চেনা সুরের রাগ-রঙ

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় ১৬:২৬ , সেপ্টেম্বর ১২ , ২০১৮

(পর্ব : ১০)

আজকের মানুষের সঙ্গে কুঁচফলের খুব একটা পরিচয় আছে বলে মনে হয় না। চকচকে লাল আর কালোর আবরণে মোড়া পুঁতির মতো নিটোল ছোট্ট এই ফলটি এক সময় স্বর্ণকারের সূক্ষ্ম তুলাযন্ত্রের বাক্সে দেখা যেত। তখন সোনা ওজনের জন্য এই কুঁচফল ব্যবহার করা হতো বাটখারা হিসেবে, যার ওজন নাকি ঠিক ১ রতি! কিন্তু সেটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ এটাই যে, এই কুঁচফলই হলো নামান্তরে ‘গুঞ্জা’, যার কথা উঠে এসেছে কাজী নজরুল ইসলামের দু’টি গানে এবং গান দু’টি হলো, ‘গুঞ্জা মালা গলে কুঞ্জে এস হে কালা’ এবং ‘গুঞ্জা-মঞ্জরী-মালা অঞ্চলে শুকায়’। কিন্তু সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ যা, তা হলো, এই দু’টি গানই যে রাগে আধারিত, তার নাম ‘মালগুঞ্জ’! অর্থাৎ গুঞ্জা ফুলের মালা!

ব্রজের রাখাল শ্রীকৃষ্ণ। সে অন্য ফুল কোথায় পাবে? তাই বনের গুঞ্জাফুলের মালাই তার ভূষণ। মাথায় ময়ূরের পাখা, ঠোঁটে বাঁশি আর গলায় গুঞ্জাফুলের মালা পরে সে বৃন্দাবনের বনে বনে গরু চরায়। ‘বন মে চরাও ত গাইয়া...’ মালগঞ্জ রাগে একটি খেয়ালের বাণী এ কথা বলছে। পুরোনো দিনের সেই 78RPM  রেকর্ডে পণ্ডিত নারায়ণ রাও ব্যাসের কণ্ঠে গানটি শুনুন। কণ্ঠে একটি বড় রেকর্ডও আছে। সেটি মালগুঞ্জ রাগে তারানা। সে কথায় পরে আসছি; কিন্তু তার আগে আরো দুটি রেকর্ডের কথা বলি। একটি দ্রুত খেয়াল— ‘রটত রটত রাধা মনমোহন...’ এবং অন্যটি রাগপ্রধান বাংলাগান, ‘উজল কাজল দুটি নয়ন তারা’— দুটিই মালগুঞ্জ রাগে এবং শিল্পী জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী। গান দুটি অবশ্যই শুনুন। প্রসঙ্গত, এই গানটির (উজল কাজল দুটি নয়ন তারা) আরো একটি বহু পুরোনো রেকর্ড আছে। রেকর্ডটি আমি শুনিনি, শুধু তার কথা শুনে ছিলাম, সেও বহুকাল আগে আমার মায়ের কাছে। তখন আমার ছেলেবেলা, সে গান তখনই মায়ের কাছে স্মৃতি বৈধুর্যে ভরা। ‘দেবদাস’ ছায়াছবিতে কে.এল. সাইগল গেয়েছিলেন ‘উজল কাজল দুটি নয়ন তারা’। সে রেকর্ড না শুনলেও মা-র গলায় গানটি শুনেছিলাম। সুরটা আজও ভুলিনি আর তাই মিলিয়ে নিতে পারি— রাগ, মালগঞ্জ।

মালগঞ্জ প্রসঙ্গে আরও একটি রেকর্ডের কথা বলতেই হবে এবং সে রেকর্ডটিও আপনাদের শুনতেই হবে, সেটি হলো ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর বেহালায় গৎ। যন্ত্রসঙ্গীতে কোনো বাণী থাকে না, থাকা সম্ভবও নয়। কিন্তু তবু আলাউদ্দীন খাঁর মালগঞ্জে যেন বেহালাও কথা বলে! বলে সেই একই বাণী— ‘বন মে চরাওত গাইয়া’।...

এ বিষয়ে অনেক কথা বলার আছে। বিশেষত আলাউদ্দীন খাঁ প্রসঙ্গে এসব কথা বলতে গেলে, তার অবধি থাকে না। অস্তিত্বের পরম সত্যকে যিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, তার কাছে ঈশ্বর, আল্লাহ, গড... এসবই একাকার। তাই একনিষ্ঠ মুসলমান হয়েও আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব কত অনায়াসে বেহালায় কীর্তনের সুর বাজান! সত্যিই, কীর্তনের সুরে তার বেহালায় দুটি রেকর্ড আছে, যা শুধু দক্ষতা বা মাধুর্যের বিচারেই নয়, ভক্তিরসের বিচারেও অতুলনীয়!

