৭৫ তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি নাট্যপ্রাণ আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গ

মুহাম্মদ মহিউদ্দিন ১২:২৩ , জুলাই ১২ , ২০১৮


আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল একটি ভুলের মধ্য দিয়ে। ভুলটা এমনই, যা আমার জীবনের মোড়ই ঘুরিয়ে দিল। ২০০১ সালে আমার প্রথম উপন্যাস ‘নিশাচর আবেদ আলী’র জন্য আমি জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার পাই। সেই সূত্র ধরে কবীর স্যারের সঙ্গে আমার ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একদিন কবীর স্যারকেই বললাম, আমি নাটক লিখতে চাই। কবীর স্যার বললেন, তুমি মামুনের সঙ্গে দেখা কর। মামুন বলতে তিনি মামুনুর রশীদ না আবদুল্লাহ আল মামুনকে বুঝিয়েছেন তা আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। তবে আমি ধরে নিয়েছিলাম নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদকে বুঝিয়েছেন।

কবীর স্যার আমাকে একটা ফোন নম্বর দিলেন। বললেন কথা বলতে। আমি ফোনে কথা বললাম। কথা বলেও আমি নির্ণয় করতে পারলাম না তিনি মামুনুর রশীদ না আবদুল্লাহ আল মামুন।

২০০৪ সালের কথা। ফোন করে বাসায় গেলাম। আমার দুটো উপন্যাসে লিখলাম- ‘শ্রদ্ধাভাজনেষু মামুনুর রশীদকে শুভেচ্ছাসহ’

অপেক্ষা-ঘরে কিছুক্ষণ বসলাম। গলাকাটা হাফ হাতা ফতুয়া আর লুঙ্গি পরে এলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। আমার কল্পনায় তখনো ভাসছিল মামুনুর রশীদ। প্রথম আবদুল্লাহ আল মামুনকে দেখে চমকালাম, অবাক হলাম। পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। বই দু’টি হাতে দিলাম। তিনি পাতা উল্টে দেখলেন। কিন্তু মামুনুর রশীদের নাম লেখা দেখে আমাকে কিছুই বললেন না। বললেন, যোগাযোগ রেখ।

সে থেকে প্রায় পাঁচ বছর আমি আবদুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছি। পরিচয়ের সপ্তাহখানেক পরে আবদুল্লাহ আল মামুন তার লেখা উপন্যাস ‘গুণ্ডা-পাণ্ডার বাবা’ আমাকে দিলেন। বললেন, বইটা পড়। এটাকে ধারাবাহিক নাটক বানাব। বইটা আমি পড়লাম। তিনি আমাকে লাইনআপ তৈরি করা শেখালেন। তারপর একদিন বললেন, ‘মহিউদ্দিন তোমাকেই আমার দরকার। আমার আর লিখতে ইচ্ছে করে না। অবশ্য আমাকেও তোমার দরকার।’ সে থেকে আবদুল্লাহ আল মামুনের দিকনির্দেশনায় আমি ধারাবাহিক নাটক ‘একজনমে’ লিখেছি। যা এটিএন বাংলায় প্রায় ৩০০ পর্ব প্রচারিত হয়েছে। বৈশাখী টেলিভিশনের জন্য আমাদের যৌথ রচনায় তৈরি হয়েছে ধারাবাহিক নাটক ‘যা থাকে কপালে।’ চ্যানেল আই, এটিএন বাংলায় প্রচারিত হয়েছে ‘যার যা ভূমিকা’, গৃহ জামাতাগণ এবং লেখা হয়েছে বেশ কয়েকটি খণ্ডনাটক। আমেরিকায় নির্মাণের জন্য আমার লেখা ধারাবাহিক ‘বসত করি আমেরিকায়’ও আবদুল্লাহ আল মামুনের পরিচালনার কথা ছিল।

দীর্ঘ ধারাবাহিক ‘এক জনমে’ লিখতে গিয়ে আমাকে বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে। কখনো থেমে গেছে কলম। পথ খুঁজে পাইনি গল্পের। প্রতিবারই লাইনচ্যুত বগিকে লাইনে তুলে দিয়েছেন আবদুল্লাহ আল মামুন।গল্প ফাঁদার এবং চমৎকার সংলাপ তৈরির কারিগর ছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। মুহূর্তের মধ্যে পথ চলতে চলতে তিনি নাটকের গল্প, ট্র্যাজেডি, কমেডি বলে ফেলতেন। যে কোনো গল্পের একটু সূত্র ধরে দিলেই তিনি বাকি গল্পটা চমৎকার তৈরি করে নিতেন। তার মাথায় প্রতিটি মুহূর্ত যেন নাটকই গিজগিজ করত।

আবদুল্লাহ আল মামুন অসুস্থ হয়ে পড়লে অফিস থেকেই আমি স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাই।

সে দিনের কথা। স্কয়ার হাসপাতালে মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের পর তিনি সুস্থ হয়ে এলেন।

আইসিইউতে শুয়েই তিনি সবার সঙ্গে মোটামুটি কথা বলছেন। কখনো হাসছেন। কখনো কাঁদছেন।

আইসিইউতে তাঁকে দেখতে গেলে তিনি আমার হাত চেপে ধরে বললেন-‘জানো মিয়া, এইখানে কতো নাটক হয়। একজন চিৎকার করে, একজন গোঙ্গায়, আর একজন হাউমাউ করে কাঁদে।’

