বইপড়ার গল্প প্রতিষ্ঠান তৈরির আগেই প্রতিষ্ঠান বিরোধী

মৃদুল মাহবুব ১৪:১৬ , মে ১৬ , ২০১৮

একজন লেখকের সার্বক্ষণিক সঙ্গী বই। নিজেকে সৃজনমুখর করতে বইয়ের বিকল্প নেই। বইয়ের স্পর্শ, গন্ধ ও অক্ষর-সমুদ্র সবসময়ই আন্দোলিত করে লেখককে। বাংলা ট্রিবিউন সাহিত্য বিভাগের লিখিত প্রশ্নে আমরা শুনতে চেয়েছি এ সময়ের পড়ুয়া লেখকের বইপড়ার গল্প। 

বাংলা ট্রিবিউন : আপনার পড়া প্রথম বইয়ের নাম মনে আছে? বইটি কীভাবে পেলেন? প্রচ্ছদ বা ভিতরের পৃষ্ঠাগুলো কেমন, পড়ার অনুভূতি কেমন—ইত্যাদি গল্প শুনতে চাই।

মৃদুল মাহবুব : প্রথম বই আমি পড়িনি, আমি প্রথম বই দেখেছি, আমার সেই বইটার কথা মনে আছে। পড়ার আগে বইটা দেখা ছিল। কালো মলাটের বইটার ইমেজগুলো মনে আছে এখনো তা হলো ‘ছোট্ট রাজপুত্র’ একটা সচিত্র বই। অক্ষরগুলো থেকে ছবি সুন্দর। ছবিগুলো এক একটা কথা, এক একটা রহস্য। তবে এই যে একটা বিখ্যাত বই তা আমি মাত্র সাত আট মাস আগে জেনেছি।

 

বাংলা ট্রিবিউন : সর্বশেষ কী বই পড়লেন—বইটির পাঠ অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

