হাজী মুরাদ।। বিদ্রোহী, মুক্তিযোদ্ধা না সন্ত্রাসী?

জাহেদ সরওয়ার ০৬:০০ , জুলাই ২৭ , ২০১৮


লেভ তলস্তয়ের বেশ কিছু চরিত্র প্রায় অমরতা লাভ করেছে, যেমন- ওয়ার অ্যান্ড পিসের ‘পিটার’ আর ‘সুফিয়া’, রেজারেকশনের ‘নেখলয়ুদভ’ আর ‘মাসলোভা’, আন্না-কারেনিনার ‘আন্না’, ‘কিটি’, ‘লেভিন’ ও ‘ব্রনস্কি’, হাজী মুরাদের ‘মুরাদ’ও তেমন অমর একটি চরিত্র। অবশ্য ‘হাজী মুরাদ’ উপন্যাসের চরিত্র হিসাবে অমরতা লাভ করলেও তখনকার চেচেন-বীর হাজী মুরাদকে অমর করে রাখার জন্যই হয়তো তলস্তয় ‘হাজী মুরাদ’ উপন্যাসটি রচনা করেন। হয়তো একজন সৎ লেখক হিসেবেও তার এই দায়টা ছিলো। তলস্তয় নিজেই জারের আমলের রাশিয়ার উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। তিনি প্রথম যৌবনে রুশ সাম্রাজ্যবাদের দখলকৃত কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিলেন যোদ্ধা হিসাবে। তারপরও রুশ সাম্রাজ্যের ত্রাস চেচেন-বীর হাজী মুরাদের মতো একটা বিদ্রোহীর চরিত্র যে দৃঢ়তা, বিশ্বস্ততা ও মহৎ আবেগে এঁকেছেন তাতেই তার সততা প্রমাণিত হয়ে যায়।

যুগ যুগ ধরে আলোচিত এই ছোট উপন্যাসটি তলস্তয়ের অন্যান্য কাজের মধ্যে দুর্লভ কোনো বুনো ফুলের মতো জেগে থাকে। এটি তার শেষ উপন্যাস। ১৮৯৬-১৯০৪ সাল পর্যন্ত আট বছর ধরে তিনি এই ছোট উপন্যাসটি লেখেন। ১৯১৭ সালে জারের আমল শেষ হওয়ার পর কোনোরকম সেন্সর ছাড়াই উপন্যাসটি রাশিয়ায় প্রকাশিত হয়। তলস্তয় আগেও কসাকদের নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছেন ‘ককেসাস’ নামে। তবে সেখানে তার রুশ পক্ষপাত ছিল। কিন্তু ‘হাজী মুরাদ’ উপন্যাসে তিনি নির্মোহভাবে বিরোধিতা করেছেন রুশ সাম্রাজ্যবাদের। সে সময়ে হাজী মুরাদকে রুশরা নেপোলিয়ানের সাথে তুলনা করতো। সততা, সাহস, বিচক্ষণতা, আত্মসন্মানবোধ, দেশপ্রেম এবং ধর্ম ছিল হাজী মুরাদের আরাধ্য।

এ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ১৮৫১ সালের শেষের দিকের। শুরুতে তলস্তয় উপন্যাসটির মূল চরিত্র ‘হাজী মুরাদ’কে পাঠকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এভাবে-“‘হাজী মুরাদ’ শামিল-এর নায়েব। লোকটি লুটতরাজের জন্য বিখ্যাত। নিজের পতাকা ও ডজন খানেক মুরিদ বা অনুগামী পরিবৃত না হলে সে কখনো ঘোড়ায় চড়ে বাইরে বের হয় না।”

তবে শামিলের সাথে মুরাদকে বাধ্য হয়েই কাজ করতে হয়েছিলো। শামিলরা ছিল অনেকটা বর্তমান জঙ্গি সংগঠনগুলোর মতো, ধর্ম-কেন্দ্রিক। হাজী মুরাদ তা ছিলেন না। তিনি ছিলেন অনেকাংশে জাতীয়তাবাদী। কিন্তু শামিল ক্ষমতাবান ও নির্যাতনকারী হওয়ায় তাকে বাধ্য হয়ে শামিলের নায়েব হিসাবে কাজ করতে হয়েছে। পরে এই শামিলই হাজী মুরাদের সম্ভাবনা ও সাহস দেখতে পেয়ে তাকে নায়েব পদ থেকে বরখাস্ত করেন। শুধু তাই নয়, হাজী মুরাদের দুই স্ত্রী, মা আর জনাপাঁচেক ছেলেমেয়েকে বন্দি করে কারাগারে নিয়ে আসা হয়। মুরাদের পরিবারকে বন্দি করে তাকে আত্মসমর্পনের জন্য বলা হয়। হাজী মুরাদ জানে, সে আত্মসমর্পন করলেই তাকে হত্যা করা হবে। আর তাই এই শামিলের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যই রাশিয়ান জারের আগ্রাসী সেনা বাহিনির কাছে হাত মেলান।

