দ্য এনিগমা অব এ ডিপারচার ভি. এস. নাইপলের প্রস্থানপর্ব

অমল চক্রবর্তী ১৬:৪৩ , সেপ্টেম্বর ০৪ , ২০১৮

আইরিশ কবি ইয়েটসের স্মরণে আরেক মহান কবি অডেন লেখেন:

'Earth Receive an honoured guest:

William Yeats is laid to rest.’

গত ১১ আগস্ট প্রয়াত হলেন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সাহিত্যিক স্যার ভি. এস. নাইপল। বংশসূত্রে ভারতীয় ব্রাহ্মণ, জন্মসূত্রে ত্রিনিদীয় ও কর্মসূত্রে ব্রিটিশ নাইপল প্রায় পাঁচ দশকের সাহিত্যযজ্ঞে উত্তর-ঔপনিবেশিক খাণ্ডবদাহনে বাস্তুহারা মানুষের নৈরাশ্য, অস্তিত্বহীনতা, নৈঃসঙ্গ ও নৈরাজ্যের নিখুঁত কথাচিত্র বিনির্মাণ করেছেন। ১৯৩২ সালে ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রাক্তন চুক্তিদাসের পরিবারে ভারতের গাঙ্গেয় অববাহিকার বহুদূরে ত্রিনিদাদের এক আখ-উপনিবেশ চোহানাতে জন্ম নেয়া নাইপল ১৯৫০ এর শুরুতে অক্সফোর্ডে উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে আর ফিরলেনই না জন্মভূমি ত্রিনিদাদে। পরবর্তী পাঁচ দশক জন্মভূমি ও আত্মপরিচয়ের ঠিকুজি খুঁজতে সারাপৃথিবী চষে বেড়ালেন। এই ইংল্যান্ডেই অস্তিত্ব ও আত্মসংকটের দ্বৈরথে রচনা করলেন উপনিবেশ-উত্তর পৃথিবীর জতুগৃহে শূন্যতা ও আত্মরতির মহাপুরাণ ‘আ হাউস ফর মি. বিশ্বাস’। সারাজীবন শেকড়হীন অনিকেত এই পরিব্রাজক যখন তার প্রবজ্যায় ইতি টানলেন বয়স তখন পঁচাশি, আর ঝুলিতে নোবেল পুরস্কার সহ সাহিত্য জগতের তালেবড় সকল শিরোপা।

ভি. এস. নাইপল লেখক হিসেবে অনেক বড়, কিন্তু তাকে নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্কের ইতিহাসও নাতিদীর্ঘ নয়। এই দু’দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের ‘The Republic’ পত্রিকার শিরোনাম স্মর্তব্য: 'V.S. Naipaul, a towering writer and deeply flawed man, is dead.'

মানসম্পন্ন মার্কিন দৈনিক ইউইয়র্ক টাইমসের ভাষায় ‘তিনি ছিলেন বিতর্কের চলমান বস্তা।’ এডওয়ার্ড সাঈদ ও চিনুয়া আচেবের মতো বিদগ্ধ উত্তর-ঔপনিবেশিক বেত্তাদের কাছে নাইপল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষের স্বনিয়োজিত সমর্থনকারী মাত্র। ১৯৯৪-এ প্রকাশিত 'Representation of the Intellectual' গ্রন্থে সাঈদ লেখেন ‘নাইপলের অনৈতিকতার চরম বহিঃপ্রকাশ এই যে, তিনি পশ্চিমা নিষ্পেষণের সচেতন ওকালতির দায়িত্ব নিয়েছেন।’ জীবিতকালে কনরাড, ডিকেন্স এবং টলস্টয়ের সাথে তুলনীয় নাইপলকে চিনুয়া আচেবে তার 'Home and Exile' গ্রন্থে তুলাধুনা করেছেন। কনরাড ও নাইপলের মতো লেখকের কাছে আফ্রিকা শুধু একটি বর্ণবিদ্বেষী চোখে দেখা অভিশপ্তভূমি মাত্র। আর নাইপল অঙ্কিত ইসলামের চিত্র তো সালমান রুশদী ও উইলিয়াম ডার্লিম্পলদের কাছেও অগ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। ১৯৯০-এ নাইটহুড পাওয়া নাইপল বর্ণবিদ্বেষী, নারীদ্বেষী, পুরুষতন্ত্রের নির্লজ্জ সমর্থনকারী ও ইসলামবিরোধী হিসেবে নানাভাবে নিন্দিত। এক সময়ের বন্ধু পল থুরোর মতে নাইপল ‘এক কুন্দলে বুড়ো’ মাত্র!