মৃদুল মাহবুব : আমি এখন অ্যান ইনট্রোডাকশন টু দ্য হিস্ট্রি অব সাইকোলজি পড়ছি। পিওর একাডেমিক বই। যারা সাইকোলজি পড়ে তারা এটা পড়ে। পিওর একাডেমিক বই। মূলত ফ্রয়েড, সাইকো-এনালাইসিস, নিউরো-ল্যাঙ্গুয়েজস্টিক প্রোগামিং(এনএলপি), ফুকো, দেরিদা, লাঁকা, জিজেক ঠিকমত বোঝার জন্য এটা একটা দীর্ঘ মেয়াদী পড়ালেখা। এই ক্রনোলজিক্যাল পাঠটা না থাকলে মুশকিল। আমি ফিল করি। যেকোনো বিষয় বোঝার জন্য গোড়াটা জানা দরকার। আমাদের সমাজে ভাবা হয় নতুন চিন্তা মানেই নতুন কিছু। আসলে চিন্তা পূর্ববর্তী সময়ের চিন্তার ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠে। সেই কারণে পূর্ব চিন্তার অস্পষ্ট ধারণা না থাকলে কী নতুন, কী পুরাতন, কী দরকারী, কী অদরকারী তা বোঝা যায় না। আগে আমি ইফিশিয়েন্টলি পড়ালেখা করিনি। বা ব্যাপারগুলো বুঝতাম না। ফলে ছিন্নভিন্ন পড়া লেখা হয়েছে। হিউম, কান্ট, হেগেল না পড়ে শুধু ফ্রয়েড বা তার পরবর্তী চিন্তকদের পড়লে ঝামেলা তৈরি হয়। ধরেন ফ্রয়েডের ‘ড্রিম অন্যালাইসিস’ বা জিজেকের ‘ডিসেপশন’ পেলাম। পড়ে ফেললাম। এই সমস্তের রুট না জেনে শুধু পড়ে ফেললে হয় না। এমন পড়া লেখা আসলে ভুলভাবে পাঠ। এই সিরিয়াস বিষয়গুলো খুব মৌলিকভাবে পড়া দরকার। এই সমস্ত চিন্তার রুট খুবই গভীর। সেই গভীরতা জানা চাই। কোনো একটা তত্ত্বের বেজ লাইন না জেনে তা পড়া নানা রকম ইফিসিয়েন্সি লস তৈরি করে। এটা নিজে নিজে বুঝতেও আমার অনেক সময় লেগেছে। আমাদের দেশে ক্রিয়েটিভ রিডিংয়ের ক্রনোলজিটা বলার মতো লোকই নাই। তরুণদের চিন্তকরা দূরে সরিয়ে রেখেছে। বা তরুণরা তাদের বিশ্বাস করতে পারে না নানা কারণে। তরুণরা ভাবে ভালো কোচ মানেই ভালো প্লেয়ার। তা কিন্ত না। ভালো একাডেমি ও একাডেমিশিয়ানের অভাব। প্রতিষ্ঠান তৈরির আগেই আমরা প্রতিষ্ঠান বিরোধী। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো ৭১ এ। ৮০তেই আপনি প্রতিষ্ঠান বিরোধী জ্ঞান চর্চা দেখবেন। কীভাবে হয়! যেদেশ প্রতিষ্ঠানই গড়ে উঠতে পারল না সেখানকার শিল্পীরা প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার সার কোথায় পেল। আমাদের তত্ত্ব কাঠামো নকল। নিজেকে ২০ বছর বয়সে খুব ছোট ছোট ভাবে শুধরে দেওয়া যেত। কিন্তু সেটা আমি বুঝতে পেরেছি ৩২ বছর বয়সে এসে। ১২ বছর সময় লাগলো কীভাবে পড়তে হয় এটা জানার জন্য। হয়তো এখনো অনেক ভুল আছে পড়া লেখার মধ্যে। সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও তাত্ত্বিকদের ব্যর্থতার কারণে জীবনের কেমন অপচয় হয়। যাদের বয়স ২০ তাদের বলছি কিছু পড়া লেখায় খুব সিরিয়াস হন, আদি থেকে ক্রনোলজি ধরে  পড়ুন, নোট রাখুন, আন্ডারলাইন করুন, ধার করা বই কম পড়ুন। বিচ্ছিন্ন পড়া লেখা অনেক সময় কাজে লাগে না। যা পড়বেন তা নিয়ে কথা বলুন, লিখুন। সমাজকে তৈরি করতে হবে সিরিয়াস বিষয়ের জন্য। এই সিরিয়াস তরিকায় লালন পড়াও চলছে আমার। এই দেশে যারা লালন নিয়ে কাজ করেছে, তাদের লেখাপত্র পড়ার চেষ্টা করছি। সাথে সাথে বই সংগ্রহের কাজ চলছে। সমকালে প্রকাশিত বই পুস্তক পড়ার প্রতি একটা চাপ থাকে। এবার মেলা থেকে কিছু বই পত্র কিনেছি সমকালীন ও পুরাতন গদ্য পদ্য উপন্যাস মিলমিশ করে। এর মধ্যে ৪২ কবির ৪৩টা বইও আছে। কিছু বই উল্টে পাল্টে দেখেছি। কিছু চোখ বুলিয়ে বুঝেছি পড়ার দরকার নাই। আমার মেয়ে হয়তো বড় হয়ে সময়ে ক্ল্যাসিক হয়ে ওঠা কোনো বইয়ের প্রথম মুদ্রণ খুঁজে বের করবে।

