চেনা সুরের রাগ-রঙ : ভৈরবী

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় ১৫:১৮ , জুন ১০ , ২০১৮

খুব অবাক হয়ে যাই, যখন লোকে বলে, ‘বুঝি না বলেই শাস্ত্রীয় সংগীত শুনতে ভাল লাগে না!’ অথচ বুঝি না বলে রসগোল্লা খাই না—একথা কদাচ কেউ বলে মনে তো পড়ে না। কিংবা এই যে গোলাপ এত ভাল লাগে— এ কি গোলাপ বুঝি বলেই? যে এস্টার (Ester) জাতীয় রাসায়নিক যৌগের কারণে গোলাপের সৌরভ,  তার রাসায়নিক গঠন বুঝি বলেই কি, তা আমাদের ভাল লাগে?

বলাই বাহুল্য, তা কখনোই নয়। ভাল লাগার সঙ্গে বোধ্যতার সর্ম্পক যে থাকতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। বিজ্ঞান বা অঙ্ক, অথবা দর্শন বা যুক্তিশাস্ত্রের মতো বিষয়গুলির সঙ্গে বোধ্যতার সম্পর্ক যতটা নিবিড়, সংগীতের সঙ্গে এতটা হয়তো নয়। আসলে আমাদের সমস্ত ভাল লাগার মূল বোধ্যতায় নয়, বরং সৌন্দর্যেই নিহিত। যা কিছু সুন্দর, আমাদের তাই ভাল লাগে। সংগীত, সাহিত্য, কবিতা, বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন... এক কথায় সমগ্র বিশ্বজগৎ এবং জীবন সম্পর্কেই একথা খাটে। আসলে সুন্দর কোনো কিছুর দ্বারা বিমোহিত হয়ে কেউ যখন সে আনন্দকে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করেন, তখন তিনি আসলে শিল্পই রচনা করেন। শুধু সংগীত, সাহিত্য, চিত্রকলাই নয়। এই ব্যাপক অর্থে বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন... আসলে শিল্পই, আর কিছুই নয়; তাদের প্রকাশের ভাষা আলাদা—এই মাত্র। আর যেকোনো শিল্প আস্বাদনের একমাত্র প্রাথমিক শত্য শুধু এই যে, তার ভাষাটা আপনাকে জানতে হবে। যেমন, রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তে হলে বাংলা ভাষাটা জানতেই হবে। সেই ভাবেই, বিজ্ঞানের ভাষা, দর্শনের ভাষাও হলো অঙ্ক বা যুক্তি। ছবির ভাষা হলো রঙ সংগীতের ভাষা সুর।

এই যে নানান ভাষা, এর মধ্যে কথ্যভাষা, যেমন বাংলা ইংরেজি ইত্যাদি এসব ভাষা মানুষেরই সৃষ্টি। এসব ভাষার প্রতিটি শব্দেরই একেকটা আভিধানিক র্অথ আছে, প্রতিটি বাক্যের গঠন একটা ব্যাকরণের নিয়ম মেনে চলে, সে সব নিয়ম আমাদের বোধের অন্তর্গত না হলে বা অভ্যাসের সঙ্গে মিশে না গেলে আমরা সে ভাষা বুঝতে পারি না। বিজ্ঞান, অঙ্ক, দর্শনের ক্ষেত্রেও এই কথ্যভাষার প্রয়োজন তো আছেই, সেই সঙ্গে জানতে হয় যুক্তি শাস্ত্রেরও নিয়মগুলি।

কিস্তু রঙ আর সুরের ভাষা ঠিক সে রকম নয়। একেকটা রঙ বা একেকটা সুর যে আমাদের মনে একেক রকম ভাবের সঞ্চার করে তাকে যদি ভাষা বলি, তবে সে ভাষা আভিধানিক নয়, বরং প্রত্যক্ষের। এ ভাষায় ভাবের সঞ্চার কোনে শব্দের বা বাক্যের মাধ্যমে হয় না। হয় প্রত্যক্ষ সংযোগের দ্বারা।

