কল্পনার ওপর উপন্যাসকে ছেড়ে দেওয়া যায় না : মোস্তফা কামাল

. ১০:০০ , নভেম্বর ৩০ , ২০১৮

ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক মোস্তফা কামালের জন্ম ৩০ মে ১৯৭০ বরিশালের আন্ধার মানিক গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন সাংবাদিকতাকে। দেশের শীর্ষ দৈনিকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে দৈনিক কালের কণ্ঠর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। সম্প্রতি ভারতের নোশনপ্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার ইংরেজি উপন্যাসের সংকলন ‘থ্রি নভেলস’। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাসউদ আহমাদ

সম্প্রতি ভারত থেকে প্রকাশিত হয়েছে আপনার উপন্যাস সংগ্রহ থ্রি নভেলস। তিনটি উপন্যাসের সংগ্রহ এ বই। প্রথমে তো ঢাকা থেকে আলাদা বই হিসেবে উপন্যাস তিনটি বের হয়, এবার অন্য দেশ থেকে ইংরেজিতে প্রকাশ পেল। আপনার অনুভূতি কেমন?

মোস্তফা কামাল : অনুভূতি খুবই ভালো। কারণ এই প্রথম আমার কোনো বই দেশের বাইরে থেকে ইংরেজিতে প্রকাশিত হলো। তিনটি বইই প্রথমে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। থ্রি নভেলস-এর প্রথমটি ফ্লেমিং ইভেনটাইড, যা ‘বারুদপোড়া সন্ধ্যা’ নামে প্রকাশিত হয় অনন্যা থেকে। এর ইংরেজি রূপান্তরটি আমি নিজেই করেছিলাম। পরে পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করে দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। প্রথমে ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে। এই বইটির পটভূমি হচ্ছে—বাংলাদেশে মুক্তযুদ্ধপরবর্তী সময়ে যখন জামায়াত-বিএনপি সরকারে ছিল, সেই সময়ের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা। একটি মুক্তযুদ্ধের পরিবার কীভাবে ভিকটিম হয়েছিল এবং গল্পের প্রয়োজনে আরো নানা ঘটনাপ্রবাহ এসেছে। পরের বইটি ‘হ্যালো কর্ণেল’ প্রকাশিত হয় অবসর প্রকাশনা সংস্থা থেকে। এটির অনুবাদ করেন দুলাল আল মনসুর এবং নাম দেন ‘তালিবান, পাক কর্ণেল এন্ড আ ইয়াং লেডি’। তৃতীয় উপন্যাসটির নাম ‘তেলবাজ’, এটি অনন্যা থেকে প্রকাশিত হয়। এর অনুবাদ করেছেন মাছুম বিলাহ—‘দ্য ফ্ল্যাটারার’ নামে। তিনটি উপন্যাসই আমার প্রিয় উপন্যাস। তিনটি বই একত্রে অন্য ভাষায় অন্য দেশ থেকে বেরিয়েছে, নতুন পাঠক ও নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে—লেখক হিসেবে এটা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।

আলাদাভাবে এই তিনটি বই নির্বাচিত হলো কীভাবে?

মোস্তফা কামাল : ‘বারুদপোড়া সন্ধ্যা’ যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখনই বেশ সাড়া পড়ে। তরুণ ও বোদ্ধা পাঠক উপন্যাসটি পছন্দ করেন। সেই প্রেরণা থেকে এর ইংরেজি অনুবাদ করা হয়। পরের উপন্যাসদুটিও নানাভাবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। আমার নিজের তো অভিপ্রায় ছিলই, অনুবাদকেরাও বলছিলেন, তিনটি উপন্যাস একসঙ্গে কোথাও দেবার জন্য। সেই ভাবনা থেকেই আমি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে জমা দিয়েছিলাম। পরে ভারতের নোশনপ্রেস অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে পাণ্ডুলিপি গ্রহণ করে এবং কিছুদিন পর তারা বইটি নির্বাচন করেছে এবং প্রকাশ করবে সেই খবরটি আমাকে জানায়। তারা আমার কাছে ম্যানস্ক্রিপ্ট পাঠাতে বলে। আমি পাঠিয়ে দেই। তারা চুক্তিপত্র এবং বইয়ের কভার পাঠায়। সব ধরনের প্রক্রিয়া মেনে অবশেষে বইটি প্রকাশিত হলো। আমি ভাবিনি যে, বইটি এত দ্রুত প্রকাশিত হয়ে যাবে।

থ্রি নভেলসপ্রকাশের পর কেমন সাড়া পাচ্ছেন?