বহু ভালো কবিতা পড়লাম। খারাপও পড়লাম। কবিতাকে আমার সবাই মিলে ব্যবহারিক শিল্পের বাইরে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছি। কবিতা মানেই এমন কিছু যার সাথে জীবনের, সমাজের কোনো যোগ নেই। কবিতা মানেই ছন্দ, শব্দ, ভাষার কসরৎ। এই সমস্ত অপ্রয়োজনীয় শব্দ-অত্যাচার থেকে কবিতা বের হয়ে এসেছে কেউ কেউ। বিমূর্ততা সরলতার ইউনিট, একক। বিমূর্ততা মূর্ততাকেই সার্ভ করে। কিন্তু জীবনানন্দ শাসিত বাংলা কবিতায় পরবর্তীতে ভাষা আর অকল্পনীয় ইমেজ তৈরির যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে তা এখনো সমকালীন কবিতায় আছে। কবিতা মানেই কারো কারো কাছে শব্দ ও ভাষার ছন্দ সংগ্রাম। কবিতায় চিন্তার ধারাবাহিকতা আমরা নষ্ট করে দিয়েছি ত্রিশের ভুল ব্যাখ্যায়। যেকোনো শিল্প মাধ্যমের কোনো কারেকশন নাই, শ্রেষ্ঠত্ব নাই। পরপস্পর বিরোধী নানা ধারার স্রোতে তা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ত্রিশের সবচেয়ে বড় কবি আমরা একা একজন জীবনানন্দকে নির্বাচন করলাম। তাদের তৈরিকৃত রবীন্দ্র কৌশলের বিরোধিতা আমার ত্যাগ করতে পারলাম না। ত্রিশের মেধাবীদের অস্বীকার করার মতো মেধা বাংলা ভাষায় তারপর আর আসে নাই। আজ অব্দি ত্রিশে মাত্র একজন কবি মেজর হয় কীভাবে সে প্রশ্ন আমরা করছি না। প্রতীভা সংকট। আমাদের পূর্বসূরীদের ভুল বিচার বাংলা কবিতার ক্ষতি করেছে আমি বলবো। জীবনানন্দের চিন্তাহীন ভাষা কীভাবে ৫০/৬০ বছর রাজত্ব করে আমি বুঝি না। আমরা চিত্ররূপময়, নির্জনতার কবিকে বছরের পর বছর তার সঠিক মূল্যায়ন ছাড়াই মাথায় তুলে রাখলাম। বাংলা কবিতার ভাষা জীবনানন্দের ভাষা থেকে খুব বেশি আগায় নাই। কারণ কী? জীবনানন্দের কবিতায় দুনিয়ার আধুনিকতম চিন্তার সাথে তেমন একটা যোগ নাই। তিনি যেই সময়ের কবি সেই সময়ে দুনিয়ায় চিন্তার জগতে বিপ্লব হয়ে গেছে। কিন্ত তার কবিতায় না আছে পশ্চিম, না আছে পূর্ব। সময় পেলে আপনারও একটু ভেবে দেখবেন। তিনি ইউরোপবাহিত বাংলা ভাষার কবি, কিন্তু তার চিন্তার নির্যাসটা নাই। রবীন্দ্রনাথের চিন্তার বৈচিত্র্যের তুলনায় জীবনানন্দের ভাবনাগুচ্ছ চিন্তা খুবই পুওর। নজরুলের হৃদয় ও আনন্দ থেকে জীবনানন্দতো হাহাকারময়। জসীমউদ্দীনে গ্রাম্য ব্যথা ট্যথা নাই এইটাতেই তিনি বেটার। নজরুল যতটা জনসংযুক্ত, জীবনানন্দ ততটাই বিচ্ছিন্ন। এই সহজ ভাষা নির্ভর ইমেজের জয়ের মধ্য দিয়ে কবিতায় চিন্তায় একটা বড় পরাজয় ঘটে গেছে। আমরা মেনেও নিয়েছি। ফলে এই সময়ের দুর্দান্ত বড় কবি উৎপল কুমারবসুও জীবনানন্দ সৃষ্ট ইমেজের বাইরে যেতে পারেননি। তিনি জীবনানন্দের ভাষা ও ইমেজের শেষ এক্সটেনশন। বলাই যায়। শুধু মাত্র ইমেজ আর ভাষা দিন শেষ। কবিতায় চিন্তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলা কবিতার ইতিহাস চিন্তারই ইতিহাস। কবিতা জনমানুষের চিন্তার সাথে সম্পৃক্ত। সমকালের বহুজনের কবিতা পড়ে বুঝলাম চিন্তার দিন ফিরছে। কবিরা বুঝতে পারছেন। কবিতা যে শুধু ভাষার চর্চা না তা অনেকেই উপলব্ধি করেছে। শিল্প একটা ব্যবহারিক বিষয়। কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ বা ববীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ কি শুধু শিল্প? এর কোনো ব্যবহারিক উদ্দেশ্য নাই?

