সমান্তরাল ।। আব্দুল্লাহ আল মুক্তাদির

. ১০:০২ , ডিসেম্বর ৩১ , ২০১৮

পূর্ব, পশ্চিম—দুই প্রদেশেই হঠাৎ একদিন সন্ধ্যাগুলো বদলে গেলো। শহরে শহরে টিভি এলো। ভরা শীতের বিকাল তখন। একপাশে বয়ে চলা নদীর জল জমে প্রায় বরফ হয়ে গেছে। পূর্ব পাকিস্তানের ছোট্ট এক মহকুমা শহর। এর সমস্ত জুড়ে আছে সর্পিল পাকা পথ। পথের দুই পাড়ে টিনের চাল-দেয়া ঘর, মাঠ, বাগান, গাছের ছায়া ইত্যাদি। পাকা দালানের সংখ্যা কত হাতে গুনে বলে দেয়া যায়। দোতলা বাড়ি আছে মাত্র ছয়টি। শহরকে দুইভাগ করে দিয়ে ঠিক মধ্যখান দিয়ে চলে গেছে একটা জীবন্ত খাল। খালের উপর দাঁড়িয়ে আছে অপরূপ, সুদর্শন এক লোহার পুল। বেশ লম্বা সেই পুলের মাঝখান থেকে চতুর্দিকে শহরের বিস্তৃতি প্রায় সমান।

‘বাতা দ্যু কিউ, ওহ নো!’

ছেলেটা একেবারেই আমার সমান বয়সি। এক জোড়া তীক্ষ্ণ মায়াময় চোখ মেলে উনসত্তর সালের মাঘ মাসের এক রাতে সে আমার দিকে প্রথম চাইল। আমি তাকে দেখতে পাই না, কিন্তু আমাকে সে বিরতিহীন, ক্লান্তিহীন দেখতে থাকে। তার শহরে আমি তখন কেবল শব্দ আর ছবি, বাক্সবন্দী।

সারা দেশে অজস্র লোক আজকাল আমার কণ্ঠ শুনতে উন্মুখ হয়ে থাকে। আমি শিল্পী। যদিও এখনও স্কুলে পড়ি—ক্লাস টেন, তবু দীর্ঘ চার বছর ধরে সিনেমায় প্লেব্যাক করছি। এরই মধ্যে আমার গাওয়া গান নিয়ে দু'টি লং প্লে রেকর্ড বের হয়েছে। অদ্ভুত এক জীবন কাটাচ্ছি। যশ, নাম, উত্তেজনা, উচ্ছ্বাস নিয়ে অবাক করা দিনগুলো সপ্তাহ, মাস, বছর হয়ে অতি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে শীতের এক তুমুল সন্ধ্যায় পূর্ব-পশ্চিম দুই প্রদেশে একসাথে ঘটা করে টিভি চালু হলো। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই  আমার এক অব্যক্ত অপেক্ষার শুরু। কবে ডাকবে? কবে গাইব টিভির পর্দাজুড়ে? শুধু শুনবে না, আমাকে  মানুষ দেখবেও তখন! মনে মনে কতবার নিজেকে টিভি পর্দায় দেখতে থাকি! কী গাইব, কী পরব, হাত, পায়ের ভঙ্গি কেমন হবে, চোখের চাহনিতে কতখানি আবেদন থাকবে? এইসব ভাবতে ভাবতে আমার সকাল হয়, বিকাল-সন্ধ্যা-রাতেও ঘুমাতে যাই, এই একই বাসনা, চিন্তা আর প্রতীক্ষা নিয়ে।