কিন্তু শামিলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার সাথে সাথেই মুরাদ যেন অপাংক্তেয় হয়ে পড়েন। কারণ সাধারণ মানুষ যারা ধর্মীয় দৃষ্ঠিকোণ থেকে শামিলকে মান্য করতো তারা হাজী মুরাদকে পলাতক শত্রু হিসেবে ভাবতে শুরু করে। ফলে নিজদেশেও তিনি পরবাসী হিসেবে পরিণত হন। রাশিয়ান ক্যাম্পে যাওয়ার আগে তিনি আশ্রয় নেন তার এক শুভাকাঙ্ক্ষীর বাড়িতে। রাতটুকুও ওখানে কাটাতে পারে না সে। বাড়িওয়ালা বলে, এক মহিলা ছাদ থেকে তোমাকে আসতে দেখে তার স্বামীকে বলে দিয়েছে। আর এতক্ষণে গোটা আওল (তাতার গ্রাম) জেনে গেছে। গ্রাম প্রধানরা মসজিদে সমবেত হয়েছে। তোমাকে তারা আটক করতে চাইছে।’

হাজী মুরাদের স্বপ্ন ছিল এরকম, সে রাশিয়ানদের সাথে হাত মেলাবে। সেনাপতি ভরন্তসভের দেওয়া সেনাদল নিয়ে সে শামিলের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা শুরু করবে। শামিলকে বন্দি করবে। প্রতিশোধ নেবে। রাশিয়ার জার তাকে পুরুস্কৃত করবেন। শুধু আভারিয়া নয়, গোটা চেচনিয়া তার শাসনাধীনে আসবে। কিন্তু মানুষের পরিকল্পনা তো আর সবসময় বাস্তবায়িত হয় না।

হাজী মুরাদের আত্মসমর্পণ একটি আলোচিত ঘটনা হয়ে ওঠে। কারণ হাজী মুরাদ শামিলের নায়েব থাকাকালীন রাশিয়ান সৈন্যদের কাছে এবং স্বয়ং জার নিকোলাসের কাছেই ছিলেন মূর্তিমান ত্রাস। হাজী মুরাদকে দুর্ধর্ষ তাতার যোদ্ধা হিসাবেই চিনতো গোটা জারের রাশিয়া। মন্ত্রিসভা, বলনাচের আসর, সবখানেই তখন আলোচনায় ছিলেন তিনি। প্রিন্সেস এক জেনারেলকে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা জেনারেল, আপনার কি হাজী মুরাদের সঙ্গে কখনও দেখা হয়েছে? জেনারেল উত্তরে বললেন, ‘একাধিকবার হয়েছে প্রিন্সেস’। সেনাপতি বলতে আরম্ভ করলেন, ‘১৮৪৩ সালে পাহাড়িরা গের্গেবেল দখল করার পরে হাজী মুরাদ জেনারেল পাহলেনের সেনাদলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এবং তাদের চোখের সামনেই কর্ণেল জলোতুখিনকে হত্যা করেছিল। এরপর আরেকজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা বলল, ইয়োর এক্সেলেন্সি আপনার কি মনে নেই বিস্কুট অভিযানে উদ্ধারকারী দলটিকে যে আত্মগোপনকারী পাহাড়ি দলটি আক্রমণ করেছিল তাদেরও নেতৃত্বে ছিল এই হাজী মুরাদ। জর্জিয়ার প্রিন্স বলে বসল, হাজী মুরাদ মেখতুলির আহমেত খানের বিধাব পত্নীকে অপহরণ করেছিলো। এছাড়াও সে ছাব্বিশজন বন্দিকে হত্যার হুকুম দিয়েছিল। প্রিন্স বলল, ইউরোপে জন্মালে সে হয়তো আর একজন নেপোলিয়ন হতে পারত।’

হাজী মুরাদেরও বেড়ে ওঠা আর শামিলের সাথে তার দ্বন্দ্বের কারণ ইত্যাদিও তুলে আনেন তলস্তয়। সেনাপতির কাছে স্বীকারোক্তিতে হাজী মুরাদ বলল, আমি পাগড়ি পড়েছি আমার আত্মার মুক্তির জন্য, শামিলের জন্য নয়। শামিলের পক্ষে যাওয়ার ইচ্ছা আমার কোনোকালেই ছিল না। কারণ সে আমার বাবাকে, আমার ভাইদের ও আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা করেছে।’

চেচনিয়া দখলের ফলে তখন শামিল রাশিয়ানদের মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়ায়। সেনাপতির পরিকল্পনাও তাই হাজী মুরাদকে শক্তিশালী করে শামিলের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া। কিন্তু হাজী মুরাদ তাদেরকে একটি শর্ত দেয়। তার পরিবার শামিলের হাতে বন্দি। রাশিয়ানরা যেন বন্দি-বিনিময়ের মাধ্যমে তাদের মুক্ত করে। না হলে হাজী মুরাদ কিছুই করতে পারবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়।

