বন্ধু

মাজহারুল ইসলাম ১৬:১৫ , ফেব্রুয়ারি ১১ , ২০১৯


গত এক মাসে রাহাত তার বন্ধুকে কমপক্ষে পঞ্চাশবার ফোন করেছে। অফিসের পিএবিএক্স নম্বরে ফোন করে রঞ্জুকে চাইলে কিছুক্ষণ অপেক্ষায় রেখে অপারেটর মেয়েটা একইরকম যান্ত্রিক ও ক্লান্তিকর স্বরে কখনো বলে, স্যার সিটে নাই। আবার কখনো বলে, স্যার মিটিংয়ে আছে। প্রথমদিকে দু-একবার এরকমও বলেছে, স্যার ফ্রি হয়ে আপনাকে ফোন করবেন। কাইন্ডলি আপনার ফোন নম্বরটা দেবেন? রাহাত ফোন নম্বর দিয়েছে, কিন্তু কখনোই রঞ্জু ফোন করেনি।

ফ্রন্টডেস্কের মেয়েটি এখন আর ফোন নম্বর চায় না। রাহাতের কণ্ঠস্বর তার পরিচিত হয়ে গেছে। রাহাত ‘হ্যালো’ বললেই সে চিনে ফেলে। ফোন ধরেই বলে, কাইন্ডলি একটু অপেক্ষা করুন, আমি দেখছি। কিছুক্ষণ মিউজিক শোনানোর পর একই উত্তর, স্যার মিটিংয়ে আছে। রাহাত এখন ফোন করতে কিছুটা সংকোচ বোধ করে। তার মনে হয়, মেয়েটা কী ভাববে? বন্ধু ফোন ধরছে না, তারপরও আমি লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে ফোন করেই যাচ্ছি।

রাহাত কখনো তার সেক্রেটারিকে দিয়ে ফোন করায় না। সে নিজে তার সরাসরি নম্বর থেকে ফোন করে। প্রতিদিন ঠিক সকাল দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে। সকাল এগারোটার পর রঞ্জু কাজে বেরিয়ে যায়।

রঞ্জু তার দীর্ঘদিনের বন্ধু। একসঙ্গে রাজশাহী কলেজে পড়াশুনা করেছে। হস্টেলে দুই বছর রুমমেট ছিল তারা। তারপর রঞ্জু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আর রাহাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। কিন্তু তাদের যোগাযোগ ছিল। সপ্তাহে অন্তত একটি চিঠি একজন আরেকজনকে লিখবেই। লম্বা ছুটিতে একবার রঞ্জু চলে যেত রাহাতের বাড়ি, পরেরবার রাহাত গিয়ে কয়েকদিন থেকে আসত রঞ্জুর বাড়িতে।

রাহাতের বাবা সেতাবগঞ্জ সুগারমিলে চাকরি করে। রঞ্জুর বাড়ি নড়াইল। একবার রঞ্জু ছুটিতে বাড়ি না এসে চলে গেল সেতাবগঞ্জ। মাকে এ বিষয়ে চিঠি লিখেছিল রঞ্জু। চার দিন রাহাতের বাসায় থেকে যখন নড়াইলে নিজের বাড়িতে গেল, পুরো বাড়ি যেন শোকে আচ্ছন্ন মৃত্যুপুরী। মা যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না রঞ্জু ফিরে এসেছে। ঘটনা হয়েছিল রঞ্জুর চিঠিটি তখনো পৌঁছায়নি। বাবা চিন্তিত হয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেছেন ছেলের খোঁজ করতে। একমাত্র পুত্রের কোনো খোঁজ না পেয়ে মা শয্যা নিয়েছেন।... রঞ্জুর সঙ্গে কত স্মৃতি রাহাতের!

কিছুদিন আগে রাহাত তার এক স্টাফকে দিয়ে ফোন করিয়েছিল। রঞ্জু ফোন ধরামাত্রই রাহাত তার হাত থেকে ফোনের রিসিভারটা নিয়ে বলল, দোস্ত, আমি রাহাত। প্লিজ একটা মিনিট তুই আমার কথা শোন। তারপর ভালো না লাগলে ফোন রেখে দিস।

রঞ্জু বলল, আমি একটা জরুরি মিটিংয়ে আছি। এখন কথা বলতে পারব না। পরে আমি তোকে ফোন করব।

কিন্তু রঞ্জু পরে আর ফোন করেনি। সে ইচ্ছা করেই রাহাতের সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছে না। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইহজীবনে আর রাহাতের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখবে না। সদ্য বিয়ে করা বউ আর তাকে রাহাত যেভাবে অপমান করেছে, সেটা কোনোদিন ভুলবে না রঞ্জু। ভোলার নয় সে ঘটনা। ক্ষমা করার তো প্রশ্নই ওঠে না। সে ক্ষমা করবে না। রঞ্জুর ধারণা রাহাত ইচ্ছা করেই কাজটা করেছে।

 

রঞ্জু মাস্টার্স করেছে রসায়নে। একটা ওষুধ কোম্পানিতে রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরি করছে। সামান্য বেতনের চাকরি। কিন্তু উপায় ছিল না। মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েই বাবা-মার অমতে বিয়ে করেছে নিলুফারকে। কাজেই ওইসময় চাকরিটা তার খুব প্রয়োজন ছিল। যদিও এই কাজ তার একেবারেই ভালো লাগে না। বিশেষ করে সিঙ্গারামার্কা একটা ব্যাগ নিয়ে ডাক্তারদের চেম্বারে চেম্বারে ঘুরে বেড়ানো এবং ওষুধ কোম্পানির দালালি করা। প্রথম কিছুদিন রঞ্জু ব্যাগ ছাড়াই বেরিয়েছে। একদিন মার্কেটিং ম্যানেজার আরিফ রহমান তাঁর রুমে ডেকে নিয়ে রঞ্জুকে প্রচণ্ড বকা দিলেন। রঞ্জু বলল এই ব্যাগ নিয়ে তার পক্ষে ডাক্তারদের কাছে ঘুরে বেড়ানো সম্ভব নয়।

রহমান সাহেব বললেন, ব্যাগ ছাড়া আপনি স্যাম্পল, গিফট আইটেম কি হাতে করে নিয়ে ঘুরছেন?

