‘বারাব্বাস’।। রাজনৈতিক যিশুর উপাখ্যান

জাহেদ সরওয়ার ০৬:০১ , সেপ্টেম্বর ১৪ , ২০১৮

'বারাব্বাস' সেই সব ছোট বইগুলোর একটি, যে বইগুলো ছোট হওয়া স্বত্বেও যেন একাই বহন করে চলছে একেকটা অচেনা অনাবিস্কৃত জগত।  যেমন, হেমিংওয়ের ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’, কামুর ‘দ্য আউটসাইডার’, সিংকীভিচের ‘কুয়ো ভাদিস’, স্টেইনব্যাকের ‘পার্ল’ বা থর্নটন ওয়াইল্টারের ‘দ্য আইডিস অফ মার্স’ ইত্যাদি; যে বইগুলো পঠিত হওয়ার পরও দীর্ঘ দীর্ঘ দিন ধরে প্রভাব থেকে যায় মনে।

মানবজাতির যে সমস্যাগুলোর কোনো কিনারা পাওয়া যায় না, আবার যে সমস্যাগুলো মানুষ উত্থাপন না করেও পারেনা, তেমন এক চরিত্র ‘বারাব্বাস’।

যিশুকে যেদিন ক্রুশে বিদ্ধ করা হয় তার সাথে আরেকজনকেও ক্রুশে পয়গাম দেওয়া হয়েছিল। কুখ্যাত খুনি, ডাকাত, নাস্তিক ক্রীতদাস ‘বারাব্বাস’। কিন্তু সাবাথ দিবসের মুক্তিপ্রথায় দাবি উঠল— একজনকে ছেড়ে দিতে হবে। অপরাধের তারতম্য অনুসারে তাই ছেড়ে দেওয়া হয় বারাব্বাসকেই। যখন রোমান প্রহরীরা বারাব্বাসের শিকল খুলে দিয়ে বলল ‘যা ভাগ হারামি, তুই মুক্ত’ তখনও বিস্ময়ের ঘোরে বারাব্বাস পালাতে পারেনা। কেবল তার মত একজন আজন্ম কলংকিত মানুষের চেয়ে ভয়ংকর অপরাধ আর কে করতে পারে তা ভাবতে ভাবতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জুড়ে বধ্যভুমিতে ক্রুশের লীলা দেখতে থাকে বারাব্বাস। মাঝে মাঝে ভয় পেলেও সে খুঁজে পায় না এহেন কোনো অপরাধ, যা সে নিজে করেনি। কিন্তু এই নিরাপরাধ লোকটি কি এমন ভয়ংকর অপরাধ করেছে, যা তার অসীম অপরাধকেও হার মানায়? ফলে সে অনুসরণ করে চলে কেবল সেই ক্ষীণদেহি দুর্বল লোকটিকে। মাঝে মাঝে লোকটির গভীর অস্বাভাবিক শান্ত চোখ এসে পড়ে বারাব্বাসের চোখে। এতেই যেন বারাব্বাসের সাথে লোকটি এক অলিখিত গোপন সম্পর্কে সম্পর্কিত হয়ে যায়।

সবাই ততক্ষণে জানতে পেরেছে বারাব্বাসই সেই ভাগ্যবান ব্যক্তি যার বদলে ক্রুশে ঝোলানো হয় যিশুকে। এরপর  বারাব্বাসের জীবন পাল্টে যায়। সে ওই অপরাধ আর অপরাধীর কথা ভাবতে থাকে। ঈশ্বরপুত্রের সুলভ ভাবালুতা বাদ দিয়ে বারাব্বাস আবিস্কার করে লোকটির অস্বীকারের ক্ষমতা। এটা সে বুঝেছিল খনি শ্রমিকদের ভেতর নিপতিত হয়ে। যিশুর মৃত্যুর পর যিশু যেন আরো বেশি শক্তিশালি হয়ে ওঠে সব ধরণের শ্রমিক ও দীর্ঘদিনের শোষণের শিকলপরা ক্রীদতাসদের ভেতর। যিশুই সেই ব্যাক্তি যিনি রোমান সাম্রাজ্যকেও অস্বীকার করতে পারেন। তিনি বলতেন, তিনি মুক্তিদাতা। দুনিয়া ঈশ্বরের। রোমান সম্রাটের নয়।

