রবীন্দ্রনাথ ও প্রাচ্যতত্ত্ব

শরীফ আতিক-উজ-জামান ০৬:১৪ , আগস্ট ০৬ , ২০১৮


১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর ‘প্রাচ্যের বার্তাবাহক’ হিসেবে সারাবিশ্বে রবীন্দ্রনাথের বিশেষ একটি পরিচয় দাঁড়িয়ে যায়। তাঁর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিপরীতমুখি দৃষ্টিভঙ্গি নানা ধরনের পঠন-পাঠন ও প্রতর্কের জন্ম দেয়। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ভাবনার বিশেষ ক্ষেত্র তৈরি করেছিল এবং সেই কারণে মতাদর্শ হিসেবে প্রাচ্যবাদ তাঁর ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্তি ও ভিত্তি লাভ করেছিল। নোবেল বিজয়ী হিসেবে সম্মান প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে ভ্রান্ত পর্যবেক্ষণ ও অনুধাবনের ফলে তাঁর সম্পর্কিত অনেক বিষয়ে ভুল উপসংহার টানা হয়েছে। ভারতের বাইরে রবীন্দ্রনাথকে প্রাচ্য বা এশিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে ধরে তাঁর বহুমাত্রিকতাকে শুধুমাত্র ‘আধ্যাত্মিক’, ‘মরমি’ ও ‘প্রতীচ্য বিরোধী’ মতবাদ হিসেবে চিহ্নিত করে একটি সংকীর্ণ সীমারেখার মধ্যে বেঁধে ফেলার চেষ্টা চলেছে। এই ধারণার বিপ্রতীপে বিগত একশ বছরে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়নে যে অস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে প্রাচ্যবাদ হতে পারে তা পর্যবেক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। মনীষী এডওয়ার্ড সাঈদ (১৯৩৫-২০০৩) প্রথম দেখিয়েছেন যে, প্রাচ্যবাদ শুধু একটি আদর্শিক প্রতর্কই নয়, বরং প্রাচ্য সম্পর্কিত একটি ইয়োরোপীয় চিন্তা ও চর্চাসূত্র। সাঈদ তার Orientalism-এ লিখেছেন: 
Orientalism is a style of thought based upon an ontological and epistemological distinction made between ‘the Orient’ and (most of the time) ‘the Occident’. [প্রাচ্যবাদ প্রাচ্য ও (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে) প্রতীচ্যের মাঝে তত্ত্ববিদ্যা ও জ্ঞানতত্ত্বের বিভাজনের ওপর নির্মিত একটি চিন্তাশৈলী।] আরো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সংজ্ঞাসূত্রে ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায় যে, প্রাচ্যবাদ এশিয়া বা প্রাচ্যের ওপর প্রভাব, কর্তৃত্ব ও খবরদারি ফলানোর পাশ্চাত্য ভাবনার স্বরূপ। সাঈদ এই ধারণার বীজটি সংগ্রহ করেছেন আন্তোনিও গ্রামসির (১৮৯১-১৯৩৭) হেজিমনি (hegemony) ও অ-পশ্চিমা দেশের ওপর সাংস্কৃতিক মোড়লিপনা জিইয়ে রাখার পাশ্চাত্য তৎপরতা বিষয়ক মিশেল ফুকোর (১৯২৬-১৯৮৪) প্রতর্ক থেকে। তাত্ত্বিকভাবে প্রাচ্যবাদের সঙ্গে রবীন্দ্র-ভাবনার ব্যাপক সাদৃশ্য পাওয়া বেশ অসুবিধাজনক। তারপরও যদি প্রাচ্যবাদকে আমরা প্রাচ্য-প্রতীচ্যের পার্থক্য সম্পর্কিত চিন্তাপদ্ধতি হিসেবে ধরে নেই, তবে সেই সূত্রে অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। যদিও সাঈদ প্রাচ্যের বিপুলতা সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন এবং তার কিছু ক্ষেত্র কম-বেশি ইয়োরোপ ও পরবর্তী সময়ে আমেরিকার মনযোগ কেড়েছিল তথাপি তিনি তাঁর আলোচনা ইসলামি জগতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন, কারণ পশ্চিমের সঙ্গে ভৌগোলিক নৈকট্য দীর্ঘদিন ধরে তাদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনার কারণ হয়েছে। পক্ষান্তরে, ভারতে বিশেষ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতির কারণে ভিন্ন ধরনের এক প্রাচ্যবাদের জন্ম হয়েছে যা ইয়োরোপের বৈরিতা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের খপ্পরে পড়েছে। পশ্চিম-কেন্দ্রিক ক্ষমতা-কাঠামোয় ভারতসহ অন্যান্য অ-পশ্চিমা দেশগুলোর সমস্যাসমূহও তিনি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। ‘রহস্যময় প্রাচ্য’ ও ‘আফ্রিকান মন’ শব্দগুলোর উচ্চারণ সব সময়ই এক ধরনের নেতিবাচকতার ইঙ্গিত দিয়ে এসেছে। রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত ধারণা ‘প্রতিরোধ সংস্কৃতি’র এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাতীয়তাবাদকে উপনিবেশ-বিরোধিতার কোনো কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে তিনি বিবেচনা করেননি, বরং তাঁর কাছে তা ছিল পাশ্চাত্য ধনতন্ত্র ও বস্তুবাদের সৃষ্টি করা এক ক্ষতিকারক আদর্শ। একমাত্র মানবিকতাই এই বিবেচনার ভিত্তি ছিল। এভাবেই তিনি আধ্যাত্মিক প্রাচ্যকে বস্তুতান্ত্রিক প্রতীচ্য থেকে আলাদা করে দেখেছিলেন। পাশাপাশি তিনি প্রতীচ্যের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে বিশেষ প্রশংসার চোখে দেখেছেন, কারণ তা মানবকল্যাণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। জাতিরাষ্ট্রের পাশ্চাত্য ধারণাকে রীতিমতো আক্রমণ করলেও তিনি স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখতেন এবং সেখানে প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্য এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সুবিধার একটি সমন্বয় দেখতে চেয়েছেন। তাঁর সম্পর্কে লাটভিয় ইংরেজ মনীষী ইসায়া বার্লিন (১৯০৯-১৯৯৭) মন্তব্য করেছিলেন যে, রবীন্দ্রসাহিত্য পড়ে তার মনে হয়েছে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষপাদে ভারত যে সব বিসদৃশ সমস্যা মোকাবিলা করছিল সে বিষয়ে তিনি সুস্পষ্টভাবে তাঁর প্রজ্ঞা প্রয়োগ না করে বরং একটি মধ্যপন্থা অবলম্বন করে গেছেন। প্রাগ্রসর আধুনিকতা বা পশ্চাৎপদ ঐতিহ্যের কোনোটাই তিনি পুরোপুরি গ্রহণ করেননি। কারণ হিসেবে অনেকেই তার প্রতীচ্য-নৈকট্যকে উল্লেখ করে থাকেন যা আংশিক সত্য।

বার্লিন ও সাঈদ রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ নন, কিন্তু তাঁর ভাবনার সর্বজনীন মূল্য রয়েছে বলে তারা মনে করতেন। বার্লিন তার জটিল পথ অনুগামিতার প্রশংসা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যতটা না পাশ্চাত্য-অনুসারী তার চেয়ে বেশিমাত্রায় সাংস্কৃতিক রক্ষণশীল বলে তাঁদের ধারণা। তবে বৈশ্বিক পরিবর্তনের মাঝে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ভাবনার আদলও পাল্টে গেছে। এই পরিবর্তনের অনেক কিছুই জ্ঞানতাত্ত্বিক যা প্রাচ্যবাদের সাথে সম্পর্কিত। রবীন্দ্রনাথের অনেক মত স্থানিক অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এবং ঐতিহাসিক অবস্থা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু যা একদমই পাল্টায়নি তা হলো পূর্ব-পশ্চিমের দ্বন্দ্ব।


বার্লিন ও সাঈদের মতো মনীষীরা রবীন্দ্রনাথকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে ভৌগোলিক সীমানার চেয়ে তাঁর জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত লেখনীকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। অভিজাত পরিবারে জন্ম নেওয়া রবীন্দ্রনাথের ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় সংস্কৃতি ও আধুনিক পাশ্চাত্য শিল্প-সাহিত্য-বিজ্ঞানের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ছিল। পাশাপাশি একটি ঔপনিবেশিক শাসনামলে সারাটা জীবন কাটানোয় প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের উত্তেজনার বিষয়টিও সম্যক অবগত ছিলেন। এর মাঝ থেকেই তিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন এবং প্রাচ্যের বার্তাবাহক হিসেবে বিশ্বে বিশেষ মর্যাদা লাভ করতে লাগলেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ তাঁর একটি অতি স্বাভাবিক কাজ হয়ে উঠল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতার বাণী সামনে নিয়ে এসেছিলেন যা পাশ্চাত্যের বস্তুবাদ ও জাতীয়তাবাদ কেন্দ্রিক সংস্কৃতির একটি প্রতিবিধান ছিল বলে মনে করা হয়। ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদে কী ছিল যে তা নিয়ে রোদেনস্টাইন, ইয়েটস প্রমুখরা এত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন? রবীন্দ্রনাথ নিজেও সে বিষয়ে যথেষ্ট বিস্ময়বিমুগ্ধ ছিলেন। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে প্রতীচ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা উর্ধ্বমুখি হয়েছিল এবং প্রাচ্যমনীষী হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল। ইয়েসট যা দেখে বেশি মুগ্ধ হয়েছিলেন তা হলো তার মরমিবাদ, নিজস্ব রাজনৈতিক ভাবনা এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতি অনিহা। কিন্তু পাশ্চাত্য সমালোচকরা ভারতীয় চেতনার সঙ্গে পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যের সংঘাত দেখতে পেয়েছিলেন। ‘গীতাঞ্জলি’ প্রকাশিত হওয়ার পর হার্বাডে তিনি যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন যা পরবর্তী সময়ে Sadhana শিরোনামে প্রকাশিত হয় সেখানে তিনি উপনিষদের নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন, বুদ্ধ দর্শন সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। পাশ্চাত্যের পাঠক সমাজ ভারতের প্রাচীন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হবে বলে এই বক্তৃতায় তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। মরমি কাব্য অস্থির চিত্তের স্বস্তিদায়ক মলম। ‘গীতাঞ্জলি’তে যুক্তিবাদী ও বিতর্কপ্রবণ রবীন্দ্রনাথের চেয়ে ‘সাধনা’র রবীন্দ্রনাথকে অনেক বেশি বার্তাবাহী মনে হয়েছে। সাংস্কৃতিকভাবে রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনাগুলোর প্রতি আকর্ষণ ছিল ক্ষণস্থায়ী। কারণ জয়েস, লরেন্স, পাউন্ড, এলিয়টরা যতটা বোদ্ধা পাঠকমহলে সাড়া জাগিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ সে তুলনায় বেশ পিছিয়ে পড়েছিলেন। এমনকি তাঁর প্রথম পাশ্চাত্য জীবনীকার এডওয়ার্ড থম্পসন (১৮৮৬-১৯৬৫) তাঁকে ভিক্টোরীয় কবিদের সাথে তুলনাযোগ্য মন্তব্য করে বড় বেশি বিভ্রান্তি ছড়িয়েছিলেন। পাশ্চাত্য বোদ্ধামহলে রবীন্দ্রনাথের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ ছিল ইয়েটস কর্তৃক তাঁকে ‘অন্যজগত’ এর কবি হিসেবে তুলে ধরা, আর সেইজন্য সবাই তাঁকে ‘মরমি’ হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে। ১৯১৭ সালে Nationalism প্রকাশের পর তিনি আরো বেশি করে পাশ্চত্যের সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে লাগলেন। ওই নিবন্ধে তিনি পশ্চিমের জাতীয়তাবাদকে সর্বজনীন মানবতাবাদের নিরিখে আক্রমণ করেছেন। মেরি লাগো তার Restoring Rabindranath Tagore প্রবন্ধে মন্তব্য করেছেন যে, তিনি একজন রাজনীতিকের মতো কথা বলছেন, আর তাঁর মন্তব্য প্রাচ্য-প্রতীচ্যকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সংস্কৃতি ও রাজনীতি— দুই দিক থেকেই রবীন্দ্রনাথকে প্রাচ্যের বার্তাবাহক বলা হয়েছে। কিন্তু প্রাচ্য কেমন ছিল এবং প্রতীচ্যের সঙ্গে তুলনায় তা কিভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছিল? তিনি প্রতীচ্যের স্বীকৃতির