অবশেষে একদিন ডাক আসে। নিজের পছন্দের প্রায় এক ডজন পোশাক, এক বাক্স গয়না নিয়ে সকাল বেলা পৌঁছালাম টিভি স্টেশনে। গান আগেই রেকর্ড করা হয়েছে। আজকে শুধু ভিডিও ধারণ। প্রডিউসার এসে  আমাকে একের পর এক নির্দেশনা দিতে লাগলেন। টানা রিহার্সেলও হল বেশ কয়েকবার।  উনাকে আমি নিজের পছন্দের পোশাক পরে পর্দায় হাজির হওয়ার ইচ্ছাটা জানাতেই বেশ বিরক্ত হয়ে  বললেন, 'শাড়িই পড়তে হবে'। একটু মন খারাপ হলো, তবু রাজি হয়ে গেলাম। শাড়ি পরে মাত্রই মেকাপ নিতে বসেছি—উনি এসে আমাকে দেখে যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বললেন—'এভাবে হবে না। টিভিতে মেয়েদের একটা ড্রেসকোড আছে, মানতে হবে। স্লিভলেস, জর্জেট এইসব  চলবে না। দর্শক, সুশীল সমাজ, হর্তা-কর্তা সবাই ক্ষেপে যাবেন। এই গান প্রচার করাই সম্ভব হবে না।'  উনার কথা বলার ধরণও কেমন যেন। আমি খানিকটা অপমান বোধ করলাম। কিছু না বলে মিনিট পাঁচেক ভাবলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম রেকর্ড না করে ফিরে যাওয়ার। আশা ভঙ্গের তীব্র কষ্ট ছিল, লোকটার প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক কণ্ঠস্বর শুনে রাগে, অভিমানে দমবন্ধ হয়ে আসছিল। নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম—'তাহলে থাক।  নিজের স্টাইল, রুচির বাইরে গিয়ে আমি কিছু করতে চাই না। ধন্যবাদ।' একদমই দেরি না করে বের হয়ে আসলাম। আমাকে কেউ ডাকলও না! প্রচণ্ড দম্ভ নিয়ে  টিভি সেন্টারের বাইরের বাতিগুলো তাকিয়ে আছে আমার দিকে। গাড়িতে বসেই আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। দুই চোখ সমানে ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু আমি কাঁদতে চাই না, একেবারেই না।

পরের দিন দুপুরে একটা ফোন এলো টিভি সেন্টার থেকে। আমাকে ডিজি নিজে অনুরোধ করলেন, তাদের ড্রেসকোড মেনে গান গাওয়ার জন্যে। আমি বিনয়ের সাথে তাঁকে ‘না’ বলে দিলাম। আমার পুরো পরিবারকে অবাক করে দিয়ে বিকেল বেলা উনি আর উনার স্ত্রী আমাদের বাসায় এসে হাজির। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বেশ আন্তরিক হয়ে বললেন—'মা, তুমি আমার মেয়ের বয়সি। দিনে দিনে তোমার জনপ্রিয়তা যে হারে বাড়ছে, তোমার গান  একদিন না একদিন আমাদের টিভিতে প্রচার করতেই হবে। তাই আমি দেরি করতে চাই না। কালকে আর একবার এসো। তোমার ইচ্ছামতোই রেকর্ড হবে। কিন্তু দর্শকের কাছ থেকে অন্যরকম বা বাজে কোন প্রতিক্রিয়া আসলে সে দায় সম্পূর্ণ তোমার।'

আজকে রাতে সেই গান অবশেষে প্রচার করা হচ্ছে। আরও হাজার-লক্ষ মানুষের মাঝে এই ছেলেও একজন। নির্বাক হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতোন আমার সুর, ছবি গিলছে। সত্যি বলতে আমি নিজেই নিজের থেকে চোখ ফেরাতে পরছি না, সাদাকালো পর্দায়  যদিও আমার শাড়ির গাঢ় ফিরোজা রঙকে ঘনকালো মনে হচ্ছে। খোলা চুল। দুই হাতের মধ্যমায় পাথর বসানো বড় আঙটি। খোলা বাহু। ডানদিকের হাতে বাজুবন্দ। গলা খালি। পাতলা জর্জেটের শাড়ি গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। আঁচল না ছড়িয়ে কয়েক ভাঁজ করে বামপাশের ঘাড়ে আটকানো। নাভিতে বসানো গয়নারও খানিকটা আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

