অনেকটা পথ যাওয়ার পর

শাহনাজ মুন্নী ১৫:০৮ , মে ১৩ , ২০১৮

আলো ও তাপ আগুনের ধর্ম, তাপ ও আলোক ভিন্ন যে আগুন তা প্রকৃত আগুন নয়।

আগুনটা অনেকক্ষণ ধরে একটু একটু করে এগুচ্ছিল। প্রথমে ওটা ছিল ছোট্ট একটা স্ফুলিঙ্গ মাত্র, দুর্বল আর স্বল্পায়ু, তারপর বাতাসের সামান্য দোলায় সে উড়ে গিয়ে স্পর্শ করলো কাছেই লুটিয়ে থাকা একটা সুতি কাপড়, মুহূর্ত মাত্র অপেক্ষা, তারপর সেখান থেকেই উচ্চাভিলাষী অগ্নিশিশুকে আকৃষ্ট করলো সামনে পড়ে থাকা আরও সব দাহ্য বস্তু, যার সামান্য আশ্রয় পেয়ে শক্তি বাড়লো তার, লকলকিয়ে উঠে এলো ওপরের দিকে, নিজ ধর্মে অবিচল থেকে দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দিলো যা পেলো সামনে তা-ই, চামড়া ও কাপড় পোড়া গন্ধে ভরে উঠলো ঘর।

আগুনের সঙ্গী ধোঁয়া। সেই ধোঁয়া পাখা মেলে উড়ছে ঘরজুড়ে। অভ্যাসবশত রেজাউল করিমের মুখ গহ্বরে তার প্রায় অসাড় জিহ্বা খানিকটা নড়াচড়া করলো। কিন্তু তাতে কোনো শব্দ বের হলো না। বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে রেজাউল করিমের বাকযন্ত্র। বাঁচার তাগিদে নীরবে চিৎকার করছে জিভ, কিন্তু কেউ কিছু শুনতে পাচ্ছে না। ঝাঁপসা ধোঁয়ায় কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না রেজাউল করিম, ভারি হয়ে যাওয়া চোখের পাতা দুটো নামিয়ে এবার চোখ বন্ধ করলেন তিনি, আর তার সামনে থেকে সরে গেল পর্দা। রেজাউল করিম অবাক হয়ে দেখতে থাকলেন, তার শুধু মনে হলো দেখা কখনো ফুরায় না। একই দৃশ্য বারবার দেখলেও মনে হয় দেখা শেষ হয়নি, কিছু দেখা বাকি থেকে গেছে। সেই বাকিটা যে কী, তাও যেন ঠিকমতো জানা নেই।

এই জানা অজানার মাঝে চোখের সামনে খুলে যায় একটা পথ, রেজাউল করিম ভাবেন, এমনও তো হয়, একটা রাস্তা ধরে বহুদূর যাওয়ার পর হঠাৎই বোঝা যায়, এটা ভুল পথ, এই রাস্তায় কখনও গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না। তখন প্রথমে থমকে যাওয়া, তারপর ফিরে যাওয়ার কথা ভেবে ক্লান্তি নামে মনে, মনে হয় কেন তবে এই কাঁটাময় পথে এসে দুর্লভ সময়ের এত বিরাট অংশ খরচ করে ফেললাম, এরচেয়ে অন্য কোনও রাস্তা ধরাই তো ভালো ছিল। যে রাস্তা ধরে আরও কম মেধার মানুষজন তাদের লক্ষ্যে পৌঁছে গেছে। 

কিশোর বেলায় রেজাউল করিমের ইচ্ছা ছিল পরিব্রাজক হবেন, পায়ে হেঁটে প্রথমে সারা বাংলাদেশ, পরে পুরো বিশ্ব ভ্রমণ করবেন তিনি। ইবনে বতুতা, হিউয়েন সাং, ফা হিয়েন-এর মতো বিখ্যাত পর্যটক হবেন, উড়বেন-ভাসবেন চলিষ্ণু মেঘের মতো। কিন্তু তা কি আর হলো? আটকে দিলো লোভ, আটকে দিলো মোহ। মেঘ ভেসে চলে গেলো, আমি রয়ে গেলাম গাছের মতো, এক জায়গায় স্থির।

