চেনা সুরের রাগ-রঙ

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় ০৬:০০ , আগস্ট ০১ , ২০১৮


কোনো রাগের রূপায়নে দু’টি পর্ব থাকে। প্রথম পর্বটি হলো ‘সা’ থেকে চড়ার ‘র্সা’-তে আরোহণ’ বা উঠে যাওয়া এবং দ্বিতীয় পর্বটি হলো ‘অবরোহণ’ বা চড়ার ‘র্সা’ থেকে খাদের ‘সা’-তে নেমে আসা। যেমন, ভৈরবের আরোহণ আর অবরোহণ হলো, ‘সা ঋ গা মা পা দা ণি র্সা/র্সা ণি দা পা মা গা ঋ সা’। কথা হলো, এর প্রতিটি স্বরই ভৈরবের পক্ষে অপরিহার্য এবং এর মধ্যে অন্য যে কোনো একটি স্বরও ব্যবহার করলে তা ভৈরবের রূপকে নষ্ট বা বিকৃত করে দেবে। কিন্তু একটি মাত্র স্বর বদলে বা সংযোজন করে অন্য কোনো রাগ পেতেও পারি। তবে, আবার বলি ভৈরবকে চিনতে হলে, তার রস উপভোগ করতে, এমনকি রাগটি গাওয়ার জন্যও এসব জানা যে একান্তভাবেই প্রয়োজনীয়, এটাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে রাগটি সম্বন্ধে কিছু কথা বলতে হলে, বিশেষত, তার সঙ্গে অন্যান্য রাগের তুলনামূলক আলোচনা করতে হলে কয়েকটা বিষয় মনে রাখলে সুবিধা হয়, এই আর কি! যেমন ধরা যাক, বিকেল আর সন্ধ্যার ঠিক সন্ধিলগ্নের একটি রাগ ‘পূরবী’। অথচ ভৈরবের সাথে তার একটিমাত্র স্বরের পার্থক্য। ভৈরবের শুদ্ধ মধ্যমকে বদলে তীব্র মধ্যম করে দিন, অমনি আপনি পেয়ে যাবেন পূরবীর স্বর সমন্বয়! হ্যাঁ। স্বরের পার্থক্য ওইটুকুই মাত্র, কিন্তু তাতেই ভাবের জন্মান্তর ঘটে গেল! এটা ঠিক ঠিক উপলব্ধি করতে হলে এনায়েৎ খাঁর আরেকটি রেকর্ড আপনাকে শুনতে হবে ভৈরবের।

কিন্তু আমরা এক্ষুণি পূরবীতেই মগ্ন হব না। বরং ভৈরবের খুবই ঘনিষ্ঠ সকালের আরেকটি রাগ ‘রামকেলী’র প্রতি মনোযোগী হব। এই রাগটির আরোহণে স্বর সমন্বয় ভৈরবেরই মতন, শুধু অবরোহণে ভৈরবের সঙ্গে আরো একটি স্বর যুক্ত হচ্ছে- তা হলো তীব্র মধ্যম। অর্থাৎ দুটি ‘মধ্যম’ই লাগছে। স্বরের পার্থক্য শুধু এইটুকুই। ফলে রাগটি ভৈরবের খুবই কাছাকাছি, তবু শুধু অবরোহণে একটি মাত্র স্বর, তীব্র ‘মধ্যম’র ব্যবহারে, ভৈরবের উদাস গাম্ভীর্য আর বৈরাগ্যকে ছাপিয়ে ‘রামকেলী’তে লেগেছে শৃঙ্গারের রঙ।

