শীতের রঙ রূপ গন্ধ

মোকারম হোসেন ১৩:০৪ , জানুয়ারি ০২ , ২০১৯

ছবি : আব্দুল মমিন‘পৌষের কাছাকাছি রোদমাখা সেই দিন’—এমনই এক উজ্জ্বল সোনারোদমাখা নতুন দিনের প্রত্যাশায় থাকি আমরা। সত্যি, শীতের আলো ঝলমলে আকাশে মুঠোভরতি সোনার পসরা সাজানো থাকে। এই রোদ আমাদের স্বপ্নগুলো নতুন করে সাজায়, মনকে করে পরিযায়ী। রূপসী বাংলার আবেগঘন অনিন্দ্যশোভা ভাসে বর্ণিল কোনো দৃশ্যের মতো। চিরায়ত বাংলার পুকুরপাড়ের সেই বাঁশঝাড়, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা বকের সারি, তাদের কোলাহল, পাতাঝরা বন, শস্যের মাঠ, শিশিরভেজা মায়াবী জোছনা। এমন দিনে অন্ধকার গাঢ় হওয়ার আগেই ফাঁকা মাঠে কুয়াশা জমাট বাঁধতে শুরু করে। চিরচেনা পথঘাট ডুবে যেতে থাকে সাদা চাদরের আবরণে। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক অপার রহস্য। ঘনায়মান অন্ধকারেও অতিথি পাখিরা ছুটে চলে দলবেঁধে। এমন সময় গৃহস্থ বাড়িতে ব্যস্ততা বাড়ে। হাঁস-মুরগি ঘরে তোলা, রাতের রান্না শেষ করা। ছেলেরা খড়কুটো জমিয়ে আগুন জ্বালায়। হাটুরে মানুষরা দ্রুত ঘরে ফেরে।

সবকিছু ঘুমিয়ে পড়ার পর দূরের গ্রামে জেগে ওঠে পাণ্ডুর চাঁদ। তার রহস্যময় আলো ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। নদীতরঙ্গে এক আলোছায়া মায়াবী রূপ খেলা করে। রূপালি জ্যোৎস্নাগলা শিশিরকণা ঝরে পড়তে থাকে ঘাসের ডগায়। গাছের পাতা, ফসলের মাঠ, লাউয়ের মাচা শিশির সিক্ততায় সতেজ হয়ে ওঠে। কুয়াশার চাদরে ভর করে আধখাওয়া চাঁদ যেন নেমে আসে অনেক নিচে। রাতের গভীরতায় আলো আরও বাড়তে থাকে। রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চাঁদটা আরও নিচে নেমে আসে। একসময় নারকেল গাছটার মাথায় এসে বসে। ঝরা পাতা, শিশির, মায়াবী চাঁদ, তারার হাতছানি-এসবই শীতের অনিবার্য সহচর।

শীতের বিকেলটা বড়ই নিস্তরঙ্গ, একঘেয়ে। সর্বত্রই যেন শূন্যতা আর শূন্যতা। মন-খারাপ করা নিস্তেজ, অনুজ্জ্বল রোদ। শীত ও সন্ধ্যার অন্ধকার গ্রাস করার আগেই পথিক পৌঁছে যেতে চায় গন্তব্যে। অন্ধকার গাঢ় হওয়ার আগেই কুয়াশার হালকা আবরণে ঢেকে যায় চারপাশ। বিকেলের এই বিষণ্ণতা মনকে নানাভাবে বিষন্ন করে তোলে। দূরে সুপারির বনে যখন সূর্যটা হেলে পড়ে, গৃহস্থের রসুইঘরের ধোঁয়া আর কুয়াশা মিলে তখন এক মায়াবী মেখলা পরিয়ে দেয় গোটা গ্রামকে। সায়াহ্নের এই আলো-আঁধারির খেলায় তখন ক্ষয়ে-যাওয়া আবছা চাঁদ মৃদু আলো ছড়াতে থাকে। এ আলো গ্রামজুড়ে যেন অপার রহস্য ছড়িয়ে দেয়।ক্যামেলিয়াআমরা কল্পনায় এমন একটি শীতরাতের কথা ভাবতে পারি।