মোস্তফা কামাল : দারুণ সাড়া পাচ্ছি। আমার তো প্রায় একশ বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বই প্রকাশের যে আনন্দ, সেটা এবারে বিশালভাবে অনুভব করলাম। বইটির পাঠক কিন্তু বাংলাদেশেই শুধু না, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমি রেসপন্স পেয়েছি। বইটি এখন বাংলাদেশের রকমারি ডটকমে পাওয়া যাচ্ছে। আমার কয়েকটি বই বেশ পাঠকপ্রিয় হয়েছে। কোনো কোনো বইয়ের একাধিক মুদ্রণও বেরিয়েছে। কিন্তু ‘থ্রি নভেলস’ প্রকাশের পর দেশে ও দেশের বাইরে থেকে যে সাড়া পাচ্ছি, আগে কখনো আমি এমন সাড়া পাইনি। আমাজন ডটকম, আমাজন ইউকে, আমাজন ইন্ডিয়া, ভারতের দুটো বড় বইয়ের মার্কেটিং প্লেস, গুগল প্লে এবং গুগল স্টোরসসহ নানা জায়গায় বইটি পাওয়া যাচ্ছে। আমি খুবই অভিভূত হই, পৃথিবীর নানা দেশে আমার বন্ধু আছে, তাদের কাউকে যখন বইটির কথা বলি, তারা বইটি খুঁজে পায় এবং বলে যে, ঠিক আছে। পাওয়া যাচ্ছে। একজন লেখক হিসেবে আমি মনে করি, কোনো লেখকের জন্য এটা একটা বড় প্রাপ্তি। সাধারণ যে কোনো পুরস্কারের চেয়েও এই প্রাপ্তিটা বেশি আনন্দের।

আপনার আরো একটি উপন্যাস জননীলন্ডনের অলিম্পিয়া পাবলিশার্স থেকে ইংরেজিতে প্রকাশিত হচ্ছে, সেই বইটি নিয়ে বলুন?

মোস্তফা কামাল : ‘জননী’ও আমার প্রিয় একটি উপন্যাস। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে। বছর খানেক আগে লন্ডনের অলিম্পিয়া পাবলিশার্সকে আমি উপন্যাসটির সিনফসিস পাঠিয়েছিলাম। আরো কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানেও পাঠিয়েছিলাম। পরে অলিম্পিয়া পাবলিশার্স আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং বলে যে, তোমার এই বইটি অন্য রকম লাগছে। তুমি আমাদেরকে এর ম্যানস্ক্রিপ্ট পাঠাও। প্রথমে আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলাম—তারা কেমন প্রকাশক। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখলাম, তারা অনেক বড় ও নামি প্রকাশক। লন্ডনে তাদের বিশাল অফিস এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাদের অফিস আছে। ভারতেও তাদের শাখা আছে। বিশাল নেটওয়ার্ক আছে তাদের। পাণ্ডুলিপি পাঠানোর পর, তারা বলল যে আমরা ছয় সপ্তাহ সময় নেব। ঠিক ছয় সপ্তাহ পরে তাদের এডিটোরিয়্যাল বোর্ডের যিনি প্রধান, তিনি আমাকে বড় একটি চিঠি লিখলেন। তারা জানালেন যে, আমরা তোমার বইটি প্রকাশ করতে চাই। তুমি পাণ্ডুলিপিটি আবার পাঠাও, যেটা ফাইনালি বই আকারে প্রকাশিত হবে। এর সঙ্গে তোমার কাছে বই সংক্রান্ত একটি ডিলের কপি যাবে, তোমার পছন্দ হলে গ্রহণ করে সাইন করে পাঠাও। আমি তখন খুবই উত্তেজিত বোধ করি—এত বড় প্রতিষ্ঠান আমার বইটি প্রকাশ করার সম্মতি জানিয়েছে। আমি ডিডের কপিটা পড়ি। অত্যন্ত গোছানো ও পরিকল্পিত এবং একজন লেখকের যে রাইট—রয়্যালটি, স্বত্ব সমস্ত কিছু তাতে উল্লেখ করা আছে। সবকিছুই আন্তর্জাতিক কাঠামোতে উল্লেখ করা ছিল। পরে আমি সই করে পাঠালাম। সম্মতিপত্রে ডিজিটালি সাইন করতে হয়। সেটা পাঠানোর পরে তারা কাউন্টার সাইন করে একটি কপি আমাকে পাঠায়। পরে আমার সঙ্গে আর একজন যোগাযোগ করেন। যিনি তৃতীয় পর্যায়ে যোগাযোগ করেন, তিনি আলাদা একজন। তাদের প্রত্যেক বিভাগে আলাদা নির্বাহী আছেন। তিনি আমাকে বললেন যে, আমার ব্যাংক একাউন্ট এবং কীভাবে রয়্যালটি পাঠাবেন, সে বিষয়ে। বই প্রকাশের আগেই সব বিষয়ে লেখককে তারা অবহিত করেন এবং লেখকের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন।

