আউটসাইডার ।। অর্থহীনতা বনাম শূন্যতা

জাহেদ সরওয়ার ০৭:০০ , জুলাই ০৬ , ২০১৮


আলবেয়ার কামুর ‘আউটসাইডার’কে উপন্যাস হিসাবে পড়লে ভুল বোঝাবুঝির প্রচুর সুযোগ আছে। এটা উপন্যাসের চেয়েও বেশি কিছু ধারণ করে। আউটসাইডারের কোন উপাদান একজন পাঠককে আবিষ্ট করে রাখে এমন প্রশ্নের জবাব হতে পারে তার ভাষার সুর। সেটা প্রথম লাইন থেকেই শুরু হতে পারে। আউটসাইডারের প্রথম লাইনই অবশ করার মতো, হতবুদ্ধি হওয়ার মতো। যে কোনো বিষয়ে এই জগতে মা সম্পর্কিত মন্তব্য করতে গেলে মানুষের আরও বেশি সচেতনতার পরিচয় দেওয়াই সামাজিকতা। এই একটি ব্যাপারে কোনো তর্ক চলে না যেন। বিশ্বাসীদের ঈশ্বর-বিশ্বাসের মতোই মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস। কারণ মা-ই হয়তবা মানুষের অস্তিত্বের কারিগর। সেই সূত্রেই প্রথম আঘাতটি করেন আলবেয়ার কামু। ‘মা আজ মারা গেছে। কিংবা, হয়ত, গতকাল। আমি ঠিক বলতে পারছি না। বৃদ্ধাবাস থেকে আসা টেলিগ্রামটায় বলা আছে ‘তোমার মা মারা গেছে। আগামীকাল সৎকার করা হবে। গভীর সহানুভূতি।’

বইটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে কেঁপে উঠেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ। জাঁ পল সার্ত্র বলেছিলেন, মঁসিয়ে কামুর আউটসাইডার ছাপাখানার বাইরে আসতে না আসতেই বিপুল আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে। সকলে বলতে লাগল ‘যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে এইটাই শ্রেষ্ট বই’। সমসাময়িক সাহিত্যসৃষ্টির নামে উপন্যাসটি নিজেই একটি আউসটাইডার।’

এটা যেন মানুষের স্বভাবজাত যে যুদ্ধ, বিগ্রহ, নিষ্ঠুরতা ও প্রতারণাময় পণ্যসমাজের অন্তঃসারশূন্যতাকে চ্যালেঞ্জ। মানুষের অভিজ্ঞতা জগতে কম হল না। যে মানুষ নিজের মাকে শ্রদ্ধা করে সে কি যুদ্ধের নামে অন্যের মাকে হত্যা করছে না? যে মানুষ নিজের ধর্মের জন্য জীবন ত্যাগ করতে পারে সে কি অন্যের ধর্মকে ধুলিসাৎ করা চেষ্টা করছে না? যে মানুষ নিজে উপোস থাকলে কষ্ট জর্জরিত হয় সে একই মানুষের কারণে কি শত শত মানুষ উপোস থাকছে না? তাহলে কিসের মূল্যবোধের অহংকার মানুষের? মানুষের সব মূল্যবোধই মূলত স্বার্থপরতার নামান্তর। মেকি বাস্তবতা। সুতরাং সে সমাজের তথাকথিত মূল্যবোধকেই এবার সমূলে উৎপাটন করা যাক।

আউটসাইডারের নায়ক মারশোলের স্বগতোক্তি থেকেই আমরা ধরে নিতে পারি। এই নায়ক অপরাপর উপন্যাসের নায়কের মতো নয়। এ এক নতুন নায়ক। যিনি ইতমধ্যে সভ্যতার বিষ খেয়ে নীল হয়ে গেছেন। তার কাছে জীবনই অর্থহীন। মনে রাখতে হবে মারশোল বুর্জোয়াদের ঈশ্বরেও বিশ্বাস করেন না। তিনি স্পষ্টতই নাস্তিক। মানুষ জন্মগতভাবে নাস্তিক হয় না। নাস্তিকতার পিছনে তার অনেক অভিজ্ঞতা ও জানশোনার ব্যাপার আছে। একজন নাস্তিক একজন দার্শনিকও প্রায়। নাস্তিকতা কোনো ফ্যাশন নয়।

