দাহ ও দ্রোহের রসায়ন : দ্য ওম্যান ইন দ্য রিউমার

সৌম্য সরকার ১৭:৪২ , ফেব্রুয়ারি ১০ , ২০১৯

সাধারণীকরণের সম্ভাবনা নিয়েই বলা যায় সমস্ত শিল্পের পেছনে শিল্পীর আত্মযন্ত্রণার প্রভাব থাকে, না থাকাটা স্বাভাবিক নয়। অনেকে একধাপ এগিয়ে বলবেন শিল্পকে শিল্পোত্তীর্ণ করে ব্যক্তিগত দাহ। সেই সাথে দ্রোহ আর ক্ষোভ। ঋত্বিক ঘটক যখন কেনজি মিজোগুচির কাজ সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত তখন খুব সম্ভব তিনি নিজের দাহ ও দর্শনের সাথে মিজোগুচির দগ্ধ মনের ঐক্য খুঁজে পান। দেশভাগের যে যন্ত্রণা ঋত্বিক ঘটককে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে সে রকম যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে গেছে মিজোগুচিও।

শৈশবে মিজোগুচি দেখেছেন বাবার হাতে মায়ের যন্ত্রণা-ভোগ। আর পারিবারিক আর্থিক কষ্টের বলি হয়ে বড় বোনকে যৌনালয়ে যে বিক্রি করে দেওয়া হয় সে ব্যথা সারাজীবন তাড়া করে মিজোগুচিকে। তার প্রথম দিককার প্রধান চলচ্চিত্রের একটি ওসাকা এলিজি মুক্তি পায় ১৯৩৬ সালে। দেখালেন, কীভাবে সমাজ একটি মেয়েকে ঠেলে দেয় উন্মুক্ত রাতের রাস্তায় একা—স্পষ্ট ইঙ্গিত, কী হতে যাচ্ছে মেয়েটির জীবনে। ১৯৩৬ সালেই সিস্টার্স অফ দ্য গিয়ন যেটি শেষ হচ্ছে এই ধরণের প্রশ্ন দিয়ে :  ‘কেন এই পৃথিবীতে থাকবে পতিতাবৃত্তি, কেন থাকবে এমন অনায্য প্রথা?’ ১৯৫৩-তে এ গেইশা, ১৯৫৪-তেদ্য ওম্যান ইন দ্য রিউমার আর তার জীবনের শেষ ছবি স্ট্রিট অফ শেইম (১৯৫৬)। সেই একই ক্ষোভ: কেন, কেন, কেন! 

দ্য ওম্যান ইন দ্য রিউমার ছবিতে চলচ্চিত্রকার দুটি স্তরকে গেঁথে দিয়েছেন। গেঁথেছেন ব্যথার সুতো দিয়ে। মুনীর চৌধুরীর কবর নাটকের মুর্দারা যেমন বিচ্ছিন্ন হতে পারে না কারণ তাদেরকে গুলি দিয়ে গেঁথে দেওয়া হয়েছে তেমন। পনেরটি গেইশা মেয়ের জীবন, দারিদ্র্য, কখনো একটু স্বপ্ন, সংগ্রাম, অসুস্থতা, অনিশ্চয়তা, অসময় মৃত্যু এক-দুজনের এবং নতুন একটি তরুণীর পতিতাবৃত্তিতে অন্তর্ভূক্তি তার মানে এই শেষ নেই যেন। আর অন্যদিকে প্রধান তিন চরিত্র অর্থাৎ এই গেইশা হাউসের কর্ত্রী হাতসুকো—মধ্যবয়সী, বিধবা প্রথম যৌবনে। হাতসুকোর মেয়ে ইউকিকো—আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, টোকিওতে বড়, পিয়ানো শিখেছে। ডাক্তার মাতোবা—উচ্চাকাঙ্ক্ষী, হাতসুকোর গেইশা হাউসের ‘হোম ডক্টর’, হাতসুকোর সাথে প্রেমের সম্পর্ক বজায় রেখে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চায়। হাতসুকো এই অল্পবয়সী তরুণ ডাক্তারের প্রেমে অন্ধ। এই নিয়ে পর্দার আড়ালে কানাঘুষা—রিউমার, কিন্তু প্রেম তো প্রেমই হাতসুকোর কাছে। স্বামীর সাথে তার প্রেম ছিল না, ওটা ছিল শুধুই বিয়ে। সে স্বপ্ন দেখে একদিন সে ডাক্তার মাতোবার সাথে সংসার পাতবে। তাই তার হাতের পয়সা দিয়ে হাতে ধরে রাখতে চায় ডাক্তারকে—একজন যেটা চাচ্ছে আরেকজন সেটাই দিয়ে যাচ্ছে, খেলাটা পরিষ্কার। মিজোগুচিও পরিষ্কার করেছেন ছোটো-ছোটো ইঙ্গিত ব্যবহার করে। মনে হবে যেন প্রেমটা বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে; বাস্তবে তা নয়।