কৃপায় বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছিলেন— এই মূল্যায়নই সর্বত্র ঘোরফেরা করছিল। কিন্তু এই কি সামগ্রিক রবীন্দ্রনাথ? তাঁর বহুমাত্রিকতাকে সেদিন তারা ধারণ করতে পারেননি। তাঁর সম্পর্কিত পশ্চিমা মূল্যায়নের ভিত্তি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। রবীন্দ্রনাথের পাশ্চাত্য সম্পর্কিত উপলব্ধি মূলত ঔপনিবেশিক শাসন সূত্রে যুক্তরাজ্য থেকে প্রাপ্ত। যেখানে রবীন্দ্রনাথের দেশের মানুষ তাকে বাস্তববাদী জীবনসূত্রে দেখতে আগ্রহী সেখানে প্রাচ্যবাদ তাঁকে মূল্যায়নের সর্বোৎকৃষ্ট মতবাদ নয়। তাছাড়া পশ্চিমে তাঁর সম্পর্কে যা লেখা হয়েছে পশ্চিমারা সেইসব লেখা বেশি পড়ে। একদা আশীষ নন্দী বলেছিলেন যে সব বাঙালি বুদ্ধিজীবীই রবীন্দ্র-পণ্ডিত। এর কারণ রবীন্দ্রনাথ বাঙালিদের কাছে এক আইকনের নাম। ২০১১ সালে The Guardian পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছিল যে, আর কোনো ভাষাভাষির মানুষ তাদের কোনো লেখককে এত সম্মান করে না যতটা বাঙালি করে রবীন্দ্রনাথকে। এর বিপরীতে পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রনাথের প্রতি এক ধরনের ঔদাসিন্য দেখানো হয়েছে। অক্সফোর্ড বা পেঙ্গুইনের উদ্ধৃতি অভিধানে রবীন্দ্রনাথের কোনো উদ্ধৃতিই স্থান পায়নি। ইয়েটস ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’র মুখবন্ধে লিখেছিলেন, as the generations pass, travellers will hum them on the highway and men rowing upon rivers... কিন্তু ইংরেজের আচরণে তা নির্মম পরিহাসের মতো মনে হয়। এই ইয়েটসই ১৯৩৬ সালে The Oxford Book of Modern Verse— এ রবীন্দ্রনাথের ৭টি কবিতা যুক্ত করেছিলেন। প্রতীচ্যে তাঁর সৃষ্টির ব্যাপক আবেদন না তোলার কারণ হিসেবে যে কথাটি বলা হচ্ছে তা হলো অনুবাদের সীমাবদ্ধতা এবং পূর্ব-পশ্চিমের সাংস্কৃতিক পার্থক্য।
সাহিত্যিক না হলেও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে নিজের বিশেষ আগ্রহ থেকে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন Tagore and His India তে উল্লেখ করেছেন যে, খোদ ভারতেই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কিত প্রচারণায় গলদ রয়েছে। তাঁকে পুরাণের খোলস থেকে বের করে আনাকে নিজের প্রধান কাজ বলে তিনি মনে করেছেন। রবীন্দ্রনাথের আন্তর-জটিলতা ও অসঙ্গতি সম্পর্কে অমর্ত্য সেন সচেতন ছিলেন। তিনি চেষ্টা করেছেন তাঁর সর্বোচ্চ মৌলিকতা তুলে ধরতে। কিন্তু ‘আধ্যাত্মবাদী’ ও ‘প্রতি-আধুনিক’ হিসেবে তাঁর ইমেজের কাছে বাকি সবকিছু ম্লান হয়ে যায় বলে তার ধারণা। রবীন্দ্রনাথকে রেনেসাঁ-পুরুষ হিসেবে তুলে ধরতে তিনি ১৯৯৫ সালে Rabindranath Tagore: The Myriad-Minded Man রচনা করেন। দেখান যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, চিঠিপত্র ইত্যাদি তাঁর সৃষ্টিশীলতার পূর্ণ প্রকাশ নয়। তাঁর দু’হাজারের বেশি গান এবং আড়াই হাজারের মতো ছবি রয়েছে যা তাঁর সৃষ্টিশীলতার অন্যমাত্রা তুলে ধরে। মজার ব্যাপার হলো, যখন ‘গীতাঞ্জলি’ প্রতীচ্যে অভ্যর্থনা পেয়েছিল তখন তাঁর গদ্যরচনা সম্পর্কে কোনো খোঁজ ছিল না। কিন্তু এখন অনেকেই মন্তব্য করেন যে, তাঁর গদ্যরচনা সহজেই নোবেল পুরস্কার নিশ্চিত করতে পারত। তাঁর অন্যান্য অর্জন সম্পর্কে মানুষ এখন জানতে পারছে। কমিটি তাঁকে নোবেল পুরস্কার দিয়েছিল যে বিবেচনায় সে সম্পর্কে একস্থানে বলা হয়েছে:
