বেগম পাড়া

সালমা বাণী ১২:৫৬ , জুন ১০ , ২০১৮

‘বেগম পাড়া’ সালমা বাণীর প্রকাশিতব্য ‘সেলাই করা মুখ’ এর অংশবিশেষ। এ উপন্যাসের সমস্ত ঘটনা কাল্পনিক। বাস্তবজীবনে বাংলাদেশ বা কানাডার কোনো ব্যক্তি বা পরিবারে সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

আজ রায়ানের লাশ ভেসে উঠেছে লেক অন্টারিওর উড বাইন বিচে। তিন মাস ধরে আরসিএমপি হোমোসাইড গ্রুপ তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ায় জীবিত অথবা মৃত রায়ানকে। জীবিত অথবা মৃত খোঁজার কারণ যেদিন সকালে রায়ান বাড়ি থেকে চলে গেল, লিখে রেখে গেলো একখানা সুইসাইড নোট—সেই সুইসাইড নোটে লেখা ছিল—আই হেট দিস ফ্যামিলি, নো পয়েন্ট অফ লিভিং, গোয়িং টু ডাই, নো বডি ইজ রেসপনসিবল, আই এ্যাম টেকিং অল রেসপনসিবলিটি উইথ মি। সেই নোট ধরে পুলিশ খুঁজেছে, খুঁজেছে রায়ানের বাবা-মা বন্ধুবান্ধব সবাই তন্ন করে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, কমিউনিটির বাংলা পত্রিকা, মেইন স্ট্রিম পত্রিকার জনপ্রিয়গুলো কোথাও বাদ রাখেনি রায়ানের নিখোঁজ সংবাদ ছাপাতে অথবা ‘রায়ান কাম ব্যাক হোম’ এই রিকোয়েস্ট পাঠাতে। রায়ানের মা দুই হাতে মাথার চুল ছিঁড়ে কাঁদছে, মাথায় ঘোমটা দিয়ে দুই হাত তুলে মোনাজাত করছে, বুকের কাছে বড় বড় অক্ষরে লেখা পোস্টার ‘কাম ব্যাক হোম মাই সুইট হার্ট সান’ এই সব ছবিতে ভরে ফেলেছে সম্ভাব্য সকল মিডিয়া। বাংলা মেইল, বাংলা রিপোর্টার, দেশের আলো সবগুলো বাংলা পত্রিকাতে প্রতি সপ্তাহে রায়ানের ছবিসহ হারানো বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়েছে, কিন্তু কোথাও সন্ধান পাওয়া যায়নি রায়ানের।

যোহরের নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য মোনাজাত ধরে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে আর ছেলেকে ভিক্ষা চাচ্ছে তখন শুনতে পায় কে যেন দরজার বেল বাজালো। বেল শোনা মাত্র রায়ানের প্রিয় কুকুর সুগার ছুটে যায় দরজার কাছে, ক্রমাগত ঘেউ ঘেউ সেই সঙ্গে লাফ ঝাপ। রায়ানের মা উর্মি আহমেদ আর সুগার ছাড়া এখন কেউ নেই বাড়িতে। রায়ান নিখোঁজ হবার পর সুগার সারাদিন গলা লম্বা করে দরজার দিকে তাকিয়ে শুয়ে থাকে। ওর দুই চোখের কোণায় স্পষ্ট দেখা যায় কান্নার ভেজা অথবা শুকনো দাগ। রায়ানের মা সুগারকে বলে— সুগার তোর পাপার জন্য দোয়া কর, তোর পাপা ফিরে এলে তোকে তোর প্রিয় ব্লু মাউনটেনে নিয়ে যাবে, বাংলাদেশে যাবি? বাংলাদেশে নিয়ে যাবে। রায়ান আদর করে সুগারকে ডাকতো বেবি, মাই বেবি, আর সে কারণে রায়ানের মা রায়ানকে ডাকতো সুগারের পাপা। ইমিগ্রেশন নিয়ে আসার সময় সুগারকে বাংলাদেশ থেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে রায়ান। তখন রায়ানও ছোট, সুগারও ছোট। সুইজারল্যান্ড বেড়াতে গিয়ে সুগারকে দেখে পছন্দ হলে পাঁচ হাজার ডলার দিয়ে সুগারকে কিনেছিলো রায়ানের বাবা।  

রায়ানের বাবা মহিদুল আহমেদ দুই দিনের জন্য দেশে গেল গতকাল। দীর্ঘদিন তার অনুপস্থিতিতে জটিল সমস্যা দেখা দিয়েছে ইন্ড্রাস্ট্রিতে। সুতরাং ছেলে হারানো শোক সামাল দিয়ে তাকে যেতে হলো ঢাকা। তার বিজনেস ডাইনাসটি সে ছাড়া  অচল। রায়ান নিখোঁজ হবার আগে প্রতি মাসে একবার অথবা দুবার আসা যাওয়া হতো ঢাকা টরন্টো।  