খনি শ্রমিকদের জোড়ায় জোড়ায় বেধে রাখাই তখন নিয়ম। বারাব্বাসের সাথে বেধে রাখা হয়েছিল শাহাক নামের যিশুর এক অনুসারীকে। কিন্তু বারাব্বাস সম্পর্কে শাহাকের ছিল একই সাথে তীব্র ঘৃণা ও টান। ঘৃণা এই জন্য যে, শাহাক ভাবতো এই সেই পাপিষ্ট যার বদলে যিশুকে ক্রুশে ঝোলানো হয়েছিল। একই সাথে সে ভাবতো এই সে লোক যে শেষ বেলায় যীশুকে সঙ্গ দিয়েছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে নিজের অজান্তেই বারাব্বাস গ্রন্থিত হয়ে গিয়েছিল যিশুর নিয়তির সাথে। দুই বিপরীত চরিত্রকে দিয়ে লাগের্কভিস্ট এমন একটা মন্তাজ ঘঠান এই উপন্যাসে, যা সর্বকালেই কাহিনীকারদের সাধনার বিষয়।

বারাব্বাস কোনো অলৌকিকতায় বিশ্বাস করে না— অন্যান্য খনি মজুরদের মত, ক্রীতদাসদের মত, যারা যুগ যুগ ধরে এই দাসত্বের শিকল থেকে মুক্ত হতে চায়। এই সাধারণ মানুষরা অতি লৌকিকতায় বিশ্বাস করে এবং তাদের যন্ত্রণার অবসান চায়। তারপরো শেষ পর্যন্তু বারাব্বাসের কাছে যীশুর প্রয়োজনীয়তা ছিল অন্য কারণে। বারাব্বাস দেখেছিল, যীশু ‘দুনিয়া ইশ্বরের’, ‘বন্দীদের পরিত্রাণ আসন্ন’, ‘তিনিই সেই পরিত্রাতা’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহারের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন সাধারণের মধ্যে, আর ভীতিকর হয়ে উঠেছিলেন শাসক শ্রেণীর মধ্যে। এই বইয়ে ধর্ম থেকে দূরে এনে অনেকটা রাজনৈতিক যিশুকেই একেছেন লাগের্কভিস্ট।

অত্যাচারিত খনি মজুরদের মধ্যে ফিসফিসানি চলে তিনি পুনরজ্জীবন লাভ করবেন। তিনি অমর। তার নামও অনেক পবিত্রতার সাথে উল্লেখ করতে দেখা যায়। কিন্তু বারাব্বাস দেখেছিল যীশু ক্ষীণদেহি এক দুর্বল লোক, যে কিনা নিজেকে নিজেই রক্ষা করতে পারে না। বলতে গেলে যিশুকে এক ধরণের ঘৃণাই করতো বারাব্বাস। তার এই নাস্তিক্যধর্মী দর্শনের কারনে যীশুর ভক্তরা দ্রুত তার উপর থেকে আস্থা হারাতে থাকে। তারা বলতে থাকে এই সে অভিশপ্ত বারাব্বাস যার জন্য ঈশ্বরপুত্রকে ক্রুশে চড়তে হয়েছে। শাহাকও তীব্র ঘৃণা করতে থাকে বারাব্বাসকে। কিন্তু নিয়তি তাদের কে জোড়া লাগিয়ে রাখে। মাঝখানে শ্রমিকদের ভেতর যীশুর গুনকীর্তণ করার জন্য স্বয়ং সম্রাট ডেকে পাঠায় শাহাককে, সাথে বারাব্বাসকেও। সম্রাটের সাথে ক্রীতদাস শাহাকের কথোপকথন থেকেই যেন উঠে আসে এক রাজনৈতিক যিশু ছবি।

তখন ক্রীতদাসদের গলার সাথে একটা চাকতি বাধা থাকতো, যাতে ছাপ মারা থাকতো রোমান সাম্রাজ্যের। শাহাকের গলায় সেই চাকতিটি ধরে সম্রাট জিজ্ঞেস করল,

—‘এই যে এর ওপর একটা ছাপ মারা আছে, তুমি কি এর অর্থ জান?’

