আন্দামান ভ্রমণ কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৫

মুহম্মদ মুহসিন ১৭:০৫ , জানুয়ারি ০৩ , ২০১৯

যাই হোক, ইন্ডিয়ায় আমার মতো বুদ্ধিমান ট্যুরিস্ট যায় দেখেই, ওরা সেলুলার জেল ঐভাবে ঢেকে রেখে টিকেটের ব্যপারটি সবদিক দিয়ে যুক্তিসিদ্ধ করে রেখেছে। ছোটবেলায় মুরুব্বিদের কাছে শুনেছিলাম— ‘শ্যাহেরা [শেখেরা = মুসলমানরা] দুধ বেইচ্যা পচাঁ চিঙ্গইর কিন্যা খায় দেইখ্যা, শ্যাহেগো মাতায় থাহে গোবর, আর ইন্দুরা পচাঁ চিঙ্গইর বেইচ্যা দুধ কিন্যা খায় দেইখ্যা হেগো মাতায় থাহে ঘিলু।’ মুরুব্বিদের কথা তো আর মিথ্যে হতে পারে না। যাই হোক, জন্মগতভাবে ‘শেখ’ (মুসলমান) বলে সেই কম বুদ্ধির মাথা নিয়ে কম কম দেখেই বের হলাম সেলুলার জেল থেকে। জেলগেটে একটি স্যুভেনিরের দোকান। সেখানে আন্দামান ও সেলুলার জেল নিয়ে লেখা কিছু বইপত্র পেলাম। বই কেনায় একটি ভাব থাকে মনে করে বইগুলো সবই কিনলাম। এরপর জেলের সামনের চত্বরে এসে বসলাম। সেখানে সেলুলার জেলের সাত জন বিপ্লবী বীরপুরুষের ভাস্কর্য নির্মিত দেখলাম। সাতটি ভাস্কর্যের মধ্যে ছয় জন হলেন এমন, যাঁরা বিপ্লবী হিসেবে এই সেলুলার জেলেই মৃত্যুবরণ করেছেন। ছয় জন শহীদ হলেন ইন্দুভূষণ রায়, পণ্ডিত রাম রাখা, মহাবীর সিংহ, পণ্ডিত পরমানন্দ, মনোকৃষ্ণ নমদাস (মোহন কিশোর) ও মোহিত মৈত্র। 

এই ছয় জনের মধ্যে দুজন ছিলেন বর্তমান বাংলাদেশের—ইন্দুভূষণ রায় ও মনোকৃষ্ণ নমদাস ওরফে মোহন কিশোর। ইন্দুভূষণ রায়ের মূল বাড়ি ছিল খুলনায়। তিনি চন্দননগরের মেয়র এন. তারাদিভালকে হত্যার জন্য বোমা হামলা করেছিলেন। ১৯০৯ সালে আলীপুর বোমা হামলার আসামী হিসেবে তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে তাকে সেলুলার জেলে পাঠানো হয়েছিল। এই জেলের অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ২৯ এপ্রিল ১৯১২ তারিখে তিনি নিজ সেলের মধ্যে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে শহীদ হয়েছিলেন।

