প্রেম ও দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ পার করলেন ৭ দশক

আলীম হায়দার ২০:২৩ , অক্টোবর ০৭ , ২০১৮

হেলাল হাফিজ

বাল্যকালে মাতৃবিয়োগের বেদনা নিয়ে বেড়ে ওঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত প্রাঙ্গণে বিহঙ্গের জীবন, তারপর স্বাধীনতার পটভূমি রচিত হওয়ার অগ্নিগর্ভ সময়ে দ্রোহের স্লোগান হয়ে মিছিলের কণ্ঠে কণ্ঠে যার কবিতা ঘুরেছে- সেই কবি, কবি হেলাল হাফিজের জন্মদিন আজ (রবিবার, ৭ অক্টোবর)। ৭০ বছর পূরণ করে ৭১-এ পা দিলেন তিনি। কোলাহলমুখর নাগরিক জীবনের মধ্যে থেকেও জন্মদিন নিয়ে আলাদা কোনও উচ্ছ্বাস নেই তার। জৈবিক বয়সকে যেন অবজ্ঞাই করছেন হেয়ালির ছলে জীবনের সবগুলো বসন্ত পার করে দেওয়া এই কবি। নিজের লেখার মধ্যেই সময়কে এবং নিজেকে খুঁজে পান তিনি, চোখ বুজে দেখতে পান দীর্ঘ জীবনের হাতছানি। সেই হিসেবে এখনও ১৮-এর প্রাণবন্ত তরুণ তিনি। বয়সটা যেনো শুধু এক সংখ্যা তার কাছে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিহঙ্গ জীবনেও কখনও কখনও নিভৃত জীবন বেছে নিয়েছেন তিনি। দেখতে সুদর্শন হওয়ার এবং কাব্যিক জীবনের জন্য দ্রুত ক্যাম্পাসের আড্ডার মধ্যমণিতে পরিণত হয়েছিলেন। কবিতা চর্চার এক পর্যায়ে ছাত্রজীবনেই খ্যাতির শিখরে আরোহন করেন। ক্যাম্পাসের আড্ডায় মুখে মুখে ঘুরতে থাকে তার লেখা কষ্টের পঙক্তি। অন্যদিকে ততদিন ঢাকা শহরের দেয়ালে দেয়ালে অগ্নিস্ফূলিঙ্গ হয়ে ভেসে উঠেছে তার বিদ্রোহের বাণী। কবি হেলাল হাফিজের লেখা ‘‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাওয়ার তার শ্রেষ্ট সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’’ চরণ দুটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পূর্বপ্রস্তুতির প্রক্কালে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের মিছিলের স্লোগানে পরিণত হয়। ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নামের এই কবিতাটি তার কবি জীবনের মাইলফলক হয়ে ওঠে। এরপর আর কখনও কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে কষ্ট করতে হয়নি। একটি কবিতাই তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। আর আরও অনেক পরে প্রকাশিত হয় তার প্রথম ও এখন পর্যন্ত প্রকাশিত একমাত্র মৌলিক কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। নব্বইয়ের দশকে এই গ্রন্থ প্রকাশের পর ধীরে ধীরে নির্জনতম জীবনের পথ বেছে নেন কবি।

মাঝখানের এই সময়টাতে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে ভক্তদের মধ্যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেন কবি। ভক্তদের অনেকের ধারণা হয়েছিল, তিনি হয়তো দেশে নেই; আবার অনেকে ভাবতেন হয়তো ইহলোক ত্যাগ করেছেন কবি। অবশেষে প্রায় দুই দশকের নির্জনতা ভেঙে গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বসে নিয়মিত আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন তিনি। এরমধ্যেই কবিতা ৭১’ নামে একটি সংকলিত গ্রন্থ প্রকাশ হয় তার।  ইদানীং শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ হলেও মনের প্রেমে এখনও পৃথিবী রাঙিয়ে যাচ্ছেন এই যৌবনের কবি।

কবি হেলাল হাফিজের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তার জন্ম ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর, নেত্রকোনায়। কবির বাবার নাম খোরশেদ আলী তালুকদার, মা কোকিলা বেগম। ১৯৬৫ সালে নেত্রকোনা দত্ত হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৭ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময় ১৯৭২ সালে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন হেলাল হাফিজ। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত এই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালের শেষ দিকে দৈনিক দেশ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক পদে যোগ দেন। সর্বশেষ দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন তিনি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের রাতে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান কবি। ওই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যান তিনি। এরপর কারফিউ জারি হয়। তাই সেখানেই থেকে যান। নাহলে রাতে নিজের হল তথা তৎকালীন ইকবাল হলে (বর্তমানে জহুরুল হক) থাকার কথা ছিল তার। পরে, ২৭ মার্চ কারফিউ তুলে নেওয়ার পর কবি হেলাল হাফিজ নিজের হলে গিয়ে দেখেন যে- চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, লাশ আর লাশ। হলের গেট দিয়ে বেরুতেই কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে দেখা হয় তার। তাকে জীবিত দেখে বুকে জড়িয়ে ধরেন নির্মলেন্দু গুণ। ২৫ মার্চের কালরাতে হেলাল হাফিজের কী পরিণতি ঘটেছে তা জানার জন্য আজিমপুর থেকে ছুটে এসেছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। পরে কেরানীগঞ্জের দিকে আশ্রয়ের জন্য দুজন একসঙ্গে বুড়িগঙ্গা নদী পাড়ি দেন। এরপর দেশ স্বাধীনের পর সাংবাদিকতায় যোগ দেন কবি হেলাল হাফিজ। তারপর ধীরে ধীরে নিভৃত জীবনের পথ বেছে নেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখবোধের সঙ্গে সঙ্গে প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের আকাশচুম্বি খ্যাতিই তাকে নীরব জীবনের পথে ধাবিত করেছে বলেও জানিয়েছেন কবি।

 

/এফএএন/

x