চেনা সুরের রাগ-রঙ

বিশ্বদেব মুখোপাধ্যায় ১০:০০ , নভেম্বর ২৮ , ২০১৮

পর্ব-২০

মেঘ বা মেঘমল্লার, যাই বলি, প্রচলিত রাগ হিসেবে মিঞা মল্লারের পরেই বোধহয় নাম করতে হয় ‘রামদাসী মল্লারের’। মিঞা মল্লারের সঙ্গে এর মিল আছে, কিন্তু মিঞা মল্লার রাগটির সমগ্র অস্তিত্বজুড়েই যেমন ঘন মেঘের সমারোহ, রামদাসী মল্লারে যেন ঠিক তেমনটি নয়। মিঞা মল্লারের প্রাণ যে স্বরটি তা হলো আন্দোলিত কোমল গান্ধার, যা এর মেঘাচ্ছন্নতাকে প্রকাশ করে; মিঞা মল্লার গভীর, গম্ভীর, মগ্ন। এতটাই যে তার রস প্রায় নৈর্ব্যক্তিক—শুধু মাত্র প্রকৃতিতে সম্পৃক্ত। কিন্তু শুধু মাত্র শুদ্ধ গান্ধারের স্পর্শে রামদাসী মল্লারে সে যেন লৌকিক হয়ে ওঠে। মিঞা মল্লারে শুদ্ধ গান্ধার লাগে না; কিন্তু রামদাসী মল্লারে সে যখন ষড়জ থেকে সবগুলি শুদ্ধস্বর ছুঁয়ে পঞ্চম থেকে কোমল গান্ধারকে স্পর্শ করে, মনে হয় সে যেন আলোকিত মর্ত্যলোক থেকে হঠাৎ মেঘলোকে প্রবেশ করে আমাদের হৃদয়কে বিহ্বল করে দিল।

ওস্তাদ আলি আকবর খাঁর সরোদে রামদাসী মল্লারের রেকর্ডটি শুনুন। ওস্তাদ আমীর খাঁর কণ্ঠেও একটি অনবদ্য রেকর্ড আছে। আছে পণ্ডিত বিনায়ক রাও পট্টবর্ধনের কণ্ঠে একটি ছোট রেকর্ড। শ্রীকৃষ্ণ রতন জঙ্কারের গাওয়া রেকর্ডটিও শুনতে পারলে ভালো হয়।

রামদাসী মল্লার রাগে বাংলা গান শুনেছি, যতদূর মনে পড়ে, মাত্র দুটি। একটি নজরুলগীতি, বাণী—‘ঝর ঝর ঝরে শাওন ধারা/ভবনে এল মোর কে পথহারা...’ গানটি কার কণ্ঠে শুনেছি, মনে নেই; কারও রেকর্ড আছে কিনা তাও জানা নেই। তবে গানটিতে রামদাসী মল্লারের রূপটি পরিস্ফুট—তা মনে আছে। আরেকটি রেকর্ডের কথা মনে পড়ছে। রাগপ্রধান বাংলাগান, শিল্পী—হৈমন্তী শুক্লা। গানটির কথা—‘তুমি বাজালে জীবনের বীণা’। রামদাসী মল্লার রাগটিকে এখানেও পাবেন সুন্দরভাবে।

রামদাসী মল্লারের পরেই আসে গৌড় মল্লারের কথা, অন্তত জনপ্রিয়তার বিচারে। তবে সেটা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রেক্ষিতে বিচার করলে। লঘুসঙ্গীত বা রাগপ্রধান বাংলা গানের নিরিখে, মনে হয়, গৌড় মল্লারই বেশি জনপ্রিয়। অবশ্য এ প্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন, গৌড় মল্লারের রূপ নিয়েও বলাইবাহুল্য, বহু মতভেদ আছে। রাগটির দুটি রূপ। একটি হলো কাফী ঠাটের গৌড় মল্লার, যা সম্ভবত বেশি প্রাচীন, কিন্তু এখন প্রায় শোনাই যায় না। তবে এ রূপ কেমন ছিল তার আভাস আজও পাওয়া যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের কিছু গানে এবং তার সংখ্যাও নেহাৎ কম নয়; যেমন, আজ তারায় তারায়, আঁধার অম্বরে প্রচণ্ড ডম্বরু, আবার এসেছে আষাঢ়, আমি শ্রাবণ আকাশে ওই, তুমি কোন্ ভাঙনের পথে এলে, মন মোর মেঘের সঙ্গী, বাণী মোর নাহি, বর্ষণ মন্দ্রিত অন্ধকারে এসেছি, তুমি কোন্ ভাঙনের পথে এলে... প্রভৃতি। আরো অনেক রবীন্দ্রসঙ্গীতেই কাফী ঠাটের গৌড় মল্লার রাগটি আছে অন্য রাগের সঙ্গে মিশ্রভাবে— বিশেষত সাহানার সঙ্গে মিশে আছে অনেক গানেই; যেমন, আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে, যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি, শুধু তোমার বাণী নয়গো হে বন্ধু হে প্রিয়। আবার মেঘ রাগের সঙ্গে মিশ্র হিসেবে পাচ্ছি, যেতে যেতে একলা পথে— গানটিতে। কিন্তু এই যে রাগটি, অর্থাৎ কাঠী ঠাটের গৌড় মল্লার, এর পরিপূর্ণ শাস্ত্রীয় রূপের পরিচয় পাওয়া আজ আর খুব সহজ কথা নয়। আমার অন্তত এই রাগটির শাস্ত্রীয় রূপটি প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়নি।