প্রথম যেদিন কাগজে নিজের লেখা ছাপা হলো, লেখার সঙ্গে ছাপা হলো নিজের নাম। আহা সেদিনই প্রথম বুঝলাম, নিজের নামটা মানুষের কত প্রিয়। বারবার ঘুরে ফিরে দেখা, মনের মধ্যে আলোড়ন, বুকের মধ্যে ঢেউ তোলা, একটা ছোট্ট ছড়ার নিচে ছাপার অক্ষরে লেখা রেজাউল করিম। কী আনন্দ, কী শিহরণ! সেই আনন্দ শিহরণের লোভেই যেন বাঁধা পড়ে গেলাম।

আমার বন্ধু গৌতম বললো, ‘কবি লেখকদের পত্রিকার সাথে সংযুক্ত থাকতে হয়। তাহলে লেখার সুবিধা। তাছাড়া এটা স্বাধীন পেশা। উন্নত মম শির, কারও সামনে মাথা নোয়াতে হয় না। কাউকে স্যার বলতে হয় না, বুঝছিস?’

‘বসদেরও স্যার বলে না?’

‘না রে। সেটাই তো মজা। বসদেরও ভাই বলে ডাকা যায়।’

সেই মোহ আহা, কাস্টমসের চাকরি আর ভালো লাগলো না, তখন পোস্টিং হয়েছিল বেনাপোলে, শামসুদ্দিন ভাইকে বলতে গিয়েছিল রেজাউল করিম। ‘দৈনিক নব অভিযান’ পত্রিকার সম্পাদক শামসুদ্দিন ভাই এপয়েন্টমেন্ট লেটারে চোখ বুলিয়ে বলেছিলেন, ‘বাহ্!  ভালো চাকরি! কিন্তু চাকরগিরি করতে পারবা তো? সাংবাদিকতার নেশা বইলা একটা কথা আছে, অনেকেই গিয়া টিকতে পারে না।’

‘আসলে ফ্যামিলির সবাই চায়, সরকারি চাকরি, সুযোগ-সুবিধা বেশি...।’

‘না, না, ঠিক আছে। আমিও চাই ভালো হোক তোমার।’

তখনও রেজাউল করিম জানতো না যে আসলে নেশার চক্করেই পড়ে গেছে সে। রক্তের গভীর গোপনে সেই নেশার প্রভাব তাকে চাকরিতে মন বসাতে বারণ করে, মনে হয় এখানে কেন এলো সে, এ তো তার স্থান নয়। এ ভুল জায়গা, এ ভুল কাজ। এখানে তাকে মানায় না, এই সংস্কৃতিতে সে বেমানান। এইখানে গিভ অ্যান্ড টেকের খেলা না খেললে উন্নতি করা যায় না। এখানে তার হিসাবে গরমিল বেধে যায়। এখানে নিজেকে পরাধীন মনে হয়। মনে হয় চোরাবালিতে, পাঁকের মধ্যে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে সে।

‘চাকরিটা ছাইড়া দেই...’, বউকে বলে সে। 

সুলেখা মুখঝামটা দিয়ে বলে, ‘কী হইছে? আরও দশজন মানুষ চাকরি করতেছে না? নাকি দুই লাইন ছড়া আর তিন লাইন খবর লেইখ্যা তুমি আলাদা হয়ে গেছো?’

কখনও স্বামীকে উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করে, ‘দেখো নব অভিযানে তোমার দুই তিন মাস বেতন হতো না, টিউশনি করা লাগতো, এইখানে মাস শেষে বেতন পাও। টানাটানি নাই। খামাকা ওই অনিশ্চিত জীবনের কথা মনে করো কেন? কেন পেছনে ফিরে তাকাও?’