একজন লিভ ইন ন্যানি আছে সে থাকে বেজমেন্টে। সকাল থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত কাজ করে। দুপুর একটা থেকে দুটো পর্যন্ত লাঞ্চ ব্রেক। এই সময় সে নিজের প্রয়োজনে বাইরে চলে যায় অথবা বেজমেন্টে থাকে।  প্রতিদিন সকালে একজন লিভ আউট ন্যানি আসে সারা বাড়ি ক্লিন, ডিস ওয়াসিং, ব্যবহৃত কাপড় চোপড় ওয়াস, ড্রাই এন্ড ফোল্ড এসব কাজের জন্য। আজ সেও আসেনি, সকালে টেলিফোন করে সিক কল করেছে। মেয়ে রোশেল চলে গেছে বোস্টন ইউনিভার্সিটি। অগত্যা দরজা খোলার জন্য উর্মি আহমেদকে উঠে আসতে হয়। 

দরজা খুলে উর্মি আহমেদ ভাষাহীন চোখে তাকিয়ে থাকে। সংখ্যায় ওরা চারজন। একজন নারী, তিনজন পুরুষ পুলিশ। পুলিশ দেখেই উর্মি আহমেদের বুকের ভেতর শকুনের থাবা এসে পড়ে, কে যেন কলিজা ধরে টান দেয়। দরজার ওপরে আছড়ে পড়ে, না না, আমাকে তোমরা খারাপ কথা বলো না, আমার ছেলেকে এনে দাও। একান্ত আপনজনের মতো উর্মি আহমেদকে তুলে বসায়। একই সময়ে জানতে চায় রায়ানের বাবা কোথায়?

মৃত্যুর কয়েক বছর আগ থেকেই রায়ানের সঙ্গে তার মায়ের তীব্র মতবিরোধ চলছিলো। প্রথম দিকে এন্ড্রুর সঙ্গে রায়ানের মেলামেশাকে নিরেট বন্ধুত্ব ভেবে সহজভাবে গ্রহণ করে উর্মি আহমেদ। সাদা ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, মায়ের ভালোলাগে, মনে হয় এন্ড্রুর সঙ্গে বন্ধুত্বে কিছুটা অহংকারী দেখায়। প্রায়ই রেশমা ভাবীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় বলে—আমার ছেলের কোনো কালো বা ইন্ডিয়ান বন্ধু-বান্ধব নাই, ওর বন্ধুরা সব সাদা। এন্ড্রুকে বরং বাড়তি যত্নআত্তি দেয়া হয়, দামি দামি গিফট কেনা হয় এন্ড্রুর জন্মদিনে, ক্রিসমাসে।

এন্ড্রু সচারাচর রায়ানদের বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতো না। কিন্তু প্রায়ই ড্রাইভ ওয়েতে এসে উঠিয়ে নিতো অথবা  নামিয়ে দিতো। মায়ের চোখে কিছুই এড়ায় না, এন্ড্রু আসার আগে রায়ান নিজেকে যত্ন করে সাজায়। যুবক হয়ে ওঠার এই সময়ে রায়ানের আচরণ স্বাভাবিক মনে হয় না মায়ের কাছে, বেশ কয়েকদিন মায়ের চোখে ধরা পড়েছে—এন্ড্রু আসার সময় হলে রায়ানকে অদ্ভুত অস্থির দেখায়। মায়ের দৃষ্টিতে ধরা দেয় মেয়েদের জন্য কোনো রকম ভালোলাগার, ভালোবাসার এমন কী বন্ধুত্ব করার আবেগ আগ্রহ কিছুই নাই রায়ানের। এন্ড্রু এলে রায়ান নিজের গাড়ি না নিয়ে এন্ড্রুর গাড়িতে চলে যায়।

উর্মি আহমেদের বেড রুমের জানালা দিয়ে বাড়ির সামনের ড্রাইভ ওয়ে, এবং রাস্তার দুই প্রান্তের বহু দূর পর্যন্ত দৃষ্টিতে আটকায়। সেদিন জানালা দিয়ে উর্মি আহমেদ বাইরে তাকাতেই বরফের মতো জমে যায় তার সমগ্র অস্তিত্ব। একি দেখছে সে! তার ছেলেকে চুম্বনে আবদ্ধ করে রেখেছে এন্ড্রু। এই টরন্টো এসে শুনেছে এখানে পুরুষে পুরুষে নারীতে নারীতে প্রেম ভালোবাসা বিয়ে সবই আইন করে বৈধতা দিয়ে রেখেছে। সেম সেক্সের প্রেম ভালোবাসা অবাধ মেলামেশা এখানে অপরাধ না। এদের বলে গে, লেসবিয়ান, সর্ট করে সেম সেক্স। তাহলে কি তার ছেলে! না না, এ অসম্ভব, সেই থেকে মা ছেলের দ্বন্দ্ব। ছেলেকে প্রয়োজনের থেকে বেশি পাহারা দিয়ে রাখা।  

রায়ান আর রাইসা এই দুই সন্তানের জন্য দেশ ছেড়ে এই দেশে আসা। ওদের জন্য বেছে বেছে এই টরন্টোর  সেরা এলাকা রোজডেলের এই বাড়ি কেনা। পাঁচ মিলিয়ন ডলার দিয়ে পাঁচ হাজার স্কয়ার ফিট এই বাড়ি কেনার পর হাউজ ওয়ার্মিং পার্টিতে রায়ানের বাবার এমন সব মন্তব্য ছিল। এখন থেকে আমার ছেলে মেয়ে এই দেশেই থাকবে, সুতরাং দেশের মতো আমি ওদের এই শহরের সেরা এলাকায় বাড়ি কিনেছি।