এই পাঁচ জনের মধ্যে আর একজন বাংলাদেশী হলে মনোকৃষ্ণ নমদাস, যার জনপ্রিয় নাম মোহন কিশোর। কিশোরগঞ্জের সরাচর গ্রামে ছিল তার বাড়ি। সেলুলার জেলে ১৯৩৩ সালে কর্তৃপক্ষের অত্যাচারের বিরুদ্ধে যে অনশন শুরু হয়েছিল সেই অনশনের দ্বিতীয় শহীদ ছিলেন বাংলাদেশের এই কিশোর। অনশন ভাঙ্গাতে কর্তৃপক্ষের জোর করে দুধ খাওয়ানোর প্রচেষ্টায় মোহন কিশোরের ফুসফুসে দুধ চলে যায়। এতে মোহন কিশোর মারাত্মক নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতারের মাত্র ৩ দিন আগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ এই বিপ্লবী ১৯৩৩ সালের ২৬ মে  শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সাত জন শহীদের ছয় জনের এখানে ভাস্কর্য রয়েছে। যে একজন শহীদের  ভাস্কর্য এখানে নেই তিনি হলেন লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার বন্দি শহীদ ভান সিং। খদ্দর পার্টির অন্যান্য সহকর্মীদের সঙ্গে প্রথম মহাযুদ্ধের সময় প্রথম লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দণ্ডে দণ্ডিত হয়ে সর্দার ভান সিং আন্দামানে নির্বাসিত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে তার স্থান হলো সেলুলার জেল। ১৯১৫ এর কাছাকাছি সময়ে জেল কর্তৃপক্ষের বর্বর আচরণের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল বিপ্লবী কয়েদিদের দুর্দান্ত প্রতিবাদ। এই প্রতিবাদের মধ্যে ভান সিং-এর সাথে জেল সুপারিন্টেন্ডেন্টের সাথে বচসা হয়। সাহেব সুপারইনটেন্ডেন্ট ভান সিং-এর অমিত তেজের সামনে নিজেকে অপমানিত বোধ করে। পাশবিক প্রতিহিংসায় সাহেব হুকুম দেয় ভান সিংকে অন্য সকলের থেকে আলাদা করে তিন নম্বর মহলের ১৫৬ নং সেলে আটকে রাখার জন্য। তারপর জোয়ান জোয়ান সিপাই লেলিয়ে দেয়া হয় এই নিঃসহায় সিংহ শিশুর ওপর। পিটিয়ে পিটিয়ে ভান সিংকে মেরে ফেলা হয়। বিংশ শতকের প্রথম দিকে সশস্ত্র সংগ্রামীদের মধ্যে সেলুলার জেলে শহীদ সাত জনের মধ্যে মাত্র এই এক জনের ভাস্কর্য সেলুলার জেলের সামনের এই চত্বরে কেন নেই তা আমি এখনো বুঝে উঠতে পারিনি।

তবে শহীদ এক জনকে এই ভাস্কর্য তালিকায় বাদ রাখা হলেও গাজী এক জনকে যথাযোগ্য মর্যাদায় এখানে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। তার নাম বিনায়ক দামোদার সাভারকার। শুরুতে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড দিয়ে ইংরেজ রোষানলে পড়লেও পরবর্তীতে ভারতীয় রাজনীতিতে হিন্দুবাদের জনক বিবেচনা করা হয় তাকে। আবার সম্পূর্ণ বিপরীত বাস্তবতায় তার একটি নাস্তিক পরিচয় আছে মর্মে উইকিপিডিয়ায় তার ওপর লিখিত নিবন্ধটিতে উল্লেখ আছে। এতভাবে বিশিষ্ট এই সংগ্রামী পুরুষের জন্ম হয়েছিল ১৮৭৩ সালে মহারাষ্ট্রে। ১২ বছর বয়সে তাদের গ্রামের এক হিন্দুমুসলিম দাঙ্গায় বীরোচিত ভূমিকা পালন করে তিনি বীর উপাধি পেয়েছিলেন। তার নামের সাথে সেই বীর উপাধি এখনও সারা দুনিয়াব্যাপী লেগে আছে। ১৯০১ সালে তুলনামূলক বাণিজ্যতত্ত্বের ভিত্তিতে তিনি বিয়ে করেন যাতে, শ্বশুরের অর্থে পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে পারেন এবং পুনেতে ফার্গুসন কলেজে ভর্তি হন। সেখানে ছাত্রাবস্থায় তিনি বালগঙ্গাধর তিলক, বিপিন চন্দ্র পাল প্রমুখের উৎপ্রেরণায় ব্রিটিশ বিরোধী স্বদেশী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন। পুনে থেকে গ্রাজুয়েট হয়ে স্বামীজি কৃষ্ণ বর্মার সহায়তায় পড়াশোনার জন্য বিলেত গমন করেন। সেখানে গ্রেজ ইনে ব্যারিস্টারির জন্য ভর্তি হলেন। ইংল্যান্ডে বসেই সাভারকার গঠন করেন ‘ফ্রি ইন্ডিয়া সোসাইটি’ এবং ইংল্যান্ডে বসেই তিনি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজটি করেন। ১৮৫৭ সালের সংগ্রাম নিয়ে তিনি লেখেন তার অমর বই ‘দি হিস্ট্রি অব দি ওয়ার অব ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেস’। ব্রিটিশ রাজ বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ম্যাডাম ভিকাজি কামা নামের এক ভারতীয় বিপ্লবী প্রবাসীকে নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ও জার্মানিতে এই বই প্রকাশ ও বিক্রয়ের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়। বইটি সারা দুনিয়ায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে লেখকের নাম ও বিপ্লবী ব্যক্তিবর্গের নাম পরিবর্তন করে এই বই ভারতে গোপনে প্রকাশিত হয় এবং বিপ্লবীদের হাতে একরকম বাইবেল হয়ে ওঠে।

