চেনা সুরের রাগ-রঙ

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় ১৩:৫৪ , আগস্ট ০৮ , ২০১৮

অনেক সময় একটি রাগের সঙ্গে আরেকটি রাগের মিশ্রণ ঘটিয়ে নতুন একটি রাগের সৃষ্টি করা হয়, যা পৃথক একটি রাগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েও পর্যায়ক্রমে মূল দুটি রাগের রূপের উদ্ভাস ঘটায়। সে এক আলাদা সৌন্দর্য, আলাদা অভিজ্ঞতা। এই ধরনের রাগকে মিশ্র রাগ বলে।

মিশ্র রাগ অনেক, কিন্তু তাদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নামটি হলো ‘বসন্ত-বাহার’। বসন্ত এবং বাহার- দুটি পৃথক রাগ। দুটি রাগই বসন্ত ঋতুর ভাবকে প্রকাশ করে এবং তাদের সম্মিলনে ‘বসন্ত-বাহার’। ঠিক একই রকম, ভৈরব এবং বাহারের সম্মিলনে ‘ভৈরব-বাহার’। ভৈরব এবং আহিরী- এই দুটি রাগের সম্মিলনে সৃষ্টি হয় ‘আহির-ভৈরব’। এই রাগটিও এখন আমাদের কাছে সুপরিচিত। নাম হয়তো জানি না, সুরে চিনি।

প্রথমেই বলব, একটি নজরুলগীতির কথা। ‘অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারী...’ গানটি প্রায় সবারই চেনা। এটি আহির-ভৈরব রাগে বাঁধা এবং যে কথা একটু আগেই বলেছি, কাজী নজরুল ইসলাম এর বাণীর মধ্যেই রাগটির নামের আভাস রেখে দিয়েছেন। ‘... অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারী’- এই প্রথম বাক্যে ‘যোগী ভিখারী’- শিব, অর্থাৎ ভৈরব নামটির আভাস দেয়া হলো। এরপর, চতুর্থ বাক্যে আভাস আরেকটু স্পষ্ট হলো, যখন শ্রী রাধা বলছেন, ‘রাস-বিলাসিনী আমি আহিরিণী’- তখন আসলে ‘আহিরী’ রাগটিরই আভাস দেওয়া হলো। রাগটির নাম আরো স্পষ্ট হলো অষ্টম পঙ্ক্তিতে, যখন রাধা বলছেন, ‘... হে ব্রজেশ ভৈরব আমি ব্রজবালা’।

এ গান শুনতে শুনতে অভিভূত হয়ে যাই, শ্রী রাধা এক হয়ে যান পার্বতীর সাথে যখন ব্রজের কৃষ্ণ আর কৈলাসের শিব এক হয়ে যান। এ দৃষ্টি প্রকৃত প্রাজ্ঞের যিনি জানেন যে এই জগৎজোড়া আপাত বহুত্বের মধ্যে আসলে একই সত্য বিরাজ করছেন। যিনিই কৃষ্ণ, তিনিই শিব, যিনিই রাধা, তিনিই পার্বতী, যিনি ঈশ্বর, ভগবান, ব্রহ্ম, তিনিই আল্লাহ, তিনিই গড। তাই তিনি তার গানের মধ্যে দিয়ে অনায়াসেই পৌঁছে যান জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের হৃদয়ে।

