সেলিব্রেটি

স্বরলিপি ০৮:০০ , জানুয়ারি ০৮ , ২০১৯

প্রাচীন বাড়িটির নিচতলা ডুবে গেছে। দ্বিতীয় তলাকেই নিচতলা মনে হয়। বাড়িতে ঢোকার দুটি দরোজা। একটি প্রবেশের অন্যটি বের হয়ে যাওয়ার জন্য। দরোজায় লাগোয়া কাঠের ব্রিজ। দুটি ব্রিজই প্রধান রাস্তার সঙ্গে মিশে গেছে। বের হয়ে যাওয়ার দরোজাটি খোলা পেয়ে একজন সেলিব্রেটি বাড়িতে ঢুকে পড়লেন। তিনি আগে অভিনয় করতেন, বর্তমানে গল্প লেখা ও পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত। তাকে স্বাগত জানালো শ্যামল। সে পেশায় মাছ শিকারী। শ্যামলী ওর বড় বোন। এই প্রাচীন বাড়িটা ওদের। সেলিব্রেটির জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। সেলিব্রেটি উপস্থিত হওয়ার কিছু সময় পরও ঘুমাচ্ছিলো শ্যামলী। 

—আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, আমার ঘুমিয়ে যাওয়াটা ঠিক হয়নি। সত্যিই আমি দুঃখিত। আপনাকে বুঝি স্বাগত জানিয়েছে আমার ভাই?  আপনি বললেন,  যে দরোজা খুলে দিয়েছে সে কে? আমি মূলত তার কথায় বলছিলাম। আপনি রেগে আছেন সে আমি বুঝতে পারছি। ঠিক করে উঠতে পারছি না আপনাকে কোথায় বসতে দেবো।

আমি থাকি দ্বিতীয় তলায় আর আমার ভাই থাকে তৃতীয় তলায়। আপনি শুটিংয়ের লোকেশন হিসেবে বাড়িটি উপযোগী কিনা, তাই দেখতে এসেছেন। এই সুবাদে আপনাকে কাছ থেকে দেখা হল। জানেন, বড় পোস্টারে আপনার মায়াভরা মুখ আমি দেখেছি সেই ছোটবেলায়। স্কুলে যেতাম। মাথায় ওড়না টেনে তারপর পোস্টারের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, যাতে মানুষ আমাকে দেখতে না পারে। বোঝেনতো পোস্টারের দিকে তাকিয়ে থাকাটা খুব একটা ভালো চোখে দেখা হতো না। আপনাকে দেখতাম আর মনে হতো, মুখে গভীর ছায়া পড়ে আছে।

এতো কথা বলছি শুনে আপনি ভাববেন না অসম্মান করছি। তবু আপনাকে বলার লোভ সামলাতে পারছি না। আজ যখন গোসল করছিলাম তখনও মনে মনে ঈশ্বরকে বলছিলাম, আপনার সঙ্গে যেন দেখা হয়ে যায়। এখন মনে প্রশ্ন জাগছে ওই অবস্থায় ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলেও কি ভুল করে ফেললাম। একথা বলার জন্য আমার হয়তো আর একটু আড়াল নেওয়া দরকার ছিল।

আপনি বসুন। আরে কি করছেন, ওখানে বসবেন না। ওই বাদামী রঙের জানালা ঘেঁসে বসবেন না। জানালায় ঘুণ ধরেছে। আমার ছোটভাই রং খুব ভালোবাসে। জানালাটি শ্রীহীন হলেও রংহীন বলা চলে না। তার নিজস্ব রং তাকে সত্যিই সুন্দর করে তুলেছে। দিন যায় আর ভেতরের রংয়ে রঙিন হয়ে ওঠে জানালাটি। আমি তার বদলে যাওয়া দেখি। হয়তো সেও আমাকে দেখে। আমি জানালাটির কাছাকাছিই থাকি। শুধু হেলান দিয়ে বসি না। জানি, ভেতরে ভেতরে সে কঠিন অসুখ পোষে। জানালাটির স্মৃতি মোড়ানোর গল্পও আছে। আভিজাত্য আর পাখির গানশোভিত গল্প, আমি সেই গল্প শুনতে শুনতে নমে যাই—এক একটি ভোরে।