কিন্তু এই গৌড় মল্লারের ‘গৌড়’ শব্দটির অর্থ কী? প্রশ্নটা মনে আসা স্বাভাবিক, কিন্তু এর স্পষ্ট উত্তর দেওয়া কঠিন। এক সময় বাংলার উত্তরাঞ্চলকে বলা হতো গৌড় দেশ এবং দক্ষিণাঞ্চল রাঢ় দেশ নামে পরিচিত ছিল। গৌড় দেশ থেকে উৎপত্তি বলেই কি গৌড় মল্লার? কিন্তু অন্য একটা সম্ভাবনাও আছে। সে কথা বলছি।

একটি খুব প্রাচীন রাগ ছিল, যার নাম ছিল, গোঁড়। নামটি গৌড় শব্দের অপভ্রংশ হতে পারে। গোঁড় রাগাশ্রিত একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত হলো, হে নিখিল ভার-ধারণ বিশ্ববিধাতা, যা আসলে ‘ভাঙা গান’ হিসেবে চিহ্নিত অর্থাৎ অন্য একটি পুরোনো গানের অনুসরণে লেখা। রবীন্দ্রসঙ্গীতটি এবং মূল গানটিও ছিল, ঝাঁপতালে নিবদ্ধ, অর্থাৎ দশমাত্রার তালে। মূল গানটির বাণী ছির, ‘তু সকল রূপ’। ঝাঁপতালে নিবদ্ধ এই ধরনের ধ্রুপদ গানকে বলা হয় সাদরা। এই গানটি অবশ্য আমি শুনিনি। চৌতালে নিবদ্ধ আরেকটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘তুমি জাগিছ কে’। এটিও ‘গোঁড়’ রাগাশ্রিত এবং ভাঙা গান পর্যায়ের, যার মূল ধ্রুপদটি ছিল ‘তুম নয়ন মে’। না এ গানও শুনিনি। যতদূর জানি, গোঁড় রাগে ধ্রুপদের একমাত্র রেকর্ড যেটি, সেটির শিল্পী মোহন সিং। গানটির বাণী, ‘য়হ লঢ়াই তুম’ ... যতদূর মনে পড়ে। তবে পুরোপুরি নিশ্চিত নই। প্রসঙ্গত বলি, রামদাসী মল্লার রাগটির সঙ্গে গোঁড় রাগটির কিছুটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়। পণ্ডিতদের মতে রামদাসী মল্লার রাগটি আসলে সাহানা আর গোঁড়—এই দুটি রাগের সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে। আবার গোঁড় রাগটি সম্পর্কে পণ্ডিত ভাতখণ্ডেজীর মতে গোঁড় রাগটি পূর্বাঙ্গে (অর্থাৎ খাদের দিকে) কানাড়া এবং উত্তরাঙ্গে (অর্থাৎ চড়ার দিকে) মল্লারের সংমিশ্রণ। বিষ্ণুপুরের প্রখ্যাত ধ্রুপদী গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার ‘সঙ্গীতচন্দ্রিকা’ গ্রন্থে একই মত প্রকাশ করলেও গোঁড় বা কাঠী ঠাটের গৌড় মল্লার এখন অবলুপ্ত। গৌড় মল্লারের যে রূপ এখন প্রচলিত, তা আসলে কাফী ঠাটের নয়, খাম্বাজ ঠাটের। মনে হয়, এর স্বাতন্ত্রের কারণেই এই রাগটি তার নিজের অস্তিত্বকে বজায় রাখতে পেরেছে। আসলে কাফী ঠাটের অনেকগুলি রাগ ভাবগত দিক থেকে খুবই কাছাকাছি; যেমন, মেঘ, মিঞা মল্লার, কাফী কানাড়া, সুহা, সুঘ্রাই, গোঁড় এবং আরো অনেক নামই হয়তো করা যেতে পারে, যারা পৃথক রাগ রূপে স্বীকৃত হলেও, ওই সূক্ষ্ম পার্থক্যের কারণেই বহু রাগই ক্রমমই হারিয়ে যায়। রাগটি হলো, ‘গৌড়গিরি’। কেউ কেউ বলেন ‘গৌড়গিরি মল্লার’। রাগটির উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। ইতিহাস নির্ভর না হলেও, ভারতের নামে প্রচারিত যে মত, তাতে বলা হয়েছে, মূল ছ’টি রাগ থেকে সব রাগ উৎপন্ন হয়েছে। ছয় রাগের প্রত্যেকের পাঁচটি করে রাগিনী, পাঁচটি করে পুত্র এবং প্রত্যেক পুত্রের আবার একজন করে পত্নী, অর্থাৎ মোট ছিয়ানব্বই জনের রাগরাগিনীর পরিবার। আরো নানা মতও প্রচলিত আছে, কিন্তু রাগরাগিনীর এই বিভাজন এখন আর মানা হয় না; মনে হয়, এসব বিভাজন প্রায়শই মনগড়া এবং অকারণ। বিশেষত রাগ ও রাগিনীর বিভাজন কিভাবে হবে, তার কোনো নির্ণায়ক নীতিও পাওয়া যায় না। ফলে এ বিভাজনের মূল্য এখন শুধুমাত্র ঐতিহাসিক, আর কিছু নয়। ...