কিন্তু ভি. এস. নাইপল শুধুমাত্র ঔপনিবেশিক প্রভুর স্তুতিকারী নান্দিকার হলে তাকে নিয়ে এই আলোচনা মূল্যহীন হতো। নিউইয়র্কার পত্রিকার সাহিত্য সমালোচক জেন ক্রেমারের মতে নাইপল শূন্যতার এক মানচিত্রের সুমহান লেখক। ২০০১ সালে নোবেল কমিটি সাহিত্যের পুরস্কার দিয়ে এই স্তুতি করেছেন ‘নাইপল পুরস্কারে ভূষিত হলেন কারণ অনুভূতিপ্রবণ বর্ণনারীতি এবং তার সাহিত্যকর্মে কলঙ্কমুক্ত পর্যবেক্ষণ ভঙ্গীর সংযোগের মাধ্যমে অবদমিত ইতিহাসসমূহ উত্থাপিত করার সুযোগ দান করেছেন।’ আর প্রথিতযশা অভিবাসী সাহিত্যিক অমিতাভ ঘোষের কাছে এখনো তার প্রথম জীবনের নাইপল পাঠ স্মরণীয়তম অভিজ্ঞতা। নাইপলের মৃত্যুর পরে ইংল্যান্ডের গার্ডিয়ান পত্রিকার সম্পাদকীয় এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য: ‘তাঁর সাহসী মৌলিকত্ব এবং লেখনীর চরম সৌন্দর্য সকল পাঠকের কাছে প্রশংসনীয় করে রাখবে।’

সকল বৈপরীত্যের মধ্যেও ভি. এস. নাইপল অতুলনীয় তার অনুপম রচনারীতি, অনুকরণরহিত বর্ণনারীতি ও মার্জিত রসবোধের জন্য। নাইপল সচেতনভাবে বিতর্কিত, কিন্তু উপেক্ষণীয় নন।