একই সত্য, পন্ডিতেরা তাকে নানা নামে উল্লেখ করেন। ‘একং সদ্বিপ্রাঃ বহুধা বদন্তি’। কাজী সাহেবের গানের সূত্র ধরে আমরা আবার এই মহান সত্যের কাছে পৌঁছে গেলাম। ‘আহির-ভৈরব’ রাগের মধ্যে আমরা প্রত্যক্ষ করলাম পরমেশ্বর বৃন্দাবনলীলা এবং কৈলাসলীলার মহামিলন! এই সুরটি কি আপনাকে খুব পরিচিত আরেকটি হিন্দি গানের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে? গানটি মান্নাদের গাওয়া। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। গানটি হলো, ‘পুছো না ক্যায়সে ম্যায়নে রয়ন বিতায়ি’। এই গানটিও শুনুন। কিন্তু শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কথা উঠলে, আমি প্রথমেই বলব, সেই বিখ্যাত খেয়ালটির কথা- ‘আলবেলা সাজন আওরে / মোরা আত্মন সুখ পায়োরে’। গানটির অনেক রেকর্ড আছে, কিন্তু আমার সবচাইতে বেশি মনে পড়ে পন্ডিত বাসবরাজ রাজগুরুর গানটির কথা। আরেকটি গান, শিল্পী পারভিন সুলতানা। আর যন্ত্র সঙ্গীতে দুটি রেকর্ডের মধ্যে একটি সরোদ, শিল্পী ওস্তাদ আলি আকবর খাঁ এবং অন্যটি সানাই, শিল্পী বিসমিল্লা খাঁ।

কাজী নজরুল ইসলামের গানে, আরো অন্ততঃ ...... রকমের ভৈরবের সন্ধান পাওয়া যায় এবং সেগুলি হলো, আনন্দভৈরব, অরুণভৈরব, বিরাটভৈরব, বিষ্ণুভৈরব এবং উদাসীভৈরব। এসব রাগ বেশ প্রাচীন এবং এর মধ্যে প্রায় অধিকাংশ রাগই বেশ অপ্রচলিত। তবু গানগুলির মধ্যেও যেমন এইসব রাগ ধরা আছে, তেমনি এই গানগুলির মধ্যে আবার রাগের নামও বলা আছে, কখনো বা স্পষ্টভাবে আর কখনো সুকৌশলে- আভাসে। এসব রাগের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের রেকর্ড পাওয়া সহজ হবে না; তবু নজরুলগীতি শুনলে এসব রাগ চিনতে নিশ্চয়ই সুবিধা হবে। যেমন ধরুন, ‘জয় আনন্দভৈরব ডমরু পিনাক পানি’, গানটি স্পষ্টতই ‘আন্দভৈরব’ রাগাশ্রিত। দ্বিতীয় গানটি হলো, ‘জাগো অরুণ-ভৈরব জাগো হে শিব ধ্যানী’- ‘অরুণ-ভৈরব’ রাগাশ্রিত এবং ‘জাগো বিরাট-ভৈরব যোগ সমাধি মগ্ন’ গানটি ‘বিরাটভৈরব’ রাগাশ্রিত। ‘উদাসী-ভৈরব’ নামে ভৈরবের আরেকটি প্রকার আছে। উদাসী-ভৈরব রাগে নজরুল গীতিটির বাণী হলো, ‘সতী হারা উদাস-ভৈরব কাঁদে।’ তবে ‘বিষ্ণুভৈরব’ রাগে গানটির মধ্যে নামটা আছে কিন্তু একটু বিচ্ছিন্নভাবে। গানটা হলো, ‘বিষ্ণুসহ ভৈরব মধুর মিলনে।’

নজরুলগীতির সমুদ্র মন্থন করে এরকম নানা রাগসম্বলিত গানের একটি দীর্ঘ তালিকা পেশ করা যায়, যাতে গানের বাণীর মধ্যেই রাগের নামটি বলা আছে বা তার ইঙ্গিত দেওয়া আছে। আমি এর মধ্যে থেকে কিছু গান নিয়ে একটি তালিকা এই নিবন্ধের শেষে যুক্ত করছি। তবে আবার বলে রাখি এর মধ্যে সব রাগ এতটা প্রচলিত নয় বলে সে বিষয়ে খুব বিশদভাবে আলোচনায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই; কিন্তু, বেশ কিছু প্রচলিত রাগের এক আশ্চর্য সম্ভারও এই সঙ্গে থাকছে। সময়মতো সে সব রাগের প্রসঙ্গ আসবে। কিছু স্বল্প প্রচলিত রাগের সঙ্গেও পরিচয় হবে এই সূত্র ধরে, যেসব রাগে অন্য কোনো বাংলা গান প্রায় নেই বললেই চলে।

যাই হোক, রাগগুলিকে প্রচলিত, স্বল্প প্রচলিত এবং অপ্রচলিত- এই তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করে তালিকাটি আপনাদের সুবিধার জন্য সাজিয়ে দেওয়া হলো :

 

“নীলাম্বরী”

‘নীলাম্বরী শাড়ি পরি নীল যমুনায়

কে যায় কে যায় কে যায়। ...’