কোনো-এক জ্যোৎস্নালোকিত শীতের রাত। নক্ষত্রখচিত আকাশের ছায়া পড়েছে নদীর স্বচ্ছ টলটলে জলে। নিঝুম প্রকৃতি। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দূরে কোথাও পাম্প মেশিন চলছে। শিমের গোলাপিরঙা পুষ্পদণ্ডে জমেছে মুক্তোদানা শিশির, লাউয়ের মাচার কাকতাড়–য়াটা যেন হঠাৎ করেই নড়ে উঠে ভয় দেখায়। টিনের চালায় টুপটাপ শব্দে ঝরে রাতের অশ্রু।হলিহক ফুলমূলত হেমন্তের মাঝামাঝি থেকেই প্রকৃতিতে শীতের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। তখন প্রকৃতির মতো মানুষের মনও বদলাতে থাকে। শীতের শুষ্কতায় প্রকৃতির সবুজ প্রলেপ খসে পড়লেও আমাদের কল্পনায়, কবির ভাবনায় তার আবেদন ভিন্নরকম। নজরুলের কবিতায় পাওয়া যায় পৌষের আবাহন গীত। তাতে থাকে বিগত ঋতুর বিদায়-প্রসঙ্গ, ঝরাপাতাদের বেদানাসিক্ত বিলাপ। সেখানে অস্তগামী সূর্যই যেন অস্ত-বধূ, দীপশিখা তার আলো হারিয়ে ফ্যালে সন্ধ্যাতারার সান্নিধ্যে।

‘পউষ এল গো!

পউষ এল অশ্রু-পাথার হিম পারাবার পারায়ে।...

সে এল আর পাতায় পাতায় হায়

বিদায়-ব্যথা যায় গো কেঁদে যায়,

অস্ত-বধূ (আ-হা) মলিন চোখে চায়

পথ-চাওয়া দীপ সন্ধ্যা তারায় হারায়ে।’

শীতের ভালোলাগাটা রবীন্দ্রনাথের মনে দাগ কাটতে না পারলেও বিরহের সুর গেঁথেছেন ‘উদ্বোধন’ কবিতায়। তাতে গাছের শুষ্কশাখা, জীর্ণ পাতা, কুয়াশার ঘন জাল, হিমহিম ভাব—কোনোটাই বাদ যায়নি। শীতের আগমনকে তিনি বসন্তের জয় হিসেবেই দেখেছেন।

‘শুষ্ক শাখা যাও যে চুমি, কাঁপাও থরথর—

জীর্ণ পাতা বিদায়গাথা গাহিছে মরমর।’

অন্যত্র:

‘বাহির হতে বাঁধিলে ওরে কুয়াশার ঘন জালে-

ভিতরে ওর ভাঙালে ঘোর নাচের তালে তালে।

... এসেছে শীত গাহিছে গীত বসন্তেরই জয়-

যুগের পরে যুগান্তরে মরণ করে লয়।’

পৌষালি দিনে প্রকৃতিতে চলে এক অদ্ভুত কুয়াশার খেলা। কুয়াশার রহস্যময় আবরণ মানুষের দৃষ্টিসীমা বেঁধে দেয়। রাতের কুয়াশা ভোরের শিশির হয়ে স্নিগ্ধতা ছড়ায়। জীবনানন্দের কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ পরাবাস্তবতা। কুয়াশার মাঠে ফিরে যাওয়ার ব্যাকুলতা তাঁর পরাবাস্তব সংলাপে অনবদ্য হয়ে ধরা দেয়-

‘এক দিন কুয়াশার এই মাঠে আমারে পাবে না কেউ খুঁজে আর, জানি;

হৃদয়ের পথচলা শেষ হল সেই দিন গিয়েছে যে শান্ত হিম ঘরে...