এই দ্বিধান্বিত নাইপল পাঠ আমাদের কাছে পরিষ্কার করে নাইপলের ‘অন্ধকার জগত’কে। এই নামে তার সমধিক খ্যাত ভ্রমণকাহিনী ‘এ্যান এরিয়া অব ডার্কনোস’ এ যেমন আমরা দেখি নাইপলের মনোভূবন- ঘৃণা ও ভালোবাসা, সহানুভূতি ও উপেক্ষা, আকর্ষণ ও স্যাডিজমের সাংঘর্ষিক সহাবস্থান। প্যাট্রিক ফ্রেঞ্চ ‘দ্যা ওয়ার্ল্ড ইজ ওয়াট ইট ইজ’ এ অসাধারণ সততার সাথে নাইপলীয় প্রদোষ উন্মোচিত করেছেন নাইপলের সম্মতি নিয়েই। আমরা শিউরে উঠি, কিভাবে নাইপল তার প্রথম স্ত্রী প্যাট্রিসিয়া হেলকে বছরের পর বছর নির্যাতন করেছেন। কিভাবে প্রায় দুই দশক আর্জেন্টিনিয় বান্ধবী মার্গারেটকে নিয়ে দ্বিচারী জীবন কাটিয়েছেন আর প্রথম যৌবনে রাতের পর রাত পতিতাপল্লীতে সময় কাটিয়েছেন নাইপল। নাইপলের রহস্যময় মনোভূমি উন্মোচিত হলে আমরা বুঝি বাবা শ্রীপসাদ নাইপলের ব্যর্থতাবোধ, সাফল্যের জন্য আকাঙ্ক্ষা, ত্রিনিদাদের স্বল্প পরিসর উৎকেন্দ্রিক জীবনের ক্ষোভ, ইংল্যান্ডে প্রথম জীবনের তীব্র দারিদ্র্য ও উপেক্ষা সবকিছু মিলে নাইপলের মাঝে এক জটিল মোহনবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে যে, কিং লীয়ারের মতো পাগলের মতো একটু সম্মান, এক টুকরো জমি ও একটি অবস্থান তৈরি করতে চেয়েছে মাত্র। সারা জীবন নাইপল তার অকালপ্রয়াত বাবার পরিচয়হীনতার গ্লানি বয়ে বেড়িয়েছেন, আর ত্রিনিদাদ যেন তার কাছে বুড়ো নাবিকের গ্রীবায় ঝোলানো অ্যালবাট্রস। মাকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন ‘ত্রিনিদাদ বড় সংকীর্ণ। মূল্যবোধ ত্রুটিপূর্ণ আর লোকগুলো সংকীর্ণমনা।’ অথচ এই ত্রিনিদাদকে নিয়ে লেখা ‘দ্য মিগুয়েল স্ট্রিট’ ‘দ্যা মিস্টিক ম্যাসুর’ ‘এ হাউস ফর মি. বিশ্বাস’ তাকে জগৎ জোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছে। (শুধু ঘৃণা দিয়ে এই সৌধ নির্মাণ অকল্পনীয়, ভালোবাসা ও সংবেদনশীলতার বন্ধন যদি না থাকে)। ভি. এস. নাইপল আসলে শেকড়চ্যুত মানুষের অন্তর্জগতকেই তুলে ধরতে চেয়েছেন উত্তর-উপনিবেশের জতুগৃহে তাদের স্থাপন করে, যেখানে ‘এ বেন্ড ইন দি রিভারের’ সলিমের মতো বাস্তুহারারা বৃথাই নোঙ্গর খুঁজে মরে। ব্যক্তিজীবনে যতই অপূর্ণতা থাক, সাহিত্যকর্মে নাইপল অকপটভাবে জীবনভর পরিব্রাজক; ১৯৬৪ সালে ‘এ্যান নরিয়া অব ডার্কনেস’-এ নাইপল খোলামেলাভাবেই স্বীকার করেছেন-

‘এক বছরে আমি মেনে নিতে পারিনি ভারতকে। ভারতের সাথে আমার বিচ্ছেদকে আমি মানতে শিখেছি- অতীতশূন্য, পূর্ব পুরুষের নামশূন্য, এক উপনিবেশি উদ্বাস্তু হিসেবে।’

স্বীকার করতে বাধা নেই নিজের সম্পর্কে এই সরল উক্তি নাইপলের সততাকেই বিমূর্ত করে তোলে। উত্তর-ঔপনিবেশিক এশীয়, আফ্রিকান ও ক্যারিবীয়দের বিচ্ছিন্নতাবোধের মানচিত্র নির্মাণ করতে গিয়ে তিনি চিরন্তন ত্রিশঙ্কু অস্তিত্বের এই যাতনাই প্রকাশ করেছেন:

‘তবু কেন এত একাকি?

তবু আমি এত একাকি!’

এই অর্থে ভি. এস. নাইপল নিছক একজন উত্তর-ঔপনিবেশিক কথক নন; তিনি যন্ত্রণাক্ষুব্ধ নিরালম্ব মানবাত্মার মহান সূত্রকার।