 

বাংলা ট্রিবিউন : কিনে রেখেছেন, পড়া হয়নি কিন্তু পড়ার জন্য ভেতরে এক ধরনের চাপ অনুভব করেন—এমন বই সম্পর্কে জানতে চাই।

মৃদুল মাহবুব : পড়ার জন্য টান অনুভব করি এমন বইয়ের সংখ্যা বলে শেষ করা যাবে না।  দেবেশ রায়ের ‘তিস্তাপাড়ের বিত্তান্ত’ আমি এগারো বছর কিনে রেখেছি। দুইবার শুরু করেছি। শেষ হয়নি কোনোবার। তবে এটা পড়ার জন্য একটা টান অনুভব করি। রবীন্দ্রনাথের নানা রকমের গদ্যগুলো পড়ে ফেরতে চাই। বাংলা কবিতা প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে টাইম লাইন ধরে ধরে পড়ে ফেলতে চাই। উমবর্তো ইকোর ‘অন আগলিনেস’টা কাল পরশুর মধ্যে পড়ে ফেলতে চাই। এমন টান ফিল করি মাঝে মাঝে। কোনো বই পড়া বা না পড়ার জন্য চাপের কিছু নাই আমার। আমি পড়ি আনন্দে। এবং এও জানি দুনিয়ায় যা পড়া দরকার তার ৩-৫% পড়ে শেষ করা যাবে নাকি সন্দেহ। সেই কারণে আমার পড়া না-পড়া নিয়ে তেমন কোন চাপ নাই।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কোন কোন বই পড়ার আকাঙ্ক্ষা আছে, কিন্তু সংগ্রহে নেই?

মৃদুল মাহবুব : কোনো নির্দিষ্ট লেখকের নির্দিষ্ট বইয়ের নাম বলা যাচ্ছে না। চাইল্ড ডেভলেপমেন্ট, সাইকোলজি, প্যারেন্টিং, এনএলপি, কগনিশন, মানুষের জ্ঞানের ইতিহাস, পশু পাখির স্বভাব ও অভ্যাস, দর্শন, রাজনীতি, পুঁজিবাদ ইত্যাদি নিয়া আপাতত পড়াশোনা করতে চাই। এর অধিকাংশ বইপুস্তক আমার কাছে নাই। সংগ্রহ করছি ধীরে ধীরে।

 

বাংলা ট্রিবিউন : কোন বইটি সবচেয়ে প্রিয়, বারবার পড়তে চান? কেন?

মৃদুল মাহবুব : বারবার কবিতার বই ছাড়া তেমন কিছু পড়া হয় না আমার। কোনো উপন্যাস দুইবার পড়েছি তার নজির নাই। এতো এতো বই যে দুইবার তিনবার পড়ার সুযোগ নাই বললেই চলে। আমিতো একাডেমিশিয়ান না। রেফারেন্সের কোন এক্সটা চাপ আমার মধ্যে নাই। কবিতার বই বাদে কোন বইই বার বার পড়তে তেমন চাইও না। অসংখ্য কবিতার বই আছে যা আমি বারবার পড়েছি। জীবনানন্দ ও উৎপল আমার বাংলা ভাষার প্রিয় কবি। অতি ব্যবহারের কারণে তাদের দুজনের বইই ছেঁড়া ফাড়া। মানে বহুবার পড়া। কেন এগুলো বারবার পড়েছি তার কোনো কারণ নেই। কবিতা বিষয়টাইতো এমন। বারবার পড়ে নতুন নতুন ভাবে কাজে লাগানো যায় জীবনে। জীবনে যা কাজে লাগে না তা বারবার পাঠের মাধ্যমে মুখস্থ করার কোনো মানে হয় না।

 

 বাংলা ট্রিবিউন : কোন বইটি আপনার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে? কী করেছিলেন?

মৃদুল মাহবুব : কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ আর আলবেয়ার কামুর ‘আউটসাইডার’এর ভালো একটা  অনুবাদ আমি পড়েছি বোধ হয় পনের ষোল বছর বয়সে। এমন দুটো মহাগ্রন্থ আমি পড়েছি খুব কাছাকাছি সময়ে, পর পর। মানুষকে খুব বিচ্ছিন্ন জীব হিসাবে দেখতে পারার একটা বোধ অর্জন করেছিলাম এগুলো পড়ে। দুনিয়ার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার একটা ফ্যাশন ও প্যাশন তৈরি হয়েছিল মনের মধ্যে। তবে তরুণ বয়সের ঘোষণা দেওয়া বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব জীবনে প্রেম বয়ে আনে। সেটা খারাপ না। রাষ্ট্র, সমাজ, পুঁজি মানেই মানুষের স্বাধীর অস্তিত্বের ওপর একটা জুলুম। ব্যক্তি মানুষ খুব একা জীব। জগৎ দুনিয়ার ওপর একটা দীর্ঘ মেয়াদী বিষাদ নেমে এসেছিল এগুলো পড়ে। সেই বিষাদ থেকে বের হতে আামার অনেক সময় লেগেছে। সময় ও বয়সের সাথে সাথে মানুষের বুঝের পরিবর্তন হয়। সেই বয়সে কাফকা বা কামুর ওপর একটা ভুল ইন্টারপিটেশর নিয়ে আমি বহু বছর পার করেছি।

