কিস্‌সা কথক আফসার আমেদ

ইরা সামন্ত ১২:১৭ , আগস্ট ০৭ , ২০১৮

আফসার আমেদ [৫ এপ্রিল ১৯৫৯-৪ আগস্ট ২০১৮]
প্রথম প্রথম অনেকেই ‘আমেদ’কে ‘আহমেদ’ মনে করে গুলিয়ে ফেলেছে। কিন্তু তার তা আর কতক্ষণ! উপন্যাসের কয়েক পাতা যেতেই বারবার প্রচ্ছদে লেখকের নাম উচ্চারণ করে সহজেই ‘আমেদ’ শব্দটি আত্মস্থ হয়ে যায়।

বলছি কথাসাহিত্যিক আফসার আমেদের কথা। ক’দিন আগেও অরুণ মিত্র তাকে নিয়ে স্মৃতিকথা লিখেছেন। তখনো প্রাণবন্ত আফসার আমেদ সেই লেখার কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে একটি দীর্ঘ লেখা লিখেছিলেন। সেই লেখার সূত্রে আমরা অনেক ঘটনা জেনেছি।

কথাসাহিত্যিক আফসার আমেদকে পেয়েছি ১৯৯৮ সালে। সে বছর তার প্রকাশিত উপন্যাস ‘এক আশ্চর্য বশীকরণ কিস্‌সা’ পড়তে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছি আর মুগ্ধ হয়েছি। ম্যাজিক রিয়ালিজম তার লেখায় আছে কি নেই, সেসব তর্কে না গিয়ে বলবো ঘটনার আপাত বর্ণনার মধ্যে দিয়ে যে প্রতীকী বাস্তবতার ক্যানভাস তিনি রচনা করেছেন, তা যেন তার গল্প-উপন্যাসের কাহিনীগুলোর মধ্যে অন্য এক বৃত্তান্ত হাজির করে। পাঠক আপনা আপনি চলে যেতেন পাঠক্রিয়ার মধ্যে। আপনাতেই পাঠকের করোটিতে ফুটে ওঠে অন্তর্গত বাস্তবতা। যেন রচনার ভেতর কাহিনী চলছে এক ধরনের, পাশাপাশি মস্তিষ্কে উঁকি দিচ্ছে আরও আরও ঘটনা।

তার সম্পর্কে হিন্দোল ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘আফসার আমেদ ছিলেন প্রকৃতপক্ষেই সেই নিখোঁজ মানুষটি, যিনি এক আধুনিক রূপকথার মতোই আমাদের এই বাংলা সাহিত্যে এনে দিয়েছিলেন নিম্নবর্গ ও মুসলিম সমাজের ভাষ্য, তাদের জীবন যন্ত্রণা, কাহিনী ও সমাজের অন্দর মহলের কথা।’

ভারতে প্রাদেশিক ভাষা বাংলায় তেমন চর্চা হয় না বলে আফসার নিযুক্ত ছিলেন অনুবাদের কাজে।

‘ঘরগেরস্তি’ দিয়ে যার সাহিত্যের পথে যাত্রা। সেই মানুষটি মিশে গেলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ অসামান্য কিছু কিস্‌সায়। উপন্যাসের একটি অর্থ যে কথন, যা প্রায় আমরা ভুলতে বসেছি এই সময়ে, তা আফসার আমেদ তার সারা জীবনের সাহিত্যকর্মে নানাভাবে প্রতিফলিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তবু এই কথন, সোজাসাপ্টা ন্যারেটিভ নয়। এর মধ্যে মিশে যায় পরাবাস্তবের নানান স্পর্শ, নানান গলিঘুঁজি, আলো-অন্ধকার। মূলত, বাস্তবের এক পরাবাস্তব রূপের মধ্যেই তিনি বাস্তবের কঠিন কাঠামোগুলিকে তুলে ধরেন আমাদের সামনে। পাই হলুদ পাখির কিস্‌সা, মেটিয়া বুরুজে কিস্‌সা, এক ঘোড়সওয়ারের কিস্‌সা, হিরে ভিখারিনি ও সুন্দরী রমণী কিস্‌সার মতো অসামান্য কিছু উপন্যাস। এই কিস্‌সা সিরিজের উপন্যাসগুলি বাংলা সাহিত্যের এক চিরকালীন সম্পদ হয়ে থাকবে বলাই বাহুল্য।