হায়, রেজাউল করিমের মনে হয়, সুলেখা আমায় বুঝতে পারে না। এই দমবন্ধ করা পরিবেশে, এই বন্ধুহীন নিরানন্দ জায়গায়, এই দেওয়া-নেওয়ার হাটে, হায়! সুলেখা কেন বোঝে না? সে কি এভাবেই যন্ত্রণা সয়ে যাবজ্জীবন এই কারাগারে থাকতে বাধ্য করবে আমাকে?

কমিশনার স্যার বলেন, ‘মনে রাখবেন কাস্টমস সরকারের গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব আহরণ করে ও মানুষকে সেবা দিয়ে থাকে। কার্গো ও আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট আপনাদের হাতে।’

‘ইয়েস স্যার!’

‘কোনও অবৈধ পণ্য পাচার করা যাবে না। প্রয়োজনে ব্যাগেজ তল্লাশি করবেন। রাজস্ব আদায় করবেন। যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে অযথা হয়রানি করবেন না।’

‘ইয়েস স্যার!’

‘কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন পুলিশ একে অন্যের পরিপূরক। চোরাচালান ও শুল্ক ফাঁকি রোধে আপনারা একযোগে কাজ করবেন।’

‘ইয়েস স্যার!’

‘স্যার, স্যার, স্যার’—রেজাউল করিমের জিহ্বার চামড়া উঠে যায় স্যার ডাকতে ডাকতে। কাতর মন বলে, বেরিয়ে পড়ো। এই আটকেপড়া জীবনের চেয়ে পথ ভালো। খোলা প্রান্তরে অন্তত প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়। জুতা খুলে খালি পায়ে হাঁটা যায়, শিশির ভেজা ঘাসের স্পর্শ-গন্ধ পাওয়া যায়। ওহে সুদূরের পিয়াসী, তুমি না একদা পরিব্রাজক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলে! পৃথিবীর অপূর্ব মায়াময় আলো-বাতাস ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্ক্ষা করেছিলে!  সুলেখা এসব শুনে খিলখিল করে হাসে। বলে, ‘আজকাল বিনা পয়সায় কোথাও যেতে পারবে না। ঘুরতেও  টাকা লাগে, পায়ে হাইট্টা আর কতদূর যাবা, বলো?’

সুলেখা স্মার্ট, সুন্দরী, হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল। সে তার গুণমুগ্ধ বন্ধুবান্ধব নিয়ে পিকনিকে যায়, পার্টি করে। মহাআনন্দে দিন কাটায়।  

সুলেখা বলে, ‘শোনো, তোমার কর্মচারীরা নাকি এসপি সাহেবের মেয়ের তিনটা বাক্স আটকে দিছে, একটু ছেড়ে দিও তো।’

‘বাক্স ছাড়া যাবে না, ওইগুলিতে ঝামেলা আছে।’ রেজাউল করিম বলে। 

‘থাকলে থাকুক। উনি খুব রিকোয়েস্ট করেছেন। তুমি বলে দিলেই তো হয়।’

‘না। এটা সম্ভব না।’

সুলেখা রাগ করে বলে, ‘তুমি একটা বিরক্তিকর মানুষ। নীরস। প্রাণহীন। নির্দয়। কোনও চার্ম নাই। তোমার সঙ্গ অসহ্য। কমিশনার সাহেবকে বললেই উনি ছেড়ে দেবেন।’

রেজাউল করিম বলে, ‘সুলেখা, চাকরিটা ছাইড়া দেই। ভাল্লাগে না আর...।’

সুলেখা তাতে সায় দেয় না। বলে, ‘আসো একটা সন্তান নেই, তখন তোমার চাকরি ছাড়ার বিলাসী ইচ্ছে আর থাকবে না।’