বাংলাদেশের বড় ও বিখ্যাত প্রকাশনা থেকে আপনার বই প্রকাশিত হয়েছে, বিদেশে বই প্রকাশের অভিজ্ঞতায় পার্থক্যটা কেমন?

মোস্তফা কামাল : ঢাকার বড় বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে আমার অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু অলিম্পিয়া পাবলিশার্স লেখককে এত গুরুত্ব ও মর্যাদা দেয়, বাংলাদেশের কোনো লেখকের আন্তর্জাতিক কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বই প্রকাশিত না হলে আসলে অনুধাবন করতে পারবে না। এটা বড় একটা অ্যাচিভমেন্ট। একজন লেখকের কত সম্মান ও গুরুত্ব—তারা সেটা নতুন করে বুঝতে সাহায্য করেছেন আমাকে। তারা চূড়ান্ত কপিটি পাঠিয়েছেন—বইয়ের কোথায় তারা সম্পাদনা করেছেন, নতুন শব্দ ব্যবহার করেছেন, কীভাবে করেছেন, সবকিছু দেখিয়েছেন। ‘দ্য মাদার’ নামে জানুয়ারিতে বইটি প্রকাশিত হবে। প্রথম মুদ্রণে তারা পাঁচ হাজার কপি ছাপবে এবং রয়্যালটি দেবে কুড়ি পার্সেন্ট। দ্বিতীয় মুদ্রণ থেকে পঁচিশ শতাংশ রয়্যালটি দেবে। পাশাপাশি তারা ই-বুক করছে, সেখানেও ৫০% রয়্যালটি দেবে। আশা করছি, এটা একটি ভালো কাজ হবে। বাংলাদেশের একজন লেখক হিসেবে আমি অত্যন্ত আনন্দিত এবং খুশি।

আপনি ট্রিলজি উপন্যাস লিখছেন ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সময়কে উপজীব্য করে। আগামী বইমেলায় এর শেষ পর্ব প্রকাশিত হবে। এ বিষয়ে বলুন?

মোস্তফা কামাল : আমার আসলে অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল বড় ক্যানভাসে কাজ করার। সে কারণে গত ১৭/১৮ বছর ধরে আমার কাজে লাগতে পারে, এমন বইপত্র আমি সংগ্রহ করেছি। ঢাকা থেকে তো বটেই, ভারতের বিভিন্ন লাইব্রেরি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তির বাড়ি থেকেও বই সংগ্রহ করেছি। যে সময়টা ধরে আমি কাজটা করছি—ইতিহাসের বিশাল একটা ক্যানভাস, সময়, ঘটনাপ্রবাহ এবং নানা উত্থান-পতন; সাতচল্লিশের দেশভাগ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত। এই দীর্ঘ সময়, ঘটনাপ্রবাহ এবং চরিত্রগুলো সত্য। আমাকে লিখতে হবে উপন্যাস। ফলে এই বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হয়েছে—যিনি নায়ক তাকে তো আমি ভিলেন বানাতে পারব না, বা মিথ্যে কোনো তথ্যও দিতে পারব না। ইতিহাস-ঘটনা পরম্পরা ও চরিত্রকে পড়াশোনা করে জেনে বুঝে সেখানে প্রাণ দিতে চেষ্টা করেছি। ইতিহাসের চরিত্রগুলোকে আমি বাস্তবের রক্ত মাংশের মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেছি। আমার কল্পনা ও সৃজনমানস কাজে লাগিয়েছি। পাঠক উপন্যাস পড়তে পড়তে যেন ঘটনা ও চরিত্রের সাথে মিলেমিশে যেতে পারেন—আমি আমার মতো চেষ্টা করেছি। বাকিটা পাঠক বলতে পারবেন। এর দুটো পর্ব প্রকাশিত হয়েছে—অগ্নিকন্যা এবং অগ্নিপুরুষ; শেষ পর্ব ‘অগ্নিমানুষ’ আগামী বইমেলায় প্রকাশিত হবে।