গান শেষ হয়ে গেছে। ছেলেটা এখনও জাদুগ্রস্থ  হয়ে টিভির দিকে চেয়ে আছে। এই দেশে এই প্রথম কোন মেয়েকে সে  এমন করে দেখলো! প্রাণবন্ত, দুর্দান্ত কিশোরী। আধুনিকের চেয়েও আধুনিক। গলায় এতো ভীষণ সুর! চোখের আবেগ এতো চঞ্চল! সারা গায়ে কোনদিন না দেখা এক  অচিন ভাব-তরঙ্গ!

‘কাম অন বেইবি, লাইট মাই ফায়ার'

জীবনের প্রথম মদের স্বাদ পেলে  যেমন হয় ছেলেটার চোখে মুখে তেমন—নেশার ফুল ফুটে আছে। টিভি পর্দায় বুঁদ হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে যেন। দেখে মনে হচ্ছে একেবারেই আমার সমান বয়স। আমি একটা নতুন ব্যান্ডের মূল গায়ক। আজকে  জাতীয় টিভিতে আমাদের প্রথম পরিবেশনা। উনসত্তর সাল চলে এখন, ভরা শীতকাল।

এই ব্যান্ডের ধরণ একেবারেই আলাদা্। আমি এখানে প্রচণ্ড স্বাধীন। বাকি সবাই চির-মনোরম বন্ধুর মতোন- আমাকে উৎসাহ দিয়ে আরও উন্মাদ করে তুলছে দিনে দিনে। আমি মঞ্চে যেমন ইচ্ছা গাই, নাচি, থেমে যাই, ফিরে আসি—সদা সর্বদা  আমার সঙ্গীদের মুখে হাসি। এরা কখনও হারায় না। এদের অবিরাম প্রশ্রয় আমাকে দুঃসাহসী, মাতাল, পাগলে পরিণত করে ফেলেছে এরই মধ্যে।

আমাদের কয়েকটা গানের রেকর্ড এখন বাজারে খুব চলছে। প্রায় প্রতি রবিবারেই আমাদের কনসার্ট থাকে। প্রচুর লোক জমা হয়।  পয়সাও কামাচ্ছি অনেক। জীবন ধারা দ্রুত পাল্টে যাচ্ছেে। গত সপ্তাহের টিভির একটা জনপ্রিয় শো-এর প্রডিউসার আমাদের দাওয়াত করেছেন। অন্তত একটা গান গাইতে হবে। টিভিতে পারফর্ম করার ইচ্ছা আমাদের বহুদিনের—সুযোগ হয়নি কখনও। উনাকে 'না' বলার তাই প্রশ্নই ওঠে না। রেকর্ডিং-এর দিন আমরা চারজন নিজেদের গাড়ি, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি নিয়ে রওনা হলাম। চোখেমুখে উদ্বেগ আর উত্তেজনা। বাকি তিনজনের পরনে সাদা স্যুট। আমি পরেছি লেদারের প্যান্ট, গাঢ় সোনালি রঙ। নেভি-ব্লু শার্টের উপর ডিটেইলড ভেস্ট। ভেস্টের বর্ডারের সাথে মিলিয়ে এক্সট্রা-ওয়াইড বেল্ট।

