শামীম হোসেনের কবিতা

. ০৬:০৩ , অক্টোবর ১২ , ২০১৮


বাহুবদ্ধ দিন

শুকনো পাতার শিরায় লুকিয়ে আছে পিঁপড়া-জীবন! অন্ধমাহুত জানে কীভাবে রেখা ও রঙ ছড়িয়ে

যায় মৃত প্রজাপতি। কত যে সবুজ প্রণালী মিশে গেছে কামপোড়া ঘুঘুর কণ্ঠের ভেতর!

পঞ্চঋতু মারা গেলে বসন্তের জ্বর আসে। তপ্ত দেহের বিপরীতে ছড়িয়ে যায় গীতল হাওয়া। আমার

ফেরারি মন পার হয় পাহাড়ের চুড়ো। হত্যাপ্রবণ রাতে কীসের মাদল বাজিয়ে জাগিয়ে রাখো

চোখের মায়া! উল্কির ইশারায় সতর্ক হয় বনের হরিণ। মেঘের কার্নিশে আঁকা হচ্ছে বাহুবদ্ধ দিন।

 

আত্মপক্ষ

এই ঘাসে ঘাসে কেটে গেলে বেলা, স্মৃতিচিহ্ন জেগে ওঠে শোকবাহী গোধূলির ছাদে। কথার চাবুকে

মেশে না মনের ডোরাকাটা দাগ। আঙুলের ফসিল জানে বিলিকাটা নখের ব্যঞ্জন। সূর্যের সিঁথানে

পোড়ে হননের গান। বাজুবন্দ খুলে গেলে পোড়ে দেখো পায়েরও পাতা। যুদ্ধের ফাঁক-তালে উঁকি

মারে তরবারির রেখা। মোমবাতি জ্বেলে কে পাহারা দেবে গুহামুখ? কপালের ভাঁজ মুছে পাবো কি

ভোরের দেখা? জোনাকির আলো সরিয়ে ভিজিয়ে রাখি মুত্যুর ছায়া। উড়বার আগে কেটে রাখি

সমূহ ডানা।

 

ভোজের বৈঠক

হাওয়াদের ঘরবাড়ি আছে। জমিজিরাতে বুনে দেয় ধূলিকণার বীজ। ঝড় ও ঝগড়ার রাতে লাঙল

বিফলে গেলে খুশি খুশি থাকে। সেবার অঝোর ধারা। মানুষ সমান স্রোতে হাতি ভেসে আসে।

পাক খায় জল ও কাদা। ঘূর্ণির মতো ঘুরে উপরে উঠে যায় বায়ুচোখ।

হাওয়া, বন্ধনে বেঁধেছো যাকে—নীল হয়ে সেও জেগে থাকে। মায়া ও মালতী ফেলে গ্রহণ করে

ঘাসের শরীর। সমুদ্রের ঢেউ হয়ে ভিজিয়ে রাখে মোমের সংসার। বিষের গহীন পথে পায়ে পায়ে

ফ্যাকাশে হয় ভোজের বৈঠক।

 

মাছির গুঞ্জন

জন্ম সত্য জেনে যাপনে রাখি ক্ষরণের পাহাড়। ডিঙির আলোর মতো আমাদের জীবনের ভাঁজ।

ফল ও ফসলের বাসনা পুঁতে রাখি লালিমবাগানে। চিচিঙ্গাস্বভাবে বসে থাকি ঝুল-দোলনায়।

গুপ্তকূপের ভেতর কে শুকায় বোধের চাতাল? মৃত্যু ফিকে করে ঢেউ হয়ে খেলি লুকাচণ্ডি খেলা।

আয় আয় চোখ। আয় আয় পা। 

 

হারিকেন নিভে গেলে কানকথা ভারী হয়ে ওঠে। ভয় ও ভারত্বে বেড়ে যায় মাছির গুঞ্জন। 

 

সহজিয়া ঋণ

এত মায়া। এত ভালোবাসা। আকাশ সমান স্নেহের শাড়ি। আমি কার কাছে রাখি! ঘাসফুল

অ্যাকুরিয়ামে প্রজাপতি হই। পাখার ওপর কে ছুঁয়ে দেয় বসন্ত-রঙ! সেইসব মহৎ শত্রুদের প্রণতি

