি ম্যাগাজিন বের হতো, নাম ‘শিক্ষক সমাচার’। সেই ম্যাগাজিনে একটি শিশু অংশ ছিল, সেখানে গল্প লেখার জন্য বাবা আমাকে আদেশ দিয়েছিলেন। ছোটবেলা আমাদের অবস্থা এমন ছিল যে বাবা যদি বলতেন মহাকাব্য লিখো, তা-ই লিখতাম। প্রশ্ন করার অধিকার যেখানে ছিল না, আপত্তি জানানো তো দূরের কথা। বাবা গল্পটা পড়ে খুশি হয়েছিলেন। ম্যাগাজিনটি আমার টেবিলে রাখতাম। ১৯৬৩ সালে যখন সৈয়দ মুজতবা আলী আমাদের বাসায় বেড়াতে এলেন, সেটি আমি তাকে দেখিয়েছিলাম। এখন ভেবে অবাক লাগে, কী কারণে তিনি পাঁচ মিনিট সময় নষ্ট করে তা পড়েছিলেন, এবং হেসে বলেছিলেন, ‘বাহ, বেশ তো’। বেশ তো কথাটার মধ্যে হয়তো একটু মজার ভাব ছিল, ‘বেশ তো সময় নষ্ট করতে শিখেছ’ অথবা এরকম কিছু। কিন্তু আমি খুশিতে আটখানা হয়েছিলাম। বড় লেখকেরা বোধহয় এরকমই হন।

আমি বেড়ে উঠেছি এ রকমই একটি পরিবেশের মধ্য দিয়ে, যেখানে বাবা বাড়ি না থাকলে অপার স্বাধীনতা ভোগ করতে পেতাম। ইচ্ছেমতো বই পড়তে পেতাম। আবার ঈদে-পার্বণে বাবা যখন আসতেন বাড়িতে, তখন অন্য ধরনের অপেক্ষা কাজ করতো মনের ভেতর। আমাদের জন্য তিনি নতুন নতুন অনেক কিছু নিয়ে আসতেন। ছেলেবেলার সেই দিনগুলো ভোলার নয়।

//জেডএস//

x