রিহার্সেল চলছিল। এরই মধ্যে শো-এর উপস্থাপক আমাদের কাছে একটা অনুরোধ নিয়ে আসলেন। খুব ইনিয়ে বিনিয়ে শুরু করলেন। ভবিষ্যতে আরও অনেকবার আমাদের সাথে কাজ করার ইচ্ছা ইত্যাদি বলে আসলেন মূল কথায়। আমাদের গানের একটা লাইন তাঁর কাছে অশালীন মনে হয়েছে। তিনি চান আমরা যেন লাইনটাকে অন্যভাবে গাই। তিনি একটা নতুন লাইন লিখেও নিয়ে এসেছেন। বাকি সবাই রাজি হয়ে হয়ে গেল। আমি 'হ্যাঁ' বলতে পারলাম না। নিয়ম কানুন মেনে চলার অভ্যাস আমার দিন দিন কমে যাচ্ছে। আর লোকটার বলার মধ্যেও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ছিল। 'একটা শব্দই তো, এ আর এমন কী?'—টাইপ মন্তব্য, উপদেশ বা আদেশ মেনে নেয়ার মতোন মানসিক অবস্থা আমার নাই। বড় করে 'না' বলে দিলাম। লোকটা প্রায় রেগেমেগে চলে যাবে—এমন সময়—আমার ব্যান্ডের বাকি সদস্যরা তাঁকে কিছু একটা বলে আশ্বস্ত করল।

যাই হোক, লাইভ প্রচার হবে আমাদের গান। অন-এয়ার এ যাওয়ার আগে বাকি তিনজন আমাকে অনুরোধ করল আমি যেন ওই লাইনটা বাদ দিয়ে গাই। প্রয়োজনে পুরো অন্তরা বাদ দিলেও সমস্যা নাই, গানটা এমনিতেই বেশ লম্বা। আমি কিছু না বলে হাসলাম কেবল। এই হাসিতেই কেন জানি ওরা বেশ ভরসা পেল। যাই হোক, প্রচার শুরু হল। আমি গাইছি। গান গাওয়ার সময় আমি সবচেয়ে স্বাধীনতাকামী। ইচ্ছা করেই বিদ্রোহ করে বসলাম। যেই লাইনটা বাদ দিয়ে গাওয়ার কথা ওই লাইনটা বরং কয়েকবার গাইলাম। সবার চোখ মুখ শুকিয়ে গেল, ভ্রু কুঁচকে সবাই চাইছে আমার দিকে। আমি  নিয়ম ভাঙার আনন্দে গেয়ে চলেছি—যুদ্ধ জয়ের সুখ তখন বুকের ভেতর!

ছেলেটার চোখে মুখে ঘোর লেগে গেল আমার গান দেখে, শুনে। যেন স্বপ্ন শেষ হওয়ার আগেই ঘুম ভেঙে গেছে- জাগরণ মেনে নিতে তার কষ্ট হচ্ছে ভীষণ। এই গান কেন এত দ্রুত ফুরিয়ে গেল—নেশায় কাতর কিশোরকে দীর্ঘ এক আক্ষেপ এসে ঘিরে ফেলল।

'ম্যায় তো মার গায়ি'/ 'আই টেল ইউ উই মাস্ট ডাই'

আমার প্রায় সমস্ত স্বপ্নে এখন তাদের গাওয়া গান ভাসে। ঘুমিয়ে গেলে প্রায়ই আমি সমুদ্র দেখি: সুগভীর, নীল, সীমাহীন। ঢেউগুলো এসে এই দু্'জনের গানের সুর তুলে আছড়ে পরে আমার পায়ের কাছে। সেই আকাশে সাদা-স্নিগ্ধ গাঙচিল ওড়ে, তাদের গুঞ্জনেও শুনি এই পাগল-করা গায়ক-গায়িকার কণ্ঠ।

সারা শহর ঘুরে দুইজনের মোট পাঁচটা রেকর্ড পেয়েছি। স্কুল থেকে ফিরে সারা বিকেল ওই গানগুলোই বারবার শুনি। বাবাকে বহু কষ্টে রাজি করিয়ে দুইজনের দুইটা ছবি আঁকিয়ে এনেছি। আমার ঘরের দরজা খুললেই রঙিন ছবি দুইটার উপর গিয়ে চোখ পড়ে। এই ঘরকে আজকাল আরও বেশি আপন লাগে।