শরীরে শরীর ঘষলেই কি সন্তান নেওয়া যায়? যদি সন্তান স্বর্গ থেকে নিজে নিজে নেমে না আসে? সংসারে সন্তান এলে কি সুলেখা রেজাউল করিমের সঙ্গে থাকতো? কে জানে? হয়তো সন্তানের মায়ায় সম্পর্কটা কর্তব্যের চিকন সুতায় ঝুলে থাকতো। ডিভোর্সের কারণ হিসেবে সুলেখা লিখেছিল, ‘মনের মিল না হওয়া’। ফাঁকা বাড়ি, শূন্য বারান্দা গুন গুন করে বলে, মনের সঙ্গে মনের মিল হলো না। অমিলে ভরা এমন সংসারে সন্তান না এসে ভালোই হয়েছে হয়তো। 

রেজাউল করিম এখন দায়মুক্ত। ঝাড়া হাত-পা। সুলেখা চলে গেছে, যার সঙ্গে তার মনের মিল হয়েছে এমন একজনের কাছে। স্ত্রী পরিত্যক্ত পুরুষ মানুষকে সমাজ কি করুণার চোখে দেখে? আড়ালে বিদ্রূপ করে? দুর্বল ব্যক্তিত্বের মানুষ ভাবে? ভাবে কমজোর? বউ ধরে রাখতে পারে না যে, সে আবার পুরুষ নাকি?  রেজাউল করিম মাথা নিচু করে হাঁটে, আগের চাইতে আরো সংকুচিত হয়ে পড়ে। আশপাশে কেউ কেউ অবজ্ঞার হাসি হাসে, অনেকে অনেক রকম কথা বলে। রেজাউল করিম সেসবে কান দিতে চায় না। কিন্তু কানে আসে। ক্লান্তি আর অবসাদ ঘিরে ধরে তাকে।

‘শামসুদ্দিন ভাই, আমি শেষ পর্যন্ত  চাকরিটা ছাইড়া দিলাম, এখন আপনের পত্রিকায় একটা যেমন-তেমন কাজ হইলেই চলবে।’

রেজাউল ফোন করলে শামসুদ্দিন ভাই আঁতকে ওঠেন, ‘করছো কী? অমন চাকরি কেউ ছাড়ে?’

‘পারতাছিলাম না ভাই, মনের ওপর খুব চাপ পড়ছিল...।’

শামসুদ্দিন ভাই তখন দৈনিক নব প্রকাশের সম্পাদকীয় বিভাগে জয়েন করতে বলে রেজাউল করিমকে।

‘দেখো, এইটা ছাড়া তোমারে আর কোনও চাকরি দিতে পারবো না। বেতন তেমন বেশি না। পোষাবে কিনা দেখো।’

রেজাউল করিম বলে,  ‘এটাতেই চলে যাবে।’ 

ছোট ভাই শফিউল করিম এসে কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে, ‘এইটা কোনও কাজ করলেন, দাদা, এত ভালো চাকরি ছাইড়া কলম পিষার কাজ নিলেন? আপনাকে আব্বা এত কষ্ট করে পড়ালেখা করাইলো। পরিবারের প্রতি আপনের একটা দায়িত্ব কর্তব্য আছে না? আব্বা আম্মা অসুস্থ, তাদের চিকিৎসার খরচ লাগে।’

‘সেই খরচ দেওয়া যাবে। রেজাউল করিম সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়।

‘ভাবিও আপনেকে ছাইড়া গেলো! আফসোস! সংসারটাও ভালোভাবে করতে পারলেন না। কেমনে সারা জীবন একা একা থাকবেন? যা হইছে, হইছে এখন আরেকটা বিয়া করেন।’