সুর এবং রঙ—সংগীতের সঙ্গে যদিও এ দুইয়েরই যোগাযোগ অতি নিবিড়, তবু প্রথমে আমরা সুরের কথা দিয়েই শুরু করব। কোন সুরের কি নাম, কোনটা সা কোনটাই বা পা—এসব আলোচনায় আমরা যাবো না। নাম না জেনেও সুর দিব্যি চেনা যায়। প্রতি বছর বসন্ত কালে গাছের ডালে ডালে যে কোকিল ডেকে ওঠে, সে কি সারেগামা সাধে? তবু তাকে কি কখনো বিসুরো গাইতে শুনেছেন? তার চেয়ে নির্ভুল সুরে কি গাইতে পারে? আসলে সুরটা যার ভেতরেই আছে, তার সাধনার বা আলাদা ভাবে সুর চিনবার দরকার হয় না। আমাদেরও না; কারণ আমরা সবাই সুরকে চিনি এবং প্রায় নিশ্চিতভাবেই চিনি—না হলে গান আমাদের প্রায় সবারই ভাল লাগে কেন?  লোকগীতি,  রবীন্দ্রসংগীত, অতুলপ্রসাদী, নজরুলগীতি—এসব গান কি আমরা ভালবাসি না। হয়তো কেউ কেউ ছায়াছবির গানেরও ভক্ত, কেউ বা আধুনিক গানের। সুরের সঙ্গে আত্মিক যোগ না ঘটলে সেটা কিভাবে সম্ভব? অতএব, কোকিলের মতোই সত্যিই আমরাও সুর চিনি!

প্রশ্ন হলো, তাহলে শাস্ত্রীয় সংগীত আমাদের ভাল লাগে না কেন? এ প্রশ্নের উত্তর আগেও দিয়েছি, আবারও বলছি, তার একমাত্র কারণ আমরা শাস্ত্রীয় সংগীতকে বুঝতে চাই। আস্বাদন করতে চাই না। শাস্ত্রীয় সংগীতের অর্থ বুঝতে চাই, তার প্রতি মুগ্ধ হতে চাই না। অথচ সেটাই ছিল স্বাভাবিক আর সেই জন্যই সহজ। আমরা আসলে প্রায় সবাই শাস্ত্রীয় সংগীতে মুগ্ধ হয়েই আছি, কারণ আমরা সংগীতের মুগ্ধ শ্রোতা। আমরা যেসব গান শুনি, তার অধিকাংশই রাগ সংগীত, তাই বহু বহু রাগই আমাদের কাছে পরিচিত এবং সে সব রাগের প্রতি আমরা অনুরক্ত। শাস্ত্রীয় সংগীতে রাগের সংখ্যা কত তা নিশ্চিত ভাবে বলা না গেলেও, প্রচলিত রাগগুলির সংখ্যা একশোর কাছাকাছি হবে, একথা নিশ্চিত বলা যায়; কিন্তু তাকে নিশ্চিত হবার কোনো কারণ ঘটেনি, যেহেতু এরও সবগুলো প্রায় কেউই চেনে না। অন্তত প্রাথমিক শ্রোতার পক্ষে এর প্রয়োজনও নেই। প্রথমে আমরা সংখ্যাটা অনায়াসেই অর্ধেক করে ফেলতে পারি, কিংবা ইচ্ছে হলে আরো কম। আসলে, সেটা আগে থেকে ঠিক করার কোনো প্রয়োজন নেই; কারণ, রাগ চিনতে হবে একটা একটা করে এবং মনে হয়, সমস্ত রাগের মধ্যে সব চাইতে জনপ্রিয় সেই রাগটিকেই প্রথমে বেছে নেওয়া ভাল। নিঃসন্দেহে সে রাগটি হল ভৈরবী, যা নিসন্দেহেই আমাদের প্রায় সবার কাছেই অত্যন্ত চেনা। বিশ্বাস হলো না? বেশ। মিলিয়ে নিন।