...because of his profoundly sensitive, fresh and beautiful verse, by which, with consummate skill, he has made his poetic thought, expressed in his own English words, a part of the literature of the West. তাঁর সাহিত্য বিষয়ক অর্জনের বাইরে কমিটির পর্যবেক্ষণে আরো ধরা পড়েছিল যে, সভ্যতার দুই অংশ, পূর্ব-পশ্চিম ব্যাপকভাবে বিভক্ত, কিন্তু এই দুর্বল যোগাযোগের মূলে যে ঔপনিবেশিক কারণ বিদ্যমান সে সম্পর্কে তারা খুব সচেতন ছিলেন না। দৃশ্যত, তিনি প্রথম প্রাচ্যবাসী যিনি নোবেল পেয়েছিলেন। তাঁর কাছ থেকে সবাই প্রাচ্য-প্রতীচ্যের মাঝে এক ধরনের পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু তাঁর নোবেল ভাষণে একটি গতানুগতিক প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। কিন্তু যে ঐতিহ্যের ভিতের ওপর রেখে রবীন্দ্রনাথকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছিল তা পরবর্তী সময়ে বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান তাঁর The Philosophy of Rabindranath Tagore গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ১৯১৮ সালের আগে রবীন্দ্রনাথের দর্শন সম্পর্কে দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। একদিকে, তাঁর আস্তিক্যবাদকে খ্রীষ্টধর্মের সমগোত্রীয় বলে মনে করা হতো। অন্যদিকে, কারো কারো ধারণা ছিল তিনি এই আধুনিককালেও বুদ্ধের শিষ্য ও উপনিষদের কথক। সেখানে ধর্মীয় বিতর্ক খাঁড়া করা অর্থহীন। রবীন্দ্রনাথ পূর্ব-পশ্চিম বিতর্ক নিয়ে নিজের যৌবন থেকেই যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। তারপর নোবেল প্রাপ্তি ও তখনকার সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অবস্থা এই প্রসঙ্গকে ধীরে ধীরে তাঁর লেখনীর কেন্দ্রে নিয়ে আসে, আর তা গুরুত্বও পেতে থাকে কারণ তাঁকে প্রাচ্যের বার্তাবাহক হিসেবে মনে করা হচ্ছিল, কবি নয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, অমর্ত্য সেন বলছেন যে, তখন প্রতীচ্যে রবীন্দ্রনাথ সেভাবে পঠিত হননি। এমনকি ১৯৩৭ সালেই গ্রাহাম গ্রিন বলেছিলেন যে, অন্যরা তো দূরের কথা ইয়েটস নিজেই এখনো ঠাকুরকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেননি। কারণ ১৯৩১ সালে রবীন্দ্রনাথের ৭০তম জন্মদিনে প্রকাশিত সংকলনে তিনি তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির পরের কবিতাগুলোকে যেমন বিবেচনা করেননি তেমনি তাঁর গদ্যসাহিত্যকে কোনো প্রকার প্রশংসা করেননি। তবে আমরা ধারণা করতে পারি যে, ইয়েটস তার জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তারপর ইসায়া বার্লিন ও এডওয়ার্ড সাঈদ নতুন ভাবনার ছাঁচে ফেলে তাকে চেনানোর আগে বলা চলে তিনি প্রচলিত ধারণার বলয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিলেন।
রবীন্দ্র-রচনা তাঁর মৃত্যুর পরও প্রতীচ্যে প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু বিশ শতকের শেষদিকে নতুন গবেষণার মাধ্যমে তাঁর উপনিবেশ বিরোধিতার স্বরূপ সামনে আসতে থাকে। তার আগ পর্যন্ত উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রসঙ্গে তাঁর লেখনীর সমালোচনা নজরে পড়েনি। এখানে মনযোগ আকর্ষণ করার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বস্তুগত ও সাংস্কৃতিকভাবে ইংরেজ শাসনের একজন সুবিধাভোগী, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ ও আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতা কাঠামোর কঠিন সমালোচক। আশিষ নন্দী তাঁর সাংস্কৃতিক অন্তর্দৃষ্টির মাঝে— পূর্ব-পশ্চিম, ঐতিহ্য-আধুনিকতা এবং অতীত-বর্তমান এই তিন ধরনের বৈপরীত্য চিহ্নিত করেছেন। তার গ্রন্থে তিনি রবীন্দ্রনাথের মানবতা, জাতীয়তা, আন্তর্জাতিকতা, এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতির সঙ্গে তার যোগসূত্রের নিরিখে