এখানে ইউকিকোর প্রবেশ। সে ঢোকে গল্পের মধ্যে কিন্তু সিনেমার প্রথম দৃশ্যেই। টোকিও থেকে ফিরে এসেছে সে মায়ের গেইশা গিল্ড-এ। তার প্রেমিক ও হবু বর তাকে পরিত্যাগ করেছে কেননা ছেলেটি ও তার পরিবার ইউকিকোর মায়ের ‘প্রকৃত’ পেশা জেনে গেছে। এমনিতেই ইউকিকো কখনো মায়ের পেশাকে মেনে নেয়নি তার ওপর এই ঘা। হতাশার ষোলো-কলা পূর্ণ হওয়ায় সে আত্মহত্যার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়েছে টোকিয়োতে থাকতে। এখন ফিরে আসতে হয়েছে সেই ঘরেই যার অস্তিত্বকে সে কখনোই গ্রহণ করেনি। অর্থাৎ তার কাছে গেইশা মেয়েরা ভিনদেশের বাসিন্দা আর সে ভিনগ্রহের কেউ গেইশা মেয়েদের কাছে।

এই ছবির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের একটি ঘটে সাড়ে চার মিনিটের দিকে। থিমের গাঁথুনির জন্য এবং ডিজাইন ও কম্পোজিশনের দিক থেকেও দরকারি। আমরা দেখি পাঁচটি নাম-না জানা গেইশা মেয়েকে মেইক-আপ ঘরে : খদ্দেরদের জন্য তৈরি হতে। প্রথম টেইকে ক্যামেরা যেন একজন ঘরে প্রবেশ করল এমন অ্যাঙ্গেল থেকে। তিনজন একদিকে মুখ করে, একজন চুল ঠিক করছে, একজন পাউডার লাগাচ্ছে গলায়, একজন একটি বাটিতে কী যেন একটা গুলছে, একজন দাঁড়িয়ে, একজন শুয়ে—তার মুখের ওপর রুমাল। দশ সেকেণ্ড পর ক্যামেরা আরো ঘরে ঢুকে যেন বসে পড়ল, নিবিড় হলো। এবার চারজন ধরা পড়ল ক্যামেরায়। বামে একজনের পিঠ, মাঝখানে শুয়ে থাকা মেয়েটি, তার ডানে একজন, মাথার কাছে একজন সিগারেট ধরাচ্ছে। মুখের ওপরের রুমাল সরিয়ে মেয়েটি বলল : ‘I’d love to go home to the countryside to see the wheat turning yellow and listen to the skylarks singing’। দূর  থেকে একটা হালকা বাঁশির সুর। হাতের ডানের মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করে বলল : ‘What a poetess’। মাথার কাছের যে মায়েটি ততক্ষণে সিগারেট ধরিয়েছে সে কেবল একটু হাসল, একটু। যে মেয়েটি বাড়ি যাওয়ার কথা বলল তার নাম আমরা জানব উসুগুমো। তাকে আমরা দেখব অসুস্থ হয়ে পড়তে কিছু পর এবং ওর অসুস্থতার সূত্র ধরেই ইউকিকোর সাথে গেইশা মেয়েদের সাথে বিশ্বাসের সম্পর্কে তৈরি হবে। সহমর্মী হয়ে উঠবে ইউকিকো। উসুগুমোর বাবা আর বোন থাকে গ্রামে। উসুগুমো চায় তার বোনের উজ্জ্বল না হলেও ভিন্ন একটু জীবন, একটু উন্নত বোধকরি। তার জন্যই তার ত্যাগ। মিজোগুচির জীবনের স্পষ্ট ছায়া। যাই হোক, শিল্পীকে হতে হয় নির্দয় এবং আমরা দেখব উসুগুমোর অসময় মৃত্যু ক্যান্সারে এবং আরো একধাপ বেশি— বোন চিয়োকোকে গেইশা হতে হবে। গত্যন্তর নেই যে। সে অবশ্য শেষ দৃশ্যে।