আশ্চর্য, ভোর কত প্রাচীন গীত। দীর্ঘকাল ধরে এই গীত গাওয়া হচ্ছে। সকাল এলেই আমরা বিদ্ধস্ত মানুষেরা তার ভেতরেই খুঁজে নিচ্ছি, বাড়ির নেমপ্লেট। আরও আছে-কত শত রংয়ের ধাতু। সবল হাত। দৃঢ় আর বলিষ্ঠ মুখ।

ওহ্, আমাদের বাড়ির নেমপ্লেটটা পরিবর্তন করা হবে। এবার আমরা ভাই-বোনের নামে বাড়ির নাম পরিবর্তন করে নেবো।

এই বাড়িটির নাম আগেও দু’তিন বার পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রতিবার যার নামে এই নেমপ্লেট করা হয়েছে, তাকে বলা হয়েছে ‘যাও ওই বাদামী জানালার সঙ্গে হেলান দিয়ে বসো’।

বুঝতে পারছেন, আপনাকে এতো করে কেন না বললাম।

নিন, এই পরিস্কার চেয়ারটাতে বসুন। একগ্লাস পানি পান করুন। পানি হলো মাছের ঘর। এই ঘর প্রাচীন নাকি নতুন; বুঝতে গেলে আমার ভয় করে। জানেন, আমার ভাই মিঠাপানির মাছ শিকার করে। বছর যায় আর তার শিকারের জায়গা সরে সরে যায়। তাই তার ঘরে ফেরার সময়ও বদলে যায়।

সে রুপালি আর সোনালী আঁইশ জমায়। ও যে পরিমাণ আঁইশ জমিয়েছে, সেই পরিমাণ কথা হয়তো সারাজীবনেও বলেনি। ও কথা কম বলে।

মায়ের মুখে শুনেছিলাম, আমার ভাইয়ের জন্মের পর পরই ওকে মধু খাইয়েছিলো। মধুর পরিমাণ এতো বেশি ছিলো যে—আমার ভাইয়ের ঘুম আর ভাঙছিলো না। এরপর, দিনের পর দিন তার ঘুম ভাঙানোর জন্য চেষ্টা করা হয়েছিলো; প্রার্থনা করা হয়েছিলো। সে এখনো ঝুলে ঝুলে হাঁটে। মাছ তার প্রিয় খাবার, তবে সে মধু খায় না।

আমি আপনার হাতে একবোতল মধু দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আপনার মুখে হাসি নেই। রেগে আছেন। টেনে টেনে দেয়ালের প্লাস্টার খসাচ্ছেন। শুনুন, আপনি আপনার আঙ্গুল নিয়ন্ত্রণ করুন। প্লাস্টার খসাবেন না।

আপনি বরং খাবার টেবিলে আসুন। অনেক রকম মাছ রান্না করেছি। ঘরে ঢুকে আমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছেন বলে ভাববেন না, আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করে নেই।

আপনি আসবেন বলে, এর আগেও তিনবার তারিখ ফেলেছিলেন। ওইসব দিনগুলোতে আমি জেগেছিলাম কিন্তু আপনি আসেননি। আসেননি ভালো করেছেন, আপনার এই রুদ্রমূর্তি দেখার জন্য আমি তখনও প্রস্তুত ছিলাম না। আমি কেবল আপনাকে ভালোবাসার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। ভালোবাসার মানুষকে সামান্যতম ভালো না বাসার প্রস্তুতি নিতে একটু সময় লাগে। এই সময়টুকু আমি পেয়েছি। আমি পুরোপুরি কোন কিছুই ভালোবাসি না। আমার ইচ্ছাও হয় না। কেন হয় না, জানি না।

আমি মিথ্যা বলি। মাঝে মাঝে মিথ্যা বলি। আমার মাঝে মধ্যে মানুষের মুখে চড় বসাতে ইচ্ছা করে। সেকি, আপনি হাসছেন। কিছু বলবেন মনে হয়।