রামকেলী রাগে বাংলা গানের কথা বললে, প্রথমেই মনে পড়ে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া সেই অবিস্মরণীয় রাগপ্রধান গানটির কথা, যার প্রথম পঙক্তিটি হলো, ‘জাগো, আলোক লগনে...’। কিন্তু গানটির ভাব যতটা উদাস ততটা শৃঙ্গার রসাত্মক নয়। কোনো কোনো অংশে অবশ্য কিছুটা হয়তো উদ্দীপক, নতুন দিন শুরুর উৎসাহব্যঞ্জক... অর্থাৎ প্রথম সকালের ভাব। তবু গানটিতে রামকেলীর পূর্ণ প্রকাশ খুঁজে পাওয়া যায়। তবু বলব, রামকেলী রাগের পরিপূর্ণ রূপটি সহজে অনুধাবন করা যায়, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর গাওয়া খেয়াল গানটিতে। সেই পুরোনো দিনের সেভেন্টি এইট আর পিএম রেকর্ড, যার দু’পিঠেই রামকেলী রাগের সেই বিস্ময়কর গানটি- ‘উনে সঙ্গে লাগে মোরি আঁখিয়া’। অর্থাৎ ‘তার সঙ্গে আমার চোখ মিলে গেছে...’। বলাই বাহুল্য যে, এ ভাব পূর্ণ প্রেমের। শৃঙ্গারের এবং শুধু বাণীতে নয়। খাঁ সাহেবের গানেও তারই পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। তখন তার যৌবন অতিক্রান্ত, কিন্তু হৃদয়ে ভালোবাসার শেষ অস্তরাগটুকু শুধু লেগে আছে। কণ্ঠস্বরে যৌবনের সেই ঔজ্জ্বল্য আর নেই, কিন্তু তবু সিংহের শৌর্যে যেন হাহাকারের মতো প্রকাশিত হচ্ছে বিগত শৃঙ্গারের সেই স্মৃতি। মনে হয়, ত্রিতালে নিবদ্ধ এই দ্রুত খেয়ালটির মতো রামকেলী রাগের নিদর্শন আর নেই। এর সঙ্গে মিলিয়ে নিন ভীষ্মবাবুর গাওয়া সেই বাংলা গানটি- ‘জাগো আলোক লগনে...’