সে যাই হোক, যে কথা বলছিলাম, ‘গৌড়গিরি’ রাগটির সন্ধান প্রথম পাই ভরতের নামে প্রচলিত রাগ-রাগিনী বিভাজনের তালিকায়। তার মতে, গৌড়গিরি হলেন হেমন্ত ঋতুর রাগ মালকোষের রাগিনী গৌরীর পুত্র বঙ্গানের বধূ। অর্থাৎ রাগিনী। রাগরাগিনী বিভাজনের প্রচলিত আরেকটি মত কল্পিনাথের নামে প্রচারিত। এই মতানুসারে গৌড়গিরি হলেন বসন্তের রাগিনী। এসব মতবিরোধ আছে, কিন্তু তবু গৌড় বা গোঁড়ের সূত্র ধরে আমরা এই রাগটির কথা স্বাভাবিকভাবেই স্মরণ করতে পারি। অবশ্য তখন এই রাগের রূপ ঠিক কেমন ছিল, তা এখন নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব না হলেও, এ রাগের রেকর্ড দুর্লভ হলেও, আছে। একটি রেকর্ড যেন সমস্ত চৈতন্যকে এক অন্তহীন মেঘের রহস্যে আচ্ছন্ন করে এবং শ্রবণের সে অনুভূতি ভোলার নয়। ততোধিক রহস্যময় শিল্পীর গায়কী এবং রাগরূপায়ণের ভঙ্গিমা। শিল্পী পণ্ডিত হরিভাউ ঘাংগ্রেকর ছিলেন গোয়ালিয়র ঘরাণার পণ্ডিত রামকৃষ্ণ বুয়াভাজের শিষ্য এবং এই পরম্পরা গায়কীর মধ্যে একটা নিজস্বতা আছে, যা অনেকটা যেন প্রাচীনত্বের গন্ধের মতো সম্মোহক। তবে রেকর্ডটি খুবই দুর্লভ। অবশ্য অনেক সহজলভ্য এবং আরো বিস্তারিত একটি সাম্প্রতিক রেকর্ড আছে। শিল্পী পণ্ডিত যশরাজ। এই রেকর্ডটি অবশ্যই শুনতে হবে। শুনলে হয়তো মনে হবে, কাফী ঠাটের গৌড় মল্লারে বাঁধা যেসব রবীন্দ্রসঙ্গীতের কথা একটু আগেই বলেছি, তাদের গভীরেও এই গৌড়গিরি রাগটির রস সঞ্চারিত হয়েছে। এছাড়া উপায় নেই, যেহেতু কাফী ঠাটের গৌড় মল্লারের কোনো ধ্রুপদের রেকর্ড প্রায় অলভ্যই বলা চলে। অবশ্যই তার চাইতেও বেদনার কথা, ধ্রুপদ গানও তো প্রায় অবলুপ্তিরই পথে! অথচ, শোনা যায়, কাফী ঠাটের গৌড় মল্লার নাকি ধ্রুপদীয়ারাই গাইতেন এবং খাম্বাজ ঠাটের গৌড় মল্লার ছিল খেয়ালীয়াদের প্রিয়। আজও তাই আছে এবং রাগটি খুবই জনপ্রিয়ই বলা যায়। এই দুটি রাগের নাম যদিও গৌড় মল্লার, কিন্তু মিল প্রায় নেই বললেই চলে! আর খাম্বাজ ঠাটের গৌড় মল্লারে রেকর্ডের কোনো অভাব নেই। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের খেয়াল আঙ্গিকে যেমন, তেমনিই লঘু সঙ্গীতের সুরেও এ রাগের ব্যবহার অনেক হয়েছে, এবং খুব সার্থকভাবেই হয়েছে। তবে এ রাগটির রূপ নিয়েও অনেক মতভেদ আছে। অথবা বলা ভালো, মতভেদ নয়, বরং অনেক মত আছে। আসলে একটাই রাগ, শুধু চলনের সামান্য একটু পার্থক্য। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম চুলচেরা বিচারে পার্থক্য করাই যেতে পারে, কিন্তু পার্থক্যটা যে করতেই হবে, এমন তো মাথার দিব্যি কিছু নেই। আমরা যারা সাধারণভাবে রাগের সঙ্গে পরিচিত হতে চাই, তাদের অত হিসেব করার কি দরকার? তবে, কাছাকাছি হলেও কোনো কোনো রাগের পার্থক্য সত্যিই আছে। এই যেমন গৌড় মল্লার আর নট মল্লার। হ্যাঁ, সেটা অবশ্যই বুঝাবো (চলবে)

//জেডএস//

x