বিশ্বায়নের প্রাসঙ্গিকতা নির্ণয়ের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের সংস্কৃতি-সমাজ-জাতীয়তাবাদী ভাবনা নিয়ে ধারাবাহিক গবেষণা চলতে পারে। তিনি যে ইংরেজি নিবন্ধগুলো লিখেছিলেন তা ছিল মূলত পশ্চিমা পাঠকদের উদ্দেশ্যে। তখন প্রতীচ্য আর ইংল্যান্ড সমার্থক ছিল। এই তুলনা সঠিক না হলেও তার ঐতিহাসিক কারণ ছিল। সেই কারণে খানিকটা বিভ্রান্তির সাথেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষ ভাষণCrisis in Civilisation-এ বৈশ্বিক রাজনীতিকে নিজের কাজে ব্যবহার করার জন্য পাশ্চাত্য, বিশেষ করে ইংরেজদের আক্রমণ করেছেন। ঔপনিবেশিকতা ও জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গ তখন আলোচনার মুখ্য বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতো। তাঁর মৃত্যুর পর বৃটেন ছাড়াও প্রতীচ্যের অন্যান্য দেশে রবীন্দ্রচর্চা বাড়তে থাকে। তবে সাড়াটা ছিল বিভিন্ন ধরনের। যেমন, জানা গেছে যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি এই প্রাচ্য-পরিত্রাতার কাছ থেকে কিছু বক্তব্য আশা করেছিল। জার্মানির সাথে রবীন্দ্রনাথের গভীর সম্পর্কের কথা কে না জানে। বুলগেরিয়ানরা তাঁর জাতীয়তাবাদী অনুসন্ধানকে গভীরভাবে সমর্থন করেছিল। হাঙ্গেরির বুদ্ধিজীবীরা তাঁর লেখনীর প্রাচ্য ব্যঞ্জনার্থ উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু প্রাচ্য-মরমি হিসেবে গড়ে ওঠা তার প্রতিরূপ খুব পাল্টেছিল বলে মনে হয় না।
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এশিয়ার অন্যান্য দেশের ঘনিষ্ঠতাও বাড়ে নোবেল প্রাপ্তির পরে। এরপর থেকেই প্রতীচ্যে তাঁকে প্রাচ্যের বার্তাবাহক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ১৯১৬ ও ১৯২৪ সালে যখন তিনি যথাক্রমে জাপান ও চীনে গেলেন তখন তাঁর কবি পরিচয়ই মুখ্য ছিল। জাপানে তাঁর লব্ধ অভিজ্ঞতায় তিনি আরো ভালোভাবে পূর্ব-পশ্চিমের বিভাজন বুঝতে পেরেছিলেন। জাপানেই তিনি প্রথম ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সার্থক সমন্বয়ের স্বরূপটি উপলব্ধি করেছিলেন এবং সে কথা তিনি অনেককে বলেছেন। জাপানি সমাজের এই রূপটি তিনি তাঁর Nationalism প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন। এশিয়া পশ্চাৎপদ কারণ তা অচলায়তন আঁকড়ে থাকতে পছন্দ করে, প্রগতির পথে বিচরণে তার অনিহা, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন না যে জাপান পাশ্চাত্যকে অনুকরণ করে আধুনিক হয়েছে। তিনি ভিতর থেকে আধুনিক হওয়া ও বাইরে থেকে আধুনিক করার মাঝে এক ধরনের পার্থক্য দেখতে পেয়েছেন। প্রথমটি ঐতিহ্য ধারণ করে ও উদ্দীপনা বরণ করে আর পরেরটি অপ্রয়োজনীয় উপযোগিতার বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসূত্রে নতুন-পুরানো বিশেষ অর্থ খুঁজে পায় যা প্রযুক্তিগত উন্নয়নের চেয়েও বেশি কিছু। তবে তাঁর কাছে জাপানের জন্য যা বিপদজনক মনে হয়েছে তা পাশ্চাত্যের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য নয় বরং পাশ্চাত্য জাতীয়তাবাদের মতলববাজিকে নিজের বলে মনে করা। তাঁর সামাজিক আদর্শ ইতোমধ্যে রাজনীতির হাতে পরাস্ত হয়েছে। কিন্তু তাঁর এই বাণী জাপানের কানে যায়নি। তখন তারা একটি উগ্রবাদী সমগ্র-এশিয়বাদের ধারণা দ্বারা তাড়িত হয়ে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কোরিয়া, তাইওয়ান এমনকি চীনকে একীভূত করতে চেয়েছে। কাউন্ট ওকাকুরার Ideals of the East গ্রন্থে Asia is one শ্লোগানকে তিনি অসার মনে করেছিলেন। জাপানের এই সাম্রাজ্যবাদী আচরণকে তিনি পছন্দ করেননি। রবীন্দ্রনাথকে জাপানে স্বাগত