শান্তিতে নোবেলজয়ী নাদিয়া মুরাদের আত্মজীবনী দ্য লাস্ট গার্ল ।। পর্ব-০১

অনুবাদ : সালমা বাণী ০৬:০০ , অক্টোবর ০৮ , ২০১৮

মুখবন্ধ

নাদিয়া মুরাদ শুধু আমার মক্কেল নয়, ভালো বন্ধুও। লন্ডনে যখন তার সঙ্গে আমার পরিচয় হলো, সেই প্রথম লগ্নেই সে আমাকে অনুরোধ করলো আমি তার আইনজীবী হয়ে কাজ করতে পারি কি না? সে আরো বললো, আমি তোমাকে মামলা পরিচালনার ফি দিতে পারবো না, কারণ আমার মনে হচ্ছে এই মামলা দীর্ঘ সময় নেবে এবং এতে জেতার সম্ভাবনা খুবই কম। তারপর সে তার গল্প বলতে শুরু করে—

২০১৪ সাল। ইরাকের একটি গ্রাম, যেখানে নাদিয়ারা বসবাস করতো, আইসিস সেটা আক্রমণ করে এবং সেদিন একুশ বছর বয়সের এক ছাত্রীর সুন্দর জীবন নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে যায়। তাকে বাধ্য করা হয় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে তার মা এবং ভাইদের মৃত্যু সহ্য করতে। নাদিয়াকে অপহরণ করার পর তাকে একের পর এক আইসিস সৈন্যদের কাছে বিক্রি করা শুরু হয়। তাকে আরো বাধ্য করা হয় প্রার্থনায় বসতে এবং ধর্ষকদের মনোরঞ্জন করতে উত্তেজক পোশাক পরতে ও সাজসজ্জা করতে। এক রাতে আইসিস দলের হিংস্র পুরুষরা দলবদ্ধভাবে তাকে ধর্ষণের নারকীয় উল্লাসে মেতে উঠলে সে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে এবং সেই অবস্থায়ই সে পড়ে থাকে সারা রাত। এই নির্মম নির্যাতনের দাগগুলো নাদিয়া তার পোশাক সরিয়ে আমাকে দেখায়। এবং সে আমাকে আরো বলে বন্দীদশার পুরো সময়টাতে আইসিস মলিট্যান্টরা তাকে ‘ডার্টি ননবিলিভার’ অর্থাৎ ঘৃণিত নাস্তিক বলে ডাকতো। এভাবেই তারা ইয়াজিদি নারী কব্জা করে পৃথিবী থেকে তাদের ধর্ম নিঃশ্চিহ্ন করার আনন্দে উল্লাস করতো।

খোলা বাজারে এবং ফেসবুকে বিক্রির জন্য আইসিসের বিজ্ঞাপন দেয়া হাজার হাজার ইয়াজিদি অপহৃত নারীর মধ্যে নাদিয়াও একজন। এইসব অপহৃত নারীকে কখনো কখনো নামমাত্র কুড়ি ডলারেও বিক্রি করা হয়। যেদিন আশিজন বৃদ্ধাকে একসঙ্গে হত্যা করে একইসঙ্গে মাটি চাপা দেয়া হয়, সেখানে নাদিয়ার মা-ও ছিলেন। একদিন শত শত ইয়াজিদি যুবককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, তাদের মধ্যে নাদিয়ার ছয় ভাইও ছিলো।

নাদিয়া আমাকে বলছিলো গণহত্যার কথা এবং পৃথিবীতে কোনো গণহত্যা অতর্কিত দূর্ঘটনা নয়, বরং সেখানে থাকে ঠাণ্ডা মাথার নিখুত পরিকল্পনা। গণহত্যার আগে আইসিস-এর ‘রিসার্চ এন্ড ফতোয়া বিভাগ’ দীর্ঘ গবেষণা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় খ্রিস্টান, শিয়া এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মতো কুর্দিস ভাষাভাষী মানুষদের কোনো ধর্মগ্রন্থ নাই, সুতরাং ইয়াজিদিরা হলো নাস্তিক এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে দাসে পরিণত করার বিধি-বিধান শরিয়া আইনে প্রণীত রয়েছে। শরিয়া ধর্মের এই ব্যাখ্যায় আইসসিরা অনুপ্রাণিত ও প্রলুদ্ধ হয়ে ইয়াজিদি গণহত্যা ও নারী ধর্ষণ করা শুরু করে এবং তারা মনে করে ইয়াজিদি ধর্ম ধ্বংস করার জন্য যে কয়টি উপায় আছে তার মধ্যে এগুলোই সর্বোত্তম পন্থা।

পরবর্তীকালে এই অপরাধ আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কারখানায় উৎপাদনের মতো মাত্রায় পৌঁছে যায়। এমন কী আইসিস ‘কব্জাকৃত নারী ও বন্দি দাসদের কীভাবে পরিচালানা করা হবে’ তার প্রশ্ন ও উত্তরমালা শিরোনামে প্রশ্নপত্র ও উত্তরমালা (প্যাম্পলেট) বিতরণ করে।

প্রশ্ন : যেসব দাসীর কিশোরী বয়স এখনো উত্তীর্ণ হয়নি তাদের সঙ্গে সহবাস করা কী বৈধ? 