এইযে অন্যান্য প্রাণিদের মতোই মানুষও একসময় জন্ম নিচ্ছে, বড় হচ্ছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে ,জন্ম দিচ্ছে আবার একটা সময়ে মরেও যাচ্ছে। ধর্মীয় কুসংস্কার বা অন্যন্যা অপবিশ্বাস বাদ দিলে আসলে এই জীবনে কি মানে? মানুষের পায়ের তলায় পিষ্ট হওয়া একটা পিঁপড়ের অধিক মূল্যবান নয় মানুষের জীবন। এই যে জীবনের নিরর্থকতা এখান থেকে নায়ক মারশোলের যাত্রা শুরু। কামুর নায়ক মারশোল এক আরবকে খুন করে। একটা গুলি করার পর একটু থেমে সে সেই আহতকেই পরপর আরও চারটে গুলি করে নিস্তেজ শরীরে। এ নিয়েই তখন সরব হয়েছিল দুনিয়ার সমালোচক মহল। এর আগে ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্টে দস্তইয়েভস্কির নায়ক রাসকলনিকভও হত্যা করেছিলেন সুদখোর বুড়ি ও তার বোনকে।

কিন্তু ছুরি হাতে সেই আরব কি খুন করতে পারতো না মারশোলকে? মারশোল একটা ঘটনায় অচেতনভাবেই জড়িয়ে গিয়েছিল। হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না আফগানিস্তানের জনগণের কী দোষ? দোষ ছিল তালেবানের। টার্গেট ছিল সাদ্দাম হোসেন- ইরাকের জনগণের দোষটা কী? ইরাকের এত শিশু ও নারীকে কেন হত্যা করা হল। হয়ত জাপানের রাজারা হিটলারের পক্ষে ছিল কিন্তু হিরোশিমা নাগাসাকিতে যাদের ওপর পরমাণু বোমা বর্ষিত হল এরা কি সবাই অপরাধী? এদের কেন হত্যা করা হয়েছিল? এখানেই শূন্যতা আর অর্থহীনতা প্রকট হয়ে উঠে। এখানেই প্রাণি হিসাবে মানুষের সমস্ত অর্জন ও সম্ভাবনার শেষ হয়ে যায়। এখানেই মিথ্যে হয়ে যায় জগতের তাবত মহাগ্রন্থগুলো। যেগুলো অজস্র মিথ্যের বেসাতি করে মানবজাতি সম্পর্কে মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়ে দুর্বলের ওপর সবলের শোষণ জারি রাখে।

এইসব আইনকানুন আদালত প্রতিষ্ঠা করে মেকি নৈতিকতা তৈরি করে মানুষের উপর হুকুমত জারি রাখে। এইসবের অন্তসারশূন্যতাকে তুলে আনেন কামুর তার আউটসাইডারে।

সর্বোপরি মানুষ এমন একটা জীব যে সর্বঅবস্থাতেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। খাপ খেয়ে যায়। আর তাই প্রাণি হিসাবে তার এতদূর আসার পিছনের কারণ। না হলে সেই বরফ যুগের শেষের দিকেই সে বিলুপ্ত হয়ে যেত। আবার এই খাপ খেয়ে যাওয়াটাও তার জন্য বিপদজনক। যাই হোক মায়ের মুত্যুর পর দিনই মারশোল তার বান্ধবীকে নিয়ে সাঁতার কাটতে ও সিনেমায় যায়। একটা পরিস্থিতি অনেক কিছু মিলে তৈরি হয়। কিন্তু বুর্জোয়া আদালত এটাকেও তার মনুষ্যত্বহীনতা বলে রায় দেয়। এইরকম অসংখ্য আদালত জগতে অজস্র গণহত্যার রায় দিয়েছিল।

মায়ের মৃত্যুর পর মারশোল বলেন, আমার মনে পড়ল আর একটা রবিবার কোনরকমে কাটিয়ে দিলাম। মায়ের সমাধি হয়ে গেছে এবং আগামীকাল কাজে যাব। আমার জীবনে কিছুই বদলায়নি। এইখানে হেরাক্লিতসের সেই বিখ্যাত উক্তি নিয়ে তর্ক হতে পারে যে আসলে কিছুই বদলায় না।

