জনক

সাদাত হোসাইন ১৫:৩৪ , মে ১৩ , ২০১৮

এক কোপে কল্লা ফেলে দেওয়ার মতো মানুষ মজনু। তা ফেলেও। কল্লা না ফেললেও রোজরোজই হইহল্লা ফেলে দেয় সে। মজনুর বয়স আটাশ। সে সারা দিন নদীর ধারে বসে থাকে। ভাটার সময় নদীর পানি হাঁটু সমান হয়। বড় নাও, ছোট ট্রলার—সব এখানে সেখানে আটকে যায়। ধাক্কা দিয়ে নামানোর জন্য বলশালী লোক লাগে। মজনু একাই পাঁচজনের শক্তি ধরে, সে ‘হেঁইয়ো’ বলে এক ধাক্কায় ছোট চর থেকে নৌকা-ট্রলার নামিয়ে দেয়। তার কুচকুচে কালো বাহুজুড়ে সাপের মতো কিলবিল করতে থাকে পেশি। মানুষের গাছের সুপারি, আম, কাঁঠাল ডাব, তাল পেড়ে দেয় মজনু। বিনিময়ে ডাব, তাল, আম যা পায়, তা নিয়ে বাজারে বসে। তার জিনিস মানুষ কেনেও। মজনুর দিন চলে যায়। মজনু জুয়ার আড্ডায় যায়। তার হাত ভালো। সে নিয়মিত জেতে। তার টাকা পয়সাও কিছু জমেছে। খরচের জায়গা নেই। বউ বাচ্চা নেই, মা বাবা নেই। একা মানুষ। নিশ্চিন্ত স্বাধীন জীবন। মজনু রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মাটি থপথপ করে কাঁপে। মানুষজনও কাঁপে। সে কথায় কথায় চড়থাপ্পড় দেয়। তার ভয় ডর নেই, দয়ামায়া নেই। সে নির্দয়, নির্বোধ। কেউ দাঁতের ব্যথায় কাতরাচ্ছে শুনলে মজনু তাকে অসুরের মতন চেপে ধরে দাঁত টেনে উপড়ে ফেলে, কারও ফোঁড়া হলে দুই আঙুলের ভয়ঙ্কর চাপে ফোঁড়া গেলে দেয়! তারপর আঙুলের মাথায় মাখা পুঁজ মুছতে মুছতে নির্বিকার ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়। কারও কান্নার শব্দ মজনুকে টলাতে পারে না, কাঁদাতেও না।

লোকজন মজনুকে ভয় পায়, তাকে এড়িয়ে চলে। তবে আড়ালে-আবডালে তাকে নিয়ে কেউ বাজে কথা বলে না। বরং বিপদে-আপদে পড়লেই বলে, 'মজনুরে ডাক, মজনু আইলেই বুঝব কী করতে হইবো?'

ফিনিক্স সাইকেল আর সিকো ফাইভ ঘড়ির কারণে হানিফ মৃধার মেয়ের বিয়ে ভেঙে গেলো। বিয়ের আসর থেকে বরযাত্রী ফিরে যাচ্ছে। হানিফ মৃধা টাকার ব্যবস্থা করতে পারেননি। পরের বছর ধান উঠলে সাইকেল আর টেপরেকর্ডার দেওয়ার অঙ্গীকার করেও লাভ হচ্ছে না। ভয়াবহ অবস্থা। এই সময়ে মজনু এসে দাঁড়ালো বরের সামনে, ‘তুমার সাইকেল আর টেপ আমি কিন্যা দিমু। তয় অহন তো কেনার সময় নাই। কাইল পরশু তুমার বাড়ি গিয়া দিয়াসমু।’

বর কিছু বললো না। কেবল ঘোঁত করে শব্দ করলো। বরের বাবা বললো, ‘আপনে গঞ্জ থেইকা কিন্যা নিয়াহেন, আমরা আপনের আহন পর্যন্ত বহি।’

মজনু বললো, ‘আমি এক কথার মানুষ। কথার খেলাপ করি না। বিয়া হউক, কাইল-পরশু আমি নিজে গিয়া দিয়াসমু।’

বর এবারো ঘোঁত করলো। তার ঘোঁতের শব্দ এবার প্রবল। সে ঘোঁত শব্দ করে বললো, ‘আপনেরে আমরা বিশ্বাস করবো ক্যান? হেরপর যদি আপনে না আহেন? এরা তো সবাই মিছা কতা কয়, মিথ্যুকের জাত সব...’।

বরের কথা শেষ হলো না। তার মাথার পাগড়ি উড়ে গিয়ে পড়লো উঠানে কাদায়। মজনু থাপ্পড় মেরেছে জোরে! বর ছিটকে পড়েছে দুয়ারের কাছে। সে হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে, নতুন বরের সঙ্গে এমন উদ্ভট আচরণ এর আগে কেউ কখনো দেখেনি!