উত্তর : যেসব দাসীর কিশোরী বয়স এখনো উত্তীর্ণ হয়নি তাদের সঙ্গে সহবাস করা বৈধ, যদি তারা সহবাস করার মতো উপযুক্ত থাকে।

প্রশ্ন : দাসী কি বিক্রি করা বৈধ? 

উত্তর : দাস-দাসী ক্রয়-বিক্রয় এবং উপহার সামগ্রি হিসেবে বৈধ, যেহেতু তারা সম্পদের মতো মামুলি উপকরণমাত্র।

যখন নাদিয়া লন্ডনে আমাকে তার জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার গল্প শোনায় তখন দুই বছর অতিক্রম হতে চলেছে আইসিসের ইয়াজিদি মানুষদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ, আটক ও বন্দি অত্যাচারের মতো ঘটনার। হাজার হাজার ইয়াজিদি নারী ও শিশুকে আইসিস অপহরণ করে বন্দীদশার মধ্যে ফেলে রেখেছে। কিন্তু পৃথিবীর কোনো আদালতে এইসব অপরাধের জন্য আইসিস সদস্যদের অপরাধী সাবস্ত্য করা হয়নি অথবা কোথাও এদের শাস্তি প্রদান করা হয়নি। বরং এইসব অপরাধীদের সকল প্রকার সাক্ষ্য-প্রমাণ নিচিহ্ন করে দেয়া হয়। ফলে ন্যায়বিচার অন্ধকারে মুখ থুবড়ে পড়ে।

আমি নাদিয়ার মামলাটি গ্রহণ করি এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার লক্ষ্যে দীর্ঘ এক বছরের অধিক সময় আমি ও নাদিয়া একত্রে জনমত গঠনে প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাই। আমরা ঘন ঘন সাক্ষাত করতে থাকি এবং আবেদন জানাতে থাকি ইরাক সরকার, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও জাতিসংঘের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের কাছে। আইনগত ব্যাখ্যা সহকারে খসড়া ও প্রতিবেদন প্রস্তুত করি এবং জাতিসংঘের  উদ্দেশ্যে বক্তৃতা প্রদান করা শুরু করি। আমরা যেসব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মুখোমুখি হই তাদের সকলেই আমাদের দ্বিধান্বিত জবার দেয় আইসিসের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার পদক্ষেপ গ্রহণ?—এটা অসম্ভব! আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন এক বছর পর্যন্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ—সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে না।

কিন্তু যখন আমি এই মুখবন্ধ রচনা করি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিরষদ ইরাকে সংঘটিত অপরাধের সত্যতা তদন্তের জন্য একটি তদন্তকারী দল গঠনের মাধ্যমে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এটাই হলো নাদিয়া এবং অন্যান্য ভুক্তভোগীদের জন্য সর্বপ্রথম বিজয় অর্জন। কারণ এর অর্থ হলো তথ্য-সাবুদ সমূহ সংরক্ষণ করার মাধ্যমে স্বতন্ত্র্যভাবে আইসিস সদস্যদের বিচারের আওতায় আনা যাবে। নিরাপত্তা পরিষদ যখন সম্পূর্ণরূপে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে অপরাধগুলো বিচারের আওতায় আনার, তখন নাদিয়ার পাশে আমি বসে ছিলাম। আমরা যখন দেখি নিরাপত্তা পরিষদের পনেরটি হাত আমাদের সমর্থন করছে তখন আমরা দুজনে শুধু দৃষ্টি বিনিময় করি। আত্মতৃপ্তি আমাদের প্লাবিত করে।

যুদ্ধের নির্মম নির্যাতনে যারা নির্বাক, নির্যাতিত এবং ভুক্তভোগী সাংবাদিক—যারা বস্তুনিষ্ট সংবাদ পরিবেশনের কারণে নির্যাতিত হয়ে ন্যায়বিচারের আশায় আদালতের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছে—একজন মানবাধিকার আইনজীবী হিসাবে আমার প্রধান কর্তব্য তাদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা। এতে কোনো সন্দেহ নাই আইসিস সদস্যরা চেয়েছিল চোখের সামনে একদিনে পরিবারের সাতজন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করে, অপহরণ ও বন্দি রেখে দাস প্রথার কায়দায় দিনের পর দিন, রাতের পর রাত ধর্ষণ নির্যাতন ও অত্যাচারের মাধ্যমে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে নাদিয়ার কণ্ঠস্বর।