বিখ্যাত ব্যক্তি বা ইতিহাস অবলম্বনে উপন্যাস লেখার সময় একজন ঔপন্যাসিকের সামনে প্রধান সমস্যা বা ঝুঁকিটা কী? আপনি কোনো ঝুঁকি বোধ করেছেন কি?

মোস্তফা কামাল : ঝুঁকিটা হচ্ছে, ঘটনা ও চরিত্রকে ভুলভাবে যেন উপস্থাপন করা না হয়। এই সতর্কতা তো আমাকে অবলম্বন করতে হয়েছে। আমি বইপত্র পড়ে, ফিল্ডওয়ার্ক করে, বিভিন্ন ভিডিও দেখে সেই সময় ও মানুষগুলোকে অন্তর দিয়ে অনুভব করে সেটা বাস্তবে রূপ দিয়ে উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেছি। মওলানা ভাষানী, সোহরাওয়ার্দী, নেহরু, জিন্নাহ এবং বঙ্গবন্ধুকে তাদের ভেতর-বাহির উপলব্ধি করে ধারণ করে কাহিনি তৈরি করতে হয়েছে। উপন্যাসই আমি লিখছি, কিন্তু কোথাও যেন তথ্যবিভ্রাট না হয়, চরিত্রকে ভুলভাবে ভুল তথ্য দিয়ে কাল্পনিক ইমেজে ধরতে গিয়ে কাউকে খুব বড় বা ছোট করা না হয়—এসব বিষয়ে আমাকে সতর্ক থাকতে হয়েছে। ইতিহাসের ছাত্র বা গবেষক যেন বলতে না পারেন যে, আমার উপন্যাসে সময় ও চরিত্রকে ভুলভাবে তুলে আনা হয়েছে। সেটা নিয়ে সাবধান থাকতে হয়েছে। আমি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের কথা লিখছি ২০১৮ সালে বসে, বা ছয় দফার কথা লিখছি, পাঠক পড়তে গিয়ে যেন একাÍতা বোধ করেন, ওই সময়ের ঘটনা ও চরিত্রের সঙ্গে মিশে যান, সেটাও মাথায় রেখেছি।

সময়ের দীর্ঘ ক্যানভাসে উপন্যাস লিখতে গিয়ে আপনার অভিনব কোনো অভিজ্ঞতা হয়েছে কিনা, যা অন্য লেখার সময় হয়নি?

মোস্তফা কামাল : তা তো হয়েছেই। কারণ যখন সাধারণ একটি প্রেমের উপন্যাস লিখছি বা মজার কোনো উপন্যাস কিংবা গোয়েন্দা উপন্যাস—সেখানে আমার কল্পনাই প্রধান। বাস্তবের সত্য নিয়ে আমাকে খুব একটা মাথা খাটাতে হচ্ছে না। কিন্তু যখন সময়ের বড় একটা ক্যানভাস ও বিশিষ্ট ব্যক্তি আমার উপন্যাসের চরিত্র, তখন লেখার সময় আমাকে সেই সময়, ঘটনা ও চরিত্রের মাঝেই ডুবে যেতে হয়েছে। কল্পনা ও কলমের ওপর উপন্যাসকে ছেড়ে দেওয়া যায় না। ফলে লেখার সময় অন্য আমি হয়ে অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, যা সাধারণ গল্প উপন্যাস লেখার সময় সেই অভিজ্ঞতা হয়নি।

এখন আপনি কী কী লিখছেন?