প্রকৃতপক্ষে, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে এই ভেদজ্ঞান শুধুমাত্র বিরলই নয়, অর্থহীনও। কত হিন্দু শিল্পীর কণ্ঠেই তো শুনি মিঞাকি টোড়ি রাগে সেই অবিস্মরণীয় খেয়ালটি, ‘আল্লাহ জানে মৌলা জানে’। এ গান যখন শুনি তখন বুঝতে পারি যিনি আল্লাহ তিনিই ঈশ্বর। কিংবা যখন শুনি, ‘আব মোরি নাইয়া পার কর হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া...’ তখন আর ভেদজ্ঞান থাকে না। জ্ঞানের কি কোনো জাত থাকে? না স্থান কাল থাকে? ইংরেজিতে লিখি, কিংবা বাংলাতেই লিখি— বিজ্ঞান তো বিজ্ঞানই! ইংরেজি বিজ্ঞান আর বাংলা বিজ্ঞান কি আলাদা। বিজ্ঞানীরা এটা বোঝেন। যারা সঙ্গীত সাধক তারাও বোঝেন। সঙ্গীতের যে রস, তার কোনো স্থানকাল নেই। শুধু কান পেতে থাকতে হয়। শুনতে শুনতে যেমন নতুন ভাষার অর্থও আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়, তেমনি সুরও শুনতে শুনতে তার পরিপূর্ণ ভাবটি নিয়ে আমাদের কাছে আত্মপ্রকাশ করে। আসলে সুর তো একটা ভাষাই! ভাষা না হলে সে ভাবকে প্রকাশ করবে কিভাবে? তার সঙ্গে যদি বাণী যুক্ত হয় এবং সে বাণী যদি সুরের ভাবের অনুগামী হয়, তবে আমাদের বোধের কাছে তার পথটা আরো সহজ হয়ে ওঠে। কিন্তু বাণী ছাড়াও গান হয়। যেমন, ধরুন খেয়াল বা ধ্রুপদের আলাপ অংশ। তাতে কোনো বাণী থাকে না, শুধু সুর। শিল্পী সাধারণত কোনো স্বরবর্ণ, যেমন ‘আ’, ‘এ’ অথবা কখনো হয়তো বা চড়ার সা-য়ে ‘ই’ উচ্চারণ অবলম্বন করে সুর প্রয়োগ করেন। তারপর একটু দ্রুত গতিতে ‘তা না তোম্...’ ইত্যাদি স্বরবর্ণও ব্যবহার করেন এবং আলাপের এই অংশকে বলা হয়, ‘তোম তায় নোম’। আপাত শ্রবণে এসব উচ্চারণ অর্থহীন মনে হলেও, আসলে কিন্তু তা নয়। এর গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ আছে। আসলে, কথাটা হলো, ‘অনন্ত হরি নারায়ণ’ এবং সেটাই দ্রুত, আবেগাপ্লুত উচ্চারণে হয়ে যায় ‘তোম তায় নোম’!

হ্যাঁ। সেই তারানা গানটির কথা মনে পড়ল। মালগঞ্জ রাগে পণ্ডিত বিনায়ক রাও পট্টবর্ধন এবং পণ্ডিত নারায়ণ রাও এর দ্বৈত কণ্ঠে, অন্য যে কোনো তারানা গানের মতোই, এ গানটি শুনলেও মনে হবে, কিছু অর্থহীন ধ্বনি মাত্র, যা উচ্চারিত হচ্ছে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে। কিন্তু আসলে তা নয় এবং ফার্সি ভাষায় এসব শব্দের যে গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ আছে, এ প্রসঙ্গে আমরা আগেও বলেছি (২য় পর্বে); তার আর পুনরাবৃত্তি করব না। শুধু এটুকুই বলব যে, সমস্ত শিল্পীর, তথা সমস্ত মানুষেরই জীবনের লক্ষ ওই তারানার একটি বাণীর মধ্যেই আধৃত হয়ে আছে। সে বাণী হলো, ‘দার তান্ আ’... অর্থাৎ ‘তুমি আমার মধ্যে প্রবেশ কর’। ‘তুমি’ অর্থাৎ সেই ‘অনন্ত হরি নারায়ণ’ যাকে ধ্রুপদের আলাপের মধ্যে দিয়ে আহ্বান করা হচ্ছে আবার ইনিই তিনি যাকে তারানায় ‘ইয়ালা’ বা ‘ইয়া আল্লাহ’ বলে ডাকা হচ্ছে।

কোনো কোনো মতে, তারানা আসলে সেতার বা সরোদের শব্দকে মুখের বোল দিয়ে অনুকরণের প্রচেষ্টা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ওস্তাদ আমীর খাঁ এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করতেন এবং যে কথা তিনি লিখেছেন, 'The Tarana Style of Singing' নামে একটি প্রবন্ধে। অবশ্য, এটা হতেই পারে যে, তারানা গান সৃষ্টির মূলে তন্ত্রীবাদ্যের ধ্বনিই ছিল আদি প্রেরণা; কিন্তু তারানার স্রষ্টা আমীর খুস্রৌ রচিত তারানাগুলি ছিল ফার্সি ভাষাতেই এবং তার মূলে ছিল সুফী সাধনার গূঢ়তম নির্যাস, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।...