আজ। যাদের বাঁকা হাসিতে গড়িয়ে গেছে মার্বেল-পথ। ভাঙা চুড়ি কুড়িয়ে পার হল বালকজীবন।

সময়ের বড়শিতে এখন মাছ হয়ে ঝুলে থাকি। ঠোঁট বেয়ে রক্ত ঝরে। সেই লাল জমা হয়

পাতালগাঙে। হৃদক্যানভাসে ফুটে ওঠে অজস্র মুখ। ছিঁড়ে যাচ্ছে মুখোশের দিন। শোধ কি হবে

সেই সহজিয়া ঋণ?


 

 পাঠ-প্রতিক্রিয়া

‘অন্ধমাহুত জানে কীভাবে রেখা ও রঙ ছড়িয়ে যায় মৃত প্রজাপতি।’

আচ্ছা, অন্ধ মাহুত ঠিক কীভাবে জানে এটা? কবি নিজে কি ব্যাখ্যা দিতে পারবেন? কবির কাছে কবিতার ব্যাখ্যা চাওয়া ধৃষ্টতা হয়তো, কিন্তু কবির কি পাঠককে বুঝিয়ে দেওয়ার, অন্তত ইশারা দেওয়ার দায়বদ্ধতাটুকুও নেই? হয়তো এ বাক্যে ইশারা আছেও, পাঠক হিসেবে যেটি আমি ধরতে পারিনি। যেটা ধরতে পেরেছি, সেটা হলো কবির পঠন ভালো, গঠনশৈলী ভালো, কবজিতে জোর আছে, কিন্তু যে বোধ ‘উড়বার আগে কেটে রাখি সমূহ ডানা’য় পাওয়া যায়, সে বোধ আমি এখানে পাইনি। দু’ধরনের উদাহরণই দেওয়া যাবে কবিতা কটি থেকে। এবং সেখান থেকেই আমি সিদ্ধান্তে আসতে পারি, কবির যাপনে কবিতা আছে, স্পর্শকাতর ও ধ্যানী হৃদয় আছে তার; কবি হওয়ার নেশাও আছে, উত্তেজিত মস্তিষ্কে কবিতা বানানোর ঝোঁকও আছে। ফলে ‘আকাশ সমান স্নেহের শাড়ি। আমি কার কাছে রাখি’ কিংবা ‘সময়ের বড়শিতে এখন মাছ হয়ে ঝুলে থাকি। ঠোঁট বেয়ে রক্ত ঝরে’-তে যতটা মুগ্ধ হই, ততটাই হতাশ হই ‘আঙুলের ফসিল জানে বিলিকাটা নখের ব্যঞ্জন’ কিংবা ‘গুপ্তকূপের ভেতর কে শুকায় বোধের চাতাল? মৃত্যু ফিকে করে ঢেউ হয়ে খেলি লুকাচুরি খেলা’য়। কারণ, মুগ্ধতার পঙ্ক্তিগুলো একদম সাবলীল, আমাকে ইশারা দেয়, কাঙ্ক্ষাও দেয়; আবার হতাশার পঙতিগুলো যেন বহুব্যবহারে জর্জরিত, কবিতার পাঠক হিসেবে মাঝে মাঝে বিরক্তিও আনে।

কবিকে আমি শুধু একটাই অনুরোধ করব, জোর করে লিখবেন না। লেখাই আপনাকে ডাকবে। অপেক্ষা করুন। শুভকামনা আপনার জন্য। ‘সহজিয়া ঋণ’-এ ঋণী করুন।

....

[আমরা গল্প ও কবিতার সঙ্গে পাঠ-প্রতিক্রিয়া জুড়ে দেবার সীদ্ধান্ত নিয়েছি। যিনি পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখবেন তাকে শুরুতে জানতে দেয়া হয় না লেখকের নাম। আবার লেখক কখনোই জানতে পারবেন না পাঠ-প্রতিক্রিয়া কে লিখেছেন।বি.স.]

//জেডএস//

x