ইতোমধ্যে, ১৯০৫ সালের রাশিয়ার বিপ্লবের এক কর্মীর সাথে সাভারকারের সখ্য হয়। সাভারকার তার কাছ থেকে বোমা বানানো শেখেন। সাভারকারের এক বন্ধু মদন লাল ধিংড়া স্যার উইলিয়াম হাট কার্জন ওয়াইলিকে হত্যা করে। এ হত্যার বিচারে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে সাভারকার জনমত গড়ে তুলতে চেষ্টা করেন। ১৯০৯ সালের মর্লি-মিন্টো সংস্কারের বিরুদ্ধে লন্ডনে সাভারকার সশস্ত্র প্রতিবাদ আয়োজন করেন। এ পর্যায়ে পুলিশি গ্রেফতার এড়াতে তিনি পালিয়ে প্যারিসে যান এবং ম্যাডাম কামার বাসায় আশ্রয় নেন। কিন্তু পুলিশ ১৯১০ সালে প্যারিস থেকেই তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার করে তাকে ফ্রান্সের মার্সেই জেলে রাখা হয়। সেই জেল থেকে তিনি পলায়ন করেন। কিন্তু পলায়নের পরে আবার ধরা পড়েন। ভাগ্য ভালো ঘটনাটা ১৯১০ সালে ঘটেছিল এবং ফ্রান্সেই ঘটেছিল। ২০১০ সালে হলে এবং দেশটা বাংলাদেশ হলে সাভারকারকে ততক্ষণে হয়তো দুইবার ক্রসফায়ার হয়ে যেতে হতো।

যাই হোক, এরপর ১৯১০ সালেই ব্রিটিশ সরকার সাভারকারকে ভারতে নিয়ে আসে এবং পুনে জেলে রাখা হয় তাকে। ভারতে তাকে দুইবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। ১৯১১ সালের ৪ জুলাই দুই জীবন কারাবাসের দণ্ড নিয়ে তিনি আন্দামানের সেলুলার জেলে আসেন। সেলুলার জেলে অবশ্য তিনি প্রতিবাদের শক্তিটাকে একটু অন্য দিকে প্রবাহের প্রয়াস নেন। সেখানে তিনি বাধ্য নিয়মানুবর্তী কয়েদি হিসেবে আদৃত হন। ১৯১১ সালের ৩০ আগস্ট তার একটি ক্ষমাভিক্ষার চিঠিও জেল কর্তৃপক্ষ ফরোয়াড করেছিল। কিন্তু সে যাত্রায় তার ক্ষমা মেলেনি। তিনি সেলুলার জেলে একটি লাইব্রেরি গড়ে তোলার কাজে হাত দেন। কিছু কয়েদিকে লেখাপড়া শেখানোর দায়িত্বও তিনি নিয়েছিলেন। ১৯১৩ সালে তিনি আবারও ক্ষমা ভিক্ষার দরখাস্ত প্রেরণ করেন। কেন যেন বীরের মুখে কিংবা বিপ্লবীর মুখে মানায় না এমন কিছু কথাই বীর সাভারকার সেই দরখাস্তে লিখেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন যে তাকে মুক্তি দেয়া হলে ব্রিটিশ শাসনের ওপর ভারতীয় যুবকরা আস্থা ফিরে পাবে এবং মুক্ত জীবনে তিনি তার সাধ্যমত ব্রিটিশ সরকারের জন্য কাজ করে যাবেন। তিনি লিখেছিলেন—My conversion to the Constitional line would bring back all those misled young  men in India and abroad who were once looking up to me as  their Guide. I am ready to serve the government in any capacity they like, for as my conversion is conscientious so I hope my future conduct would be.

