চেনা সুরের রাগ-রঙ

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় ১৩:৫৩ , অক্টোবর ১০ , ২০১৮

(পর্ব-১৪)

আশাবরী ঠাটের আশ্রয় রাগ জৌনপুরী, অর্থাৎ ওই ঠাটের সব স্বরই এই রাগটিতে আছে। জৌনপুরী রাগের একটি মাত্র স্বর কোমল ধৈবত বা ‘দা’কে পরিবর্তন করে শুদ্ধ ধৈবত বা ‘ধা’ আমরা যে স্বর সমন্বয় পাই, তা কাফী ঠাটের এবং তার আশ্রয় রাগ হলো কাফী। সহজ কথায় একটি মাত্র স্বরের পরিবর্তনেই জৌনপুরী হয়ে গেল কাফী—অথচ দুটি রাগে ভাবগত পার্থক্য বিপুল!

আশাবরী বা জৌনপুরীর সময় হলো সকাল, আর কাফী রাগটি রাত্রের। অর্থাৎ স্বরের পার্থক্য বিচার করে যে ভাবের পরিমাপ করা যায় না, এই সত্যটাই আসল। প্রকৃতপক্ষে জৌনপুরীর সঙ্গে কাফী রাগটির কোনো মিলই নেই, শুধু ওই স্বরগত মিলটুকু ছাড়া।

এই সব চুলচেরা বিচার ছেড়ে দুটি রাগকে পাশাপাশি শুনলেই কথাটার তাৎপর্য উপলব্ধি করা সহজ হবে।

জৌনপুরী রাগটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে আগেই। এবার আসুন, কাফী রাগটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক। রাগটি শুনলেই বুঝতে পারবেন, এ রাগও আপনার অনেক চেনা। কাফী রাগে বাংলা গানের অভাব নেই। কিন্তু আগে, আসুন, এর বিশুদ্ধ শাস্ত্রীয় রূপটি প্রত্যক্ষ করা যাক ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁর কণ্ঠে। ভৈরবীর মতোই, এ রাগেও খেয়াল গাওয়া হয় না। ঠুংরি বা টপ্পা অঙ্গের গানই চলে। ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের গানটি একটি ঠুংরি, কিন্তু এর চাল অনেকটা টপ্পার মতোই—গিটকারী বা মীড়-প্রধান। এই গানটির সঙ্গে তুলনীয় গান বাংলায় দুর্লভ নয়। যদি গানের চাল বা গতির কথা বলি, তবে প্রথমেই টপ্পা অঙ্গের এক ঝাঁক গানের কথা বলতে হবে, যার মধ্যে তিনটি গানের শিল্পী জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী। গানগুলি হলো—‘যাহা কিছু মম আছে প্রিয়তম’, ‘আমার শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে’, এবং ‘ভীষ্মজননী ভাগীরথী’। প্রথম দুটি নজরুল গীতি, তৃতীয়টির লেখক সম্ভবত তুলসী লাহিড়ী। পাশাপাশি মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি গান— যেমন, ‘এ পরবাসে রবে কে’, ‘কে বসিলে আজি’, ‘যদি এ আমার হৃদয় দুয়ার’, ‘চরণ ধ্বনি শুনি তব নাথ...’ ইত্যাদি। খুব সূক্ষ্ম বিচারে পণ্ডিতেরা এতে অবশ্য কাফীর সঙ্গে আরেকটি রাগের সংমিশ্রণের কথা বলবেন; সেই রাগটিও কাফীর খুবই কাছাকাছি, ফলে অত সূক্ষ্ম বিচারে আপাতত আমাদের না গেলেও চলবে। তবু কিছু কথা বলা যেতে পারে। যেমন, ‘শূন্য হাতে ফিরি হে’— গানটি রবীন্দ্রনাথের ভাঙা গান পর্যায়ের এবং বিশুদ্ধ কাফী রাগাশ্রয়ী। মূল গানটি ছিল, ‘রুম ঝুম বরখে’, যা একটি ধ্রুপদ, সুরফাকতা তালে নিবদ্ধ। তালটি দশ মাত্রার এবং রবীন্দ্র সঙ্গীতটিও ওই একই তালে বাঁধা। কিন্তু টপ্পা অঙ্গের দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীত, ‘এ পরবাসে রবে কে’ এবং ‘কে বসিলে আজি’ গান দুটিও ভাঙা গান পর্যায়ের এবং মূল গান দুটি ছিল আসলে শোরী মিঞার টপ্পা। শোরী মিঞা কে ছিলেন অনেক তর্ক আছে। কাহিনীও আছে অনেক। কেউ কেউ বলেন, শোরী মিঞা আসলে দুজন। শোরীর প্রেমিক মিঞা শুধুমাত্র টপ্পা শেখার জন্য শোরীর বাড়িতে পরিচারকের কাজ নিয়ে ছিলেন এবং আড়াল থেকে তার গান শুনে শিখে নেন। তারপর যখন খুব গোপনে গভীর রাত্রে ঘরের দরজা বন্ধ করে বিয়াজ করছেন, তখন একদিন শোরী তাকে আবিষ্কার করলেন এবং তাঁর প্রেমে পড়লেন। কিন্তু অনেকের মতে, ওটা গল্প মাত্র। আসলে শোরী মিঞা একজন মাত্র, দুজন পৃথক নরনারী নয়। কেউ কেউ বলেন, শোরী মিঞা আসলে একটা ছদ্মনাম যার আড়ালে রয়েছেন লক্ষ্ণৌ এর বিখ্যাত টপ্পা গায়ক ওস্তাদ গোলাম নবী। ‘টপ্পা’ শব্দটা এসে ‘ডপা’ শব্দ থেকে। ডপা হলো পাঞ্জাবের মরুঅঞ্চলে উটচালকদের গান, যাতে এই ধরনের দ্রুত চালের মীড় বা গিটকারী দেওয়া হতো। গোলাম নবী এই গান শিখে এসে সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেন।