নর্থ ইয়র্ক, রিচমন্ড হিল এসব এলাকায় কয়েকজন পরিচিত বিজনেস এসোসিয়েট বাড়ি কিনেছে। উর্মি আহমেদ স্বামীকে বলেছিলো চলো আমরাও না হয় নর্থ ইয়র্কে বাড়ি কিনি, শুনেছি বে ভিউ খুব সুন্দর পশ রেসিডেন্স। ওদিকে থাকলে মাঝে মাঝে রেশমা ভাবী অথবা রিনা ভাবীর সঙ্গে দেখা হবে। আরে না, পশ নেউবার হুড শুধু নর্থ ইয়র্ক, আর রিচমন্ড হিলেই না, এটা পৃথিবীর সেরা দেশগুলোর একটা। দেশে অনেক পশ নেইবার হুডের অভাব নাই। ডাউন টাউন লিভিং-এ ছেলে মেয়ে বেশি স্মার্ট হয়। তুমি কি এটা বাংলাদেশ পেয়েছো যে শুধু গুলশান আর বনানী ছাড়া আর কোন পশ জায়গা নেই! আরে এটা কানাডা, এখানে ধনীরা অনেক জায়গাতেই থাকে।

টরন্টো ডাউন টাউনেই থাকতে চায় আইনুল আহমেদ। ডাউন টাউন টরন্টোর রোজডেল, ফরেস্ট হিলের বেশ কয়েকটি ডিটাচড হাউজ দেখেশুনে শেষ পর্যন্ত এই বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত। এবং এই শহরে বসতের শুরুতেই স্ত্রী উর্মিকে সতর্ক করে দেয, সে যেন এই শহরের লো ইনকাম বাঙালিদের সঙ্গে না মেশে এবং ছেলে মেয়েকেও মিশতে না দেয়। মধ্যবিত্তের সঙ্গে মেলামেশা করে ছেলেমেয়ের ওপর মধ্যবিত্ত মানসিকতার প্রভাব পড়ুক এটা কখনোই চায় না রায়ানের বাবা। তাছাড়া দেশ থেকে ক্যাশ টাকা নিয়ে এসে বিদেশে বাড়ি কেনার এই বিষয়টা এখন জানাজানি হয়ে গেছে। দেশ থেকে টাকা আসে ডলার হয়ে। এখানে রেখে যাওয়া ফ্যামিলির বৌ ছেলেমেয়েরা দেশের টাকায় চলে। সারসাইভ বা এডুকেশন খরচ চালানোর জন্য লো এন্ড জব করে না। পত্রিকাগুলো জোকের মতো লেগে আছে। বিদেশে সেকেন্ড হোম, ব্যাংক খালি যত রকমের ড্যামেজিং নিউজ বানানো যায় বানিয়ে চলেছে। বেশির ভাগ বাঙালিই তো এই শহরে লো এন্ড ঘেটো এরিয়াতে লো এন্ড এপার্টমেন্টে  থাকে। রোজডিল, ফরেস্ট হিল, রিচমন্ড হিল, নর্থ ইয়র্কের বে ভিউ এসব এরিয়াতে বাড়ি কেনার সামর্থ তো এই সব লো এন্ড মিনিমাম স্যালারি আর্নারদের নাই, সুতরাং রিচ এরিয়াতে এই সব বাড়িতে আমাদের লিভিং, এটা ওয়ার্কিং ক্লাস বাঙালিদের চোখে সইবে না, টাটাবে, যন্ত্রণা দেবে। পিছে লেগে যাবে, পত্রিকায় লেখালেখি করবে। অলরেডি বেগম পাড়া নাম দিয়ে নানা রকমের রিউমার বানাচ্ছে মার্কেটে। সুতরাং সাবধান, যদি ফ্রেন্ডশিপ করতে হয় আমাদের স্ট্যান্ডার্ড দেখেই করো। উর্মি আহমেদ নিজেও স্বামীর মতো সচেতন, নর্থ ইয়র্কের বে ভিউতে রেশমা ভাবী, রিচমন্ড হিল বে ভিউতে রিনা ভাবী এমন হাতে গোনা দু’একজন বাংলাদেশি ছাড়া কোনো বাংলাদেশিদের সঙ্গে তার পরিচয় নাই। 

দুইচারজন বাংলাদেশিদের সঙ্গে পরিচয় হলেও উর্মি আহমেদ খুব সাবধানে শুধুমাত্র রিচ বাংলাদেশি যারা তাদের মতোই দেশ থেকে এসে এখানে বাড়ি গাড়ি এসব স্ট্যাটাস মেইনটেইন করে চলে তাদের সঙ্গে কথা বলে। 

স্ত্রী সন্তানদের নিরাপদে রেখে আইনুল আহমেদ ফিরে ফিরে যায় দেশে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের বিজনেস ক্লাসে। সেখানে তার বহুমুখী ব্যবসা বাণিজ্য, শুধু ব্যবসা না, ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতি। ব্যবসা রাজনীতি এইসব কিছুতে ব্যস্ত থাকার কারণে সংসারে স্ত্রী কন্যাপুত্রদের সঙ্গে সময় কাটানো হয় না।