এইভাবে একে একে চারখানা ক্ষমা ভিক্ষার দরখস্ত দিয়েও সাভারকার তার মুক্তি অর্জনে সক্ষম হলেন না। অবশ্য জয়ন্ত যোগলকর, যিনি বীর সাভারকারকে ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদের জনক হিসেবে অভিহিত করেছেন, তিনি তার গ্রন্থে লিখেছেন যে, ক্ষমাভিক্ষার এই চিঠিগুলোর কোনো কথাই জেনুইন ছিল না। এগুলো ছিল একেবারেই সেই রকম চিঠি যেই রকম চিঠি শিবাজী লিখেছিলেন আওরঙ্গজেবকে। সে যাই হোক, ১৯২৪ সালের ৬ জানুয়ারি বীর সাভারকারকে শেষ পর্যন্ত মুক্তি দেয়া হয়েছিল অনেক শর্তে। সে সে শর্ত এমন ছিল যে, তিনি রতনগিরি জেলার বাইরে কোথাও যেতে পারবেন না এবং তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে পারবেন না। এই শর্তে রাজি হওয়ায় সরকার খুশি হয়ে তাকে মাসিক ৬০ টাকার একটি বৃত্তির ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন।

এই সময় মুসলিম লীগের ছাতার তলে দিগ্বিদিক মোল্লা ও শেখেরা একত্রিত হতে থাকলে কংগ্রেসের ‘গরম দল’-এর মধ্যে সাভারকারের ভাবনা ও মতাদর্শের সমর্থনও দিগ্বিদিক বাড়তে শুরু করে। ১৯৩৭ সালে বৃটিশ সরকার প্রভিন্সিয়াল অটোনমি প্রদর্শন করলে সাভারকারের ওপরে জারি করা পূর্বের বিধিনিষেধ শিথিল হয়ে যায়। এ সুযোগে ১৯৩৭ সালে তিনি বোম্বে গমন করেন এবং ১৯৩৭ সালেই তিনি হিন্দু মহাসভার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিছুদিনেই বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। সাভারকার ব্যাপক উৎসাহে হিন্দুদেরকে ব্রিটিশের পক্ষে যুদ্ধে যোগদানে আহবান জানান যাতে হিন্দুরা সশস্ত্র হয়ে ওঠার শিক্ষাটা পায়। কংগ্রেসের ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলনের তিনি মারাত্মক সমালোচনা করেন। ১৯৪৪ সালে গান্ধী কর্তৃক মুসলিম লীগের সাথে আলোচনার প্রতিও তিনি তীব্র বিষেদাগার করেন। সাভারকারের সবচেয়ে মারাত্মক সমালোচনা ছিল মহাত্মা গান্ধীর প্রতি। তিনি গান্ধীকে ভণ্ড ছাড়া বলতেন না। সাভারকার সম্বন্ধে ড. অম্বেদকরের মন্তব্য বেশ কৌতূহলপ্রদ। তিনি বলেছিলেন—জিন্নাহ আর সাভারকার মূলত একই জিনিস। আজকাল যেমন বিজেপি আর জামায়াতকে অনেকে এক বলে মনে করেন। অবশ্য অম্বেদকর দুয়ের মধ্যে একটি পার্থক্যের কথা বলেছিলেন। তার মতে জিন্নাহ্ আর সাভারকারের পার্থক্য হলো— ‘জিন্নাহ্ বলেন ভারতীয়রা দুই জাতি—হিন্দু আর মুসলমান, তাই তাদের দুটি দেশ দরকার যাতে দুই জাতি আলাদা আলাদা ভাবে নিজেদের শাসন করতে পারে; আর সাভারকার বলেন ভারতীয়রা দুই জাতি হলেও তাদের থাকতে হবে। এক দেশে যাতে হিন্দুরাই দুই জাতিকে শাসন করতে পারে’।