বেশ কয়েকবার শুনে আর তারপর দুটি গানের তুলনা করলে, ‘রামকেলী’ রাগটি চিনতে আপনার আর কোনো অসুবিধা হবে না। অবশ্য আরো অনেক বাংলা গানও আছে যা এই রাগে বাঁধা। বিশেষত কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথাই মনে পড়ছে। যেমন, ‘আঁখি জল মুছাইলে জননী’, ‘তুমি নব নব রূপে এসে প্রাণে’, ‘দাও হে হৃদয় ভরে দাও’, ‘স্বপন যদি ভাঙিলে রজনী প্রভাতে’ ইত্যাদি গানগুলির সুর মূলত রামকেলী রাগাশ্রয়ী হলেও, ঠিক বিশুদ্ধ রামকেলী বলা যায় না। অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ কখনোই কোনো রাগের বিশুদ্ধ রূপকে ফুটিয়ে তোলার ব্রত নিয়ে কোনো গানই রচনা করেননি; বরং নিজের ভাবটিকে নিখুঁতভাবে ফোটানোর জন্যই প্রয়োজনমতো রাগ বেছে নিয়েছেন এবং প্রয়োজনমতো তার পরিবর্তনও ঘটাতে কুণ্ঠিত হননি। তবু এসব গানের মধ্যেও ‘রামকেলী’ রাগটিকে চিনতে অসুবিধা হয় না। বিশেষত, ‘আঁখি জল মুছাইলে জননী’, ‘দাও হে, হৃদয় ভরে দাও’ এবং ‘স্বপন যদি ভাঙিলে’ গান তিনিটই রামকেলীর মূল শাস্ত্রীয় গান ভেঙে তৈরি এবং এগুলির মধ্যে রামকেলীর রেশ পাওয়া যায়। আরো সবিশেষ এই যে, ‘স্বপন যদি ভাঙিলে’ ‘গানটির একটি বহু পুরোনো রেকর্ড আছে, যার শিল্পী বিষ্ণুপুর ঘরাণার প্রবাদপ্রতিম ধ্রুপদী রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামী, যিনি ছিলেন জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদের কাকা এবং সঙ্গীত গুরু। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও তার প্রীতির সম্পর্ক ছিল। যাই হোক, রাধিকাপ্রসাদের ওই রেকর্ডটি শুনলে রামকেলী রাগের আরেকটি রূপের সঙ্গে পরিচয় ঘটবে, যা একান্তভাবেই বিষ্ণুপুরের। আসলে রবীন্দ্রনাথের গানে যে রাগ রূপ পাওয়া যায় তার উৎসও যে বিষ্ণুপুর, এটা ভুলে গেলে চলবে না। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতের যিনি আদর্শ ছিলেন সেই যদু ভট্টের সঙ্গে বিষ্ণুপুরের গায়কী যে গভীরভাবে মিশে ছিল, এ কথা বহু শ্রুত, যদিও তিনি এবং রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামীর ধ্রুপদেও উত্তর-ভারতীয় ওস্তাদী গানের প্রভাব যে অনেকখানিই ছিল, এই মতও পোষণ করেন বর্তমানের বহু গবেষক। তবু চুলচেরা বিচার যাই বলুক, যদু ভট্ট বা রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামীর সঙ্গে বিষ্ণুপুরের সঙ্গীত সাধনার যোগ যে সুনিবিড় ছিল, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। অতএব রবীন্দ্রনাথের ওপরও যে গভীরভাবেই এই গায়ন শৈলীর প্রভাব পড়েছিল, সেটাও মনে হয় সত্য। তবে, রাধিকাবাবুর গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীতটি রামকেলী রাগের নিদর্শন হিসেবে অনবদ্য হলেও তানকর্তবের ঘনঘটায় সেটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের চাইতে বরং বাংলা খেয়ালই হয়ে উঠেছিল। এই গানটির রাবীন্দ্রিক রূপটি যদি দেখতে চান তবে বরং ওই একই গান শুনুন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে।

ভৈরব রাগের অনুষঙ্গে আরো একটি রাগের কথা বিশেষভাবে মনে আসে এবং সেটি হলো রাগ ‘যোগিয়া’। মনে হয় উত্তর ভারতের গ্রামাঞ্চলে যোগী শব্দটিই অপভ্রংশ যোগিয়া হয়ে গেছে। নিতান্তই দেহাতী অপভ্রংশ, যার মধ্যে একই সঙ্গে স্নেহ আর ভক্তি মিশে আছে। ‘বঁধু’ থেকে যেমন ‘বঁধুয়া’, সেই রকম। যোগী হলো প্রধান, প্রাজ্ঞ এবং পরিণত। কিন্তু যোগিয়া হলে তরুণ কিন্তু নবোদিত সূর্যের মতো দীপ্ত, ভোরের মতো উদাস এবং সুদূরের। তার পথচলা সদ্য শুরু হয়েছে, কিন্তু সে বহুদূরের যাত্রী। নবীন জটাধারী, সুন্দর কান্তি সে গৈরিকধারী যোগী সন্ন্যাসী। সংসার ছেড়ে সে চলেছে পরমার্থের সন্ধানে আর তার বিরহে ব্যাকুলা এই বিশ্বপ্রকৃতি। সেই বিরহই যোগিয়ার স্থায়ী ভাব। ভৈরব উদাসীন আর যোগিয়া যেন ভৈরবের প্রেমের সঞ্চার!