শাহাক বলল, ‘জানি এ ছাপ রোমান রাষ্ট্রের’।

—‘হ্যাঁ ঠিক বলেছ এই ছাপের অর্থ হল রোমান রাষ্ট্রই তোমার মালিক।’

এরপর চাকতিখানা উল্টিয়ে সম্রাট কাঁপা কাঁপা গলায় উচ্চারণ করলেন ‘যিসাস ক্রাইস্ট’ এবং

‘এ নাম কার’ প্রশ্ন করেন।

শাহাকও কাপা গলায় বলে, ‘এ আমার ঈশ্বরের নাম’

—‘ঈশ্বর নাম! একি শুধু তোমাদের দেশের ঈশ্বর?’

শাহাক আবার কাঁপা গলায় বলল, ‘না, ইনি সবদেশের সবার ঈশ্বর।’

—‘সকলের ঈশ্বর! বলো কি! সকলের ঈশ্বরের নাম পর্যন্ত জানি না আমি? যাইহোক আমি জানতে চাই চাকতির ওপর তুমি তার নাম লিখে রেখেছো কেন? সম্রাটের কণ্ঠে শ্লেষ।’

—‘কারণ তিনি আমার প্রভু।’

—‘প্রভু! কেন তুমি রাষ্টের ক্রীতদাস নও? তোমার মালিক রাষ্ট নয়?’

শাহাক বুঝতে পারল পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে। কিন্তু সে এও বুঝতে পেরেছিল যে, মৃত্যুতেই তার মুক্তি।

—‘সে বলল আমার ঈশ্বরই আমার প্রভু। তিনিই আমার মালিক।’

এরপর সম্রাট বারাব্বাসের দিকে তাকালেন, জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমিও কি একই ঈশ্বরের বিশ্বাস কর?’

আড়াআড়ি মাথা নাড়ল বারাব্বাস।

সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাহলে তুমিও চাকতিতে তার নাম লিখে রেখেছ কেন?’

বিষন্ন গলায় বারাব্বাস বলে, ‘আমার কোনো ঈশ্বর নেই।’

সম্রাট বলল, ‘তোমার ঈশ্বর নাই, কিন্তু তুমি চাকতির ওপর তার নাম খোদাই করে রেখেছ কেন?’

—‘আমার একজন ঈশ্বর(মুক্তিদাতা) দরকার।’ দৃঢ়ভাবেই জবাব দেয় বারাব্বাস।

পুরো ‘বারাব্বাস’ উপন্যাসের সুরটা এই লয়ে বাধা।যিশুর অলৌকিকত্ব বিশ্বাস না করা স্বত্বেও সে সময়ে যিশুর প্রয়োজনীয়তা ‘বারাব্বাস’ উপন্যাসের মাধ্যমে এভাবেই ব্যাখ্যা করেন শক্তিমান কথাশিল্পী পার লাগের্কভিস্ট। এই সুইডিশ উপন্যাসিক ও নাট্যকার জন্মগ্রহণ করেন ১৮৯১ সালে। মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনি প্যারিসে চলে যান। বাকি জীবন সেখানেই অতিবাহিত করেন। ‘দ্য ডোয়ার্ফ’ (১৯৪৪) ‘বারাব্বাস’ (১৯৫০) ‘দ্য সিবিল’ (১৯৫৬) তার বিখ্যাত উপন্যাস ট্রিলজি। ১৯৫১ সালে শুধুমাত্র ‘বারাব্বাস’ উপন্যাসের জন্য তাকে নোবেল পুরস্কার  দেয়া হয়।

//জেডএস//

x