কিন্তু শোরী মিঞার টপ্পা বা পাঞ্জাবি টপ্পা রপ্ত করা অতি দুরূহ। শোনা যায় নিধুবাবু এই গান শেখার জন্য বহু ওস্তাদের পেছনে ঘুরেছিলেন; কিন্তু তখনকার দিনের ওস্তাদরা নিজের কষ্টার্জিত বিদ্যা সহজে কাউকেই দিতে চাইতেন না। নিধুবাবু শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে ফিরে এলেন, কিন্তু দমলেন না। টপ্পাকে তিনি বাংলার মাটির উপযোগী করে সহজ করে নিলেন, যা পরবর্তীকালে নিধুবাবুর টপ্পা নামেই প্রভ‚ত জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার গানে মীড় অত দ্রুত চালের ছিল না, কিন্তু তা ছিল অনেক গভীর এবং তার পাল্লা ছিল অনেক বড়!...

পার্থক্যটা বোঝাতে গেলে একটু উপমা দিতে হবে। পুকুরের স্থির জলের ওপর দিয়ে একটা ছোট্ট পোকা দ্রুত ধাবিত হলো এবং তার সঞ্চার পথে খুব সূক্ষ্ম একটা তরঙ্গের নকশা এঁকে গেল। আর, ওই শান্ত জলে একটা বড় পাথর ছুঁড়লে যে ব্যাঘাতের ঢেউ বৃত্তাকারে ছড়িয়ে পড়ে—এই দুটো ছবি দু’রকমের টপ্পা গানকে বোঝাতে সাহায্য করবে। প্রথমটা যদি শোরী মিঞার টপ্পা হয়, তবে দ্বিতীয়টি হবে নিধুবাবুর টপ্পা।

নিধুবাবু অর্থাৎ রামনিধি গুপ্ত— ত্রিবেণী অঞ্চলে চাপড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সেটা ছিল ১৭৪১ সালের কথা। বাংলা গান তখনো তার আপন মহিমায় পূর্ণ ঐশ্বর্য নিয়ে প্রকাশিত হয়নি। ঠিক এমনি এক সময়, নিধুবাবু নিয়ে এলেন তার টপ্পা গান। তার কাছে বাংলা গানের ঋণ অপরিমেয়। পরবর্তী কালে পুরাতনী গান, শ্যামা সঙ্গীত, আগমনী গান, দেহতাত্ত্বিক গান, এমন কী রবীন্দ্রনাথেরও বহু গানেই নিধুবাবুর টপ্পার প্রভাব স্পষ্ট।...

