হাঙ্গার : সৃজনশীলতা বনাম ক্ষুধা

জাহেদ সরওয়ার ০৬:০০ , সেপ্টেম্বর ০৭ , ২০১৮


প্রাণী জগতের আত্মরক্ষার অন্যতম বা সবচাইতে দরকারি উপাদান খাদ্য। যে প্রাণী নিয়মিত পর্যাপ্ত খাদ্য পায় সে আত্মরক্ষা ও বংশবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপের দিকে এগুতে পারে। আর যে প্রাণী পর্যাপ্ত খাদ্য পায় না সে টিকে থাকার প্রথম ধাপেই ঘুরপাক খেতে থাকে। এখানে খাদ্য পায় বলা হচ্ছে কারণ খাদ্য ঠিক ব্যক্তিগত উৎপাদন সম্পর্কের সাথেও জড়িত নয়। পুঁজির বিকাশের সাথে সাথে খাদ্যও নিয়ন্ত্রিত হয়ে গেছে। ফলে পুঁজিবাদীরা জনগণের সাথে কী ধরণের উৎপাদন সম্পর্ক বাসনা করে তার ওপরই খাদ্যের বণ্টন নিয়ন্ত্রিত। যদিও খাদ্য প্রাণী মাত্রেরই জন্মগত অধিকার। যেমন তাদের জন্মগত অধিকার পৃথিবীতে বেঁচে থাকা। কিন্তু শক্তিমানরা সেই খাদ্য ও বেঁচে থাকারও নিয়ন্ত্রণ করে।

নরওয়েজিয়ান লেখক ন্যুট হামসুনের ‘ক্ষুধা’ বইয়ের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে এই ভূমিকা করতে হচ্ছে কারণ, এটা এমন এক মানবসন্তানের আলেখ্য যিনি নিজের পছন্দ মতো এক পেশা বেছে নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যে পেশা সবসময় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও নিয়ন্ত্রকদের কাছে এবং অন্যান্য উৎপাদকদের কাছেও অপাংতেয়। সৃজনশীল ‘লেখালেখি’কে এখনো পৃথিবীতে পেশা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয় না। অথচ লেখাকে এখনো সবচেয়ে সম্মানজনক ভাবা হয়। সেটা দেশ বা মহাদেশিয় যাই হোক না কেন। একই পেশা নিয়ে এরকম দ্বিচারিতা অন্য কোনো পেশা নিয়ে দেখা যায় না।

প্রচলিত জীবনের প্রতি অনীহা ও নতুন জীবন অনুসন্ধানই সৃজনশীল সাহিত্যের পথ। ফলে প্রচলিত জীবনযাপনে যারা অভ্যস্ত ও জীবনকে যারা প্রচলিত ধারার ভেতর আটকে রাখে তাদের কাছে সহসাই এক অপরিচিত, অনাখাঙ্ক্ষিত, অগ্রাহ্য করবার মতো লোকই বটে একজন সাহিত্যিক। যিনি তার লেখার ভেতর প্রচলিত সমাজের অনিয়ম, সমাজের উচু স্তরের শোষকদের অব্যস্থাকে তুলে ধরেন। যা খানিকটা প্রচলিত সমাজের শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল।

আর তাই লেখকের যুদ্ধ সামগ্রিক শোষিত-বঞ্চিত সমাজের পক্ষে হলেও সমাজের দ্বারা সবচাইতে নিগৃহীত তিনি। এই সঙ্কট থেকে যে দায়বোধের জন্ম নেয় তাই একজন প্রকৃত লেখককে এগিয়ে যাবার সামর্থ্য জোগায়। একদিকে গড্ডলিকা প্রবাহের জনগণ, অন্যদিকে পুঁজির পাহারাদার রাষ্ট্রের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা বা মোকাবেলা করেই একটা জীবন কাটাতে হয় সৃজনশীল লেখককে।