মাঝে মা-মেয়ে-ডাক্তারের ত্রিমুখী প্রেম। মা ভালোবাসে মাতোবাকে। এদিকে বিষণ্ন ইউকিকোকে সঙ্গ দিতে দিতে তারা জড়িয়ে পড়ে প্রেমে। ইউকিকো অবশ্য মায়ের অন্তর্গত জগতের গল্প জানে না। যখন জানে তখন জটিল নাট্যমুহূর্তের জন্ম হয়। মায়ের ঈর্ষা, মেয়ের ক্ষোভ, মায়ের আত্মসমর্পণ, মেয়ের সমবেদনা, ডাক্তারের নাইভিটি অথবা অতিধূর্ততা এবং অতঃপর মায়ের আত্মত্যাগের প্রয়াস অথচ মেয়ের ম্যাচুরিটির প্রকাশ ঘটে। মিজোগুচি অসাধারণ মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তার ‘লঙ টেইক’ ও ‘মেজ-আন-সেন’ দিয়ে। ইউকিকো ডাক্তার মাতাবোকে একধরনের খেদিয়েই দেয় এটা বলে যে সে এখন তার মায়ের কষ্ট বুঝতে পারছে। সে নিজেই তো এর মধ্যে নিয়ে গেছে—প্রত্যাখান।

হাতসুকো অসুস্থ হয়ে পড়লে আমরা দেখি ইউকিকোকে বাড়ির সমস্ত দায়িত্ব তুলে নিতে। সে তার আত্মপরিচয় খুঁজে পায় যেন। এ এক শুদ্ধির পথ, কষ্টভোগ ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে—মিজোগুচির দর্শনচিন্তার অন্যতম দিক। মায়ের জন্য নাস্তা নিয়ে গেলে যে কথপকথোন হয় মা-মেয়েতে, সেটি এমন :

হাতসুকো : You probably hate me for all the pain I’ve caused you.

ইউকিকো : What are you saying? I’m as much a victim as you are.

হাতসুকো : Being able to recognize that shows how much you have grown up.

ইউকিকো : Absolutely. In matters of love, I’m far more experienced than you.

হাতসুকো : You have learned some valuable lessons about the world, haven’t you?

ইউকিকো : It’s these experiences forced upon me that I hate.

হাতসুকো : You know, in some ways, life is all about suffering, but you have to learn to live with it.

কিন্তু তারপরও একটু বাকি থাকে। চিয়াকো, উসুগুমোর বোন, আসে। গেইশা হতে চায়। আর কোনো পথ নেই। ইউকিকো একদমই রাজি হয় না প্রথমে। উসুগুমো চায়নি তার বোন পুরুষের এভাবে মনোরঞ্জন করুক। কিন্তু উপায় কী? এও এক অনিবার্যতা যেন।

ক্যামেরা ঘুরে চিয়োকোর পিছনে আসে। অন্য গেইশারা একে-একে বের হয় সেজে-গুজে। খদ্দেরদের কাছে যায় তারা। চিয়োকে সবাইকে বলে যেন নতুন কর্তীকে একটু বুঝিয়ে বলে তার হয়ে। একজন গেইশা যেতে-যেতে বলে—

‘I ask myself. When will there be no more need for girls like us...’        

এ যেন সিস্টার্স অফ দ্য গিয়ন  ছবির শেষ কথাগুলোর পুনরাবৃত্তিই। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্ন, সেই আঘাত।

ট্রেডিশন ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বের জটিল মিথস্ক্রিয়ায় যে জাপানের দৃশ্য আমরা পাই সে যেন বেশি দূরের কোনো আখ্যান নয়—দর্শক একটি পুরুষের পৃথিবীতের নারীদের অবস্থানের স্বরূপ পেয়ে যাচ্ছেন যার শেষ চাচ্ছেন মিজোগুচি। গেইশা হাউজ যেন এক দীর্ঘ যন্ত্রণার মেটাফোর হয়ে থাকে তার জন্য—তার অন্তর্দাহ ও দ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠে।  

//জেডএস//

x