হানিফ মৃধার গলা শুকিয়ে গেলো। এই বিয়ে হওয়ার যে সামান্য সম্ভাবনাটুকুও ছিল, মজনু সেটুকুও দরজার বাইরের জল কাদায় মিশিয়ে দিয়েছে। সে শ্বাস নিতে পারছে না। তার শরীর অবশ হয়ে আসছে। সে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে বললো, ‘আপনেরা কিছু মনে কইরেন না, ও পাগল, ও এই এলাকার পাগল। অর মাথা ঠিক নাই। আপনেরা অর কথায় কিছু মনে কইরেন না।’

মজনুকে দুই হাতে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো, কিন্তু পারলো না। মজনু পাহাড়ের মতো অনড় দাঁড়িয়ে আছে। হানিফ মৃধা দরজার সঙ্গে হেলান দেওয়া আধশোয়া জামাইয়ের পা চেপে ধরলো। তারপর কাঁদতে কাঁদতে মাফ চাইতে লাগলো। কিন্তু জামাই কিছু বললো না, তার সাধের পাগড়িটা জল কাদায় মাখামাখি হয়ে আছে। বরযাত্রীরা সবাই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সময় কেটে যাচ্ছে, স্থিরচিত্রের মতো। অনড়। অবশ। শেষ পর্যন্ত বর উঠে দাঁড়ালো। তারপর বললো, সে বিয়ে করবে, কিন্তু সবার সামনে তার পা ধরে বসে থাকতে হবে মজনুকে, যতক্ষণ পর্যন্ত এই বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ না হবে, ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত।

হানিফ মৃধা এখন কী করবে?

সে কাতর চোখে মজনুর দিকে তাকালো। মজনু তাকালো বরের দিকে। বরের চোখে স্পষ্ট ক্রোধ, প্রতিহিংসা, আসন্ন বিজয়ের উল্লাস। মজনু পরাজিত, বিধ্বস্ত মানুষের মতো বরের দিকে হেঁটে গেলো। ধীরে। তারপর বরের পা ধরার জন্য নিচু হলো। কিন্তু দ্বিতীয় থাপ্পড়ের শব্দটা হলো আরও জোরে, আরও বেশি শব্দে! বর এবার ঘরের বাইরে জল কাদায় মাখামাখি হলো। মজনু তার কলার ধরে তুলে এনে শামিয়ানার নিচে বসালো। তারপর কাজিকে ডেকে বললো, ‘বিয়া পড়ান।’

বিয়ে পড়ানো হলো। জনা পঁচিশেক বরযাত্রী বিয়ের খাবার খেয়ে চলে গেলো। কেউ কোনও উচ্চবাচ্য করলো না। মজনু তার পরদিন সাইকেল আর টেপরেকর্ডার কিনে দিয়ে এলো। বর সরু চোখে কম্পমান গলায় বললো, ‘মিয়া ভাই, এইগুলান লাগবো না। আপনে আমার বড় ভাই, আপনের বইনেরে দিছেন আর কিছু লাগব না।’

মজনু নির্বিকার ভঙ্গিতে বললো, ‘আরে নেও মিয়া, এইগুলা না নিলে থাপ্পড়ের কথা ভুইল্যা যাইবা। থাপ্পড়ের কথা মনে থাকনের দরকার আছে। এইগুলান দেখলেই থাপ্পড়ের কথা মনে পড়বো। আর বইনও আমার ভালো থাকবো, লাইফটাইম গ্যারান্টি।’

দিন চলে যায়, মজনু মজনুই থাকে। একই জীবন, একই রুটিন। বয়সও যেন থেমে আছে। স্থির।

আচমকা একদিন সেই ডাকাবুকা মজনু বিয়ে করে ফেললো। বউ দেখতে ভালো। গায়ের রং শ্যামলা। সে মজনুকে বাঘের মতো ভয় পায়। এই ভয় মজনু তাড়াতে পারে না! রাত দুপুরে সে যখন বউকে বুকের ভেতর জাপটে ধরে, বউ তখন ভীত পাখির মতো কাঁপে। সন্ত্রস্ত হরিণীর মতো লুকাতে চায়। ভয়ে গুটিয়ে থাকে।