জানাতে গঠিত কমিটির একজন সদস্য ছিলেন নগুচি ওনেজিরো। তিনি সামরিক বলপ্রয়োগের তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন এবং তিনি রবীন্দ্রনাথকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে সমগ্র-এশিয়াবাদী তত্ত্ব বাস্তবায়নে প্রয়োজনে চীনের সাথে যুদ্ধ করতে হবে। হতাশ রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৭ সালে চীনের জনগণকে সান্ত্বনা দিয়ে পত্র লেখেন। বলেন যে, জাপান পাশ্চাত্য ঔদ্ধত্যের কাছে নতি স্বীকার করে এই আধুনিক যুগে এশিয়াকে নেতৃত্ব দেওয়ার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে। পাশ্চাত্য থেকে রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্যবাদের ইউরোকেন্দ্রিক একটি সংস্করণের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন। কিন্তু জাপান ও চীন তাঁকে আধ্যাত্মবাদের প্রাধান্য সম্বলিত প্রাচ্যবাদের নিজস্ব মত গড়ে তোলার রসদ দিয়েছিল। তবে এডওয়ার্ড সাঈদ তার Orientalism-এ রবীন্দ্রনাথের যুক্তি সরাসরি উপস্থাপন করেননি। তার চমকে দেওয়া মতবাদের প্রায় ৫০ বছর আগে একটি আন্তর্জাতিক ফোরামে রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাশ্চাত্য প্রভাবিত প্রাচ্যবাদী ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে যে প্রাচ্যের বার্তাবাহক বলা হতো তা প্রতীচ্যের দেওয়া নাম, প্রাচ্যের নয়। প্রাচ্য পরিভ্রমণ তাঁর ভাবনায় তেমন কিছু যোগ করেনি। জাপান-চীনে তাঁর সম্বর্ধনা প্রতীচ্যের স্বীকৃতির কারণে ঘটেছে। এই দুই দেশ তাঁকে খুব প্রভাবিত করতে পারেনি যেমন তাঁর ভাবনা দ্বারাও তারা খুব প্রভাবিত হয়নি। রবীন্দ্রনাথকে জাপানি ও চীনা বুদ্ধিজীবীদের আলাদা করেছে এশিয়া নিয়ে তাঁর আদর্শবাদী ধারণার জন্য যা একদিকে জাপানের আক্রমণাত্মক সমগ্র-এশিয়াবাদের ধারণা এবং চীনের জাপান ও প্রতীচ্য বিরোধী রক্ষণাত্মক এশিয়াবাদী ধারণার বিপরীত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক রাজনীতির পরিবর্তনের ফলে জাপান ও চীনে জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উপেক্ষিত সমালোচনা বিশেষ গুরুত্ব লাভ করতে থাকে। তীব্রভাবে পরাজিত জাপানিরা যে কোনো মূল্যে শান্তি বজায় রাখার সংকল্প ব্যক্ত করে। রবীন্দ্রনাথের ১৯২৪ সালের বিতর্কিত চীন সফর নিয়ে চীনা বুদ্ধিজীবীরা নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। তাঁরা মেনে নেন যে চীনা সাহিত্যের ওপর রবীন্দ্রনাথের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। বিশ্বায়নের ভিত্তিতে প্রাচ্য-সভ্যতায় রবীন্দ্রনাথের অবদানের পুনঃমূল্যায়ন শুরু হয়। বিশ্বে তাঁর বহুমাত্রিক প্রাসঙ্গিকতা দৃঢ় ভিত্তি লাভ করতে থাকে। শুরুতে রবীন্দ্রনাথকে শুধুমাত্র মরমি হিসেবে চিহ্নিত করার যে প্রবণতা ছিল ১৯৬১ সালের পর থেকে তা থেকে পাঠকের দৃষ্টি অন্যদিকে সরে আসতে থাকে। তাঁর কবিতার মূল্য তাঁর শিক্ষাদর্শ ও মানবিক দর্শনের চেয়ে বেশি নয় সেদিকে আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হতে থাকে। অমর্ত্য সেনের মতে, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শের মূলে ছিল মানবিকতা, স্বাধীন মতের প্রতি আস্থা ও যুক্তিবাদিতা। প্রকৃতির কোলে বসে জ্ঞান আহরণকে আনন্দদায়ক করার জন্য শান্তিনিকেতনের মতো প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল এভাবে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে এক বিশেষ বন্ধন তৈরি হয় আর তা ভারতের প্রাচীন অরণ্য সভ্যতার ঐতিহ্যকে সমর্থন করে। উপরন্তু, সাধারণ ধারণার বিপরীতে রবীন্দ্রনাথ যুক্তিচর্চার উৎসাহী