—এখানে আগামী সপ্তাহে শুটিংয়ে আসতে চাই

—চলে আসুন’ তবে বুধবার বাদে। বুধবার আমি আর আমার ভাই পৃথিবীর দুয়ার খুলি না। আমাদের মা আত্মহত্যা করেছিলো, এই দিনে। এরপর থেকে আমাদের বাবা আমাদের কারও নাম ধরে ডাকতো না। বাবা তাকালেই আমরা বুঝে যেতাম, কাকে চাইছে।

মায়ের ছিলো বড় নাভি। বাবার বড় নাভি পছন্দ ছিলো না। এ কথা মাকে প্রায়ই শোনাতো। মা আমাদের বড় হওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছিলো। একটা উচ্চতায় পৌঁছানোর পর আমি আর আমার ভাই কেউই আর বড় হচ্ছিলাম না।

মা আমার ভাইকে একজনের কাছে নিয়ে গেলো। লোকটি আমার ভাইকে মাছ শিকার করা শিখিয়ে দিলো। হয়তো মা ধরে নিয়েছিলো, আমরা বড় হয়ে গেছি।

মাকে প্রশ্ন করেছিলাম, লোকটি কে? মা উত্তর দেয়নি। বাবা বলেছিলো, লোকটিকে বাবা খুব ভালো করে চেনে। হাড়ে হাড়ে চেনে।

আমাদের বাড়িতে নাকি তার খুব যাওয়া-আসা ছিলো। শীতকালে বাড়িতে প্রচুর মাছ দিয়ে যেত লোকটি। তারপর অসুস্থ্য অবস্থায় লোকটি একবার আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলো। একদিন বাবাকে কিছু না বলেই সে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিলো। স্বভাবে সে ছিলো শান্ত, আর আমার বাবার ছিলো খুব রাগ। বাবা রেগে যাওয়ার আগেই মায়ের মুখে মেঘ জমে যেত।

আমার ছোট ভাইটাও স্বভাবে খুব শান্ত হয়েছে। তারপরও মা বলতো, ‘হয়েছিস তোর বাবার মতো’।

বাবাও শান্ত স্বভাবের হয়েছিলো, তবে মায়ের মৃত্যুর পর। চালের ব্যবসা গুটিয়ে ঘরে বসে গিয়েছিলো সে। সন্ধ্যার নামার আগে বাবা মাকে ডাকতো—একবার, দুইবার, তিনবার। বউ. . . বউ. . .বউ। তারপর বাবা থেমে যেতো। পৃথিবীতে সন্ধ্যা নামতো। শুধু মনে হতো, মা যদি শুনতো।

আমাদের বাড়িটাও ক্রমে বাবার মতো ছন্দ ফিরে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। এই বাড়িতে ঢুকে আপনি সেটা বুঝতে পেরেছেন?

আর একটা কথা, বাবার মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী নই। বাবাও নয়। এমনকি আমার ভাইও নয়। তারপরও কতবড় ক্ষতি হয়ে গেলো। ক্ষতির জন্য সব সময় দায়ী হতে হয় না। বাবার শরীর একদিন প্রচণ্ডরকম কাঁপতে শুরু করলো। বাবা কাঁপতে কাঁপতে নিথর হয়ে গেলো। আমরা দেখলাম আর কাঁদলাম। বাবার মৃত্যু বর্ষাকালে।

‘তোমার জীবনের গল্প একান্তই তোমার। এই গল্পটা তুমি আগেও হয়তো কাউকে না কাউকে বলেছো, তাহলে এখন আবার কেন বলছো। পরেও হয়তো কাউকে বলবে। আমাদের কেবল বাড়িটা দরকার। আমাদের গল্প আছে?’

—আপনাদের গল্পটা কি আগে কেউ শোনেনি?

—না।

—কিন্তু আমি গল্পটা জানি।

—বলো কী!