সন্ধ্যা হলে গান বন্ধ করে পড়তে বসতে হয়। মায়ের তৈরী কড়া নিয়ম, অন্যথা করার  উপায় নাই কোনমতেই। পড়তে পড়তে বারবার ছবিগুলোর দিকে তাকাই। মাথার মধ্যে তখনও গানের লাইন। পড়ায় মনোযোগ খুব একটা আসে না। খাওয়ার সময়সহ এক ঘণ্টা টিভি দেখার সুযোগ পাই। প্রিয় মুখ খুঁজে বেড়াই। গায়িকার দেখা  মেলে, দুই সপ্তাহ বাদে একবার। প্রতিবারেই তার নতুন রূপ, নতুন গায়কি। যেন নিজেকে নিত্য ভাঙছে আর গড়ছে। ছেলেটার দেখা সচরাচর মেলে না টিভির পর্দায়, ছয়-সাত মাসে বড়জোর একদিন। কিন্তু তার নতুন নতুন রেকর্ড আসছে বাজারে।  দিনে দিনে আরও বেশি মাতাল হচ্ছে তার কণ্ঠ। একেকটা গান যেন অন্য কোন জগতের পথে একেকটা সিঁড়ি। প্রতি ধাপে তার নতুন নতুন নেশা।

এরই মধ্যে একদিন এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। আগের মতোই নীল, সুনীল সমুদ্র, কিন্তু উপরে কোন আকাশ নাই। গাঙচিল, গাছের ছায়া কিছুই নাই। অর্ধেক সমুদ্র, অর্ধেক মরুভূমি। তপ্ত দুপুর। আমি বালুতে হাঁটু গেড়ে বসে দর দর করে ঘামছি। সামনে সমুদ্রের বুক এক জোড়া বাঁশের ভেলা, বিশাল ঢেউয়ে দুলছে। দুই ভেলাতে দুইজন। আমার সবচেয়ে প্রিয় দুই কণ্ঠ। তাদের চোখ বন্ধ, মগ্ন হয়ে  গান গাইছে। বিকেলে শোনা রেকর্ডের মতোন একটানা সুর ছড়িয়ে পড়ছে দিক-দিগন্তরে। হঠাৎ খেয়াল করলাম শরীরের সাথে কণ্ঠ মিলছে না। গায়কের শরীর থেকে গায়িকার কণ্ঠ। গায়িকার শরীর থেকে গায়কের গান। তাদের শরীরও ঘামে ভেজা। ভেজা শরীর থেকে  উঠে আসা গন্ধরাজের ঘ্রাণ আশেপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রচণ্ড রোদের নিচে আমার চোখ, শরীর ঝলসে যাচ্ছে- আমি তবু দৃষ্টি ফেরাতে পারছি না।

মধ্যরাতেই ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে বৃষ্টি, ঠাণ্ডা বাতাস। আমার সারা গা তবু ঘামে ভেজা।  আবিস্কার করলাম এখানেই শেষ না। আরও একটা কিছু ঘটে গেছে। স্বপ্নদোষ এই প্রথম না। আগেও হয়েছে। কিন্তু আজকের মতোন অস্বস্তি আগে কখনও লাগে নাই। পরনের কাপড় খুলে তখনই ধুয়ে ফেললাম। ঠাণ্ডা পানি দিয়ে অনেকক্ষণ গোসল করে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। সারা আকাশ ঘন কালো। মাত্রই বৃষ্টি থেমে গেছে।  কেউ নাই ঘরে, কেউ জানে না। কিন্তু আমি প্রচণ্ড লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছি। ঘরের দুইটা ছবি যেন চেয়ে আছে। ওরা যেন সমস্ত জানে। বাকি রাত আর ঘুমাতে পারলাম না।