আমি এরকম অজস্র গানের কথা বলতে পারি, যা আপনাদের সবার কাছেই খুবই চেনা এবং সেগুলি প্রত্যেকটাই ভৈরবী রাগাশ্রিত। কিন্তু আমি প্রথমেই যে গানটির সঙ্গে নতুন করে আবার পরিচয় করিয়ে দেবো, সেটি একটি রবীন্দ্রসংগীত। গানটি হলো, ‘সকরুণ বেণু বাজায়ে কে যায়’...। গানটি ভৈরবী রাগাশ্রিত শুধু এই কথাটা মনে রাখলেই, ভৈরবী রাগটি চিনতে আপনার কোনো সমস্যা হবে না। গানটি খুব মন দিয়ে কয়েকবার শুনুন এবং মনে রাখার চেষ্ঠা করুন। শুধু এর সুর নয়, গানটির বাণীর মধ্যে এর সুরের পরিচয় আছে, আছে ভৈরবীর ভাব—রূপ বর্ণনা। বিশেষত এই দুটি পঙক্তি মনে গেঁথে নিন—

‘তাই শুনে আজি বিজন প্রবাসে হৃদয় মাঝে

শরৎ শিশিরে ভিজে ভৈরবী নীরবে বাজে।’

অর্থাৎ সুরটা যে ভৈরবীরই সুর, তা মনে গেথেঁই দেওয়া হলো।... এবং শুধু তাই নয়, ভৈরবী—‘শরৎ শিশিরে ভিজে’। অর্থাৎ রোদ ঝলমলে একটি সকালের ছবিই হল ভৈরবীর ছবি।

হ্যাঁ, ভৈরবী রাগটি শাস্ত্রমতেও সকালেরই রাগ হিসাবে চিহিৃত। সকাল, কিন্তু ভোর নয়। সূর্যের উজ্জ্বল, সাদা আলোয় চারিদিক উদ্ভাসিত হয়েছে কিন্তু রোদ তখনো প্রখর হয়ে ওঠেনি—এই হলো ভৈরবীর রূপ। কিন্তু তবু এটাই তার একমাত্র রূপ নয়। যে যেমন একটি আনন্দালোকিত সকালের রূপকেও প্রকাশ করে, তেমনি তার আরেক রূপে প্রকাশিত হয় হৃদয় বিদারক বিষণ্নতার ছবি। মনে করুন, আরেকটি রবীন্দ্রসংগীত....

‘সকাল বেলার আলোয় বাজে বিদায়ব্যথার ভৈরবী—

আন্ বাঁশি তোর, আয় কবি।’

এই গানটিত প্রথম পঙক্তিতেই রাগের পরিচয় দেওয়া হয়েছে এবং তার সময়টা যে সকাল, তারও উল্লেখ করা হয়েছে স্পষ্টভাবেই। এর পরের পঙক্তিতে পাচ্ছি—

‘শিশির শিহর শরতপ্রাতে শিউলি ফুলে গন্ধ সাথে

গান রেখে যাস আকুল হাওয়ায়, নাই যদি রোস নাই রবি'

অর্থাৎ, ভৈরবীর সময়টা যে শরতের সকাল, তাও বলে দেওয়া হলো। কিন্তু সেই সঙ্গে একটা বিষণ্ন সম্ভাবনার ছোঁয়াও যেন লেগে রইল কয়েকটি মাত্র কথায়

‘গান গেয়ে যাস আকুল হাওয়ায়, নাই যদি রোস্ নাই রবি।’

বেদনার এই ছোঁয়াটুকুও একান্তভাবেই ভৈরবীর। বাণী যদি নাও থাকে, তবু শুধুমাত্র ভৈরবীর সুরেই ওই শরৎ সকালের আনন্দ আর বিচ্ছেদ বেদনার মেশামেশি প্রত্যক্ষ হয়। প্রমাণ? শুধু একবার গানের বাণী ভুলে সুরটা একটু গুনগুন করুন না। ঠিক প্রমাণ পাবেন।