রেজাউল করিম ছোট ভাইকে মৃদু ধমক দিয়ে থামিয়ে দেয়। নিজেকে বরং তার এখন মুক্ত মানুষ মনে হয়। বাঁধা-ধরা, মাপা কথা বলা, লোভে চকচক চোখের মানুষে ঘেরা জীবন থেকে বাইরে এসে সে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। সে আসলে ভালো খাজনা আদায়কারী নয়, রাষ্ট্রের পাইক-পেয়াদা হিসেবেও সে ব্যর্থ, অপদার্থ।

তবে পুরনো জায়গায় ফেরাটাও সবসময় যে খুব সহজ নয়, সেটা বুঝতে পারে রেজাউল করিম, গত তিন বছরে তার চেনা জগতেও যে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। মানুষগুলোর চেহারাও পাল্টে গেছে।

বন্ধুবান্ধব মাথা নেড়ে বলে, ‘বোকামি করছেন ভাই। স্রেফ পাগলামি করছেন! বুঝবেন, কিছুদিন গেলেই বুঝবেন। কাজটা ঠিক করেননি।’

সবাই সুলেখার মতো এত বৈষয়িক হয়ে গেলো কীভাবে? এত বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন! রেজাউল করিম চায়, অন্তত কেউ একজন তাকে বলুক যে সে ঠিক কাজটাই করেছে, বলুক, ওহে বন্ধু, হৃদয়ের আর্তনাদ শুনেছো তুমি, মনের আকুতিটা বুঝেছো, যা করেছো তা ভালোই করেছো। এটাই ঠিক। এটাই কাম্য ছিল। আত্মাকে বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিয়েছ। এই তো চাই! ব্রেভো! প্রত্যেকের আত্মা বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাক।

শামসুদ্দিন ভাই চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বলেন, ‘এত দাঁতালো সম্পাদকীয় লেখো কেন ভাই? পত্রিকাটা বন্ধ করতে চাও? লেখা থেকে দাঁত ফালাও। মোলায়েম করো। বিপ্লব করার কথা ভুলে যাও।’

‘চারদিকে এত তোষামোদি কেন, এত চাটুকারিতা?  শামসুদ্দিন ভাই, আমি কি এই জগতেও অচল হয়ে গেলাম? আমাকেও আর সবার মতো চালাক আর ধুরন্ধর হতে হবে?’

‘তা না। তবে তোমাকে একটু কৌশলী হতে হবে। সিনিয়রদের বেশি বেশি সালাম-আদাব দিবা। যেদিকে বৃষ্টি পড়ে ছাতাটা আস্তে করে সেদিকে ঘুরায়া দিবা। এতে দোষের কিছু নাই। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকার যোগ্যতা বাড়াতে হলে এডাপটেশন মানে অভিযোজন পাওয়ার বাড়াতে হবে। এখন চলো একটু পাগলা পানি খেয়ে আসি।’   

শামসুদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে আগেও ক্লাবে গেছে রেজাউল। তার এক ব্যবসায়ী বন্ধু আছে আরিফ হাসান, যিনি বিনা পয়সায় মদ খাওয়ান। বিনিময়ে তার নন-স্টপ কথা শুনতে হয়। ভদ্রলোক পারেনও বটে। বলতেই থাকেন, বলতেই থাকেন। শামসুদ্দিন ভাই কথা শোনার ভান করেন বটে তবে তার নজর থাকে মদের গ্লাসে। আরিফ হাসান কথা বলেন আর শামসুদ্দিন ভাই মদ গিলেন। রেজাউলের ভালো লাগে না। কিন্তু তবু শামসুদ্দিন ভাইয়ের পীড়াপীড়িতে সে ক্লাবে গেলো। আরিফ হাসান মদের অর্ডার দিয়ে যথারীতি কথা বলতে থাকলো, ‘সরকারি অফিসে টাকা পয়সা না দিলে একদম কাজ হয় না, বুঝছেন? সব শালা হা করে বসে থাকে টাকার জন্য। আমাদের মতো ব্যবসায়ীদের দরকার দ্রুত কাজ। নয়তো লস খাবো। কে লস করতে চায়, বলেন? লস যেন না হয়, সে জন্য আমরা ঘুষ দেই। সোজা কথা।’

