ফিলিপ মণ্ডল সম্পর্কে যে কথাগুলো আমাদের জানা দরকার

অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায় ১৫:৪৪ , জুন ২৪ , ২০১৮

সুইসাইডের জন্য কিনে আনা নাইলনের দড়িতে না ঝুলে, পরদিন সকালে তা টাঙিয়ে তাতে ভেজা জামাকাপড় মেলার কথা ছিল তার। কুকুর যেমন বারবার তার বমির কাছে ফিরে যায়; ফিরে গিয়ে দ্যাখে, তাতে ক্রমশ নতুন নতুন পোকা, আর প্রতিবারই তার ফলে নিজের বমিকে সে চিনতে পারে না; না পারারই কথা; তাই আবার ফিরে যায়, হ্যাঁ, বমির কাছেই। সেইভাবে, এটা উপমা নয়, ঠিক সেইভাবেই তেশিমলা গ্রামের হায় হায় পাথারের ফিলিপ মণ্ডল বারবার নাইলনের দড়ি কিনে আনে, ভেজা জামাকাপড় মেলবে বলেই, আর ঝুলে পড়ে। অর্থাৎ এই জন্ম এক বমি। ওই মৃত্যু, বমি। এই ঝুলে পড়া, এক বমি। সেই হেতু প্রতিবারই ফিলিপের মৃত্যু, এক বমি বই অন্য কিছু নয়। মৃত্যুর পরেও সে কীভাবে আবার ফিরে আসে, সেটা এ গল্পের বিষয় নয়। কিন্তু ফিরে আসা, এক বমি। উল্লেখ এই যে, কুকুর যেমন বারবার তার বমির কাছেই ফিরে আসে, যা আগেই বলা হয়েছে। ফলত এ বোধগম্য, অন্তত বোধগম্য বলে এ সময়ে কিছু ধরে নেওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এ বোধগম্য যে, ফিলিপের প্রতিবার মৃত্যুর পর ঠিক ততোবার ফিরে আসা এবং প্রতিবারই ভেজা জামাকাপড় মেলার জন্য নাইলনের দড়ি কিনে আনা এবং তা না করে শেষতক ঝুলে পড়া, যুগপৎ কুকুরের নিজের বমির কাছেই ফিরে আসার সমতুল নয়, তা এক্কেবারে বমির কাছে কুত্তার ফিরে আসা। তাই আরেকবার সে বমির কাছে ফিরতে নয়, বরং বমিকে নিজের কাছে ফেরাতে প্রবল উদ্যমী হয়। সেই উদ্দেশে জীবনে আরও একটিবার সে নাইলনের দড়ি কেনে, ভেজা জামাকাপড় মেলার জন্য, সুইসাইডের জন্য নয়। বেড়ার খাঁজে রাখা থাকে দড়ি। যার প্রতি সে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে নিজেকে এই বলে যে, কাল সকালে এই দড়ি সে ছিলা টানটান করে টাঙাবে। জীবন মৃত্যুর এ মাথা ও মাথা বরাবর ধনুকের গুণ পরাবার মতো বাঁধা যাবে তাকে, কাল সকালে। যার ওপর দিয়ে পাশাপাশি দুটো পিঁপড়ের যাওয়া সম্ভব নয়। যেতে হবে একা। পিঁপড়ের মতোই, এ জীবন, তাকেই মরা শিকারের মতো মুখে নিয়ে। পিঁপড়ে, জীবন। পিঁপড়ের মুখে খাদ্য, সেও জীবন। সেই পিঁপড়ের হেঁটে যাওয়ার মহাসড়ক যোজনা নেবে সে কাল। অর্থাৎ, দড়িটা টাঙাবে। জীবনে একবার। গলায় নীলচে কালো দাগ হয়ে যাওয়া এতোবারের ফাঁস চিহ্ন;  ফাঁসুড়ে ও ফাঁসির দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপেক্ষারত কয়েদি যেখানে পরস্পর মোলাকাত করে একই দেহে, একজন বয়ে বেড়ায় আরেকজনকে; সেই ফাঁস চিহ্ন জুড়ে জুড়ে, গিঁট পাকিয়ে পাকিয়ে, কত লম্বা হবে? এই নাইলনের দড়িটার পাশে ওই দাগের দড়িটাকে টাঙানো যেতে পারে। তবে তা কাল। কাল সকালে। সকালে উঠে ফিলিপ বোঝে, এই ঘরেই রাখা আগের দড়িগুলো, যেগুলো তার বহু শেষ শ্বাসকে ধরে শুয়ে আছে চুপ, তাদের প্রত্যেকের কাছে গচ্ছিত আছে ফিলিপের একেকটা জীবন। পুরনো ওই দড়িগুলোর থেকে যেকোনও একটা দড়ি নিয়ে আরেকবার গলায় পরে নিলে, সে দড়ি আর ফিলিপের পুরনো শ্বাসকে পাবে না। একই শ্বাস দুবার পায় না দড়ি। যদি এ দড়ি না হয়ে ব্লেড হত, যদি হত আগুন, তবে, একই রক্ত দুবার পায় না ব্লেড। একই মাংস ও মেদ দুবার খায় না আগুন। পুরনো দড়িগুলোর কাছে তার জীবনগুলো গচ্ছিত রয়েছে যদি, তবে মৃত্যু গচ্ছিত কোন দড়িতে?

