৮০ তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রাতিস্বিক হায়াৎ মামুদ

তুষার প্রসূন ১৩:৫৬ , জুলাই ০২ , ২০১৮

হায়াৎ মামুদএইতো ২০১৫ সালের এক ঢিলেঢালা বিকেলে অফিসের কাজে ব্যস্ত রয়েছি। হঠাৎ জানতে পেলাম হায়াৎ মামুদ স্যার আসছেন আমাদের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘পুথিনিলয়’-এ, যেখানে আমি সৃজনশীল বিভাগে কর্মরত। পুথিনিলয়ে তিনি বাংলা বিভাগের সম্পাদনা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দিক-নির্দেশনা দেবেন। মনের মধ্যে একটা আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। এমন একজন বিজ্ঞ মানুষের সাথে কাজ করা সৌভাগ্যের ব্যাপার। স্যারের লেখা পড়ি, নাম জানি কিন্তু সরাসরি দেখিনি। ছবি দেখেছি বিভিন্ন বইয়ে। অবশ্য তখন মনে হয়েছিল এমন কোট-টাই পরা ভদ্রলোক রাশভারী হবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না। স্যার আসলেন অফিসের একঘেয়ে নীরবতা ভেদ করে একগাল হাসি দিয়ে, হাত নাড়িয়ে, করমর্দন করে সবার সাথে একাত্ম হয়ে গেলেন মুহূর্তেই। সেদিন থেকে হায়াৎ স্যার আমার কাছে সরলতার প্রতিমূর্তি।

অনুমান করি, হায়াৎ স্যারের ‘বাংলা বানানের নিয়মকানুন’ ঢাকা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বাদ পড়েনি আমার ঘরও। উল্লেখ্য যে, তাঁর এই বইটির সর্বাধিক সংস্করণ হয়েছে। নব্বই দশকের কথায় আসি। তখন বইমেলায় এসেছে স্যারের ‘নষ্ট বঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্রের প্রব্রজ্যা’ প্রবন্ধের বইটি। জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যে ঠাসা প্রবন্ধের এই বইটি পড়ে আঁচ করতে পেরেছিলাম পাণ্ডিত্য। তাঁর সাথে আলাপের পর পেয়েছি অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। স্যারকে জানা যায় একজন বৈয়াকরণ-গবেষক-বুদ্ধিজীবী হিসেবে। কিন্তু তিনি একাধারে লিখেছেন কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণাগ্রন্থ। সম্পাদনা ও অনুবাদ করেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বই। শিশুদের জন্য তাঁর লেখা বই বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গল্প উপন্যাস যে তাঁর দ্বারা হবে না তা তিনি লেখক জীবনের শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন। তবে কবিতার বই সর্বসাকুল্যে তিনটি লেখার পর সম্পূর্ণ ডুব দেন সাহিত্যের অন্যান্য শাখায়। প্রবন্ধ ও গবেষণার পাশাপাশি নিপুণ হাতে অনুবাদ করে সমৃদ্ধ করেছেন অনুবাদ সাহিত্য। সাহিত্যে তাঁর মতো প্রাণবন্ত ও ঝরঝরে গদ্য-শৈলী বেশ কম।

হায়াৎ স্যারের সাথে যারা মিশেছেন তারা সবাই জানেন যে তাঁর কাছে গেলেই তিনি সবাইকে বন্ধু বানিয়ে নেন। ফলে তাঁর সাথে চলতে গিয়ে পেয়েছি তাঁর জ্ঞানভাণ্ডরের অনেক রত্ম। তিনি যা বোঝানোর তা বুঝিয়ে দেন যুক্তি সহযোগে, সেখানে কোনো দায়সারা ভাব নেই। তাঁর মতে সফলতার হাত ধরতে হলে লেখাপড়ার কোনো বিকল্প নেই। স্যারের ব্যক্তিজীবন বেশ রবীন্দ্রপ্রভাবিত, ফলে তাঁর জীবন পুরোটাই বাঙালিয়ানায় পূর্ণ। কানাডা, রাশিয়া, আমেরিকাসহ বেশ কয়েকটি দেশে তিনি ঘুরেছেন, থেকেছেন, চাকরি করেছেন কিন্তু বাবুয়ানায় তাঁকে কখনো পেয়ে বসেনি। একদিন তাঁর সাথে রিকশায় যাচ্ছি, বললেন, ‘আমার এই পুরান ঢাকা বিশেষ করে গেণ্ডারিয়া ছেড়ে কোথাও বেশিদিন থাকতে ভালো লাগে না।’