সেদিন রায়ান ইউনিভার্সিটিতে গেলে চুপি চুপি ছেলের ঘরে প্রবেশ করে। ছেলের পড়ার টেবিল ব্যক্তিগত কাগজপত্র তন্ন তন্ন করে খুঁজতে হয় না। ড্রয়ার খুলতেই এন্ড্রুর সঙ্গে অসংখ্য ঘনিষ্ট ছবি—এন্ড্রুকে চুম্বন দিচ্ছে, এন্ড্রুর বুকে মাথা পেতে শুয়ে আছে বিছানায়, এছাড়া এমন সব একান্ত ঘনিষ্ট ছবি মা উর্মি আহমেদের পক্ষে সেদিকে দৃষ্টিপাত করতে লজ্জা লাগে। হাঁপাতে থাকে উর্মি আহমেদ, মৃত্যু পথযাত্রীর মতো যন্ত্রণা বিহ্বলতা নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কান্না থামিয়ে সেল ফোনের সেভ করে রাখা নম্বরে স্বামী আইনুল আহমেদকে ফোন দেয়। অপর প্রান্ত থেকে হ্যালো বলতেই চিৎকার দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে—তুমি আজই এখনই টরন্টো আসো যদি তোমার ছেলের সর্বনাশ ঠেকাতে চাও।

মেয়ে রোশেলকে টেলিফোনে জানায় রায়ানের অধঃপতনের কথা, পাপ, অন্যায় অনচারের কথা। রোশেল অবাক হয় মায়ের এই মন্তব্যে—মা, কাম অন, তুমি এটাকে কেন এত বড় ইস্যু করছো? ইফ রায়ান ইজ গে দিস হই হিজ লাইফ, হিজ চয়েস, লেট হিম বি। তুমি কি বায়োলজি বোঝো? তুমি তো ওর মা, তুমি কেমন মা? তুমি তো এসবের কিছুই বোঝো না? কিন্তু মা আমি কিন্তু অনেক আগে থেকেই বুঝি, রায়ান ইজ নট দ্য সেম বয় এজ ইউ আর থিঙ্কিং, হি ইজ গে, নাথিং রঙ ইউথ দিজ।

ওরে জানোয়ার, ওরে কানাডিয়ান মেয়ে, এই জন্য তোমাদের কানাডা এনেছিলাম? না, আমি এটা হতে দেবো, হতে দিতে পারি না, আমাদের ধর্ম আছে, সমাজ আছে, এর থেকে ওর মরণ আমাদের জন্য অনেক ভালো।

পরদিন রাতে পৌঁছায় আইনুল আহমেদ। এন্ড্রুর সঙ্গে ছেলের সম্পর্কের কথা সেই সঙ্গে রায়ানের ড্রয়ার থেকে পাওয়া নানা পোজের ছবি তুলে দেয় স্বামীর হাতে। রায়ান তখনো ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরেনি। রায়ানকে টেলিফোন করে ইমার্জেন্সি বাড়ি আসতে বলে। রায়ান বাড়ি ফিরতেই সিংহের মতো হুংকার। রায়ান আমি আর তোমাকে এই দেশে রাখতে চাই না, তুমি ইউরোপ আমেরিকার কোথাও চলে যাবে এডুকেশনের জন্য।

না আমি কোথাও যেতে চাই না, আমি এখানেই স্টাডি করতে চাই, আমি টরন্টো লিভ করে কোথাও যাবো না। মুখের কথা শেষ হয় না, আইনুল আহমেদ টেনে একটা চড় বসিয়ে দেয় ছেলের গালে। ঝাপিয়ে পড়ে স্বামীকে বাঁধা দেয় উর্মি আহমেদ। কী করছো? সর্বনাশ হয়ে যাবে, এখনই পুলিশ আসবে। আসুক, ওকে আমি মেরে ফেলবো। এদেশে নিজের শিশু কিশোর সন্তানের গায়ে হাত দেয়া যায় না, আর রায়ান তো এডাল্ট।

— ড্যাডি আমার মনে হয় তুমি ও মা দুজনেই আমার পারসোনাল লাইফে টু মাচ ইন্টারফেয়ার করছো।

— সাট আপ, আর বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি তোমাকে বাংলাদেশে নিয়ে যাবো। আমার সামাজিক সম্মান মর্যাদা আমি কখনোই নষ্ট হতে দেবো না। দরকার হলে আমি তোমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে ফেলবো, তোমার মতো নোংরা ঘৃণিত সন্তানদের মেরে ফেলা অনেক ভালো।

শুরু হয় মায়ের সঙ্গে ছেলের তর্ক বিতর্ক, মতের দ্বন্দ্ব। আমি বেঁচে থাকতে, আমার দেহে শেষ নিঃশ্বাসটুকু থাকতে আমি এ হতে দিবো না রায়ান, হতে দিতে পারি না। কি বলবে সমাজের মানুষেরা? আমি এই সমাজে মুখ দেখাতে পারবো না। আমার ধর্মে এটা পাপ, ভয়ানক পাপ, এই সব বায়োলজিকাল ব্যাপার, হরমোনাল ইমব্যালেন্স, যত সব স্টুপিড কথাবার্তা, এই সব বলে বলে সমাজকে নষ্ট করা হচ্ছে। আল্লাহ তাহলে নারী ও পুরুষ আলাদা করে তৈরি করতো না। তুমি যদি এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করো আমি তাহলে আত্মহত্যা করবো। মায়ের আত্মহত্যার প্রয়োজন হয় না। নিজের দেহমনের ভেতরে ধীরে ধীরে যে সত্য বিস্তার পেয়েছে তাকেই রায়ান বিশ্বাস করে, এখানে পাপ নেই, অন্যায় নেই, সমাজ নষ্ট করার কিছু নেই। আর এই বিশ্বাসের সঙ্গে মায়ের বিশ্বাসের মতভেদে নিজের দেহকে ডুবিয়ে দেয় লেক অন্টারিওর হিমশীতল জলে।