সমর্থক। একজন আশাবাদী বিজ্ঞানী ও যুক্তির সীমানা সম্পর্কে সচেতন একজন মানুষের মধ্যে পার্থক্য তিনি উপলব্ধি করতে পারতেন যাকে সবাই মরমিবাদ বলে ভুল করেছেন। ইসায়া বার্লিন ঠিকই বলেছেন যে, কেউ কেউ মনে করেন রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য ভাবনায় অনেক কিছুই যোগ করেন। আবার কারো ধারণা, তিনি নিজেকে অতিরক্ষণশীলতার বলয় থেকে বের করে আনতে পারেননি। রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করলে স্বাধীনতা ও যুক্তিবাদিতার ওপর ঝোঁক রবীন্দ্রনাথের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন ভারতের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর মতে, জাতীয় মুক্তি অর্জিত হওয়া উচিত সম্মান, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, জ্ঞান ইত্যাদি দ্বারা; ভিক্ষা বা সহিংসতার মাধ্যমে নয়। বিশ শতকের মূল্যায়নে ধরা পড়েছে যে তাঁর কাব্য অনেক বেশি রোমান্টিকতাশ্রয়ী ও আধুনিক, কিন্তু মৃত্যু পরবর্তী মূল্যায়নে তাঁর মানবতা ও আদর্শবাদ বেশি নজরে পড়েছে।
রবীন্দ্রনাথ পঠন-পাঠনের কিছু বিশেষ বিষয় রয়েছে। তাঁর রচনার ব্যাপকতা যেমন আছে তেমনি আছে বৈপরীত্য। ভারতীয় সমালোচকরা তাঁর লেখনীর এই বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে সেগুলোর প্রাসঙ্গিকতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন। শিক্ষাবিদ ও গ্রাম-সংস্কারক হিসেবেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। তাছাড়া তিনি উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রতর্ক নির্মাণে অবদান রেখেছেন। আর এই বিষয়গুলোই তাঁর রচনার বহুমাত্রিকতা নির্দেশ করে। ভারতীয়রা এর পরম্পরা বহন করে। ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস তাদের বাধ্য করে এই প্রসঙ্গে মনোনিবেশ করতে এবং পাশ্চাত্যের সাথে বিতর্কে জড়াতে। এভাবেই একটি প্রাচ্য-প্রতীচ্য বিতর্কে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বিশেষ ভিত্তি লাভ করেছে। এখানে প্রশ্ন উঠেছে যে, ভারত ছাড়া তিনি অন্যান্য প্রাচ্যদেশ সম্পর্কে কতটুকু জানতেন? একটি অভিজাত সামন্ততান্ত্রিক পরিবারে জন্মে এবং ঔপনিবেশিক পরিবেশে মানুষ হয়ে তাঁর সাংস্কৃতিক অর্ন্তদৃষ্টি একটি অভিজাত ভারতীয় ধারায় ধাবিত হয়েছিল যেখানে আধ্যাত্ম ও বস্তুবাদী বৈশিষ্ট্যের মাঝে একটি বড়সড় বিভেদরেখা ছিল। সেখানে প্রাচ্য-আধ্যাত্মবাদই তাঁর দর্শনের একমাত্র বৈশিষ্ট্য নয়, আর তাই তা সর্বজনীন সহমর্মিতা লাভ করতে পারেনি। অন্য এশিয় দেশসমূহ সম্পর্কে বিশেষ জানাশোনা না থাকা সত্ত্বেও তিনি এশিয়ার সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, যখন আমরা ইউরোপীয় সভ্যতা সম্পর্কে কথা বলি তখন যে পদই ব্যবহার করি তার শাব্দিক অর্থ একই রকম, কিন্তু যখন প্রাচ্যমন ও সংস্কৃতির কথা বলি তখন কোনো সর্বজনীন বা একই সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বোঝাতে পারি না, কারণ প্রাচ্যের সংস্কৃতি এতটাই ছড়ানো-ছিটানো। প্রকৃতপক্ষে, রবীন্দ্রনাথের বহুমাত্রিকতা নজরে পড়ে আইনস্টাইন ও রোমাঁ রোলাঁর সাথে তাঁর কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। শিল্পকলা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, যুক্তিবাদ ইত্যাদি তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল, কিন্তু নিদেনপক্ষে রবীন্দ্রনাথ প্রাচ্যবাদের ধারণাটা প্রতীচ্য মগজে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছিলেন যা পাশ্চাত্যের মোড়লিপনার বিরুদ্ধে দুর্বল হলেও একটি প্রতিবাদ ছিল। পুনর্মুদ্রণ

//জেডএস//

x