গানটি নীলাম্বরী রাগাশ্রিত। এই রাগটি বর্তমানে উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতের প্রচলিত হলেও, আসলে কর্ণাটকী রাগ। উদাস, শান্ত ভাবের এই রাগটি শ্রবণ মাত্র যেন মনে হয়, দু’চোখ নীলাভ, স্নিগ্ধ এক আলোর আবরণে আচ্ছন্ন হয়ে এল! সঙ্গীতজ্ঞদের মতে এ রাগের সময় হলো রাত্রি প্রথম প্রহর, অর্থাৎ রাত্রি দশটা থেকে একটা। কিন্তু সে রাত্রির মধ্যে কোনো অন্ধকারের আড়াল নেই, তার সর্ব অবয়বজুড়ে শুধু সেই নীলাভ আলোয় যমুনা পুলিনে চলেছেন নীলাম্বরী শাড়ি পরিহিতা শ্রীরাধা।

আমার শ্রবণে ‘নীলাম্বরী’ রাগটি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রহরে, দিনের কোনো একটি বিশেষ সময়ে বাঁধা পড়ে না। না দিন, না রাত্রি, না দুপুর, না বিকেল ... সে যেন এক নিশ্চল অনন্ত সময়ে স্থির হয়ে আছে! ... এর কূল কিনারা মেলে না!

এ ভাবেরই প্রকাশ ঘটেছে, পন্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের সেই অবিস্মরণীয় রেকর্ডটিতে। খেয়াল, রাগ নীলাম্বরী। এই গানটি শুনলে নীলাম্বরী রাগটিকে তার স্বরূপে প্রত্যক্ষ করবেন ভুবন ভরা এক আশ্চর্য নীলাভ আলোয়। গানটি শুনুন।

 

 

“নটবেহাগ”

“রুমঝুম রুমঝুম নূপুর বোলে!

বনপথে যায় ওকে বালিকা / গলে শেফালিকা / মালতী মালিকা দোলে।

চম্পা মুকুলগুলি / চাহে নয়ন তুলি / নাচে নট-বিহগ শিখী তরুতলে।।”

 

লক্ষণীয়, নটবেহাগ কবির চোখে নৃত্যরত পাখির রূপ ধারণ করে ‘নট-বিহগ’ হয়েছে। কী অসামান্য কবিত্ব থাকলে এমনভাবে দেখা যায়, তা ভেবে পাই না।

রবীন্দ্রনাথের বহু গানের উৎস খুঁজলে, আমরা জানি, কোনো খেয়াল-ধ্রুপদ কিংবা হয়তো কোনো লোকগীতিই খুঁজে পাওয়া যাবে। এগুলি তার ‘ভাঙা গান’ নামেই পরিচিত এবং সে হিসেবে এই গানটিকে আমরা নজরুল ইসলামের ভাঙা গান হিসেবেই চিহ্নিত করতে পারি।

এই গানটির উৎস ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর গাওয়া নটবেহাগ রাগে রাগে একটি খেয়াল। গানটির বাণী হলো, ‘ঝন্ ঝন্ ঝন্ পায়ল বাজে...’। ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁরই রচিত এবং শুনেছি, নটবেহাগ রাগটির স্রষ্টাও তিনিই। সেটা খুবই সম্ভব মনে হয়, কারণ এ রাগের দ্রুত খেয়ালের আর কোনো গানও তো শুনিনা। যাই হোক, এই গানটি না শুনলে, মনে হয়, ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কিছুই শোনা হলো না!