দুই বাংলায় সমান পাঠকপ্রিয় এই মানুষের বন্ধু তালিকার কলেবর ঈর্ষণীয় সন্দেহ নেই। চলার পথে তিনি বন্ধু হিসেবে পেয়েছেন- জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, পূরবী বসু, হাসান আজিজুল হক, শামসুজ্জামান খান, দ্বিজেন শর্মা, অরুণ সোম, ননী ভৌমিকসহ অনেক গুণীজন যাঁদের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব অর্ধশতাব্দীরও বেশি। তাঁর অনেক ছাত্র, সহকর্মী, বন্ধু ও স্বজনের সাথে কথা হয়েছে কিন্তু কখনো কোনো অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে শোনা যায়নি। কেবলমাত্র স্যারের পুত্র সৌম্য মামুদের কাছে শুনেছি যে ডাক্তাররা তার চিকিৎসা করতে এসে বিব্রত হন, কেননা ডাক্তারের দেওয়া ব্যবস্থাপত্র তিনি থোড়াই কেয়ার করেন না। স্যারের মতে, নিয়ম মানতে গেলেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

হায়াৎ স্যার রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। তার পাশাপাশি তিনি ভেবেছেন আরও যাদের নিয়ে কাজ করলে বাঙালি জাতির জন্য কিছু করা হবে। তাদের কয়েকজনকে তুলে ধরেছেন তাঁর কলমে। যেমন: লালন সাঁই, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আবুজাফর শামসুদ্দীন, সিকান্দার আবু জাফর, সোমেন চন্দ প্রমূখ লেখকের জীবনী বা সম্পাদিত গ্রন্থ তারই পরিচয় বহন করে। অন্যদিকে, বিদেশি সাহিত্য বাঙালি পাঠকের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানও অনস্বীকার্য। বিশেষ করে রুশ সাহিত্য। দীর্ঘদিন রাশিয়ার প্রগতি প্রকাশনে কাজ করার সুবাদে রুশভাষা আয়ত্ত করে ম্যাক্সিম গোর্কি, তলস্তোয়, গেরাসিম স্তেপানভিচ্ লিয়েবেদেফসহ অনেক লেখকের বইয়ের অনুবাদ তিনি করেছেন। আনন্দের বিষয় যে, রুশ থেকে বাংলা অনুবাদের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে ঢাকাস্থ রুশ দুতাবাস থেকে পেয়েছেন পুশকিন পুরস্কার।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি তথা বাঙালি জাতিসত্তার সাথে একাত্ম হয়ে তিনি কাজ করেছেন। তাঁর লেখা গ্রন্থ অমর একুশে, কিশোর বাংলা অভিধান, বাঙালির বাংলা ভাষা ইদানীং, বাংলাদেশে মাতৃভাষার অধিকার, বাঙালি বলিয়া লজ্জা নাই ইত্যাদি। হায়াৎ স্যার শুধু লিখেই চুপ থাকেননি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং পরবর্তীকালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তিনি ছিলেন সোচ্চার। হায়াৎ স্যারের সম্পাদিত গ্রন্থ যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি চাই তাঁর আপোষহীন মনোভাবেরই প্রমাণ। এমনকি ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর লিখেছেন বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা। এসকল কথার অবতারণা করছি একারণে যে, অনেকেই তো তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক দিক নিয়েই কথা বলেছেন। কিন্তু সে সবের মাঝে তাঁর আপোষহীন মনোভাবের কথা চাপা পড়ে গেছে।