কিন্তু নাদিয়া সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছিল নীরবতা গ্রহণ করতে। এতিম, স্বজনহারা, ধর্ষিতা, অপহৃতা, শরণার্থী এইসব তকমা যাদের জীবনের ওপর সেটে দেয়া হয়েছে তার সবগুলো প্রচেষ্টা মুছে ফেলার জন্য খাড়া হয়ে দাঁড়ালো নতুন এক নাদিয়া : সে হলো নির্যাতিত নারীর প্রতিবাদের ভাষা, ইয়াজিদি নেতা, জাতিসংঘের গুডউইল এমবাসেডর, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী।

আমি পরিচিত হলাম নতুন এক নাদিয়ার সঙ্গে, যে কিনা শুধুমাত্র একটি নারী নয়, সে হলো প্রতিটি ধর্ষিত নারীর প্রতিনিধি, গণহত্যায় স্বজন হারা এবং সোনালি সময় পেছনে ফেলে আসা শরণার্থী ইয়াজিদির কণ্ঠস্বর, সে হলো সমগ্র ইয়াজিদি জাতির নেতা।

যারা ভেবেছিল জুলুম নির্যাতনের মাধ্যমে চিরদিনের জন্য নিরব করে দেয়া যাবে নাদিয়ার কণ্ঠস্বর তারা ভুল করেছিল। নাদিয়া মুরাদের আত্মশক্তির বিলোপ সাধন, এবং তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেয়া কোনো দিনই সম্ভবপর নয়। বরং এই গ্রন্থের মাধ্যমে তার কণ্ঠস্বর হলো আগের চেয়ে অধিকতর তীব্র এবং শাণ দেয়া।

অমল ক্লুনি, ব্যারিস্টার

সেপ্টেম্বর ২০১৭

 

অধ্যায় : ১, পরিচ্ছেদ : ১

২০১৪ সালের গ্রীষ্মের সকালে, যখন আমি শেষ বর্ষ হাই স্কুলের প্রস্তুতি নিচ্ছি তখন অতর্কিত দুজন কৃষক তাদের নিজেদের ক্ষেত থেকে উধাও হয়ে গেল। কোচোর সীমানা ঠিক পার হলেই  নর্দান ইরাকের ইয়াজিদি নামের ছোট্ট এই গ্রামে আমার জন্ম এবং এখানেই আমার জীবনের বাকি সময় পার করবো বলে এমনটাই তখন ভাবছি।

মূহুর্তটি ছিল ঘরে বোনা তাঁবুর তলে বসে পুরুষেরা সুখের আমেজের অবগাহন করছিলো, পরক্ষণেই তারা বন্দী হলো নিকটবর্তী গ্রামের ক্ষুদ্র কক্ষে আর এই গ্রামটি ছিল সুন্নী আরব অধ্যুষিত। গ্রামের কৃষকদের সাথে অপহরণকারীরা একটি মুরগি এবং হাতের মুঠোয় রাখা যায় এমন মুরগির ছানাদের যা কিনা আমাদের দ্বিধান্বিত করে তোলে। আমরা একে অপরের সাথে বলাবলি করি—হতে পারে তারা সবাই ক্ষুধার্ত কিন্তু এটা আমাদেরকে প্রবোধ দেয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না।

কোচো—যতদিন যাবত আমি এখানে জীবন ধারণ করছি এটা ইয়াজিদিদের গ্রাম। নম্যাডিক কৃষক আর মেষ পালকেরা সর্বপ্রথম এখানে আগমন করে একেবারেই অজানা কোনো প্রান্ত হতে। যখন তারা তাদের মেষগুলোকে উন্নত মানের ঘাস খাওয়ানোর জন্য চরাতে নিয়ে যেত তখন মরুভূমির মতো উত্তপ্ত হাওয়া থেকে তাদের স্ত্রীদের রক্ষার্থে তারা গৃহ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। চাষের জন্য তারা ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের সিনজার রিজিওনের উন্নত যে ভূমি  পছন্দ করে সেটা ছিল তাদের জন্য ভয়ানক ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপদ সংকুল স্থান। প্রথম ইয়াজিদি পরিবার ইরাকের  ইয়াজিদিদের বসতের একান্ত সন্নিকটের তাদের বসত স্থাপন করে ১৯৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। তখন কোচো ছিল সুন্নী আরব কৃষক অধ্যুষিত এবং এই কৃষকেরা  মূসাল  ভূমিমালিকের অধীনে কাজ করতো। জমি ক্রয়ের জন্য ইয়াজিদি পরিবারেরা একজন আইনজীবী নিয়োগ করে এবং মুসলিম এই আইনজীবী এখনো তাদের কাছে একজন বীরের প্রতীক—যখন আমি জন্মগ্রহণ করি ততদিনে কোচোতে দুইশতের অধিক পরিবার বেড়ে উঠেছে এবং তাদের সকলেই ইয়াজিদি। আমরা সকলেই এমন ঘনিষ্ট বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম যেন সবাই মিলে একটি বৃহৎ পরিবার। যে ভূমি আমাদের বিশেষত্ব দান করে ছিল সেই ভূমিই আমাদের করে তোলে বিপদগ্রস্থ। (চলবে)

//জেডএস//

x