আবদুল্লাহ আল মামুনের প্রোডাকশনের অফিস ছিল ইস্কাটনের দিলু রোডে। তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আর আমি পরিচালক। দুপুরের খাবারটা অফিসেই হতো। আমি ও আবদুল্লাহ আল মামুন একসাথে দুপুরের খাবার খেতাম। তিনি আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। খেতে বসলেই বারেককে জিজ্ঞেস করতেন ‘মহিউদ্দিন কোথায়’। দুপুরে খাবার মেন্যুতে প্লেটে ভাত নেয়ার আগে তিনি একটু শাক, সবজি নিতেন। কিছুটা খেয়ে তারপর ভাত নিতেন। খাবার সময় জলপাই আচার খেতে খুব পছন্দ করতেন। যেদিন গরুর মাংস রান্না হতো সেদিন বলতেন ‘মহিউদ্দিনকে বেশি করে দাও। ও চাটগাঁইয়া মেজবান খাওয়া লোক।’ খেতে বসা অন্যরা তখন হাসত।
আবদুল্লাহ আল মামুনের পাশে লেখকএকবার ঘটল এক মজার ঘটনা। আবদুল্লাহ আল মামুন অফিস থেকে বেরুনোর সময় বললেন ডাক্তারের কাছে যাবেন। আমিও ল্যাব এইডের উদ্দেশ্যে স্যারের সঙ্গে গেলাম। ল্যাব এইডের কাছাকাছি যেতেই স্যার বললেন, ‘মানিব্যাগ তো আনা হয়নি। তোমার পকেটে টাকা আছে?’ সর্বসাকুল্যে তখন আমার পকেটে তিনশ’ টাকা। বললাম ‘স্যার ব্যাংকের বুথ থেকে আমি টাকা নিয়ে আসি।’ তখন আমাদের ড্রাইভার কাদের ভাই বললেন, ‘স্যার বাসার চাল কেনার জন্য আমার পকেটে আড়াইশ’ টাকা আছে।’
ড্রাইভারের কাছ থেকে দু’শ টাকা আর আমার তিনশ’ টাকা দিয়ে পাঁচশ’ টাকা করলাম। স্যার ড্রাইভারের চাল কেনার টাকা নিতে বাঁধা দিলেন। বললাম বেরিয়ে কার্ড থেকে আমি দিয়ে দেব। ডাক্তার দেখানো হলো। ডাক্তার কোনো ফি নিলেন না। আবদুল্লাহ আল মামুনকে নিয়ে অনেকবার আমি অনেক ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। আমি কখনো কোনো ডাক্তারকে তার কাছ থেকে ফি নিতে দেখিনি। আবদুল্লাহ আল মামুনের একটা অপূর্ণ ইচ্ছার কথা বলেই লেখাটা শেষ করব। ১২ জুলাই ২০০৮ ছিল আবদুল্লাহ আল মামুনের পঁয়ষট্টিতম জন্মদিন। তার খুব ইচ্ছা ছিল সেবারের জন্মদিনটা ঘটা করে উদযাপন করার। এ লক্ষ্যে রামেন্দু মজুমদারকে আহ্বায়ক ও আমাকে সদস্য সচিব করে একটি জাতীয় কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। জাতীয় নাট্যশালা বুকিং দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মানুষ ভাবে এক হয় আরেক। ১০ জুলাই তাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করলাম। ১২ জুলাই তার জন্মদিনটা কাটল হাসপাতালের বেডে। রাতে মাথায় অস্ত্রোপাচার হলো। আবদুল্লাহ আল মামুনের একটা ইচ্ছা অপূর্ণই থেকে গেল। পালন করা সম্ভব হয়নি আবদুল্লাহ আল মামুনের পঁয়ষট্টিতম জন্মদিন। ২১ আগষ্ট ২০০৮ চলে গেলেন তিনি না ফেরার দেশে।


আব্দুল্লাহ আল মামুন একাধারে নাট্যকার, অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন। ‘থিয়েটার’ নাট্যদল তারই হাতে গড়া। এ দলের জন্য ১৮টি মঞ্চনাটক লেখেন তিনি, নির্দেশনা দিয়েছেন ২৩টি মঞ্চনাটক।

তার রচিত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে- সুবচন নির্বাসনে, এখনও দুঃসময়, সেনাপতি, এখনও ক্রীতদাস, কোকিলারা, দ্যাশের মানুষ, মেরাজ ফকিরের মা, মেহেরজান আরেকবার ইত্যাদি।

শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘আকর’ উপন্যাস নিয়ে নির্মাণ করেন ধারাবাহিক নাটক ‘সংশপ্তক’। এ ধারাবাহিক নাটকের পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে তিনি পান প্রবাদপ্রতিম খ্যাতি। তার নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- সারেং বৌ (১৯৭৮), সখী তুমি কার, এখনই সময়, জোয়ারভাটা, শেষ বিকেলের মেয়ে।

অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার, প্রথম জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার। শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে পেয়েছেন দু’বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তিনি ২০০০ সালে একুশে পদক পান।

//জেডএস//

x