এইসব টুকরো টুকরো সত্যই সভ্যতার গড়ে তোলা জীবন। মা মারা গেছে একদিন ছুটি, নিদেনপক্ষে দুইদিন। এর অন্যথা হলেই অফিস মানবে না। শ্রমটাই তার দরকার। মানুষের আবেগ নয়। তাহলে সেই আবেগ যে কত মেকি তাই কামুর তুলে ধরেন। কামুর বলেন মানুষ যে এত ভালবাসি ভালবাসি করে সেসবও অর্থহীন আসলে। এর পেছনেও থাকে স্বার্থ। কারণ মানুষতো আর সারাক্ষণ ভালবাসতে পারে না। ভালবাসারও রূপ পাল্টে যায় ক্ষণে ক্ষণে। এক প্রেমিকের হাতে যত প্রেমিকা বা স্বামীর হাতে যত স্ত্রী নিহত হয় তা আর কোথাও হয় না। প্রেমিকা মারি যখন তাকে জিজ্ঞেস করে, মারশোল তাকে ভালবাসে কিনা তখন মারশোলের বয়ানে ‘সে জিজ্ঞাসা করল আমি তাকে ভালবাসি কিনা। আমি বললাম, এ প্রশ্নে সত্যিই কোনো অর্থ হয় না, তবে আমার মনে হয় না। এরপর মারি জিজ্ঞেস করেছিল তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও? মারশোল বলেছিল চাই না, তবে তুমি চাইলে করতে পারি।

এর আগের উপন্যাসগুলো তৈরি হয়েছে কত কায়দা করে ভালবাসার কথা বলা যায় আর কত রকম করে বিয়ে করিয়ে দেওয়া যায়। মহাত্মা কামুর এই প্রতিবাদ যুগান্তকারী। সবকিছুই সাব্যস্ত হয় যেন ‘না’ দিয়ে। অন্যান্য নায়কগুলো যেগুলো সমাজের জঞ্জাল থেকে তৈরি। সেখানে মারশোল সন্তের মতো। কারণ আরোপিত বা প্রথাগত কিছুতেই তার আগ্রহ নাই। সে স্বচ্ছ কাঁচের মতো। বিয়ে করা এবং না করা দুটোই মারশোলের কাছে সমান অর্থহীন। আর তাই মারি যখন তার কাছে জানতে চায় বিয়েটা কি খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার? মারশোল বলেন, আসলে আমার কাছে এটার কোনো গুরুত্ব নেই।

আর বুর্জোয়াদের নিরাপত্তা বেষ্টনি তাদের আদালতে বিচারের নামে যেই প্রহসন হয় সেটার ভেতর দিয়ে কামু এই বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানটির স্বরূপ উদ্ঘাটন করেন। আদালতের একজনকে ফাঁসি দেওয়া বা হত্যা করার জন্য কতগুলো অর্থহীন প্রমাণ বা তথ্য দরকার। কারণ লোকটি তাদের সুদীর্ঘদিনের গড়ে তোলা মুল্যবোধে আঘাত করেছে। আর তাই আদালতের ভাষ্য ‘আপনাদের সামনে কাঠগড়ায় যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, সে শুধু তার মায়ের মৃত্যুও পর দিন নিছক আনন্দোৎসবই করেনি, সে ঠাণ্ডা মাথায় একটা লোককে খুন করেছে। মায়ের মৃত্যুর পরদিনই লোকটা সাঁতার কাটতে গিয়েছিল, একটা মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক পাতিয়েছিল আর একটা হাসির ছবি দেখতে গিয়েছিল।’ এগুলোই তার অপরাধ। আর তাই মারশোলের কাছে মৃতুদণ্ডও অর্থহীন। তিনি বলেন, একথা সবাই জানে যে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। কেউ ত্রিশে কেউ ষাটে বা সত্তরে মরল, তাতে কোনো তফাৎ হয় না। যে কোনো ক্ষেত্রেই হোক না কেন নরনারী জীবিত থাকে জগতও আগের মতো চলে।’


আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন-

মেটামরফসিস।। অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের গল্প

 

//জেডএস//

x