এখন বুঝি এই দুটো বই প্রকৃতপক্ষে মানুষকে জীবনের সাথে লিপ্ত হতে শেখায়। জীবনে আমরা কোথায়, কখন কীভাবে সমাজ, মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি তা দেখার জন্য এদুটো হলো এক মহাগ্রন্থ। মানুষকে একা করে দেবার সামাজিক টুলসগুলো কী কী এবং কীভাবে এগুলো কাজ করে তা দেখার গবেষণাগার এগুলো। সুফিবাদ আর অস্তিত্ববাদতো পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর আমার মনে হয়। এগুলোর মধ্যে ব্যক্তিকে অতিমূল্যায়নের একটা প্রখর বিষয় আছে। দর্শন হিসাবে অস্তিত্ববাদের তীব্র সাফল্য কোন সময়ে? খেয়াল করে দেখবেন। যখন দিকে দিকে ফ্যাসিবাদ, সম্মিলিত মানুষের কথা বলা ও চিন্তা করা বন্ধ তখন অস্তিত্ববাদ দেশে দেশে শিল্পীদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিয়ের্কেগার্ড বা নিৎসের থেকে এর সূচনা হলেও সাহিত্য-শিল্পে এর ব্যবহার সার্ত্রে, কামু বা কাফকার হাত দিয়েই। মানুষের প্রবণতা হলো শিল্পে সেই চর্চাই করা যা তার অস্তিত্বটাকে রক্তাক্ত করবে না। শিল্প আসলে বিপ্লবাত্মক কিছু না। বিপ্লবের পাটাতন তৈরি করে সে। সংগ্রাম করাটা শেখাবে। সূ²ভাবে দেখলে, অস্তিত্ববাদতো সেই কথা না বলা আত্মচর্চার মাধ্যম যাতে শিল্পীর ওপর ফ্যাসিস্টের কোনো আক্রমণ নেমে না আসে। লক্ষ্য করুন। সার্ত্রের নোবেল বর্জন বড়জোর উদাহরণ, প্রতিবাদ। প্রতিঘাত না সমাজের প্রতি। শিল্প এভাবেই শিল্পীর সুরক্ষার মাধ্যমে আগায়। শিল্প সাহিত্য রাজনীতি না। ব্যক্তি মানুষের একক অস্তিত্ব থেকে তার সম্মিলিত সামাজিক ক্রিয়শীলতার গুরুত্ব বেশি। কাফকা বা কামুর একক মানুষ থেকে সম্মিলিত মানুষ হয়ে উঠতে চাই এখন। এই বই দুটো থেকে আমাকে বের হওয়ার জন্য বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবে এটা না পড়লে আমি আমার মতো দেখার চোখ পেতাম না সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ আমি।

 

বাংলা ট্রিবিউন : নির্জন দ্বীপে একজন মাত্র লেখকের বই নিয়ে যেতে বললে, কোন লেখককে বেছে নেবেন, কেন?

