নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড।। গর্ত-মানবের চিৎকার

জাহেদ সরওয়ার ০৬:০০ , আগস্ট ১০ , ২০১৮

‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ শব্দটি বৈপ্লবিক। আন্ডারগ্রাউন্ডের সাথে জড়িত বিষয়াশয় বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড বোঝায়। যেমন আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্স, আন্ডারগ্রাউন্ড সিনেমা, আন্ডারগ্রাউন্ড সাহিত্য ইত্যাদি। বৈপ্লবিক বা সমকালীন ব্যবস্থা বা দুঃশাসনের বিরুদ্ধে অবস্থানরত সমস্ত শিল্প সাহিত্য চিন্তা সবকিছু এই নাম দিয়ে আখ্যায়িত হওয়ার চল আছে। ফলে কোনো বইয়ের যখন নাম হয় ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’, তখন আমরা সেটাকেও প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে থাকা কোনো লেখকের বই হিসাবে সন্দেহ পোষণ করতে পারি। দস্তইয়েভস্কি রচিত ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’ মোটামুটি পাঠকনন্দিত বই। বইটিকে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে তকমা দেওয়া যায় না। উপন্যাসের সমস্ত লক্ষণ থাকার পরও প্রশ্ন জাগে এটা কি আসলে ফিকশন না দর্শনের বই?
ফরাসি চলচ্চিত্রকার গদার একবার বলেছিলেন, তিনি ক্যামেরা দিয়ে প্রবন্ধ লেখেন। সেভাবে দেখতে গেলে দস্তইয়েভস্কির এই বইটি সম্পর্কেও এ কথা খাটে যে তিনি উপন্যাসের মোড়কে প্রবন্ধ বা দর্শন লেখেন অথবা প্রবন্ধাকারে উপন্যাস লেখেন। যদিও দস্তইয়েভস্কির সব বই সম্পর্কে এই সিদ্ধান্ত চলে না। এই ধারার লেখাগুলোকে ফরাসিরা নাম দিয়েছিলো ‘নতুন উপন্যাস’। যেমন লুইজি বাত্তোলিনির ‘সাইকেল চোর’ বা মারগুরিত দ্যুরাসের ‘লামঁ’ ইত্যাদি।

বইটিতে সার্বিকভাবে একজন ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ (ইচ্ছে করেই এখানে ‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। কারণ ইংরেজি ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ যা ধারণ করে, বুদ্ধিজীবী শব্দটি ততখানি বহন করে না মনে করি।) ব্যক্তি আত্মচরিত্রের বর্ণনার মধ্য দিয়ে নিজেকে অন্যান্য বুদ্ধিজীবীর থেকে আলাদা করার প্রয়াস চালায়। যেমন তিনি নিজেকে আলাদা ভাবেন তেমনি নিজেকে এমন করে ভাবেন যার সমাজে কোন অবস্থান নেই। অলিখিতভাবে তিনি প্রচলিত সমাজের এক মূর্তিমান সমস্যাও বটে।

বইয়ের শুরুতেই দস্তয়েভস্কি বলেন এভাবে- ‘মেধাবী মানুষ শেষ পর্যন্ত ঐকান্তিকভাবে কিছুই হয়ে উঠতে পারে না। কিছু একটা হয়ে ওঠা নির্বোধের কাজ। হ্যাঁ, ঊনবিংশ শতাব্দীর মানুষকে অবশ্যই নৈতিকভাবে হতে হবে খাঁটি চরিত্রহীন প্রাণী। চরিত্রবান আর সৃজনশীল মানুষদের সীমাবদ্ধতা অসীম।

অতিশয় সচেতন হওয়া কিন্তু এক ধরনের অসুখ। দৈনন্দিন জীবনে মানুষের সাধারণ মানের মানবিক হলেই চলে যায়।’

এভাবেই দৈনন্দিনতার সাথে, বন্ধুদের সাথে, সহকর্মীদের সাথে, সমাজের সাথে, রাষ্ট্রের সাথে, সভ্যতার সাথে একজন সত্যিকার অর্থে বিদ্বজ্জনের সংঘর্ষ শুরু হয়।

দস্তয়েভস্কি বিদ্বজ্জনকে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের ‘চেতনাগত মাত্রা’ দিয়ে আলাদা করেন। সবকিছু সম্পর্কে অতিশয় সচেতনতাকে তিনি একপ্রকার অসুখ বলে মশকরা করেন। অতিরিক্ত চেতনাকে বিনষ্টির শেষ সীমা বলেন।

তিনি বলেন, ‘যার জন্য আমি কোনোভাবেই দায়ী নই, যা কেবলই প্রকৃতির ব্যাপার, তার জন্য নিজেকে অপরাধী ভাবাটা আমার কাছে রীতিমতো বিব্রতকর। বিশেষভাবে দায়ী কেন? চারপাশের অন্য মানুষদের তুলনায় আমি বেশি বুদ্ধিমান তাই?