যে দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথা বলছিলাম, এ পরবাসে রবে কে এবং কে বসিলে আজি গান দুটিই যদিও শোরী মিঞার দুটি টপ্পার অনুসরণেই রচিত, কিন্তু তা গাওয়া হয় নিধুবাবুর টপ্পারই ধাঁচে। দুটি গানই শুনুন এবং পাশাপাশি শুনুন শোরী মিঞার টপ্পা দুটিও। এ পরবাসে রবে কে— গানটির অবিস্মরণীয় একটি রেকর্ড আছে, মালতী ঘোষালের কণ্ঠে। এবং শোরী মিঞার যে টপ্পাটির কথা বলছিলাম, ‘বে পরিজা তাঁড়ে’ গানটির দুটি রেকর্ডের কথা মনে পড়ছে; শিল্পী—মহম্মদ বাঁদী এবং গিরিজা দেবী। দুটি রেকর্ডই শুনুন, তবে মহম্মদ বাঁদীর রেকর্ডটি বহু পুরোনো— ১৯০৫ সালের। কিন্তু ইন্টারনেটে পাবেন। দুটি রেকর্ড আছে অন্য গানটিরও অর্থাৎ ‘হো মিঞা বে জানুবালে’— যার অনুসরণে ‘কে বসিলে আজি’— রবীন্দ্রসঙ্গীতটি সৃষ্টি হয়েছে। একটি রেকর্ড গিরিজা দেবীর এবং অন্যটি গেয়েছেন মালিনী রজুরকর। কিন্তু উল্লেখ্য, এই প্রতিটি রেকর্ডেই রাগের নাম লেখা হয়েছে কাফী। কিন্তু আলোচ্য দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীতই সিন্ধু রাগাশ্রিত— এমন কথাই বলা হয়ে থাকে (ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী রচিত ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের ত্রিবেনী সঙ্গম’ অথবা প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তীল লেখা রাগ রাগিনীর এলাকায় রবীন্দ্রসঙ্গীত’ বইটি দেখুন)। অবশ্য এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই; কারণ ঠুংরি টপ্পা বা দাদরা ইত্যাদি শ্রেণীর গানে রাগ মিশ্রণ স্বাভাবিক। আর তা ছাড়া ভৈরবী, খাম্বাজ, কাফী, পিলু... ইত্যাদি রাগের অন্য রাগের কিঞ্চিৎ মিশ্রণ ঘটলেও, মূল রাগটির নামই সাধারণত উল্লেখ করা হয়। কাফী, মিশ্রকাফী, সিন্ধুকাফী, সিন্ধু... এ সবই কাফী হিসেবে চিহ্নিত হয়, যদিও সিন্ধু আর কাফীর মধ্যে মিল যতই থাকুক, দুটি রাগ যে পৃথক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। স্বরগত পার্থক্য যত কমই হোক তারা যে ভাবের সঞ্চার করে তার পার্থক্যটা খুবই স্পষ্ট। প্রথমত, কাফী রাগের ভাব হলো প্রধানত ভক্তি। সে অন্তর্মুখী এবং তার বিচরণ একটু খাদের দিকেই বেশি। এই ধরনের রাগকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিভাষায় ‘পূর্বাঙ্গ প্রধান রাগ’ বলা হয়। আর যেসব রাগের বিচরণ মূলত একটু চড়ার দিকে, অর্থাৎ সপ্তকের দ্বিতীয়ার্ধে তাদের বলা হয় ‘উত্তরাঙ্গ প্রধান’ এবং সিন্ধু রাগটি এই দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত। সিন্ধু রাগটির ভাব হলো শৃঙ্গার রসাত্মক এবং সেই সঙ্গে উদাস। এ রাগ বিরহের আর তাই এর বিস্তারের মধ্যে দিয়ে যেন একটা দূরত্ব ঘনিয়ে আসে আমাদের মনে। এ দূরত্ব প্রিয় বিরহের। যেন মনের মানুষটি চলে গেছে দূরে, সিন্ধু তারই জন্য দীর্ঘশ্বাস, পথ চেয়ে থাকা। সিন্ধু রাগটির রঙ খুব হাল্কা নীল আর ছাই বর্ণের মিশ্রণ... পড়ন্ত শীতের দুপুরের কুয়াশার মতো মতন, শুষ্ক— ছড়িয়ে আছে দিগন্ত বিস্তৃত বালিয়াডি, কাউবন... কিংবা মরুভূমি। ভাবের জগতের সবটা বাস্তবের সঙ্গে মেলে না, মিলবেও না। উৎকৃষ্ঠ শিল্প যে ভাবজগৎ সৃষ্টি করে, তা কখনোই বাস্তবের অনুকৃতি হয়ে ওঠে না, বাস্তবের প্রতিফলন বা ফটোগ্রাফ হয় না, বরং তার অন্তর্নিহিত যে সৌন্দর্য তাকেই প্রকাশ করে অসম্ভবের মধ্যে দিয়েই। এই ভাবলোকের ছবিটা ঠিক ভাষায় ফুটিয়ে তোলা যায় না। সেটা যদি সম্ভব হতো তবে তো তাকেই আমরা সঙ্গীত বলতে পারতাম। আমাদের ভাষা বাস্তবেরই ভাষা; তবু তার মধ্যে দিয়েই আভাস দেওয়ার প্রয়াস— এ ছাড়া তো উপায় নেই। কিন্তু আভাস বলেই তা যে অর্থহীন, তা তো নয়! আমি আপনাদের চেতনায় ভাষার মধ্যে দিয়ে একটা অব্যক্ত ভাবের আভাস দিতে চাচ্ছি, আপনারা চেষ্টা করলেই তা আপনাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হবে। শুধু বিশ্বাস রাখুন, আর শুনুন।