মৃদুল মাহবুব : এই প্রশ্ন দেখার পর চিন্তা করলাম আগে বাঁচতে হবে। তারপর অন্য কিছু। ‘হাউ টু সারভাইব অন অ ডিসার্টেড আইল্যান্ড’ নামে একটা বই পাওয়া যায়। অ্যামাজন থেকে দশ ডলারে কেনা যায় সহজে। কিন্ডল ভার্সন আরো কমে পাওয়া যাবে। অ্যামাজনে খুঁজলে এমন আরো বই পাওয়া যাবে। রিভিউ দেখে কিনে নিয়ে যাবো একটা। লেখকের প্রতি লয়াল না কোনোদিনই আমি। ফলে দ্বীপে বেঁচে থাকার জন্য কাজের একটা বই হলেই চলবে আমার। টম হ্যাঙ্কস অভিনীত ‘কাস্ট অ্যায়ে’ নামে একটা সিনেমা দেখেছিলাম অনেক দিন আগে। ডিএইচএল-এর বিমান দুর্ঘটনা কবলিত হয়। একমাত্র নায়ক এক নির্জন দ্বীপে বেঁচে থাকে। বাঁচার ও সভ্যতায় ফেরার যে আকুতি তা দেখার মত। মানুষ সামাজিক প্রাণী। সে সমাজে থাকতে চায়। বই সমাজে উৎপন্ন একটা প্রথা। নির্জন দ্বীপে একা একা শিল্পের কোনো ব্যবহার নাই। নির্জন দ্বীপে আমি একা বসে বসে রবীন্দ্রনাথ বা কমলকুমার বা কুন্ডেরা বা মুরাকামি পড়ে আহা উহু করছি দৃশ্যটা ভাবতেই আমার কেমন যেন লাগছে। এটার মতো রসিকতা আর কী হতে পারে। দ্বীপান্তরিত, জনমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো ব্যথা আর দুনিয়ায় নাই। জনপদের মধ্যে বসে নাগরিক নির্জনতার চর্চা করতে চাই। নির্জন দ্বীপে সাহিত্যে বই নিয়ে আমি কী বা করবো। সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য সেখানে কুন্ডেরা থেকে সার্ভাইভালের ম্যানুয়াল বেশি জরুরি। নাম না জানা অখ্যাত লেখক হলে সমস্যা নাই। বইটা কাজের হলেই হলো। শিল্প জীবনের সেকেন্ডারি বিষয়। প্রাইমারি হলো সার্ভাইভাল।

 

বাংলা ট্রিবিউন : বই না পড়ে আপনি বাঁচতে পারবেন কিনা? কেন?

মৃদুল মাহবুব : আমার জীবনে কিছুই অবধারিত না। বাঁচতে আমি পারবো। বই না পড়েই তো কোটি কোটি লোক বেঁচে আছে। বই না পড়া মানে কীভাবে মৃত্য হয়! আমি সাহিত্য করি এর মনে এই না সাহিত্য ছাড়া জীবন অচল। জীবনে বহু কিছু আছে। বই ছাড়াইতো জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটে যায়। আমার অবসর বইমুখর। বই না থাকলে গান, আড্ডা, ফিল্ম কিছু না কিছু একটা দিয়ে তা ফিল আপ করবো। আমি যেকোনো ভাবেই বাঁচতে চাই। জীবনের প্রতি মোহ আছে আমার। জীবন সুন্দর, উপভোগ্য। কোনো কিছু না করে যদি বেঁচে থাকা যেতো তাহলে আরো  ভালো হতো। ধরেন জানালার ধারে একটা কাঠবাদামের গাছ লাগালাম। জানলার ধারে বসে বসে তার বড় হয়ে ওঠা দেখছি। কেমন হতো? আলস্য খারাপ না, চিন্তার জন্য ভালো। বই পড়া অনেক সময় মানসিক চাপওতো। অশান্তির কারণ। বই পড়া মানুষ নাকি একটু জ্ঞানী হয়। শোপেনহাওয়ার বলেছে জ্ঞানীরা বেশি দুঃখী। তাদের দুঃখের অনুভব বেশি। সেই হিসাবে কম জ্ঞানী হয়ে সুখী থাকা ভালো? না কী বেশি জ্ঞানী দুঃখী থাকা ভালো? শোপেনহাওয়ার-এর উত্তর দেন নাই। তবে বুদ্ধ দুঃখ নিবারণের জন্য জ্ঞানের কথা বলেছেন। তবে জ্ঞানের ইতিহাস শুধু সুখ না অসীম দুঃখও বয়ে আনে সেটা সত্য। বুদ্ধ দুঃখ নিবারণের জন্য যে জ্ঞানের কথা বলছেন তা মূলত জ্ঞান না। জীবনাচরণ, চর্চা, প্রয়োগ। সুখের জন্য যাপনে কিছু চর্চা দরকার, জ্ঞান না। জ্ঞান ও মূর্খতা জীবন যাপনের জন্য তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। সেই কারণে বই পড়লে যা যা হয়, বই না পড়লে ঠিক তা তা হয় না। কোন জ্ঞানী বা মূর্খের কোনো জীবনই খারাপ না। তা যদি আপনার মতো করে সুখে ভরা থাকে। মানুষের মস্তিষ্কের গঠনের সাথে মানুষের সুখ, বেঁচে থাকার ইচ্ছার সম্পর্ক আছে। আমার গঠন বই কেন্দ্রিক না। স্রেফ বাঁচার মধ্যে একটা আনন্দ আছে এমন একটা বিষয় আমার মধ্যেও আছে।  যেকোনো পরিস্থিতির জন্য আমি প্রস্তুত।

 

বাংলা ট্রিবিউন : অন্যকে কোন বইটি পড়ার পরামর্শ দেবেন, কেন?