এই চেতনা যা মানুষের ভেতর জাগিয়ে তোলে ‘কাণ্ডজ্ঞান’। যেখান থেকে উৎপন্ন হয় কর্তব্যবোধ। একেবারে ব্যক্তিলাভের বাইরে গিয়ে সে এমন একটা দায়িত্ববোধের কাছে দেনাদার। যার ভার তার ওপর কেউ চাপিয়ে দেয় নাই।

‘সচেতন’ পরিচয় আলাদা করার জন্য তিনি বলেন, সচেতনতার প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে জড়তা। মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা আর কী! আবার বলছি, আবার জোর দিয়ে বলছি, সব ‘কর্মবীর’ কিংবা করিতকর্মা মানুষ সবসময় কাজে ডুবে থাকে, কারণ তারা নির্বোধ। বুঝিয়ে বলি- যাদের ধীশক্তি সীমিত তারা খুব দূরের বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না, যে সমস্যা ঠিক কাঁধের ওপর এসে পড়েছে, সেটা সামাল দেওয়াই হয়ে ওঠে তাদের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান।’

বিদ্বজ্জন যারা, তারা হয়তো খুব করিতকর্মা নয়। শেয়ারবাজারে অধিক লাভের আশায় হয়তো তিনি বিনিয়োগ করেন না। হয়তো কালোবাজারি করে টাকা কামানোর ধান্ধাও করেন না; এই সব নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক দলের তোষামোদকারী কোনো রাজনীতিকও নন তিনি। কিন্তু মানবজাতির সামগ্রিক বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার একজন পাহারাদার ও প্রতিনিধি। সারকথা- সে এমন এক বিবেকের স্রষ্টা, অন্যায় করার আগে ও অন্যায় দেখার পরে যে নিজেকেই জর্জরিত করে প্রশ্নবাণে। কিন্তু সভ্যতার নামে একটা সমাজ যখন মানুষের আদিম পাশবিক প্রবৃত্তির বেড়াজালে ঘুরপাক খেতে থাকে তখন বিদ্বজ্জন কী করতে পারে?

“হায় রে ভাই নিজেকে আমার খুব বুদ্ধিমান মনে হয়, জানেন? কারণ সারাজীবন আমি না-পেরেছি কিছু শুরু করতে, না শেষ করতে। ধরে নিয়েছি আমি একজন মানুষ যার কাজ শুধু কথার ফানুস ওড়ানো। হয়তো বিরক্তির উদ্রেক করি, কিন্তু যখন দেখা যাচ্ছে সব বুদ্ধিমান মানুষের প্রত্যক্ষ এবং একমাত্র পেশা হচ্ছে কথার ফানুস ওড়ানো, তখন কী করার থাকে?”

অনেক বিদ্বজ্জনই জগতে নিরন্তর মানুষের স্বভাব তার পরিবর্তনশীলতা তার অর্জন ও মানবিকতা নিয়ে এই কথা বলেছেন এখনো বলছেন কিন্তু যেন সবকিছু শুধু কথার ফুলঝুরি। কিন্তু এগুলো মানবের প্রাণিসুলভ হিংস্রতার কোনো রকম হ্রাস করতে পারে না। আমরা কী বলব তাহলে ব্যর্থ?

ফলে নিজের অবস্থান শনাক্ত করা যেমন একজন বিদ্বজ্জনের পক্ষে প্রয়োজনীয় তেমনি সমকালীন বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র বিশ্লেষণও জরুরি।

যে কারণে দস্তয়েভস্কি এই বইতে এমন কিছু চরিত্র সৃষ্টি করেছেন যাদের প্রশ্নের মধ্য থেকে এক ধরনের উত্তর আসে। এর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের প্রথমটি জেনারেল জেভারকভ ও দ্বিতীয়টি বেশ্যা লিসা।

জেভারকভ বর্তমান সামরিক দুনিয়ার দৃষ্টান্ত। জেভারকভের বিদায় সংবর্ধনাকে কেন্দ্র করে এমন কিছু মানুষের সাথে কথকের পূর্ণসম্পর্ক গড়ে ওঠে যারা কিনা একসময় কথকেরই সহপাঠী ছিল। একই স্কুলে, একই রাষ্ট্রে, একই সময়ে বাস করেও সহপাঠী ও কথকের পথ একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে। কারণ সহপাঠীরা অধিকাংশই বুদ্ধিজীবী। বুদ্ধিকে জীবিকা করে যারা ইতোমধ্যে সমাজে নিজেদের অবস্থান ও বিত্ত গড়ে তুলেছে। নতুন নতুন নারী শিকার আর নিজেদের অবস্থার ফসল, ও তা দেখিয়ে বেড়ানো ছাড়া যেন তাদের জীবনে আর কোনো লক্ষ্য নেই। যাদের কাছে একটা দুর্বোধ্য সহপাঠী ছিল কথক। যাকে নিয়ে তাদের কোনো দিন কোনো আশা ছিল না। এবং অনেক গুরুত্বের সাথে তাদের সঙ্গে মিশতে চেয়েও বারবার কীভাবে যেন ব্যর্থ হয়ে গর্তে লুকায় কথক। কারণ আসলেই একজন বিদ্বজ্জনের পথ একেবারেই আলাদা। হয়তো তার কথা মানবজাতিরই পক্ষে, কিন্তু তার কোনো প্রায়োগিক সত্তা নাই।

ফলে বেশ্যাবৃত্তি ছেড়ে দিতে পরামর্শ দেওয়ার পর বেশ্যা লিসা যখন তার কাছে প্রতিকারের প্রার্থনায় ছুটে আসে তখনও সে অসহায়। তাকে বলতে হয়:

‘আমার চেয়ে অপমানিত, লাঞ্ছিত, দুর্ভাগ্যবান আর কে? তুমি আরও অপমান যোগ করলে। আরও লাঞ্ছনা দিলে। তোমার জন্য আরও বড় দুর্ভাগ্য বরণ করতে হবে আমাকে।’

দস্তয়েভস্কির এই বইটি যেন উপন্যাস, দর্শন বা প্রবন্ধের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একজন গুপ্ত বিপ্লবীর ইশতেহার বা গর্ত-মানবের চিৎকার হিসেবে। 

//জেডএস//

x