আজ রায়ানের জানাজা। ছেলের মৃত দেহ পাওয়ার সংবাদ পাওয়া মাত্র উড়ে এলো রায়ানের বাবা। আনন্দ উৎসব পার্টি বিনোদন এসবে কমিউনিটির লো ইনকাম মানুষদের সংসর্গ পরিহার করে চললেও মৃত্যুর মতো সত্য সামনে এসে দাঁড়ালে তখন সকল শ্রেণির সকল পেশার মানুষের মাঝে এসে নিজেকে উপস্থিত করতে হয়। মৃত্যুর বয়ানে প্রয়োজন কান্না, শেষ বিদায়ের আহাজারি, দীর্ঘশ্বাস ভারী করে তোলার জন্য অনেক বেদনার্ত মুখের ভিড়।  রায়ানের মৃত দেহের গোসল এবং জানাজার জন্য প্রয়োজন হলো বায়তুল আমান মসজিদে যোগাযোগ করা।

বায়তুল আমান মসজিদ গড়ে উঠেছে টরন্টোর বাংলাদেশিদের অর্থ এবং সহযোগিতায়। ড্যানফোর্থের আশেপাশে আরো অনেক মসজিদ আছে, কিন্তু নিজস্ব বা নিজেদের বলে যে একটা শব্দ মানুষকে অহংকারী করে তোলে বায়তুল আমান যেন তেমনই একটি পবিত্র অহংকার। অন্যান্য মসজিদের তুলনায় বেশ ছোট, জাঁকজমকের বাহুল্য নাই, সামনে গাড়ি পার্ক করার স্থানও সীমিত, খেটে খাওয়া বাংলাদেশিদের মিলিত প্রয়াসে গড়ে তোলা মসজিদ। তবে কানায় কানায় উপচে ওঠে ধর্মপ্রাণ মানুষের উপস্থিতিতে। টরন্টো বিশেষ করে ড্যানফোর্থ ভিক্টোরিয়া পার্ক এলাকায় জুড়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশি কমিউনিটির আদরের লিটল বাংলার সকল ধর্মপ্রাণ বাংলাদেশি নারী পুরুষ এখানে আসে প্রার্থনায় সামিল হতে। এত মানুষের উপস্থিতি, মেইন স্ট্রিম নেতারাও গণনায় আনে এই মসজিদ। ভোটের সময় হলে সেসব নেতারাও আসে মাইনোরিটি এই কমিউনিটির আনুকূল্য লাভে। 

কেউ মৃত্যুবরণ করেছে, জানাজা হবে বায়তুল আমান মসজিদে, এই খবর কমিউনিটিতে প্রচার হওয়ার অপেক্ষা মাত্র। কমিউনিটির ধর্মপ্রাণ বাংলাদেশিরা, যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় মৃতের প্রতি সম্মান, ভালোবাসা জানাতে ছুটে আসে বায়তুল আমানে।

রায়ানের মৃত্যু যদি আত্মহত্যা তবুও এই মসজিদে সকল মৃতের জন্য একই সম্মান একই মর্যাদা এবং ইসলামিক রীতিনীতি পালন। আজও মসজিদ ভরে ওঠে লিটল বাংলার ধর্মপ্রাণ বাংলাদেশি মানুষদের উপস্থিতিতে।

শোক ন্যুব্জ রায়ানের মা বাবা এসে নামে মার্সিডিজ বেঞ্জ থেকে। রায়ানের লাশের গোসল দিয়েছে মোহাম্মদ আবদুল হাফিজ। সেই চব্বিশ বছর বয়সে হাফিজ বদলে গেল। এক সময়ে ঢাকা শহরের ত্রাস ছিল মোহাম্মদ আবদুল হাফিজ। তখন অবশ্য তার নাম ছিল সোহেল। ঢাকা কলেজে ১ম বর্ষ থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে মেধাবী ছাত্র সাদমান সোহেল। রাজনীতি থেকে ক্রমশ হয়ে ওঠে রাজনীতিবিদদের অস্ত্র ও হাতিয়ারে। যেকোনো সময় ওকে মেরে ফেলতে পারে। শেষ পর্যন্ত বাবা-মা সোহেলকে গলাকাটা পাসপোর্টে পাঠিয়ে দিলো কানাডা । সেই দুরন্ত সোহেল টরন্টো আসার পর ধীরে ধীরে বদলে গেল ধর্মপ্রাণ মোহাম্মদ আবদুল হাফিজ। বাংলাদেশি কমিউনিটির নিজস্ব একটি মসজিদ গড়ে তোলার প্রথম ভাবনা, প্রয়াস, উদ্যোগ এসেছে তার কাছ থেকে। সংগঠিত করেছে কমিউনিটির ধর্মপ্রাণ মানুষদের। আবদুল হাফিজ মসজিদে আল্লার ইবাদত বন্দেগির পর বাকি সময় বিলিয়ে দেয় আল্লার বান্দাদের খেদমতে। মৃতের গোসল জানাজা, দাফন, প্রয়োজনে দাফন কাফনের জন্য অর্থ সরবরাহ, শেষ ইচ্ছা পূরণের জন্য লাশ দেশে প্রেরণ সমস্ত কিছুর দায় দায়িত্ব সেই যে তুলে নিয়েছে নিজের কাঁধে আজ আবধি পালন করে চলেছে মুখে নির্মল হাসি আর আল্লার পবিত্র দোয়াদরুদ পাঠের সঙ্গে। এই পবিত্র কাজের জন্য গড়ে তুলেছে মসজিদের ভেতর সেচ্ছাসেবক বাহিনী। শুধুমাত্র বাংলাদেশি মুসলমান নয়, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সর্বত্র আবদুল হাফিজ নিবেদিত প্রাণ।