এ এক অনন্ত প্রসঙ্গ। সঙ্গীত-রসে ডুব দিয়ে তার আভাস পাই— এই মাত্র। তার বেশি গভীরে আমার প্রবেশাধিকার নেই, সে চেষ্টাও করছি না। কাজী নজরুল ইসলামে রাগনামাঙ্কিত গানের সূত্র ধরেই এসব কথা এসে গেল। কিন্তু, সেই সব গানের একটি তালিকা পেশ করার কথা ছিল; এবার সেই অসমাপ্ত কাজটা শেষ করি। অবশ্যই এ ছাড়া এ ধরনের আরো অনেক নজরুল গীতি থাকতে পারে, যা আমার নজর হয়তো এড়িয়ে গেছে। তবু, মনে হয়, সে তালিকা খুব একটা দীর্ঘ না হওয়াই সম্ভব। অন্তত, যে তালিকাটি পেশ করা হচ্ছে, তাতে যে এই শ্রেণীর অধিকাংশ গানই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।

 রাগ— গান

(১) নীলাম্বরী— নীলাম্বরী শাড়ি পরি নীল যমুনায়

(২) আহিরভৈরব— অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারী

(৩) আনন্দভৈরব— জয় আনন্দভৈরব ডমরু পিনাক-পাণি

(৪) অরুণভৈরব— জাগো অরুণভৈরব জাগো হে শিব

(৫) বিরাটভৈরব— জাগো বিরাটভৈরব যোগ-সমাধি মগ্ন

(৬) বিষ্ণুভৈরব— বিষ্ণু সহ ভৈরব মধুর মিলনে

(৭) উদাসীভৈরব— সতীহারা উদাসীভৈরব কাঁদে

(৮) যোগিয়া— কেন গো যোগিনী বিধূর

(৯) যোগিয়া— সাজিয়াছ যোগী বল কার লাগি

(১০) বৃন্দাবনী সারং—       বৃন্দাবন ধন নব ঘনশ্যাম

(১১) বৃন্দাবনী সারং— বৃন্দাবনী কুঞ্জুম আবিররাগে

(১২) মধুমাধবী সারং— চৈতালী চাঁদিনী রাতে

(১৩) মধুমাধবী সারং— মধুবাধবী সুরে বাজো বেণুকা

(১৪) মেঘ— গগনে সঘনে চমকিছে দামিনী

(১৫) মেঘ— শ্যামা তন্বী আমি মেঘ বরণা

(১৬) মালগঞ্জ— গুঞ্জা মালা গলে কুঞ্জে এল হে কালা

(১৭) মালগঞ্জ— গুঞ্জা মঞ্জরী মালা অঞ্চলে শুকায়

(১৮) রাগেশ্রী— কার অনুরাগে শ্রীমুখ

(১৯) পটমঞ্চরী       — আমি পথ মঞ্জরী

(২০) রূপমঞ্জরী— পায়েলা বোলে রিনিঝিনি নাচে রূপমঞ্জরী

(২১) আশাবরী— হে নটভৈরবী আশাবরী (কর্মাটকী—নটভৈরবী)

(২২) প্রদীপকী— প্রদীপ কী জ্বলিল আবার (পটদীপ)

(২৩) বসন্তমূখারী— বসন্ত মুখর আজি

(২৪) পরজবসন্ত— এল ঐ বনান্তে পাগল বসন্ত

(২৫) শুদ্ধ কল্যাণ— নিত্য শুদ্ধ কল্যাণ রূপে

(২৬) ছায়ানট— বিরহী বেণুকা বাজে ছায়ানটে

(২৭) শ্যামকল্যাণ— রসঘন শ্যাম কল্যাণ সুন্দর

(২৮) নটবেহাগ— রুম ঝুম ঝুম ঝুম নূপুর বোলে

(২৯) গৌরী— কেন মনে জাগে উদাসিনী গৌরী

(৩০) গৌরী— তাপসিনী গৌরী কাঁদে বেলা শেষে

(৩১) মীনাক্ষী— চপল হাঁসির ভাষায় হে মীনাক্ষী

(৩২) গৌরী— শিব অনুরাগিনী গৌরী জাগে

(৩৩) সিন্ধু— বেদনার সিন্ধুমন্থন শেষ

(৩৪) চাঁদিনী কেদার—       চাঁদিনী রাতে মল্লিকা লতা

(৩৫) দোলনচাঁপা— দোলনচাঁপা দোলে

(৩৬) সন্ধ্যামালতী— শোনো ও সন্ধ্যামালতী

...(চলবে)

//জেডএস//

x