হাজী মুরাদের বিষয়টার অনুমোদন নেয়ার জন্য সেনাপতির পত্র প্রেরণের মাধ্যমে তলস্তয় জার নিকোলাসের ব্যভিচারি জীবনটা তুলে আনেন। সেই সময় আসলে সামন্তীয়রা রাজ্যের পর রাজ্য দখল করেছে। সৈন্য বাড়িয়েছে। শত শত বেতনভুক সৈনিক নিহত হয়েছে দেশপ্রেমের নামে কিন্তু এর বিনিময়ে সাধারণ মানুষ কিছুই পায়নি। শুধু নিকোলাসদের ভোগের মাত্রা বেড়েছে। যখন যে মেয়েকে পছন্দ হয়েছে তাকে বিছানায় নিয়েছে। এরমধ্যে রাশিয়ানরা ‘চেচেন’ নামে একটা গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে সেটি মাটির সঙ্গে প্রায় মিশিয়ে দেয়। এই জন্য তলস্তয় বলেন, রাশিয়ানদের প্রতি একটিও ঘৃণাবাক্য কেউ উচ্চারণ করছে না। শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রতিটি চেচেনের মনোভাব ঘৃণার চাইতে তীব্রতর। এই সব জীবের অর্থহীন নিষ্ঠুরতায় তারা এতই আহত বিরক্ত ও বিমূঢ় হয়ে পড়েছে যে ইদুর বিষাক্ত মাকড়শা বা নেকড়ের মতোই তাদের নির্মূল করার বাসনা আত্মরক্ষার ইচ্ছার মতোই তাদের কাছে এক সহজাত প্রবৃত্তি হয়ে দেখা দিয়েছে।’

অনেকদিন অপেক্ষায় থেকে হাজী মুরাদ রুশদের শ্লথগতি দেখে বিরক্ত হয়। কারণ তার বীরগতির সাথে এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যায় না। সে এখানে থেকে কারো সাথেই যোগাযোগ করতে পারছে না। ওদিকে একটার পর একটা খারাপ খবর আসছে। পরিবারকে শামিলের হাত থেকে মুক্ত করার কোনো লক্ষণই সে দেখছে না। যেন হাজী মুরাদ এক মারাত্মক খাদের কিনারে এখন। মুরাদ স্বগতোক্তি করেন, আমি কি করব? শামিলের কথায় বিশ্বাস করেও তার কাছে ফিরে যাব? সে তো শেয়াল, আমাকে ঠকাবে। না ঠকালেও সেই ডাহা মিথ্যেবাদীর কাছে ধরা দেওয়া অসম্ভব। কারণ রাশিয়ানদের পক্ষে আসার পরে এখন আর সে আমাকে বিশ্বাস করবে না। তার একটা গল্প মনে পড়ে গেল। একটি বাজপাখি ধরা পড়ে মানুষের সঙ্গে অনেক দিন কাটিয়ে আবার একদিন বাজপাখিদের কাছে পাহাড়ে ফিরে গেল। তার পায়ে ঘণ্টা বাঁধা। অন্য বাজপাখিরা তাকে গ্রহণ করল না।

হাজী মুরাদ অনেক স্বপ্ন নিয়ে রুশদের কাছে আসলেও সে মূলত বন্দি। এসব ভেবে সে একদিন পালিয়ে গিয়ে নিজের মতো করে শামিলকে প্রতিরোধের পরিকল্পনা করে। চার-পাঁচজন সাঙ্গপাঙ্গসহ সে একদিন ভোরে ঘোড়ায় চড়ার নাম করে পালিয়ে যায়। রুশরা যখন বুঝতে পারে যে হাজী মুরাদ পালাচ্ছে তখন তারা বিভিন্নভাবে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে সে রাশিয়ান বাহিনির সাথেই যুদ্ধ করতে থাকে। তারা পাঁচজন এক ব্যাটেলিয়ান সৈনিকের সাথে যুদ্ধ করতে করতে একসময় পরাজিত হয়। অবশ্য রাশিয়ান সৈনদের হাতে নয়। আরেকটা আভারিয় গোত্রের হাতে, যাদের সাথে গোত্র-দ্বন্দ্ব ছিল হাজী মুরাদের। খুব বিভৎসভাবে তারা তাকে হত্যা করে। এভাবেই এক অকুতোভয় বীরের অমিমাংসিত মৃত্যু হয়। উপন্যাসটি ছোট হলেও তলস্তয়ের আঙ্গিকের কারণে এবং শব্দস্থাপত্যের কারণে বিশ্বসাহিত্যের ক্ল্যাসিকগুলোর মধ্যে এটি প্রথম সারিতেই আছে।

//জেডএস//

x