সত্যানুসন্ধানকেই আজীবন জীবনসংগ্রামী ভি. এস. নাইপল তার সাহিত্যকর্মের গন্তব্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম’। অপ্রিয় ও প্রথাবিরুদ্ধ সত্যকে সন্ধান করার যে ব্রত ভি. এস. নাইপল তার জীবনের মোক্ষ হিসেবে নিয়েছিলেন তা যে অনেক শত্রুতা, মতান্তর ও মর্মান্তরের জন্ম দেবে তা সহজেই অনুমেয়। আলদ্যস হাক্সলির 'The Roots' উপন্যাসের নায়কের মতোন ত্রিনিদাদীয় ব্রাহ্মণপুত্র নাইপল ১৯৬৪ সালে ভারতে পিতৃভূমি সন্ধানে এসে জানলেন এই ভারত তার কল্পনার আদর্শভূমি থেকে বহুদূরে যেখানে তার কোনো ঠাঁই নাই। সত্তর দশকে আফ্রিকায় আর আশির দশকে মধ্যপ্রাচ্য আর মালয় উপদ্বীপের মুসলিম দেশগুলো ভ্রমণের ফসল- কাহিনীগুলোতে তার উন্নাসিকতা, উৎকেন্দ্রিকতা আর চরম নৈরাশ্য বিধৃত। এই স্থান সন্ধান তার মানসিক পটভূমি অধ্যায় এক সবিশেষ প্রেক্ষাপট। সাহিত্যবেত্তা আলফ্রেড কাজিনের মতে ‘আজকের দিনে, আর কেউই মনে হয় না গদ্য ও উপন্যাসে নির্বাসিত কণ্ঠ এতটা জোরালোভাবে নাইপলের মতো ধরে রেখেছেন।’ একবিংশ শতাব্দীর এই সময়েও ভি. এস. নাইপল তার মহৎ উপন্যাস- ‘এ হাউস ফর মিস্টার বিশ্বাস’, ‘দ্যা মিমিক মেন’ ‘এ বেন্ড ইন দ্যা রিভার’ ‘হাফ আ লাইফ’ ‘দ্যা এনিগমা অব অ্যারাইভাল’-এর মতো মহৎ সাহিত্য নিয়ে আমাদের বিস্মিত, চিন্তাগ্রস্ত ও মোহাবিষ্ট করে রাখেন।

মাত্র সতের বছর বয়সী এক দরিদ্র ব্রাহ্মণসূয় ভীরুপায়ে কলোনী থেকে ‘মেট্রোপলিটন কেন্দ্রে’ এসে অক্সফোর্ডের মতো নামী এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি নিয়ে স্থিত হবার চেষ্টায় ১৯৯০-এ রানীর কাছ থেকে নাইটহুড গ্রহণ করলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথায় তার ঠিকানা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এক দীর্ঘ জীবন, পাঁচ দশকে প্রায় ত্রিশটির মতো উপন্যাস ও ভ্রমণ কাহিনীর সম্ভার রেখে বিতর্কিত অস্তিত্বের ইতি টানলেন ভি. এস. নাইপল।

তার নিন্দুকেরাও তার সাহিত্যিক অর্জনে গৌরবান্বিত না হয়ে পারেন না। তাই সালমান রুশদী টুইটারে লেখেন ‘সারাজীবন ভিন্নমত পোষণ করেছি- রাজনীতি, সাহিত্য নিয়ে। কিন্তু তার মৃত্যুতে মনে হলো বড় ভাইকে হারালাম।’ রাজনৈতিকভাবে ভি. এস. নাইপল রক্ষণশীল, পশ্চিমা মূল্যবোধে বিশ্বাসী হলেও সাহিত্যিক হিসেবে আদ্যন্ত সত্যনিষ্ঠ। এমনকি চরম নাইপলদ্বেষী এডওয়ার্ড সাঈদও মনে করেন তার বিশ্বাস ও ভ্রান্ত আদর্শ ‘মানুষকে নাইপলকে প্রতিভাময় সাহিত্যিক হিসেবে ভাবা থেকে বিরত রাখতে পারবে না। ব্যক্তি নাইপলের সকল বৈপরীত্য, অসংলগ্নতা ও উন্মাসিকতা নিয়েও সাহিত্যিক ভি. এস. নাইপল চিরঞ্জীব।’ অডেন যেমন ইয়েটসকে নিয়ে লিখেছেন,

'You were silly like us; your gift survived it all.'

আসলেই কি নাইপল চলে গেলেন?

১২/৮/২০১৮

//জেডএস//

x