বাস্তব পরাবাস্তবের ভেতর অনায়াস যাতায়াত তার লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য। পুরস্কৃত উপন্যাসের দিকে খেয়াল করতে তা স্পষ্ট হবে অনেক দিন আগে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া একটি শিক্ষিত মানুষ হঠাৎ গঞ্জে ফিরে আসে। গ্রামবাসীর কাছে যায়। বিড়ম্বিত গ্রামবাসীদের নানান বিড়ম্বনা নিরসনের উপায় সে বলে দিচ্ছে। দোলাচলের মধ্যে তারা লোকটার আশ্বাস বাণীতে সন্তুষ্ট। তারপর আবার একদিন উধাও হয়ে যায় লোকটি। উপন্যাসটি যেন এক আধুনিক রূপকথা।

আফসার আমেদ ১৯৫৯ সালের ৫ এপ্রিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত হাওড়ার কড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষ করে প্রথম কর্মজীবনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। তবে শেষমেশ থিতু হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অকাদেমিতে। ‘মেটিয়া বুরুজে কিস্‌সা’ নামে একটি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপির জন্য ১৯৯৫ সালে ভারত সরকারের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের সাংস্কৃতিক শাখা থেকে ফেলোশিপ দেওয়া হয় তাকে। ‘সেই নিখোঁজ মানুষটা’ উপন্যাসের জন্য ২০১৭ সালের সাহিত্য অকাদেমী পুরস্কার সহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। আফসার আমেদের প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ২৫-এর বেশি; এছাড়া গল্প সংকলন ও মৌলিক গল্পের বই মিলিয়ে ১৪ টি। ১৯৯৬ সালে ‘আশ্রয়’ শিরোনামে অনুবাদ করেছেন সিন্ধি ভাষার লেখক হরি মেটোয়ানির একটি উপন্যাস। এছাড়া ‘সাড়ে তিন হাত ভূমি’ শিরোনামে অনুবাদ করেছেন আব্দুস সামাদের একটি উর্দু উপন্যাস।

সবশেষে, একটি ঘটনা বলে শেষ করা যাক। একবার এক সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়েছিলো তিনি গল্প বা উপন্যাস লেখেন সেগুলো কাদের জন্য লেখেন। আফসার আমেদের মুখে হাসি ফুটে উঠেছিলো। তিনি বলেছিলেন, ‘নিজের জন্যই গল্প লিখি। ছাপার পরে সেটা সকলের হয়ে যায়। তখন আমার হাতে থাকে না বলে আবার একটা গল্প লিখি। পাঠকের কথা ভেবে গল্প লিখতে চাইলে লিখতেই পারতাম না। মনে হয়, না ছাপলেই কত ভালো হতো। পাঠকরা মশা মারবেন, না গল্প পড়বেন? ব্যাঙ্কে লাইন না দিয়ে, আয়ের হিসেবে গরমিলের সুযোগের সময় না দিয়ে, শীতে লেপ মুড়ি না দিয়ে শুয়ে, নারী-পুরুষ যৌনতায় না গিয়ে, মাছের কাঁটা বাছার সময় দেবেন, না গল্প পড়বেন? তারপর টেলিবন্ধন, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বাদ যাবে যে! লাফিং ক্লাব বাদ যাবে কেন? হাসুন। হাসি স্বাস্থ্যের জন্য উপকার। পাঠকের কথা মনেই থাকে না। হা-হা-হা।’

কিস্‌সা কথক আফসার আমেদের প্রয়াণে জানাই শোক ও শ্রদ্ধা। 

//জেডএস//

x