—হ্যাঁ, আপনি আগেই জানেন, আমাদের মা আত্মহত্যা করেছিলো। আর আমি এটা জানি আপনাদের গল্পটা কী হবে।

—আপনারা কাজ করতে এসেছেন। বাঁধা দেবো না। তবে আমার ভাইকে কোন রকমে বিরক্ত করবেন না। সে সব মাছের নাম বলে দিতে পারে।

*

ভেবে রেখেছিলাম, আপনি এলে এক দুপুর খরচ করে মাছ-ভাত খাব। দশ রকম মাছ রান্না করেছি আপনার জন্য। আরও ভেবেছিলাম এক বিকেল খরচ করে দুজনে চা খাবো। আপনি কথা শেষ করেই চলে যেতে চাইছেন। আমি আবার একবেলা এ পদের বেশি কিছু খাই না। এক পদ রেখে বাকীগুলো ফেলে দিতে হবে। আপনার কি মনে হয়, পানিতে ফেলে দিলে রান্না করা মাছগুলো তখনো মনে হবে সাঁতরাচ্ছে? ঠিক আছে কোন উত্তর দিতে হবে না আপনার।

শুনুন, আমাদেরকে উপরমহল থেকে বলা হয়েছে আগামী বর্ষায় পানির উচ্চতা বেড়ে যাবে। এজন্য এই দালানের উপরে আরও একতলা বাড়ানো হচ্ছে। আমরা দুই ভাই-বোনের যেকোন একজন উপরতলায় উঠে যাব। যদিও কাজ শেষ হবার আগে-পরে বাড়িতে যদি বড় কোন ফাটল দেখা দেয় তাহলে বাড়িটি ছেড়ে যেতে হবে।

আপনি এখন যেতে পারেন।

আর একটি কথা—আপনি সূর্যাস্তের মতো সুন্দর।  যেহেতু, এই বাড়িতে আপনি আবারও আসবেন—রাস্তা চিনে বের হয়ে যান। এতে আপনারই লাভ। যে কোন একটি ব্রিজ দিয়েই আপনি রাস্তায় যেতে পারবেন।

‘যে তলাটি পানির নিচে চলে গেছে—সেখানের কোন গল্প আমাকে বলতে পারো’।

‘আমি শুধু জানি আমার ছোট-ভাইয়ের জন্মের আগেই বাবা নিচতলা পরিত্যাগ করেছিলেন। আমার ভাই জন্মের পরেই, নিচতলা একটু একটু করে ডুবে যেতে থাকে’।

‘গল্পটা পাল্টানো লাগতে পারে’।

কিসের গল্প?

আমরা যে গল্পটা নিয়ে কাজ করছি, তাতে আরও কিছু যোগ-বিয়োগ করা লাগবে। আমার মনে হচ্ছে, এই বাড়িটা আমাদের শুটিংয়ের কোন কাজেই আসবে না, যদি না গল্পটা পাল্টাতে পারি। শুরুটা না হয়, তৃতীয় তলার বাম দরোজা থেকে শুরু করা যাবে।

—আপনিতো বললেন কোন কাজে আসবে না। গুরুত্ব কমিয়ে দিয়ে তাকে প্রধান করে তুলতে পারলে ভালো। আপনি বরং আর একটু ভাবুন। তারপর ঠিক করুন, শুটিং করবেন কি না।

—তাহলে গল্পটা নিয়ে কোন কথা বলা যাবে না।

—অবশ্যই না।

—তোমার গল্পটি বিকৃত। আমার গল্পটি হবে শিল্পীত।

—গল্পটি শিল্পীত না হলে, আপনার কাজ ছেড়ে দেওয়া উচিত।


পাঠ-প্রতিক্রিয়া

খুব সহজ একটি গল্প পাঠ করলাম। লেখকের নাম জানা নেই বলে তাকে মেনশন করার সুযোগ হলো না। লেখক আমাকে ভাবিয়েছেন। এ জীবনে আমার গল্পের পাঠ যতটুকু সে নিরিখে বলতে পারি, গল্প বলার ঢঙ্গে নতুনত্ব উপলব্ধি করেছি। তাই বলে একেবারেই যে লেখক নিজের স্টাইল প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন তা নয়, তবে তিনি চাচ্ছেন, সে চেষ্টাও আছে। লেখককে শুভকামনা।

[আমরা গল্প ও কবিতার সঙ্গে পাঠ-প্রতিক্রিয়া জুড়ে দেবার সীদ্ধান্ত নিয়েছি। যিনি পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখবেন তাকে শুরুতে জানতে দেয়া হয় না লেখকের নাম। আবার লেখক কখনোই জানতে পারবেন না পাঠ-প্রতিক্রিয়া কে লিখেছেন।–বি.স.]

//জেডএস//

x