সন্ধ্যা হলে! মৌমাছি চাক আজো বাঁধে নাকি জামের নিবিড় ঘন ডালে,

মউ খাওয়া হয়ে গেলে আজো তারা উড়ে যায় কুয়াশার সন্ধ্যার বাতাসে—’

কবি আহসান হাবীব অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করেছেন শীতের বিচিত্রতা।

উড়ন্ত ঝরাপাতার হিন্দোল, আকাশে মলিন চাঁদের টিপ, স্তব্ধ মূক অরণ্যঘর, প্রথম কান্নার মতো ঝরেপড়া কুয়াশার জল-এ সবই তাঁর নিমগ্ন চেতনার শৃঙ্খলে বাঁধা পড়েছে। তিনি দেখেছেন শিশির স্নাত ঘাসে কান্নার শেষ মাধুরীটুকু তখনও টলমল, কিংবা সেই স্বপ্নসম্ভারের অপরূপ শীতের সকাল; যার বন্দনা কবিমাত্রেরই শিরোধার্য—

‘রাত্রি শেষ!

কুয়াশায় ক্লান্তমুখ শীতের সকাল—

পাতার ঝরোকা খুলে ডানা ঝাড়ে ক্লান্ত হরিয়াল।

শিশির স্নাত ঘাসে মুখ রেখে শেষের কান্নায়

দু-চোখ ঝরেছে কার, পরিচিত পাখিদের পায়

চিহ্ন তার মোছেনি এখনও,

আছে এখনও উজ্জ্বল—

কান্নায় মাধুরীটুকু ঘাসে ঘাসে করে টলোমল।’জার্বেরাশীতের নিস্প্রাণ প্রকৃতিকে কিছুটা হলেও প্রাণবন্ত করে তোলে বর্ণিল মৌসুমি ফুল। এসব ফুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়—ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা, হলিহক, ডায়ান্থাস, জার্বেরা, সালভিয়া, কসমস, পপি, ফ্লক্স, জিনিয়া, ভার্বেনা, অ্যাস্টার, সূর্যমুখী, পিটুনিয়া, স্ট্র-ফ্লাওয়ার, কুসুম, কর্ণফ্লাওয়ার, স্ন্যাপড্রাগন ইত্যাদি। শীতের দীর্ঘজীবী ফুলের সংখ্যা খুবই কম, অন্তত আমাদের আবহাওয়ায়। শীতের শুরুতেই ফোটে তুণ, প্রায় একই সময়ে ফোটে স্বর্ণঅশোক। বর্ণহীন প্রকৃতিতে এর উপস্থিতি সত্যিই দ্যুতিময়। আমাদের দেশে আরও দুধরনের অশোক পাওয়া যায়। রাজঅশোক ফোটে হেমন্তে। শুধু অশোক ফোটে বসন্ত কিংবা গ্রীষ্মে। ঢাকার একমাত্র স্বর্ণঅশোকটি পাওয়া যাবে বলধা গার্ডেনের সাইকি অংশে। জানামতে আরেকটি গাছ আছে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে। সাইকি উদ্যান রচনার প্রথম দিকেই গাছটি লাগানো হয়। কাণ্ড, পাতা ও ডালপালা অন্য অশোকের মতোই। ফুল হলুদ সোনালি রঙের। মৃদু সুগন্ধি। প্রস্ফুটনকাল ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারি অব্দি। স্বর্ণঅশোকের জৌলুস কমতে-না-কমতেই বলধা গার্ডেনে বর্ণিল ক্যামেলিয়ার উৎসব বসে। এটিও শীতের দুষ্প্রাপ্য ফুল। এর প্রস্ফুটন-শোভা উপভোগ করা শ্রমসাধ্য বিষয়। বলধা গার্ডেনের দক্ষ ও অভিজ্ঞ নিসর্গীদের ছোঁয়ায় এখানকার সিবিলি অংশে ক্যামেলিয়া ফোটে। বাগানের উত্তর প্রান্তে গড়শিঙ্গা এবং রুদ্রপলাশের পাশে ক্যামেলিয়ার একটি ঘর আছে। এখানে ক্যামেলিয়া জাপোনিকার ছয়টি রকমফের পাওয়া যাবে। এ ছাড়া বাগানের অন্যত্রও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ক্যামেলিয়া। তবে এ-ক্যামেলিয়া গন্ধহীন। সুগন্ধি ক্যামেলিয়া সম্ভবত এখানকার আবহাওয়ায় মানানসই নয়। গাছের পাতা ও অঙ্গসৌষ্ঠব চায়ের মতোই-একই পরিবারের। জানা যায় যে, উদ্যান রচনার গোড়ার দিকে ১৯৩৬ সাল থেকেই এখানে ক্যামেলিয়া চাষ শুরু হয়েছে। সাদা রঙের ফুলগুলোর গড়ন এতটাই নিখুঁত, দূর থেকে দেখলে কৃত্রিমও মনে হতে পারে। পপিস্বেচ্ছায় কিংবা বিভিন্ন আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ অসংখ্যবার এসেছেন পূর্ববঙ্গে। ১৯২৮ সালের দিকে তাঁকে বলধা গার্ডেন দেখার আমন্ত্রণ জানানো হয়। বলধা গার্ডেন দেখে তিনি বেশ চমৎকৃত হন। বাগানের কয়েকটি ফুল নিয়ে কবিতাও লিখেন। অসংখ্য পুষ্প-বৃক্ষের ভিড়ে এই ক্যামেলিয়াগুলোই কবির মন জয় করে নিল। ক্যামেলিয়া নিয়ে তিনি লিখলেন সুদীর্ঘ কবিতা।