সাভারকার তার দ্বিতীয় বিখ্যাত গ্রন্থটি লেখেন সেলুলার জেলে এবং এটি প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে। মূলত এই বইয়ের দর্শনই তাকে পরবর্তীতে হিন্দু মহাসভার নেতা রূপে সৃষ্টি করে তোলে। তার এই হিন্দুত্ব এবং গান্ধীবিরোধী প্রচারণার কারণে গান্ধী হত্যায় তার প্ররোচনার বিষয় আদালত কর্তৃক আমলে নেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধী নিহত হন। গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসে আরএসএস-এর কর্মী ছিল এবং নাথুরাম গডসে যে পত্রিকাটি সম্পাদনা করতো সেই পত্রিকার স্বত্বাধিকারী কোম্পানি ‘হিন্দু রাষ্ট্র প্রকাশন লি.’-এ সাভারকারের ১৫ হাজার রুপির বিনিয়োগ ছিল। এছাড়াও আদালতে প্রদত্ত সাক্ষ্যমতে গান্ধীকে হত্যার পূর্বে ১৯৪৮ সালের ১৭ জানুয়ারি নাথুরাম গডসে বোম্বেতে সাভারকারের আর্শীবাদ গ্রহণ করেছিলেন। আপ্তে এবং গডসে দুজন সাভারকারের সাথে দর্শনলাভের পর আশীর্বাদের সাথে সাভারকার তাদের বলেছেন—‘যাও, কৃতকার্য হয়ে ফিরে আসো’। এমন সব প্ররোচনার দায়ে সাভারকারকে ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ তারিখে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু আদালত এই কথার পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণের অভাবে শেষ পর্যন্ত সাভারকারকে মুক্তি দেয়। আদালত মুক্তি দিলেও জনতার মনে সন্দেহ এবং ঘৃণা থেকেই যায়। সেই অনুভব থেকেই ১৯৫৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের ১০০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে ১৮৫৭ সাল নিয়ে সবচেয়ে তেজোদীপ্ত বইয়ের লেখক সাভারকারের সাথে জওহরলাল নেহেরু এক মঞ্চে বসতে রাজি হননি। এসবের পরেও আরএসএস-এর নবোত্থানের সুবাদে, হিন্দুবাদী বিজেপি কর্তৃক ভারতগ্রাসের সুবাদে, ১২ বছর বয়সে হিন্দুমুসলিম দাঙ্গায় অংশ নিয়ে বীর বনে-যাওয়া বিনায়ক দামোদর সাভারকার আজ আবার সর্ব ভারতের এক প্রভাবশালী বীর রূপে অবির্ভূত হয়েছেন। আজ সেলুলার জেলের সামনের চত্বরে বিংশ শতকের স্বাধীনতা যোদ্ধা সেলুলার জেলের সাত শহীদের এক জনকে বাদ দিয়ে সেখানে সপ্তম জন হিসেবে স্থান দেওয়া হয়েছে সেই সাভারকারকে। শুধু তাই না, আন্দামানের পোর্টব্লেয়ার বিমানবন্দরের নামকরণ হয়েছে সেই সাভারকারের নামে। ব্যাপারটা বুকের ভিতর একটা কষ্টের মোচড় তুললো। জানি না এই মোচড় কোনো সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ কি-না।