এসবতো গেল তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ জীবনের বিক্ষিপ্ত আলোচনা। তার লেখক জীবনের সব লেখা যদি বাদও দিই তাহলেও অনেক পৃষ্ঠা লেখা যাবে তাঁর ব্যক্তিজীবন নিয়ে। স্যারের কাছে তাঁর বাড়ির কাজে সহযোগিতা করা মেয়েটি তাঁর ‘মা’ ডাক থেকে বঞ্চিত হয় না। তার বাড়ির দ্বাররক্ষী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কোনো অতিথি পর্যন্ত তাঁর একই রকম ব্যবহার পেয়ে থাকেন। জীবনে চলার পথে মানুষের মুখ আর মুখোশ দুইটা থাকতে নেই স্যার তা সুনিপুণভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। সদানন্দ জীবনযাপনে অভ্যস্ত স্যারকে ‘কেমন আছেন?’ জানতে চাইলে মিষ্টি হাসি দিয়ে তাঁর একটাই সোজা উত্তর ‘আমি সবসময় ভালো থাকি, তুমি কেমন আছো গো?’ এমন আন্তরিক ভাবপ্রবণ মানুষের বাড়ির চৌকাঠ না পেরিয়ে পারা যায় না।

একদিন হায়াৎ স্যারের বাসায় গেলাম। তার সহধর্মিণী থেকে শুরু করে সকলের ব্যবহারে সন্তুষ্টি না নিয়ে ফেরাই যায় না। ওপর তলায় স্যারের লাইব্রেরি ভরা বই। তিনি বছরের পর বছর ধরে এক এক করে বই সংগ্রহ করে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তুলেছেন। বইগুলো দেখে মন ভরে যায়। স্যারের ভাষায়, ‘বই ঘরে রাখতে হবে, বিশেষ কারও পড়ার কথা ভেবে নয়, বই ঘরে থাকলে একদিন না একদিন এই বই কেউ না কেউ পড়বেই।’ হায়াৎ স্যার আজও কোনো ভালো বইয়ের সন্ধান পেলে পকেট থেকে টাকা বের করে দেন অথবা সংশ্লিষ্টজনকে ফোন করে দেন বইটি সংগ্রহে রাখার জন্য। তার ব্যক্তিগত ডিকশনারিতে ‘অহংকার’ শব্দটি নেই। ফলে বাড়িতে কিংবা বাইরে কারও সাথে বিবাদ হয়েছে বলে জানা যায় না। যে কেউ যেকোনো সময় তাঁকে ফোন করতে পারে, জানতে চাইতে পারে বাংলা বানান সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে, সে ব্যাপারে স্যারের কোনো ক্লান্তি নেই। তিনি জীবন্ত ডিকশনারি বলে মুহূর্তে মিলে যায় উত্তর। তাঁর সাথে কথা বলে আত্মতৃপ্তি লাভ করেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

কখন কবে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি করেছেন, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন, কী কী রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন এসব নিয়ে তাঁর কোনো মাথাব্যাথা নেই। তিনি যদি কখনো কারও কাছে শোনেন যে তাঁর অমুক বইটি কয়েক কপি বিক্রি হয়েছে, তিনি অকুণ্ঠিত উত্তর দেন, ‘আমার বই তাহলে মানুষ পড়ে?’ মনে মনে ভাবি আপনার বই যদি মানুষ না-ই পড়বে তাহলে এত এত প্রকাশনী কেন আপনার কাছে আসে পাণ্ডুলিপি নিতে! স্যারের বইয়ের সংখ্যা একশ ছাড়িয়ে গেছে কিন্তু স্যারের এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। তবে তিনি তো মানুষ, নিশ্চয়ই ভাবেন, তাহলে কী নিয়ে ভাবেন? উত্তর পেয়েছি, স্যার ভাবেন ভালো মানুষ হওয়ার কথা। স্যার মনে করেন, সমস্যা সেটা ব্যক্তিজীবনে হোক বা রাষ্ট্রীয় হোক প্রতিবাদ করতে হবে। তাই বলে একটি সুন্দর আদর্শিক জীবনযাপন করা থেকে কখনো বিচ্যুত হওয়া যাবে না।

জুলাই মাস এসে গেল। এই মাসের ২ তারিখে হায়াৎ স্যার (জন্ম; ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ) ৮০ বছরে পা রাখবেন- এমন মানবজন্ম সত্যিই সাধনার ফসল। বর্তমান ভূলুণ্ঠিত মানবতার ঘুণেধরা সময়ে আশা করি তরুণ সমাজ যেন হায়াৎ স্যারের মতো সত্যিকারের মানুষরূপে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে। শুভ জন্মদিনে স্যারকে প্রণতি জানাই। বিশ্বাস রাখি, শতায়ু হওয়া আপনার মতো মানুষের পক্ষেই সম্ভব।

 

//জেডএস//

x