সেই সন্ত্রস্ত হরিণীর মতো বউটা হঠাৎ মা হবে! দিন ঘনিয়ে আসছে। মজনুর অবশ্য তাতে কিছু যায়-আসে না। সে চলে গেলো হাওড় অঞ্চলে ধান কাটতে। বাড়ি ফিরলো দীর্ঘদিন পর। কয় মাস সে জানে না। এসবের হিসাব মজনুর থাকে না, কিন্তু উঠোনে পা রাখতেই সে থমকে দাঁড়ালো। বাড়িভর্তি গিজগিজ করছে গাঁয়ের মেয়েরা। পাশের বাড়ির আমেনা বু দৌড়ে ছুটে এলো, ‘পোলার বাপ আইছে, পোলার বাপ আইছে। আজান দে মজনু, আজান দে, তুই পোলার বাপ হইছস।’

মজনু কী করবে ভেবে পায় না। সে তাকিয়ে আছে খোলা বারান্দার কাপড় ঘেরা জায়গাটার দিকে। কেউ একজন কাঁদছে। সদ্যোজাত শিশুর কান্না। কী তীব্র চিৎকার! কী তীব্র! রহিমা দাই কাপড়ের পুঁটলিটা নিয়ে বের হয়ে এলো, ‘মজনু, আগুনে গা সেইকা নে, তারপর এইহানে আয়, দ্যাখ, দ্যাখ, কে আইছে, দ্যাখ?’

মজনু সেই কাপড়ের পুঁটলির দিকে তাকিয়ে রইলো। তার হঠাৎ মনে হলো রহিমা দাইর কোনও বিচার বুদ্ধি নেই, সে কি শক্ত হাতে কঠিন করেই না বাচ্চাটাকে ধরে রেখেছে! এত শক্ত করে কেউ ধরে? এমন কঠিন করে!

আচ্ছা, বাচ্চাটা এমন করে কাঁদছে কেন? ও-কি ব্যথা পাচ্ছে? কষ্ট হচ্ছে কোনও?

প্রচণ্ড গরম পড়েছে চারপাশে। মজনু দাঁড়িয়ে সেই গরমে ঘামছে। তার আচমকা মনে হলো, কাপড়ের পুঁটলির ভেতরে ওই বাচ্চাটা হয়তো গরমে কষ্ট পাচ্ছে, সে খানিক এগিয়ে ঠোঁট গোল করে বাচ্চাটাকে ফুঁ দিতে লাগলো। যেন তার ফুঁয়ে বাচ্চাটার সব কষ্ট দূর হয়ে যাবে!

সে অদ্ভুত চোখে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে রইলো। কী তুলতুলে হাত-পা, চামড়া কী নরম, পাতলা! ইশ, রহিমা দাই এভাবে কেন ধরে রেখেছে! এমন শক্ত করে! বাচ্চাটা কাঁদছে! কী কষ্ট পেয়েই না কাঁদছে!

মজনু হঠাৎ আবিষ্কার করলো, বাচ্চাটার সঙ্গে সঙ্গে সেও কাঁদছে! তার চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসছে উষ্ণ জলের স্রোত। রহিমা দাই, আমেনা বু, হাজেরা চাচি ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে মজনুর দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসছে! এই সেই মজনু, এক কোপে কল্লা ফেলে দেওয়া মজনু! উঠানের জল কাদার ভেতর থামের মতো দুই পা ডুবিয়ে কেমন স্থির দাঁড়িয়ে আছে সেই ভীম দর্শন মানুষটা! কিন্তু আসলেই কি সেই মানুষটা!

সেই মানুষটা কীভাবে? এর আগে তো কারও কান্না দেখে তারা মজনুকে এভাবে কাঁদতে দেখেনি!

মজনুর আচমকা খুব লজ্জা লাগতে লাগলো, উঠানের মাঝখানে এত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে সে কেমন বোকার মতো কাঁদছে! কান্না চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলো সে, কিন্তু পারলো না। বরং সেই কান্নার জলের উষ্ণ প্রস্রবণ হাতের উল্টো পিঠে মুছে দিতে গিয়েও মজনু আচমকা আবিষ্কার করলো, সেই নির্মম, নির্দয়, ডাকাবুকো, এককোপে কল্লা ফেলে দেওয়ার মতো মানুষটা যেন এক মুহূর্তেই কোথায় হারিয়ে গেলো!

তবে সে বুঝতে পারলো না, সেই মানুষটার বুকের ভেতর এমন চুপিসারে, এমন তীব্রতায় কী করে জেগে উঠলো এমন অদ্ভুত মমতাময় জলজ এক বাবা!

//জেডএস//

x