তবে রাগটির চলন মনের মধ্যে গেঁথে নিতে হলে কাজী সাহেবের এই গানটি পাশাপাশি শুনুন। দুটি সুন্দর রেকর্ডে দুজন শিল্পীর কণ্ঠে গানটি পাবেন। প্রথম শিল্পী দীপালি নাগ, যিনি আগ্রাঘরণায় অর্থাৎ ফৈয়াজ খাঁর ঘরাণায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন ওস্তাদ তসদ্দুক হুসেন খাঁর কাছে। অতি মধুর কণ্ঠের অধিকারিণী এই গায়িকার কণ্ঠে গানটি শুনুন। অবশ্য গানটি যখন রেকর্ড করেন তখনো তিনি দীপালি তালুকদার ছিলেন। সেটা ১৯৩৯ এর কথা। এই গানটির আরো একটি উল্লেখযোগ্য রেকর্ড করেছিলেন ইলা বসু। এঁরও কণ্ঠ সুমধুর।

কিন্তু, ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের গানটি অনুসরণে রচিত আরো একটি গানের কথাও কিছুতেই ভোলা যায় না। শিল্পী শচীনদেব বর্মনের কণ্ঠে, ‘ঝন্ ঝন্ ঝন্ মঞ্জীর বাজে / বাজে দূর বনতল ছায়ে / শুনি হিয়া মাঝে’। কার রচনা আজ আর মনে পড়ে না। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, মীরা দেববর্মনের, কিন্তু নিশ্চিত নই। যারই হোক রচনাটি অতি সুন্দর, আর গায়কের তো কথাই নেই।

এই সব রেকর্ড শুনলে নটবেহাগ রাগটির সঙ্গে পরিচয় অবশ্যই হবে এবং সেটা আরো গভীর হবে, ওই একই খেয়াল শুনুন, মল্লিকার্জুন মনসূরের কণ্ঠে, শরাফৎ হুসেন খাঁর কণ্ঠে...

নটবেহাগ রাগটি সম্পর্কে বলি, এটি রাত্রির রাগ এবং বলাইবাহুল্য এর প্রধান রস হলো শৃঙ্গার। বেহাগ এবং নট এই দুটি রাগের সম্মিলনের রাগটির সৃষ্টি। নট রাগে কোনো বাংলা গান আছে বলে জানি না, তবে পন্ডিত ওঙ্কারনাথ ঠাকুরের গাওয়া এই রাগে একটি অসাধারণ রেকর্ড আছে। অবশ্যই শুনবেন। ... আর বেহাগ রাগে বাংলা গানের অভাব নেই। অজস্র রবীন্দ্রসঙ্গীতও আছে যেমন, ‘জাগে নাথ জোছনা রাতে’, কিংবা ‘দীপ নিভে গেছে মম নিশীথ সমীরে’, অথবা ‘শুধু যাওয়া আসা স্রোতে ভাষা’, ...

আর বেহাগ রাগে খেয়ালের প্রসঙ্গে মনে পড়ছে পন্ডিত নারায়ণ রাও ব্যাসের গাওয়া একটি বহু পুরোনো ‘সেভেন্টি এইট আরপিএম’ রেকর্ডের কথা। গানটির বাণী এই রকম- “আব তো কব্ হুঁ কর জানি দো...’। আর শাস্ত্রীয় যন্ত্রসঙ্গীতে বেহাগ বললে প্রথমেই মনে পড়ে ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর বেহালায় সাড়ে তিন মিনিটের একটি গৎ। সেটিও ওই ‘সেভেন্টি এইট আরপিএম’  রেকর্ডে।

‘বেহাগ’ রাগটি প্রসঙ্গে পরে আরো বিস্তারিতভাবে কথা হবে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে সমস্ত রাগের মধ্যে বেহাগের মতো এমন রসঘন এবং গভীরভাবে হৃদয়বিদারক রাগ আর আছে কিনা সন্দেহ। কিন্তু সেসব কথা পরে। আপাতত, যে কথা বলছিলাম, কাজী নজরুলের গীতিকবিতায় রাগের নামোল্লেখ প্রসঙ্গে, তার কিছু কথা এখনো বাকি আছে। (চলবে)

//জেডএস//

x