আল মাহমুদ প্রসঙ্গে ।। চঞ্চল আশরাফ

. ১১:৩২ , জুলাই ১১ , ২০১৮


আল মাহমুদের সঙ্গে আমার কিছু স্মৃতি আছে। সেগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমার হুমায়ূন আজাদ  নামে আমার একটা স্মৃতিগ্রন্থ আছে। তার একটি অংশে আল মাহমুদকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছি।

আল মাহমুদের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিলো ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত। অল্প এই কয়টা দিনে তাঁকে আমি খুব কাছে থেকে দেখেছি। তখন তিনি শিল্পকলা একাডেমির উপ-পরিচালক ছিলেন, সম্ভবত। তাঁর অফিসে প্রায়ই যেতাম। লুৎফর রহমান রিটনকে সেখানে দু’তিন দিন দেখেছি। আরও অনেককেই দেখেছি, যারা প্রকাশ্যে আল মাহমুদের নিন্দা করতেন। আল মাহমুদের সামনে বসে তারা কথায় কথায় `জ্বি মাহমুদ ভাই’ বলতেন।

যা হোক, তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিলো ৩৩ নিউ ইস্কাটনের ইসমাইল লেনে, আনওয়ার ভাইয়ের (কবি ও সম্পাদক আনওয়ার আহমদ, তিনি আজ নেই) বাসায়। ওখান থেকে `কিছুধ্বনি‘, `রূপম‘, `সাহিত্য সাময়িকী’ নামে তিনটি পত্রিকা তাঁর সম্পাদনায় বের হতো। সেখানেই তাঁকে প্রথম দেখি। ১৯৯১ সালের মাঝামাঝি কোনো এক সন্ধ্যায়। শুধু আল মাহমুদ নয়, অনেকের সঙ্গে সেখানে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটেছিল। আব্দুল মান্নান সৈয়দ, শহীদুল জহির সহ অনেকের সঙ্গেই। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই আল মাহমুদের সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মজার ব্যাপার হলো, আল মাহমুদের সঙ্গে যেমন আমার বেশ ভালো সখ্য ছিলো, তেমনি শামসুর রাহমানের সঙ্গেও সুন্দর একটা সম্পর্ক ছিলো। আমি শামসুর রাহমানের কাছে গিয়ে আল মাহমুদের প্রশংসা করতাম। আর শামসুর রাহমানের প্রশংসা করতাম আল মাহমুদের সঙ্গে দেখা হলে। আমি দেখতাম, শামসুর রাহমান অনেকখানি উদার, তাঁকে আল মাহমুদ সম্পর্কে কোনো কটুক্তি করতে দেখিনি। অন্যদিকে, আল মাহমুদ শামসুর রাহমানকে পছন্দ করলেও তাঁর ব্যাপারে মাঝেমধ্যে তাচ্ছিল্য প্রকাশ করতেন। যেমন কথায় কথায় বলতেন, `তোমাদের শামসু মিয়া’। বলার সময় মুখের পেশিতে মৃদু হাসি ফুটে উঠতো।

আল মাহমুদের লেখা প্রথম আমি পড়ি স্কুলজীবনে। তবে সেটি সাহিত্যমনস্ক পাঠ নয়। সাহিত্যমনস্ক পড়াটা শুরু হয় উচ্চ মাধ্যমিকের পরে। তখন তাঁর গল্প পড়েছি, কবিতা পড়েছি। সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, কালের কলস ইত্যাদি। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে সোনালী কাবিন  সব থেকে সার্থক রচনা বলে আমার মনে হয়েছে। এই গ্রন্থটি পড়লে আল মাহমুদের একটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু এই বই সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি খুশি হতেন না। নিজের গদ্য নিয়ে কথা শুনতে চাইতেন। প্রায়ই আমাকে বলতেন, `এখন ফিকশনের যুগ, ফিকশনে জোর দাও।’ তো এটাও বলতেন, `তোমরা যে বইটা নিয়ে মাতামাতি করো, সেই সোনালী কাবিন  আমি লিখেছি বলে মনে করি না। নিজের এই বইটির পিতৃত্ব অস্বীকারের কারণ আমি বুঝতে পারতাম। তখন ছিলো বিএনপি-জামায়াতের আমল। `সোনালী কাবিন’কে স্বীকার করলে, তিনি যে সুবিধাবাদিতার আশ্রয় নিয়েছিলেন (আমি এটাকে আশ্রয়ই বলবো, যদিও এর কোনো প্রয়োজনই ছিল না; আশ্রয় সেই নেয়, যে বিপন্ন), বইটির চেতনা বা দৃষ্টিভঙ্গি তার পুরোপুরি বিপরীত। তবে বঙ্গবন্ধু যে তাঁকে চাকরি দিয়েছিলেন, সেটা তিনি বলতেন।