মোস্তফা কামাল : এখন কয়েকটি লেখার কাজ চলছে। কিন্তু প্রধানত এই ট্রিলজি উপন্যাসের শেষ পর্ব লিখছি—অগ্নিমানুষ। এই দীর্ঘ উপন্যাসে আমি দেখাতে চেয়েছি নারী-পুরুষ ও মানুষের সম্মিলিত যুদ্ধ। বিশাল ক্যানভাসে মানুষ সময় ও প্রতিকূলতা কীভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জয় করে নেন। যুগে যুগে নানা গুনী মানুষ স্বাধীনতা ও ভাষার আন্দোলনে কাজ করেছেন, বিরোধীতাও করেছেন। ফলে নানা সময়ের নানা ধরনের মানুষ ও তাদের মনোভাব, লড়াই ও যুদ্ধ এই উপন্যাসের প্রধান পটভ‚মি। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়, পরে বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার ঘটনায় উপন্যাস শেষ হয়। আশা করছি, তিন পর্ব একসঙ্গে বই আকারে প্রকাশিত হবে এবং ইংরেজিতেও অনূদিত হয়ে প্রকাশ পাবে।

আপনি পেশাগতভাবে সাংবাদিক। পৃথিবীর বিখ্যাত অনেক লেখক সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একজন লেখকের জন্য সাংবাদিকতা পেশাটা কেমন?

মোস্তফা কামাল : তোমার এই প্রশ্নটি আমি করেছিলাম কথাশিল্পী শওকত আলী স্যারকে। ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল, লেখক হব। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করার পর, পেশা হিসেবে আমি কোনটাকে বেছে নেব? লেখালেখির জন্য যে পেশাটি সুইটেবল হবে, সেই পেশাই গ্রহণ করব। এক বন্ধুকে নিয়ে শওকত স্যারের কাছে গেলাম, তার পুরান ঢাকার বাড়িতে। তিনি তখন টিকাটুলির ওদিকে থাকতেন। আমি তখন আমার কথাটি বললাম—স্যার, আমি তো লেখালেখি করতে চাই। কোন পেশা গ্রহণ করলে লেখালেখির জন্য সুবিধা হবে? স্যার বললেন, তুমি যদি লেখালেখি করতে চাও, তাহলে শিক্ষকতা পেশাকে নাও। আমি তো কলেজে অধ্যাপনা করি। কাজেই এই পেশাটি তোমার জন্য ভালো হবে বলে মনে করি। আমি বললাম, যদি সাংবাদিকতা পেশা গ্রহণ করি? স্যার বললেন, এটাতে তোমার অনেক সময় নষ্ট হবে। তবে তুমি চাইলে করতে পারো। পরে আমার নিজেরই মনে হলো, সাংবাদিকতা পেশা আমার জন্য উপযুক্ত হবে। এই পেশায় থাকলে অনেক কিছু জানা যাবে, যেটা অন্য পেশায় গেলে সম্ভব নাও হতে পারে। আর লেখক হতে গেলে অনেক কিছু জানার এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয়েরও দরকার। বই পড়ে জ্ঞান অর্জন করা যায়, কিন্তু সাংবাদিকতা করার জন্য আমি নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশতে পারব। বিভিন্ন দেশ ঘুরতে পারব। যা অন্য পেশায় গেলে পারব না। এবং আমি এই পেশায় থাকার কারণে পৃথিবীর নানা দেশে ভ্রমণ করেছি। অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমি আমার ‘হ্যালো কর্ণেল’ বইটি লিখেছি পাকিস্তানে কীভাবে তালেবানদের উত্থান হলো—সেই পটভূমিতে। তখন আমি প্রথম আলোতে কাজ করতাম, অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে সেখানে গিয়েছিলাম। দেশ-বিদেশে নিজের চোখে দেখা ও জানার অভিজ্ঞতা অনেক মূল্যবান। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভালো কিছু লেখা সম্ভব। তাই আমি মনে করি, সাংবাদিকতা আমাকে সমৃদ্ধ করেছে।

//জেডএস//

x