কাফী রাগের রঙও হুবহু একই রকম। কিন্তু সে রঙ বহির্লোকের নয়, তার প্রকাশ ভক্তের অন্তর্লোকে। তাতে দূরত্বের আভাস নেই, আছে এক গভীর নৈকট্যের স্নিগ্ধস্পর্শ। কাফী রাগের একটা নিজস্ব ঘ্রাণও আছে, পূজার ফুল আর নৈবেদ্যের সুরভিকে মনে পড়ায়। কাফী রাগটি প্রেম-ভক্তি রসাত্মক, শৃঙ্গার সেখানে যদি বা থাকেও, তবু তা অপ্রধান। কিন্তু সিন্ধু রাগের রস প্রধানত শৃঙ্গার, যার প্রকাশ ঘটে বিরহের মধ্যে দিয়ে, যাকে দূরত্ব বলেছি।

কাফী রাগে আরো কয়েকটি রেকর্ডের কথা বলি। পণ্ডিত বিনায়ক রাও পট্টবর্ধনের একটি অসাধারণ রেকর্ড, ‘অবদিত গুণ না ধর।’ গানটি একটি ভজন গান, কিন্তু কিছুটা ঠুংরির চালে গাওয়া হয়েছে। আরেকটি রেকর্ড, সেটিও ভজন— ‘এ্যায়সে ক্যায়সে যাঁউ পানিয়া ভরন’। এটিও ঠুংরির ঢঙেই গাওয়া। শিল্পী— বাসবরাজ বাজগুরু। পণ্ডিত ভীমসে যোশীর আরেকটি ঠুংরি... আব পিয়াতো মানত নাহি— শুনুন। সেতারে কাফী রাগের একটি বহু পুরোনো রেকর্ড আছে। শিল্পী ওস্তাদ ইমদাদ খাঁ। এই রেকর্ডটিও বহু প্রাচীন, একশো বছর অতিক্রান্ত। এটি অবশ্যই শুনতে হবে।

 সেতারে কাফী টপ্পার একটি রেকর্ড, হয়তো বা একমাত্র রেকর্ডটির শিল্পী বুধাদিত্য মুখোপাধ্যায়। এর পাশাপাশি শুনুন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া নিধুবাবুর টপ্পা— ‘তুমি কার উপরে মান করেছ, মৃগনয়না’। (চলবে)

//জেডএস//

x