এ রকমই এক চরিত্র সৃষ্টি মাধ্যমে প্রশ্ন একেছেন ‘ক্ষুধা’ বইয়ে ন্যুট হামসুন। এ এমন এক চরিত্র যার কাজ লেখা। এবং সে বিশ্বাস করে সামাজিক দায়বদ্ধতার ভেতর থেকেই লেখার জন্ম। যদিও চরম দারিদ্র্যকেই মেনে নেন তিনি। তবুও প্রতিটি অভাবই যেন তার ব্যক্তি জীবনকে সততায় উদ্ভাসিত করে যায়। প্রতিটি অভাব যেমন খাদ্য সমস্যা, বাসস্থান সমস্যার মুখোমুখি হয় বারবার সে। ফলে বিঘিœত হতে থাকে লেখাও। একদিকে সামাজিক দায়িত্ববোধ অন্যদিকে সামাজিক প্রথাগত উৎপাদনে অনীহা- এই দুয়ের মাঝখানে ঘটতে থাকে এক লেখকের টিকে থাকা ও লেখার যুদ্ধ।

“এমটি পকেট তাই কোনো খাবার দোকানে যাওয়া যাবে না, এই মুলুকে এমন কোনো লোকজনও নাই যার কাছে সময় কাটানোর জন্য যাওয়া যায়। ফলে নগরীর পথে পথে দিশাহীন ঘুরে বেড়াই, বাজারে আর গ্র্যান্ডসেনের দোকানে অনেকক্ষণ ঘুরি, ‘আফতেন পোস্তেন’সংবাদপত্রের অফিসের বাইরে যেখানে প্রতিদিন বোর্ডে পত্রিকা টাঙানো হয়, সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লাম, কাল জোহান সড়কের মোড়ে দিয়ে ঘুরে সোজা আওয়ার সেভিয়ার সমাধিস্থলে চলে গেলাম। সেখানে মরচুয়ারি চ্যাপেলের কাছে ঢালু জমিতে নির্জন জায়গা দেখে বসে পড়ি। এই সম্পূর্ণ নির্জনতায়, ভেজা বাতাসে বসে ঢুলতে থাকি, চিন্তা করতে করতে আধো ঘুমে, ঠাণ্ডায় কাঁপতে থাকি।

সময় বয়ে চলে। চিন্তাও পাল্টায়। গল্পটা কি সত্যিই একটা স্বতস্ফূর্ত, ভাল লেখা হয়েছে? ঈশ্বর জানেন, মনে হয় কিছু ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। সবদিক ভেবে দেখলে মনে হয় গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। মনে হয় মাঝারি মাপের অথবা একদম বাজে, মূল্যহীন। ওটা যে এতক্ষণে ডাস্টবিনে ফেলে দেয়নি তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? আমার আত্মবিশ্বাসে চিড়ে গেল। লাফিয়ে উঠে গোরস্থান থেকে বেরিয়ে গেলাম।”

একদিকে শূন্যহাত, অভাব আর ক্ষুধা জর্জরিত জীবনযাপন, অন্যদিকে স্বসৃষ্ট শিল্পের প্রতি সন্দেহ, অতৃপ্তি- এই প্রকৃত লেখকজীবন। চলতে থাকে বিভিন্নভাবে লেখক জীবনের রসদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা। যা জীবন যাপনের ভেতর দিয়েই একমাত্র অর্জিত হতে পারে। ভাড়ার জন্য বাসা থেকে বের করে দেয়া, পরিচিত সমস্ত মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হয়ে দিনের পর দিন না খেয়ে গোরস্থানে গোরস্থানে ঘুমিয়ে, কুকুরের জন্য হাড্ডি চেয়ে এনে নিজেই হাড্ডি কামড়ে খাওয়ার চেষ্টায় চলতে থাকে অন্যরকম এক জীবনসাধনা।

একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত করেন ‘ আমার কোনো বন্ধু নাই, নাই কোনো পরিচিত লোক যার কাছে কিছু চাইতে পারি। স্মৃতি হাতড়ে এমন কোনো লোক পেলাম না যার কাছে একটা পেনিও ধার চাইতে পারি।’

অবশেষে ‘ হঠাৎ মাথায় খেয়াল চাপল, নিচের মাংসের বাজারে যাই আর এক টুকরো কাঁচা মাংস চেয়ে নিয়ে আসি। আমি সোজা বাজারের অপরদিকের বাড়িটায় চলে গেলাম। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগলাম। নিচের তলায় দোকানগুলোতে প্রায় পৌঁছে গেছি, এমন সময় সিঁড়ি দিয়ে ওপরে তাকিয়ে পেছনের দিক দেখিয়ে শাসানির ভঙ্গী করলাম, যেন আমি ওপরে একটা কুকুরের সঙ্গে কথা বলছি আর সোজা প্রথম মাংসের দোকানের বিক্রেতাকে বললাম, আমার কুকুরটার জন্য একটা হাড় দিন তো? শুধু হাড় দেবেন, হাড়ের গায়ে যেন কিছু না থাকে, ও ওটা মুখে করে নিয়ে বাড়ি যাবে।

বুকের ভেতর হৃদপিণ্ড সজোরে লাফাচ্ছে। কামারশালাগুলোর পাশে একটা গলিপথে অলক্ষে ঢুকে গেলাম, যতখানি সম্ভব ভেতরে ঢুকলাম আর একটা ভাঙাচোরা দরজার পাশটায় দাঁড়ালাম, যেখান দিয়ে পেছনের উঠোনে যাওয়া যায়। কোথাও আলো দেখা যাচ্ছে না, আমার চারপাশে অন্ধকার। এবার আমি হাড়টাকে কামড়াতে লাগলাম। কোনো স্বাদ নাই, কাঁচা রক্তের গন্ধ বেরোচ্ছে, আমার সঙ্গে সঙ্গে বমি হয়ে গেল।’

একদিকে ক্ষুধার নৈরাজ্য অন্যদিকে একের পর এক কাজে যোগ দিয়েও কোন কাজে মন বসাতে না পারা। ভুলভ্রান্তি করার অপরাধে চাকরি যাওয়া। ফলে এমন হয় যে তিনি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন ঈশ্বরের উপরই।

‘তোমাকে বলছি ওহে নরকের পবিত্র ভুয়ো ঈশ্বর, তোমার কোনো অস্তিত্ব নাই। যদি তোমার অস্তিত্ব থাকে, তাহলে আমি তোমাকে এমন অভিশাপ দেব, যে তোমার স্বর্গ, নরকের আগুনে শিউরে উঠবে। তোমাকে বলছি, তুমি তোমার স্বর্গ ভরেছ এই নিচের পৃথিবীর খানদানি বণিতাদের নিয়ে, যারা শত অন্যায় অবিচার করার পরও মরার সময় হাঁটু গেড়ে ক্ষমা চেয়েছিল। তোমাকে বলছি, তুমি আমার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করছ, তুমি জান না, তুমি এক চির অনস্তিত্ব; যে আমি কখনও নত হইনি।’

এরপর স্বভাবতই হামসুনের বিদ্রোহের লক্ষ্যস্থল হওয়া উচিত ছিল অমানবিক পুঁজিবাদের চিরপাহারাদার রাষ্ট্র। কিন্তু রাষ্ট্র সম্পর্কে হামসুনের অভিজ্ঞতা পাওয়া যায় না বইটাতে। শেষে শুধু তিনি দেশটি ত্যাগ করে উঠে পড়েন এক রাশিয়ান জাহাজে।

ন্যুট হামসুন একবার বলেছিলেন এই উপন্যাসটি অনেকটা তার আত্মজৈবনিক। পরে এই উপন্যাসটির জন্যই তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন।

//জেডএস//

x