শামসুদ্দিন ভাই পিপাসার্ত মানুষের মতো মদ গিলে যাচ্ছিল। রেজাউল করিমও এক দুই পেগ খেয়েছে, কিন্তু আরিফের বাগাড়ম্বর সেদিন অসহ্য লাগছিল তার কাছে। বেয়ারা খালি গ্লাস আবার ভরতে এলে সে কিছু না বলে সটান উঠে দাঁড়ালো, তারপর কাউকে কিছু না বলে সোজা বেরিয়ে এলো বাইরে।

আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। হাল্কা বাতাস বইছে। রেজাউল করিমের মনে হলো, আমি কী করছি এসব? বিষাক্ত, দূষিত মানুষদের সঙ্গে বসে দুর্লভ মানবজীবন অযথাই এভাবে অপচয় করছি, আমার তো পরিব্রাজক হওয়ার কথা। বন্ধনহীন, স্বাধীনভাবে চলমান বাতাসের মতো, ভাসমান মেঘের মতো আমি পৃথিবীর সর্বত্র পর্যটন করে বেড়াবো, নিরিবিলি জীবন কাটাবো। তা না করে কী করছি আমি? যেমন স্বপ্ন দেখেছি, তেমন একটা বাধাহীন, গণ্ডিহীন, মুক্তির উল্লাসে ভরা স্নিগ্ধ, কোমল আর প্রশান্তিময় জীবন আমার কি হবে না কখনো? আমি কি দেখবো না জগতের বিচিত্র দৃশ্য? পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র, তরঙ্গ? 

এক কামরার একলা ঘরে ফিরে এসে সারা রাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে নিদ্রাহীন রাত কাটলো রেজাউল করিমের। সকালে ঘাড় আর মাথায় তীব্র ব্যথা নিয়েই অফিসে গেলে শামসুদ্দীন ভাই ঝাড়ি দেয়, ‘কি মিয়া? কালকে কিছু না বইলা কই গেলা গিয়া? ভাবলাম জল বিয়োগ করতে গেছো, কিন্তু আর খবর নাই।’

রেজাউল করিম বললো, ‘ভাই চাকরিটা করবো না, ছাইড়া দিবো।’

শামসুদ্দীন ভাই ম্লান হাসলো, ‘তুমি কি ছাড়বা মিয়া? মালিক পক্ষের লোক ছাঁটাইয়ের নোটিশ দিছে, সেইখানে তোমার নাম চার নম্বরে আছে।’

রেজাউল করিম মাথা নিচু করে বসে থাকে, তার মাথাব্যথাটা ধীরে ধীরে বাড়ছে। শামসুদ্দিন ভাই বলে, ‘অসুবিধা নাই, তোমার জন্য আরেকটা কাজ ঠিক করছি। অনলাইন পত্রিকা। কাজের চাপটা একটু বেশি। কিন্তু কাজ করে মজা পাবা।’ 

‘কিন্তু আমি তো ভাই আর চাকরি করবো না ঠিক করছি। ছাঁটাই হওয়ায় বরং আমি খুশিই হইছি। এইবার সত্যি বের হয়ে পড়বো।’

মাথা তুলে রেজাউল করিম কণ্ঠে জোর করে আনন্দ আর উৎফুল্লতা মিশিয়ে বলে। শামসুদ্দিন ভাই অবাক হয়ে তাকান, ‘মানে কী?’

‘বিশ্ব ভ্রমণে বের হবো। পায়ে হেঁটে। অনেক দিনের ইচ্ছা। এবার সেই ইচ্ছা পূরণ করবো। প্রভিডেন্ড ফান্ডের কিছু টাকা পাইছিলাম...’