ড্যানফোর্থ ভিক্টোরিয়া পার্কের আশে পাশে হাইরাইজ বিল্ডিংগুলোতে, নেইবারহুডগুলোর যেখানে বাংলাদেশিদের বসত, সেখানে গিয়ে দরজায় দরজায় লিফলেট গুজে দিয়ে আসে। মারহাবা, সরকার, রোজ গার্ডেন এই সব বাংলাদেশি গ্রোসারি স্টোর, ঘরোয়া, সুইস বেকারি, মক্কা কাবাব ও তেহারি, আনন্দ বেকারি এন্ড রেস্টুরেনন্ট, পিঠা ঘর, আল বারাকা গ্রোসারি শপ, প্রিমিয়াম সুইটস, ঢাকা বিরিয়ানি হাউজ, ভিশন ক্লিয়ার আই কেয়ার, নেচারস হেলথ, অন্য মেলা ও এটিএন বাংলা বইয়ের দোকানসহ বাংলাদেশি মালিকানা সবগুলো দোকানে লিফলেট রেখে আসে রায়ানের জানাজায় অংশগ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে।

বেশ অনেক বছর ধরেই বেগম পাড়ার নানা রকম গল্প মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে গুজবের মতো। এমন কী টরন্টো স্টার-এর মতো পত্রিকাও এই বেগম পাড়া নিয়ে বিরাট এক ফিচার প্রকাশ করে ফেলে বছর তিনেক আগে। টরন্টো স্টারের দেখাদেখি দেশের আলোও একখানা পাঠরোচক ফিচার প্রকাশ করলো। কিন্তু সে সব ফিচারের কোনোটাই বেগম পাড়াটা কোথায়? দেখতে কেমন? তার কো সঠিক চিত্র প্রকাশ করতে পারেনি। আর পারবেই বা কেন! এটা তো আর  টাঙ্গাইলের তাঁতী পাড়া, সোনারগাঁয়ের জামদানী পাড়া বা কুষ্টিয়ার কুমোর পাড়ার মতো পাড়া না যে পাড়ার মোড়ে গিয়ে মানুষজনকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দেবে—এইতো সামনে গিয়ে ডাইনে মোড় নিয়ে কয়েক গজ গেলেই দেখতে পাবেন। 

পর পর ঘটে যাওয়া কয়েকটা মৃত্যু, আত্মহত্যা এবং একজন ধনকুবের রহস্যজন হত্যাকাণ্ডের পর একেবারে লেটেস্ট ঘটনা আবেদ রহমানের কানাডার মেইন স্ট্রিমে রাজনৈতিক দল গঠনের মধ্য দিয়ে বেগম পাড়ার মানুষগুলোকে রহস্য গল্পের আড়াল থেকে হঠাৎই যেন ড্যানফোর্থের বাংলা পাড়ায় নিয়ে এলো। 

রায়ানের লাশ ফিউনারেল হোমে রেখে দেয়া হলো পুলিশি নিয়ম কানুন পার হবার পর। কারণ রায়ানের মায়ের ইচ্ছা ছেলের দাফন কাফন সম্পন্ন হউক জুম্মাবারে। রায়ানের লাশ পাওয়া এবং জানাজার সংবাদ কমিউনিটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিটির মানুষদের ভেতরে অদ্ভুত আলোচনা জমে উঠে। জুম্মার নামাজে আজ নামাজিদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বেশি। মহিলা নামাজিদের সংখ্যাও আজ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে আসা বড়লোকের ছেলের আত্মহত্যা। এই বড়লোকরা দেশ থেকে টাকা এনে বাড়ি কেনে, এদের বৌ ছেলেমেয়েরা এদেশে কাজের জন্য টিম হরটন, ম্যাগডোনালস অথবা বার্গার কিংয়ে দৌড়ায় না। এদের ছেলেমেয়েরা টেছলার, পোর্শ, ফেরারি চালায়, এদের কাছে  মার্সিডিজ অথবা বিএমডব্লিউ দামি ব্রান্ড না। কারণ সেসব তো বাংলাদেশেই ফেলে এসেছে। এদের স্ত্রীরা লিমুজিনে শপিংয়ে যায় অথবা প্রিমিয়াম উবারে।