মৃদুল মাহবুব : পড়ার পর কোনো বই উপলব্ধি করার জন্য কারো পরামর্শ নিবেন না। নিজের অনুভূতির ওপর আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠুন। যা আপনার ভালো লেগেছে তাই শুধু মাত্র ভালো।

 

বাংলা ট্রিবিউন : আপনার লেখা কোন বইটিকে আপনি বেশি গুরুত্ব দেন, কেন?

মৃদুল মাহবুব : আমার তিনটা কবিতার বই ‘জলপ্রিজমের গান’ ২০১০,  ‘কাছিমের গ্রাম’ ২০১৫ ও উনমানুষের ভাষা’ ২০১৭। সামনে কবিতার বিষয়ক গদ্য ও উপন্যাস। কাব্যনাট্য নিয়েও ভাবছি। প্রকাশিত তিনটা বইয়ের তেমন একটা দাম নাই আমার কাছে। গুরুত্ব তো আরো পরের বিষয়। লেখক হিসাবে নিজের বই নিজের গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নাই। ইন গ্রস, সবাই ভাবে নিজের বই বিরাট কিছু, কিন্তু রিয়ালিটি তো আর তা না। পাঠকের কাছে কোন বই কী তা আমার দ্বারা বলা সম্ভব না। একটা বইয়ের গুরুত্ব পাঠকই তৈরি করে। লেখা এক জিনিস আর প্রকাশিত বই আরেক জিনিস। বই প্রকাশের পর তা আর লেখকের থাকে না, পাঠকের হয়ে যায়। একটা বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার পেছনে আবার অনেক ফ্যাক্ট কাজ করে। আমি মূলত পাঠকের জন্যই লিখি। প্রকাশিত বইয়ের গুরুত্ব গুরুত্বহীনতা তাদের কাছে। লেখক হিসাবে তেমন উচ্চাকাঙ্খী না আমি। আমি আমার মত লিখতে চাই। একটা বই থেকে আরেকটা বইয়ে নিজেকে ভেঙে নতুন করে দেখতে চাই। নিজের লিমিটটাকে বার বার অতিক্রম করাই আমার লক্ষ্য।

পেঙ্গুইনের গ্রেট আইডিয়া সিরিজের বেশ কিছু বই আছে। তার মধ্যে একটা হলো জর্জ অরওয়েলের ‘হোয়াই আই রাইট’। সেখানে একটা কথা আছে। ‘এভরি বুক ইজ এ ফেইলর’। খুব কাজের কথা। মহা গুরুত্বপূর্ণ কথা। প্রতিটা বইকে যদি ব্যর্থতা হিসাবে দেখতে না শেখেন লেখক তবে পরের বইটায় কী লিখবেন। আপনি যখনই ভাবা শুরু করবেন এই বইটা খুব ভালো হয়েছে তখন আর এই বইয়ের মোহ, স্টাইল থেকে বের হতে পারবেন না। যেমন দেখবেন কিছু লেখক আছে যাদের প্রথম বই আর দশম বই একই। তেমন রেডিক্যাল কোনো পরিবর্তন নাই। তারা বছরের পর বছর একই ফর্মে লিখে যাচ্ছে। এর কারণ নিজেকে বেশি ভালোবাসা। নিজের থেকে বের হতে না পারার সাহস ও সক্ষমতা।

লেখক হিসাবে নিজের লেখাকে ঘৃণা করতে পারা এক বিরাট অর্জন। নিজেকে অস্বীকার করার শক্তি সব লেখকের থাকে না। এটা কমন সেন্সের মতো আনকমন, রেয়ার। অর্জন ও চর্চা করতে হয়।


আরও পড়ুন:

বই কেড়ে নিলে আমি নিঃস্ব—অসহায় হয়ে যাবো

//জেডএস//

x