যাই হোক, এই দুটো গান থেকেই শুরু করা যায় অনায়াসেই। এই সুর দুটোই মনে বসে গেলে, আপনি নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পারবেন, সার্থক জনম আমার—গানটিও ভৈরবী। বুঝতে পারবেন,  কথা কসনে লো রাই, মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সমান, অন্ধজনে দেই আলো, অমল ধবল জালে লেগেছে, আমাদের যাত্রা হলো শুরু, ঝরা পাতা গো আমি তোমারি দলে... এমনি অজস্র গান খুঁজে পাবেন, যাদের আপনি ভৈরবী হিসেবে চিহিৃত করতে পারবেন। কিন্তু শুধু রবীন্দ্রসংগীত নয়। অতুলপ্রসাদী, রজনীকান্তের গান, নজরুল গীতি—সবেতেই পাবেন ভৈরবীকে। আপনি কি চিনতে পারছেন, ‘মোর না মিটিতে আশা’ গানটিও ভৈরবীতে আধারিত এবং এখানেও ভৈরবীর সেই হৃদয় বিদারক রূপটিকেই খুঁজে পাচ্ছি। এই অনুষঙ্গে আমার মনে পড়ছে, ভৈরবী রাগের সম্ভবত সব চাইতে বিখ্যাত গানটির কথা। সেই অবিস্মরণীয় ঠুংরি গানটি হলো,  ‘বাজুবন্দ খুলু খুলু যায়’। কত মহৎ শিল্পীর কণ্ঠে এই একই বাণীতে ভৈরবীর কত রূপ যে প্রকাশিত হয়েছে, তা বলে শেষ করা যায় না। তাদের মধ্যে আমি শুধু দু’জনের গানের কথা বলব। গান মানে গানের রেকর্ড বা সিডি। দুজন শিল্পী হলেন ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ এবং ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁ। দুজনের গানে একই বাণীতে ভৈরবীর দুটি রূপ দেখতে পাবেন। এ গান দুটি অবশ্যই শোনা চাই।

কিন্তু ভৈরবীর যে আনন্দময় রূপটি এই গানে নেই, থাকা সম্ভবও নয়। কারণ, গানটির ভাব বিরহের। তবু তারও মধ্যেই পার্থক্য । তবে ভৈরবীর সেই উজ্জ্বল রূপটি খুঁজে পাবেন অতুলপ্রসাদের একটি গানে। গানটি হলো, ‘শোনো,  সে ডাকে আমারে/বিনা সে সখারে/রহিতে মর নারে’। এ গানটিও আপনার অনেক চেনা। এ সুরও, এতক্ষণে নিশ্চয়ই চিনতে পারছেন, ভৈরবী। ভৈরবী ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এ তারই সেই উজ্জ্বল রূপ। তবে হুবহু এরই শাস্ত্রীয় রূপ হলো সেই বিখ্যাত ঝাঁপতালে নিবদ্ধ ধ্রুপদ (সাদরা) গানটি। গানটি হয়তো শুনে থাকবেন—‘ভবানী দয়ানী মহাবাকবাণী।’ এই গানের একটি অনবদ্য রেকর্ড আছে পারভিন সুলতানার কণ্ঠে। প্রসঙ্গত বলি, এই সাদরা গানটিও বহুপ্রাচীন এবং এই গানটি ভেঙেই অতুলপ্রসাদী গানটির সৃষ্টি।...

আরও একটি গান বিশুদ্ধ ভৈরবী রাগে লোকগীতি। গানটি হলো, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসার।’ শুধু এই গানটির সুরও যদি মনে রাখেন, তবে ভৈরবী চিনতে কোনোই সমস্যা হবে না।

আসলে, শুধু ভৈরবীই নয় অনেক রাগই আপনি চেনেন, কিন্তু তাদের নামই জানেন না। অনেক গানের কথাই বললাম, তার যেকোনো একটার নাম দিন ভৈরবী।

//জেডএস//

x