বলতে বলতেই রেজাউল করিমের কথা কেমন জড়িয়ে আসে। তার মনে হয় জিহ্বা ভারি হয়ে উঠছে। হাত-পা ঝিমঝিম করে অবশ হয়ে যাচ্ছে। মুখ এক পাশে বেঁকে যাচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। রেজাউল করিম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলো, পারলো না। শামসুদ্দিন ভাই টেবিলের ওপাশ থেকে চিৎকার দিলো, ‘রেজাউল কী হইলো? ঠিক আছো তুমি? এই রেজাউল, এই...।’

রেজাউলের ছোট ভাই শফিউল করিম গাজীপুরের চালার হাটবাজারে একটা ওষুধের দোকান চালায়। সেখানে জমি কিনে একটা বাড়িও করেছে। সেই বাড়ির বারান্দায় একটা হুইল চেয়ারে বসে থাকে রেজাউল। স্থবির, শান্ত, স্থির, শব্দহীন, কর্মহীন। শফিউলের বউ সারাক্ষণই গজ গজ করে,

‘ঘাটের মরা, প্যারালাইসিসের রোগী আইসা পড়ছে আমার সংসারে, এই বোঝা আমি কেন টানমু? আমার কি ঠেকা পড়ছে? আপদ মরলেও বাঁচতাম।’

তার কথা রেজাউল করিম শোনে কিনা, বোঝা যায় না। একটা ছেলে রেখে দিয়েছে শফিউল, সে এসে সকাল-সন্ধ্যা রেজাউলকে দেখাশোনা করে, খাওয়ায়, গোসল করায়, পরিষ্কার করে, বসায়, শোয়ায়।

গাজীপুরে খুব মশার উপদ্রব বলে সন্ধ্যাবেলা রেজাউল করিমকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে তার পায়ের কাছে একটা কয়েল জ্বালিয়ে দিয়ে যায় পরিচর্যাকারী ছেলেটা। রাতে শফিউল বাড়ি ফিরে বড় ভাইকে শুইয়ে দেয়। আজও সন্ধ্যায় তার পায়ের কাছে কয়েল জ্বলছিল। সরু ধোঁয়া বেরুচ্ছিল কয়েল থেকে। রেজাউল ঘাড় নিচু করে অনেকক্ষণ ধরে দেখছিল কয়েলটাকে, একটা স্ফুলিঙ্গ উড়ে এসে পড়লো তার তার অবশ পায়ের কাছে লুটিয়ে থাকা লুঙ্গিতে, রেজাউল করিম বসেই রইলো, দাহ্য বস্তু পেয়ে আস্তে আস্তে জ্বলে উঠলো আগুন শিশু, বিপুল স্নেহে জড়িয়ে ধরলো তাকে, অভ্যাসবশত রেজাউল করিমের মুখগহ্বরে তার প্রায় অসাড় জিহ্বা খানিকটা নড়াচড়া করলো। কিন্তু তাতে কোনও শব্দ বের হলো না। রেজাউল করিম এবার তার অবসন্ন চোখ বন্ধ করে, চোখের সামনে খুলে যায় একটা পথ। বিভূতিভূষণের পথের দেবতা এসে তার সামনে দাঁড়ায়, প্রসন্ন হেসে বলে, ওহে মূর্খমানব, পথ তো কখনোই শেষ হয় না। সূর্যোদয় ছেড়ে সূর্যাস্তের পথে, দিন-রাত্রি পার হয়ে, জন্ম-মরণ, যুগ-মহাযুগ পাড়ি দিয়ে পথের বিচিত্র আনন্দযাত্রায় তোমাকে স্বাগত। চলো, এগিয়ে যাই। রেজাউল করিম শোনে, কোথাও কোকিল গাইছে। দেখে, কোথাও উচ্চ পর্বতসারিতে জমে আছে বিস্তীর্ণ বরফরাশি, কোথাও বইছে উষ্ণ ঝরনা, কোথাও ধু-ধু মরুভূমি।

//জেডএস//

x