যোগিয়ার এই প্রেমভাব প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত একটি ঠুংরির বাণীতে। ‘পিয়া মিলন কি আশ...’ গানটি অমর হয়ে আছে ওস্তাদ আবদুল করিম খাঁর অমৃত কণ্ঠে। এই গানটি অবশ্যই শোনা চাই। তবে যোগিয়া রাগে ঠুংরির রেকর্ড আরো অনেক থাকলেও বাংলা গানের সংখ্যা তত নয। তার মধ্যে দুটি গানের কথা উল্লেখ করব। প্রথম গানটি হলো, ‘বাঁশি বাজে যোগিয়ায়, যামিনী হলো যে ভোর’, শিল্পী: প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। রেকর্ডটি অনেক পুরোনো, কিন্তু যোগিয়া রাগে বাংলা গানের একটি শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। গানটির গীতিকার কে, তা মনে করতে পারি না। আর অন্য যে গানিটর কথা বলব, সেটি একটি নজরুল গীতি। গানটির প্রথম লাইনটি হলো, ‘সাজিয়াছ যোগী বল কার লাগি, অরুণ বিবাগী’। গানটি রেকর্ড আছে বহু শিল্পীর কণ্ঠেই।

কিন্তু বাংলা গান দুটির বাণী লক্ষ্য করুন। দুটি গানের বাণীতেই রাগের ইঙ্গিত দেওয়া আছে। প্রথম গানটিতে তো স্পষ্টতই বলা হচ্ছে, ‘বাঁশি বাজে যোগিয়ায়, যামিনী হলো যে ভোর’। অর্থাৎ যোগিয়া রাগের সময় যে ভোর বেলা সেটাও বলে দেওয়া হলো। কাজী নজরুল ইসলাম ‘যোগিয়া’ নামটি সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণ না করলেও, ‘যোগী’ শব্দটির মধ্যেই তার আভাসটুকু রেখেছেন। যদিও কোনো গানের বাণীতে কোনো রাগের নাম থাকলেই যে, গানটি নিশ্চিতভাবে সেই রাগেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। যেমন, ধরা যাক, ‘আমি তোমার সঙ্গে বেঁধেছি আমার প্রাণ’ এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটির কথা। এর অন্তরার সেই ঐ লাইনটির কথা ভাবুন- ‘বাঁশরি বাজাই ললিত-বসন্তে সুদূর দিগন্তে’ লক্ষ্য করুন, এই অংশটুকু দুবার উচ্চারণ করা হচ্ছে। প্রথমবারের উচ্চারণে গানটির আগের অংশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই, কিন্তু দ্বিতীয়বারে উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই সুর যেন হঠাৎ অপ্রত্যাশিত এক বাঁক নিয়ে আমাদের চেতনাকে কোন এক অলৌকিক স্নিগ্ধতার গভীরে পৌঁছে দেয়, তার কুল কিনারা পাওয়া যায় না। সেই স্নিগ্ধতার ছোঁয়া লাগে দ্বিতীয়বার এবং শুধুমাত্র ‘ললিত বসন্তে সুদূর দিগন্তে’ থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ‘... সোনার আভায় কাঁপে তব উত্তরী’ পর্যন্ত এবং তারপরেই গানটি আবার ফিরে যায় তার আগের ভাবে। কিন্তু এর থেকে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, গানটি আসলে ‘ললিত-বসন্ত’ রাগে আধারিত, তাহলে খুবই ভুল হবে। গানটিতে ললিত রাগের স্পর্শও নেই। পুরোটাই বাহার রাগাশ্রিত, শুধুমাত্র ওই অংশটিতে বসন্তের ছোঁয়া লেগেছে মাত্র। তবে সে বসন্ত আমাদের চেনা বসন্ত রাগটি নয়। এ আরেক রকম বসন্ত, যা অতিপ্রাচীন রাগ এবং শুদ্ধবসন্ত বা আদিবসন্ত নামে পরিচিত।

রাগের নামটি শুনেই গানের রাগ অনুমান করতে গেলে এমন বিভ্রান্তি অবশ্য খুবই সম্ভব। তবে অনেক গানের মধ্যেই রাগের নাম অনেক সময় ভারী সুন্দরভাবে এবং সুকৌশলে গীতিকাররা উচ্চারণ করতেন; এ বিষয়ে বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।

//জেডএস//

x