এইরকম রাত প্রতি সপ্তাহে দুই তিনবার করে আসতে লাগল। একই ধরণের স্বপ্ন। ঘুম থেকে উঠে নিজেকে একই ভাবে আবিষ্কার।  বিকেলে ছেলেটার গান শুনে আর মুগ্ধ হই না। মেয়েটার ছবির দিকে তাকালে অস্বস্তি হয় না তেমন, কিন্তু ছেলেটার ছবি দেখলেই একেবারেই অচেনা এক অনুভূতি হয়। নিজেকে অস্বাভাবিক মনে হতে থাকে। ধীরে ধীরে একসময় ছেলেটার গান শোনা বন্ধ করে দিলাম। ছেলেটার ছবিও নামিয়ে ফেললাম দেয়াল থেকে। তবু স্বপ্নে সে আসেই। একই রকম গান গায়। বাঁশের ভেলা। সমুদ্রে উত্তপ্ত দুপুর। আমি জোর করে কেবল মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকি। একসময় ছেলেটার ছবি অস্পষ্ট হতে থাকে। মাস তিনেক পরের এক স্বপ্ন থেকে সে কেবলই এক ছায়ামূর্তি। মেয়েটার রঙিন শরীরের পাশে ছায়ার রঙ নিয়ে অসহায় দাঁড়িয়ে আছে। কণ্ঠে মেঘলা বিষাদের সুর।

আমার বিকেলগুলোও সেই থেকে ভীষণ মলিন হয়ে গেল। পছন্দের গায়িকার গানে বাজার ছেয়ে গেছে। প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন রেকর্ড বের হচ্ছে। যতক্ষণ শুনি ভালো লাগে, প্রচণ্ড আনন্দে ভাসি। কিন্তু পরক্ষণেই আনমনা হয়ে যাই। ছেলেটার গান বহুদিন শুনি না। এখানে ওখানে অন্য কেউ বাজালে কান বন্ধ করে ফেলি, নয়তো দ্রুত দূরে চলে যাই, তার কণ্ঠসীমার বাইরে। আমি চাইনা আমার স্বপ্নে সে আবার রঙিন হোক। আমার খালি খালি লাগে লাগুক, কিন্তু সেই ভয়ানক অস্বস্তির অনুভব আবার ফেরত আসুক আমি চাই না। ওই শরীরের স্বপ্ন আমি ভুলে যেতে চাই। ওই কণ্ঠের ঘোর থেকে দূরে পালাতে না পারলে আমার যেন মুক্তি নাই!

'যখন থামবে কোলাহল'/'ওয়েন দ্য মিউজিক'স ওভার'

ঈশ্বর এক অতিকায় মানব মূর্তি গড়ে বহুদিন ফেলে রাখলেন তার আঙিনায়। সেই মূর্তি বিশাল শরীর আর গগনবিদারী রূপ নিয়ে জীবনের অপেক্ষা করতে লাগল। বহু বছর, যুগ, শতাব্দী এভাবে একলা কেটে গেল। তারপর একদিন ঈশ্বর ফেলে রাখা মানব প্রতিমার দিকে আগ্রহভরে চাইলেন। তাঁর দুই চোখভরা হাসির ঝিলিক। কী জানি কী মনে করে মূর্তি ভেঙে দুই ভাগ করলেন। এইবার একজনকে দিলেন নারী, আরেকজনকে পুরুষ জীবন। পৃথিবীতে তাদের একই দিনে, একই মুহূর্তে জন্ম হল, দুই ভিন্ন শহরে। তাদের জন্মের দিন স্বর্গলোকের সমস্ত দেবদূত এসে হাজির হলেন ঈশ্বরের আঙিনায়। সবার চোখেমুখে দুর্নিবার কৌতুহল। ঈশ্বর সবই বুঝলেন। এক মূর্তি ভেঙে নারী আর পুরুষের দুই দেহ গড়ার রহস্য তারা জানতে চায়। কিন্তু ঈশ্বর চান রহস্য অটুট থাকুক। তিনি বরং উপস্থিত দেবদূতগনকে আরও অবাক করে দিয়ে ঘোষণা দিলেন—পৃথিবীর জন্য যত কণ্ঠ তিনি নিজহাতে এতোদিন সৃষ্টি করেছেন, তাদের মধ্যে আজকে যে দুই জনের জন্ম হলো তাদের কণ্ঠ হবে সর্বশ্রেষ্ঠ। লক্ষ কোটি মানুষ তাদের কণ্ঠ শুনে মোহিত থাকবে যুগের পর যুগ। তাদের দুই জনেরই হবে শিল্পী জীবন। সারা দুনিয়ায় তাদের গান ছড়িয়ে যাবে। কিন্তু দুইজনকেই বিদ্রোহ করে টিকে থাকতে হবে।