রায়ানের প্রাণহীন মুখখানির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে শাশা। রায়ানের চেহারা যেমন ছিল তেমনই আছে, পচন ধরেনি, একটু বিকৃত হয়নি, এমন কি একটু ফুলে ফেঁপেও ওঠেনি। তবে কেমন যেন হালকা সবুজের স্যাডো পড়েছে। রায়ানের চেহারার দিকে তাকিয়ে শাশার শুধু মনে হয় এই মৃত্যুটা ডেকে আনা হলো, যদি রায়ানের প্রেম ভালোবাসার ইচ্ছার ওপর পরিবারের এত কঠিন শাসন না চেপে বসতো তা হলে হয়তো রায়ানের এই মৃত্যু জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পিছিয়ে যেত। এক অর্থে রায়ানকে আত্মহত্যার কাছে ঠেলে দেয়া হলো। তাহলে কি রায়ানের আত্মহত্যাকে ভিন্ন অর্থে হত্যা বলা যেতে পারে? বিষণ্ন শাশা ভাবতে থাকে রায়ানকে আসলে হত্যা করা হয়েছে। পরিবার, সমাজ, সামাজিক বিধি নিষেধ, এসব অস্ত্র রায়ানকে হত্যা করেছে।

রায়ানের সঙ্গে প্রায় রাতেই কথা হতো ম্যাসেঞ্জারে। কথা ঠিক নয়, সে সব ছিল হতাশা যন্ত্রণা অক্ষমতার কাতরতা। ইউনিভার্সিটিতে শাশার সংঙ্গে রায়ানের পরিচয় । ওয়েটিং রুমে রায়ান সেদিন বসে ছিল স্টার বাকের কফি হাতে। বসার জায়গা পাচ্ছিল না শাশা, এর পরের ক্লাস সন্ধ্যে সাতটায়। এই দীর্ঘ সময় শাশা ওয়েটিং রুম, লাইব্রেরি এসবেই কাটায়। কারণ প্রথমত বাড়ি থেকে আসা যাওয়ার সময় নষ্ট ও দ্বিতীয়ত টরন্টো বাস ট্রেনের টিকেটের পয়সা বাঁচানো।

পরিচয়ের পর দুজনার বন্ধুত্ব। যত না কথা হতো সামনা সামনি তার চাইতে অনেক বেশি ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে রাতে বাড়ি ফেরার পর। জার্নালিজমের বাইরেও শাশার শখ ফটোগ্রাফি। এন্ড্রুর কথা তখনই জানায়। এন্ড্রুকে ভালোবাসে রায়ান। এই কথা জানাজানি হবার পর থেকে মা বাবা ভয়ংকর নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে সেটাও সে শাশার সঙ্গে শেয়ার করেছে বহুদিন।

শাশা তখন রায়ানকে বলেছে নিজেকে ভালোবাসো—এটা তোমার জীবন, তুমি যদি মনে করো তুমি এন্ড্রুকে ভালোবাসবে তাহলে তুমি তোমার সিদ্ধান্তকে রেসপেক্ট করো। তুমি এডাল্ট, তোমাকে কেন বাবা মাকে কেয়ার করতে হবে? মুভ আউট ফ্রম দ্য প্যারেন্টস কন্ট্রোল। এন্ড ইউ আর নট ডুয়িং এ্যানিথিং রং। 

স্নো গলা শুরু হবার কথা মার্চের শুরুতেই কিন্তু এবার ক্ষ্যাপা ঠান্ডা আর তুষারের দাপটে স্নো গলার সময় পিছিয়ে গেল। মে মাসেও তুষারপাত হলো আর টেমপারেচার উঠানামা করেছে মাইনাস টেন টোয়েন্টি পর্যন্ত। রায়ান যেদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় তখন জানুয়ারি মাসের বারো তারিখ। সারা রাত অঝোরে ঝরেছে। সেই প্রবল তুষার আর মাইনাস টোয়েন্টির ভেতর রায়ান কেমন করে লেক অন্টারিওতে নেমে গেল! নামতে নামতে কতদূর গিয়েছিল? নিশ্চয়ই জলের ততটাই গভীরে নেমে গিয়েছিলো যতটা নামলে বেঁচে থাকার জন্য নিঃশ্বাস নেয়া যায় না। ওর শেষ নিঃশ্বাসটুকু লেক অন্টারিওর হিম শীতল জলের ভেতর থেকে বের হয়ে টরন্টোর মাইনাস টোয়েন্টি ফোর বাতাসে মিশে গিয়েছিল। তুষার জমা সেই ভয়ংকর ঠান্ডায় কেমন কষ্ট হয়েছিল রায়ানের! এই অদ্ভুত ভাবনায় নিজেকে স্টুপিড মনে হয় শাশার। নিশ্চয় কষ্ট হয়েছে অনেক, মৃত্যু কি কষ্ট ছাড়া যন্ত্রণা হয়? রায়ান তো নিজেকে নিয়ে গেছে মৃত্যুর দরজায়, তাহলে রায়ান কী মৃত্যুর সময় অভিমানের গান গেয়েছিল! সে তো রায়ানকে বলতো রায়ান, মন খারাপ হলে গান গাইবে, রায়ানের কী মনে ছিল গান গাওয়ার কথা।