সাম্প্রদায়িকতার সংজ্ঞাগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক মারপ্যাচে কোনো একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের অনুকূলে রচিত হতে থাকলে এমন মানবিক অনুভবও সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠার আশংকা তৈরী হতে থাকে। এ বড় বেদনাদায়ক। এই বেদনা নিয়েই সন্ধ্যাটা কেটে গেলো। রাতে হোটেলে এসে সেলুলার জেলের গেট থেকে কেনা বইপত্রগুলো নাড়াচাড়া করতে গিয়ে এ বেদনা আরো ভারী হতে লাগলো। আন্দামানের জেলের যে সকল বীরের গাঁথা আজ সর্বভারতে প্রচারিত তার মধ্যে ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামী বীরদের দু’ছত্রও কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ আন্দামানে পেনাল সেটেলমেন্টের মূল কয়েদি তো ছিল ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সেই বীরেরা এবং তৎপরবর্তী ইংরেজ রাজকে ত্যক্ত বিরক্ত করে তোলা ওয়াহাবিরা। একমাত্র শের আলী ছাড়া তাদের একটি নামও সন্ধ্যায় সেলুলার জেলের ‘লাইট এন্ড সাউন্ড শো’তে পর্যন্ত উচ্চারিত হতে শুনলাম না। অথচ কী কঠিন যন্ত্রণায় কত কত ওয়াহাবি ও ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা তিলে তিলে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছেছিল এই আন্দামানের রস আইল্যান্ড, ভাইপার আইল্যান্ড আর পোর্ট ব্লেয়ারের জঙ্গলে বা ব্যারাকে!

সেই যন্ত্রণার দলিল অনেকই সযত্ন অবহেলায় নষ্ট হয়েছে এবং নষ্ট হতে দেয়া হয়েছে। যে দুয়েকটি আজকের প্রজন্মের হাত পর্যন্ত পৌঁছেছে তাদের একটি হলো মাওলানা ফজলে হক খয়রাবাদীর রচিত ‘আসসাওরাতুল হিন্দিয়া’। মাওলানা ফজলে হক খয়রাবাদী ছিলেন মোঘল রাজ দরবারের পন্ডিতদের একজন। মোঘল দরবারের বিশিষ্ট জ্ঞানীগুনিরা তার বন্ধু ছিলেন। বিখ্যাত উর্দু কবি গালিব, হাকিম মুমেন খান, মুফতী সদর উদ্দীন খান আজুরদাহ, ইব্রাহীম জওক, জহির দেহলবী, মাওলানা শাহ আব্দুল কাদের, মাওলানা শাহ রফিউদ্দিন প্রমুখ সারা উপমহাদেশব্যাপী বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ মাওলানা ফজলে হক খয়রাবাদীর বন্ধু স্থানীয় ছিলেন।

আল্লামা ফজলে হক খয়রাবাদী ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে অযোধ্যার অর্ন্তগত খয়রাবাদে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা মাওলানা ফজলে ইমাম খয়রাবাদীও ছিলেন বিশিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তি। আল্লামা ফজলে ইমাম তার সময়ে দিল্লীর সদরুসসুদুর, অর্থাৎ সরকারের প্রধান আইন ব্যাখ্যাতা পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। পরবর্তীতে আল্লামা ফজলে হক খয়রাবাদীও সরকারি চাকুরি করে রাষ্ট্রের প্রধান আইন ব্যাখ্যাতা বা সদরুসসুদুর পদে উন্নীত হয়েছিলেন। শুধু আইন নয়; কাব্য, দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা প্রতি শাখায় ছিল মাওলানার অসামান্য খ্যাতি। ‘গুলেনারা’ গন্থে উল্লেখ আছে কবি আসাদুল্লাহ খান গালিব তার ‘দীওয়ানে গালিব’-এর খসড়া মাওলানা ফজলে হক খয়রাবাদীকে দিয়েছিলেন এডিটিং এর জন্য। মাওলানার এডিটিং গালিব কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করেছিলেন। এই মাওলানা ফজলে হক ১৮৫৭ সালে ফতওয়া জারি করেছিলেন যে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারন সকলের জন্য ওয়াজিব। সাথে সাথে তিনি নিজে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এই সংগ্রামে। সংগ্রাম ব্যর্থ হলে মাওলানা গ্রেফতার হন এবং যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দিয়ে মাওলানা ফজলে হক খয়রাবাদীকে ১৮৫৯ সালে আন্দামান পাঠানো হয়। মাওলানা ফজলে হক খয়রাবাদীর পূর্বে ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যে আরো যাঁদেরকে আন্দামান প্রেরণ করা হয়েছিল তাদের মধ্যে মুফতী এনায়েত আহমেদ বাকুরী অন্যতম। (চলবে)

আরো পড়ুন: কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ০৪

//জেডএস//

x