তেশিমলা গ্রামের হায় হায় পাথারের ফিলিপ মণ্ডল দড়ি হাতে বসে থাকে। কুমলাই ডাকে ঘরের উঠোনে। কুমলাই ডাকে দরজায়। কুমলাই যার নাম, নদী তার পদবি। হায় হায় পাথারে কুমলাই হায় হায় করে। দড়ির কোন মাথায় জীবন আর কোন মাথায় মৃত্যু অর্ধ সাক্ষর কিন্তু পূর্ণত নিরক্ষর ফিলিপ বোঝে না। তার আধার কার্ডের নম্বরগুলোর যোগফলের সমান সংখ্যক দড়ি জমে আছে এ ঘরে। ফিলিপ মণ্ডল কতবার মরেছে আধার কার্ডের যোগফল জানে। সরকার চিরকালই খুব বাহাদুর, তাই সে-ও জানে। তবে আজ যদি ফিলিপ এ দড়ি আবার বেঁধে নেয় গলায়, তার নথি তো রইবে না আধারে। মৃত্যু তার আঁধারে হবে। আধার পাবে না। রেকর্ড থাকবে, ফিলিপ মণ্ডল মারা যায়নি। পূর্ণত নিরক্ষর কিন্তু অর্ধ সাক্ষর ফিলিপ এসব পূর্ণ বোঝে। তাই মরলে তো হবে না এবেলা। বেইমানি হয়ে যাবে বড় সরকার বাবার কাছে। সরকার বাবার কাছে রেকর্ড আছে ফিলিপ তার আধার নম্বরের যোগফলের সমানবার মরেছে। এর চেয়ে আর একবার বেশি মরলে ঠিক কাজ হবে না। ফিলিপ তাই মরবে না বলেই ঠিক করে। দড়িটা টাঙায়। যদিও জানে না, সে দড়ির কোন প্রান্তে জীবন আর কোন প্রান্তে মৃত্যু। তবু টাঙায়। কোন দিক থেকে হাওয়া এসে পতাকা ওড়াবে তা না জেনেই সেপাই পতাকা টাঙায়। হায় হায় পাথারের ফিলিপও তা-ই করে। কুমলাই বড় ক্ষেপে যাবে ফিলিপ সরকার বাবার সঙ্গে বেইমানি করলে। সরকার বাবা বলেছে, ভোট পূজা গেলে কুমলাইয়ের জন্য একটা  বিরিজ করে দেবে। বড়লোকের বিবির গলায় যেমন নেকলেস। কুমলাইয়ের গলায় দুলবে বিরিজ। সরকার বাবা জানে, ফিলিপ কুমলাইয়ের বড় নিকট। এখন ফিলিপ যদি আধার রেকর্ড মিথ্যা করে আরেকবার মরে যায়, সরকার বাবা কি আর কুমলাইকে বিরিজ বানিয়ে দেবে? ফিলিপ তাই দড়িটা টাঙায়। জীবনের দিকে হাঁটবে বলে মৃত্যুর প্রান্ত থেকে হাঁটা শুরু করবে সে, ভাবে। হায় ফিলিপ। হায় হায় পাথারের হায় ফিলিপ। সে জানতোও না, দড়ির যে প্রান্তকে সে মৃত্যু ভেবেছে, আসলে সেখানে বুকের আঁচল খুলে শুয়ে আছে জীবন। জীবনের দিকে হাঁটছে ভেবে সে গুঁড়ি মেরে থাকা মৃত্যুর দিকে হাঁটে। যত হাঁটে, ভাবে, ওই তো দেখা যায় দড়ির প্রান্ত। জীবন। হায় ফিলিপ। ফাঁসির দড়িকে পায়ের নিচে রেখে কী আনন্দই না সে পাচ্ছিল, তখন, মৃত্যুর নিখুঁততম আগে। প্রান্তের ঠিক মুখে এসে, সে, দু হাত বুকের কাছে জড়ো করে, নিকটবর্তী প্রান্তকে বলে, নমো। দড়ির প্রান্ত খুশি হয়ে মুখ ব্যাদান করে। ফিলিপ ঢুকে যায়।

ফুরায় এ জীবনের সব আঁধার।

 

 

//জেডএস//

x