আর তারা নিজেরা কখনও জানবেনা যে একই মূর্তি থেকে তারা তৈরী। কোনদিন তাদের দেখাও হবে না। তাদের ভক্তদের মাঝে যে সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে গোপন—সেই কেবল বুঝবে এই দুই শ্রেষ্ঠ কণ্ঠ আদতে অভিন্ন। তারা আসলে একই মানুষের দুই জীবন। সমান্তরাল।

মফস্বলবাসী ছেলেটা যেদিন প্রথম তার পরম পছন্দের শিল্পীদ্বয়কে স্বপ্নে দেখে, একজনের শরীর থেকে ভেসে আসা  আরেকজনের সুর, সেদিনই তার মনে হয়েছিল এই দুই মানুষ আসলে এক ও অভিন্ন। পরেরদিন খবরের কাগজ ঘেঁটে জানতে পারে দুইজনের একই দিন একই সময়ে জন্ম। এই তথ্য তাকে অনেকক্ষণ নির্বাক করে রাখে।  তারিখ,  মাস, বছর, যে মুহূর্তে তাদের জন্ম হয়েছিল তার নিজের জন্মের সাথে সবটুকু মিলে যায়। অপার আনন্দে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে থাকে সে। কিন্তু হঠাৎ কোন এক অজানা ভয় তাকে গ্রাস করে ফেলে।  চোখ খুলে সে কেবল আকাশ দেখতে থাকে, বহুক্ষণ।

তাদের তিনজনের যেদিন জন্ম হয় পূর্ব, পশ্চিম দুই প্রদেশেই তখন আবছা আলোর ভোর। শহরগুলো ভিন্ন ছিল, তিন নামের তিন নদী সেই শহরগুলো ছুঁয়ে উত্তর-দক্ষিণে বয়ে গেছে। নদীগুলোর স্রোত আলাদা, কিন্তু তাদের বাতাসে ছিল একই সুর, একই আওয়াজ। আর আকাশজুড়ে সমান রঙের সমান সংখ্যক উদাস করা পাখি।


পাঠ-প্রতিক্রিয়া

বাংলা ট্রিবিউনের সাহিত্য বিভাগ নতুন একটি উদ্যোগ নিয়েছে—গল্প ও কবিতার সাথে পাঠ-প্রতিক্রিয়া জুড়ে ছাপানো হবে। কিন্তু যিনি পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখবেন তিনি লেখকের নাম জানতে পারবেন না। জানবেন শুধু টেক্সট। প্রথমে এই উদ্যোগকে আমি সাধুবাদ জানাই।

গল্পটি পড়লাম। অন্যরকম স্বাদ বলতে যা বোঝায়, সত্যি বলতে আমি সেটা পেয়েছি। গল্পের বর্ণনারীতি আমার কাছে আধুনিক মনে হয়েছে। লেখক যে এক্সপেরিমেন্ট করতে পছন্দ করেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ‘ভালো লেগেছে’—একথাটি ছাড়া, গল্পটি সম্পর্কে আমি আর বিশেষ কিছু লিখছি না। লেখককে শুভেচ্ছা।  

[আমরা গল্প ও কবিতার সঙ্গে পাঠ-প্রতিক্রিয়া জুড়ে দেবার সীদ্ধান্ত নিয়েছি। যিনি পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখবেন তাকে শুরুতে জানতে দেয়া হয় না লেখকের নাম। আবার লেখক কখনোই জানতে পারবেন না পাঠ-প্রতিক্রিয়া কে লিখেছেন।–বি.স.]

//জেডএস//

x