     ‘আর দিন কয়েকেই ক্যামেলিয়া ফুটবে,

        পাঠিয়ে দিয়ে তবে ছুটি।

        ...সন্ধ্যার আগে ফিরে এসে টবে দেই জল

        আর দেখি কুঁড়ি এগোল কতদূর

        ...বেরিয়ে এসে দেখি ক্যামেলিয়া

        সাঁওতাল মেয়ের কানে,

        কালো গালের উপর আলো করেছে।’

ক্যামেলিয়া চিরসবুজ চা-গোত্রীয় গাছ। জন্মস্থানে ১০ মিটার বা ততোধিক উঁচু হলেও আমাদের দেশে গুল্মবৎ, ঝোপাল, ২ থেকে আড়াই মিটার উঁচু। পাহাড়ি বাগানের সৌন্দর্যবর্ধক। ফুল সিঙ্গল বা ডাবলও হতে পারে।স্বর্ণঅশোকশীতের বহুবর্ষজীবী অন্যান্য ফুলের মধ্যে নানান রঙের ঝিন্টি, মেডলা, কুচাই, অনন্তলতা, অতসী ইত্যাদি অন্যতম। সাদা ঝিন্টি বলধা গার্ডেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাওয়া যাবে। শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান ও মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের অফিস প্রাঙ্গণের গোলাপ বাগানের পাশে ফোটে মেডলা বা বগুই ফুল। সিলেট ও চট্টগ্রামের বনে ফোটে সোনালি রঙের কুচাই ফুল। সাদা ও গোলাপি রঙের অনন্তলতা ঢাকাসহ প্রায় সারাদেশেই চোখে পড়ে। ইদানিং আবাদিত জাতের একটি লালকাঞ্চন শীতের বাগানে আলো ছড়াচ্ছে। কাঞ্চনের এই নতুন অতিথিটির নাম হংকং অর্কিড। তবে আলোচ্য এসব ফুল ছাড়াও শীতের দিগন্তজোড়া বিচিত্র শস্যের মাঠ অপূর্ব শোভায় দ্যুতিময়। শীতের মাঠে প্রধান আকর্ষণ সর্ষেখেত। ফুলকপি বা বাঁধাকপির খেতগুলো বেশ ছন্দময়। গাজরের পাতা, বেগুন-টমেটো খেত, শিমের মাচা, পেঁয়াজ, মটরশুটি, মুলা ও খেসারির ফুল-কোনটি রেখে কোনটির কথা বলি। ফসলের মাঠে এমন নান্দনিক শোভা কেবল শীত মৌসুমেই পাওয়া যাবে।

//জেডএস//

x