রায়ানের প্রাণহীন মুখের দিকে তাকিয়ে শাশা নিঃশব্দে বলে—রায়ান তুমি আসলে কাউয়ার্ড ছিলে, জীবনকে ভালোবাসতে হলে অনেক স্ট্রাগলের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, রিচ প্যারেন্টসের আদর সোহাগ সেল্টারে বড় হওয়ার কারণে তুমি ফাইটার হয়ে বড় হওনি। খুউব ছোট পারিবারিক আর সামাজিক স্ট্রাগলকে তুমি ফেস করতে পারলে না। জীবন থেকে পালিয়ে গেলে, তুমি এতই ভীরু যে শক্ত মাটির ওপরে দাঁড়িয়ে মরতেও তোমার ভয় হলো! তুমি চলে গেলে কী হবে, আমি তোমার ফ্রেন্ড বেঁচে আছি, আমি কাজ করবো, তোমার মা বাবার মতো মা বাবাদের মটিভেট করার মতো কাজ আমি এখান থেকেই শুরু করবো যেন তোমার মতো অনেক রায়ানকে আর পালিয়ে যেতে না হয়। এই কথাগুলো আত্মগতভাবে বলতে বলতে শাশা হনহনিয়ে বের হয়ে আসে মসজিদ থেকে। দ্রুত হাঁটতে থাকে ড্যানফোর্থ ধরে ভিক্টোরিয়া পার্ক সাবওয়ের উদ্দেশ্যে।

রায়ানের জানাজা শেষে  সুইস বেকারিতে বসে একখানা পিয়াজু অথবা সদ্য ভাজা ডালপুরিতে কামড় বসাতে বসাতে জাকির হোসেন বলে—যাক, অবশেষে লাশটা পায়া গেলো। অলমোস্ট তিন মাস, ভাবা যায়? তৎক্ষণাৎ  মোশতাক আহমেদ, মাহমুদ আনাম, জহির ইমতিয়াজ হয়তো ডালপুরির আস্বাদন থামিয়ে বলে—বাবা মা এত  বাড়াবাড়ি না করলেও হতো, ছেলের যখন সেম সেক্সের সমস্যা তখন আরে বাব্বা দে না কিছু দিন পার করতে, আসলেই বয়সের দোষ, গরম বয়সটা পার হলেই দোষ কেটে যেত, তা না, যত্তসব বাড়াবাড়ি, নে এখন কেদে বেড়াও।

— আরে কী যে বলেন ভাই, এই রকম একটা সিকনেস মেনে নেয়া সহজ কথা না, নিজের হলে বুঝতেন, এত অহংকার করতে নাই, আমাদের এখন কেয়ারফুল হতে হবে। ছেলেমেয়েরা কোথায় যাচ্ছে, কী করছে চোখে চোখে রাখতে হবে।

চিন্তিত ভাব নিয়ে কপাল কুচকে মাহমুদ আনাম বলে—একটা নয়, দুটো নয়, কমিউনিটিতে পর পর তিনটে আত্মহত্যা, আর সবগুলোই অই বড়লোকদের ছেলে, সবগুলোই বেগম পাড়ার। আমার তো ভয় হচ্ছে বড়লোকদের সমস্যা আবার না আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষদের জীবনে ছায়াপাত ঘটায়। 

মোশতাক আহমেদ বলে—আরে ধুর না, ডোন্ট ও্যরি, এইসব হইলো বড়লোকগো ছেলেমেয়েদের, সখের ফ্রাসটেশন, সখের ডিপ্রেশন, শখের পারভারশন। আমাদের পোলামাইয়াদের কাম কইরা পড়াশোনা করতে হয়। ওদের এইসব ডিজিজ ধরনের সময় নাই।

সুইস বেকারি এন্ড রেস্টুরেন্টের  টেবিলে যখন আড্ডা এমন জমে উঠেছে তখন রাস্তার অপর পাশে ঘরোয়া রেস্টুরেন্টের টেবিলে রুই মাছের ঝোল, কাচকি মাছের চচ্চড়ি, আলু ভর্তা ডালের সঙ্গে ভাত মাখাতে মাখাতে শামছুল হক বলে—শোনেন আহাদ ভাই, আমি তো লাশের গোসল দেয়ার সময় হাফিজ ভাইরে হেলপ করতে গেছিলাম। পোলাডার সারা গায়ে টাট্টু আঁকা, আর সেই টাট্টুগুলার সবটাতে লেখা এন্ড্রু, এন্ড্রু, আর এন্ড্রুর মুখের ছবি। আহারে কি সুন্দর ফর্সা শরীর, মেয়েদের শরীলের মতো নরম, কোমল দ্যাহ, আর মুখডাতে খুউব মায়া। সাইন্স নাকি পুরুফ করছে এইগুলা আসলেও বায়োলজিক্যাল ব্যাপার স্যাপার, পোলাডারে এত্ত টরচার না করলেও পারতো বাবামায়ে। আহা, আমার খুউব মায়া লাগছে, বুকের মইধ্যে কষ্টে উথালপাথাল করছে।

— শামছুল হক বলে হ,  জানাজা তো পড়াইলো, ধম্ম সম্মত হইছে কিনা স্যাডা আল্লায় জানে, তবে হ্যার বাবা মারে মাওলানা দিয়া পোলার জন্য তওবা পড়াইতে হবে। রাখো, অপেক্ষা করো বাইর হইতাছে, কত্তদিন গোপন থাকবে?  ব্যাগম পাড়ার আরো অনেক গল্প আইতে আছে, পোলা আরেকখান নিজের গলায় নিজে ছুরি বসাইয়া আত্মহত্যা করছে, আগামী শুক্কুরবার হ্যার জানাজা। আর মোহাম্মদ রউফ, বড়লোকটার হত্যার রহস্য এখনো তো উদ্ধার হয় নাই। 

//জেডএস//

x