১৯৮৯ সালের সম্ভবত ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক ইত্তেফাকে তাঁর একটি কবিতা ছাপা হয়, যাতে জিকিরের রিফ্রেইন ছিল। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। কবিতাটি নিয়ে যথেষ্ট নিন্দা ও সমালোচনা হয়েছিল।

বামপন্থি আল মাহমুদের এই বিচ্যুতির সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের সুবিধাবাদিতা ও আত্মপরিচয়ের উদ্বেগ গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাঙালি মুসলমান কখনো তার সাম্প্রদায়িক সত্তাকে এড়াতে পারেনি। কারণ, তা করতে গেলে একটি আইডেন্টিক্যাল টেনশন তৈরি হয়। যেমন : সে যখন নিজেকে বাঙালি ভাবছে, তখনকার টেনশন হচ্ছে সে হিন্দু হয়ে যাচ্ছে কিনা, কারণ বাঙালি সংস্কৃতি তো আর মুসলমানের সংস্কৃতি নয়। আবার সে যখন নিজেকে মুসলমান ভাবছে তখন তার মধ্যে এই উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে যে সে বাঙালিত্ব হারাচ্ছে। বাঙালিত্ব হারালে এই ভূখণ্ডে তার জন্মগ্রহণ ও বিকাশ অর্থহীন হয়ে পড়ে। অধিকাংশ বাঙালি মুসলমান এই টেনশন থেকে কখনো বের হয়ে আসতে পারেনি। তবে কিছু ব্যতিক্রম আছে, যেমন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। বাঙালি মুসলমানের আত্মপ্রতিষ্ঠার হিসাবনিকাশের দিক থেকে আল মাহমুদকে খুব সাধারণ মনে হয়। তবে সাহিত্যে, বিশেষত কিছু গল্প ও কবিতায় তিনি অসাধারণ।

আমি মনে করি, চাইলে নিজের জীবনকে তিনি একটি প্রশ্নোর্ধ্ব জায়গায় নিয়ে যেতে পারতেন। তাঁর প্রতিভা অসামান্য, মেধা অসাধারণ, জ্ঞানীও কিছু কম ছিলেন না। কথার জাদুতে সম্মোহিত করার অদ্ভুত ক্ষমতা তাঁর ছিল। একটি ছোট ঘটনা বললে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। ১৯৯৫ সালের কথা বলছি। বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পে ছিলাম সেই সময়ে। একদিন প্রকল্প পরিচালক মুহম্মদ নুরুল হুদা বললেন, আল মাহমুদ আগামীকাল আসবেন। তখন ওখানে অনেকেই প্রতিবাদ করলো, বললো, আল মাহমুদকে আসতে দেওয়া হবে না। এদের সংখ্যা ২৫-৩০ জন। হুদা ভাই বললেন, “আশা করি তোমরা তাঁর সাথে লেখকসুলভ আচরণ করবে। তাঁর মতাদর্শ নিয়ে তাঁর সামনেই প্রশ্ন করবে। লেখকের মতোই তাঁর সঙ্গে তর্ক করবে। তোমরা কি রাজনৈতিক কর্মী? লেখকের মতো করে তাঁকে মোকাবেলা করো।”

এরপর আসতে দেওয়া হবে, কিন্তু ঢুকতে দেওয়া হবে না, এরকম একটি অবস্থার মধ্যে আল মাহমুদ এলেন। তিনি ঢুকলেনও। সবারই প্রস্তুতি ছিলো, তাঁকে বাক্যবাণে জর্জরিত করা হবে। কিন্তু তিনি আসার পর যখন বক্তৃতা শুরু করলেন, ১০ মিনিটের মধ্যেই সবাই শান্ত হয়ে গেলো। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে লাগলো। এমনকি বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর যারা তাঁকে আসতে দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিল, তারাই তাঁর কাছে গিয়ে ফোন নম্বর, অটোগ্রাফ এবং বাসার ঠিকানা নিতে শুরু করলো।

সবকিছুর ওপর লেখক বেঁচে থাকেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যে। এজরা পাউন্ড নাৎসিদের পক্ষে কাজ করার জন্য নিন্দা ও ধিক্কারের মুখে পড়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস লিখতে গেলে তাঁকে বাদ দেয়া যায় না। সাহিত্যের পরীক্ষাটা অন্যরকম।

আল মাহমুদকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই।

//জেডএস//

x