রাহাত বলল, আমার নিজের একটা হাত ব্যাগ আছে, সেটা নিয়ে যাই।

রহমান সাহেব বললেন, আপনাকে যদি চাকরি করতে হয় তাহলে কোম্পানির দেওয়া ব্যাগ নিয়েই কাজ করতে হবে। নিজের ইচ্ছামতো কাজ করার সুযোগ নাই। ভালো না লাগলে চাকরি ছেড়ে দেন।

এরপর থেকে আর কখনো সিঙ্গাড়ামার্কা ব্যাগ নিয়ে ঘুরতে রঞ্জুর সমস্যা হয়নি। কারণ চাকরিটা তার ভীষণ দরকার ছিল।

এদিকে রাহাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে দেশের বাইরে চলে যায় মাস্টার্স করতে। তিন বছর পর ফিরে এসে বড়ভাইয়ের ব্যবসায় যোগ দেয়। এক বছর পর নিজে আলাদাভাবে ব্যবসা শুরু করে। অল্পসময়ের মধ্যে ব্যবসায় ব্যাপক উন্নতি হয় তার। বনানীতে এখন তার নিজের ফ্ল্যাট। কিছুদিন আগে গাড়িও কিনেছে।

১৯৮৭ সাল। অক্টোবর মাসের শেষের দিকের এক সন্ধ্যা। রাহাত তার বড়ভাইকে নিয়ে এসেছে বিখ্যাত কার্ডিয়োলোজিস্ট ডা. বরেন চক্রবর্তীর চেম্বারে। আচমকা সেখানে রঞ্জুর সঙ্গে দেখা। রঞ্জু বিয়ে করেছে শুনে খুব খুশি হলো। ১০ নভেম্বর, মঙ্গলবার, দুপুরে রঞ্জু ও নিলুফারকে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে দাওয়াত করে বিদায় নেয় রাহাত। রঞ্জু সিঙ্গারামার্কা ব্যাগ নিয়ে রিসেপশনে বসে থাকে ডাক্তার সাহেব কখন ফ্রি হয়ে ডাকবেন সেই অপেক্ষায়। মনে মনে ভাবতে থাকে এত অল্প সময়ে রাহাত কীভাবে বাড়িগাড়ি কিনে ফেলল! রাহাতের অবস্থা দেখে তারও ব্যবসা করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু টাকা পাবে কোথায়? টাকা ছাড়া ব্যবসা হয় না। রাহাতরা পৈতৃকভাবেই ধনী। রাহাতের সঙ্গে তো তার তুলনা চলে না। রাহাতের বড়ভাই অনেক বড় ব্যবসায়ী। গাজীপুরে তার বিশাল গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। রাহাত তার ভাইয়ের বাসায় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছে। সে সময় রঞ্জু একবার দুদিনের জন্য ঢাকা বেড়াতে এসে রাহাতের ভাইয়ের বাড়িতে ছিল। গুলশানে আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি। সবগুলো রুমে এয়ারকন্ডিশনার লাগানো। সেই প্রথম রঞ্জুর এসির মধ্যে ঘুমানো। গরমের দিনেও তাকে কাঁথা গায়ে দিয়ে ঘুমাতে হয়েছে।

 

দুপুর একটার মধ্যে রঞ্জু তার নতুন বউকে নিয়ে মিরপুর রোডে ম্যাগডোনালস চাইনিজ রেস্টুরেন্টে পৌঁছে গেল। রিকশা থেকে নেমে রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাহাতের অপেক্ষায়। রঞ্জু ঢাকার কোনো চায়নিজ রেস্টুরেন্টে এর আগে আসেনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বন্ধুরা কয়েকজন মিলে চাঁদা তুলে একবার চাইনিজ খেতে গিয়েছিল। রেস্টুরেন্টের নাম নানকিং চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। ঢাকায় এসে চাকরি পাওয়ার পর হুট করে বিয়ে করে ফেলায় শুরু থেকেই টাকাপয়সার টানাটানি। বাড়িভাড়া দেওয়ার পর মাসের বিশ তারিখে রঞ্জুর হাতে কোনো টাকা থাকে না। কাজেই বউ নিয়ে বাইরে কোথাও খেতে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। রাহাতের দাওয়াতে সে খুব খুশি হয়েছে। নিলুফার অন্তত জানল যে তার বড়লোক দুই-একজন বন্ধু আছে, যারা শহরের নামিদামি রেস্টুরেন্টে দাওয়াত করে খাওয়াতে পারে। রঞ্জু নিলুফারকে বলল, একটা ভুল হয়ে গেছে, আমরা আধা ঘণ্টা আগে চলে এসেছি। রাহাত বলেছিল দুপুর দেড়টায় আসতে।

নিলুফার বলল, বন্ধুর দাওয়াত পেয়ে তুমি একেবারে খুশিতে গদগদ। দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে আমাকে ঠিকমতো শাড়িটাও পরতে দিলে না।

রাহাত বলল, খুশিটা তোমার জন্য। তোমাকে নিয়ে বাইরে খেতে আসার একটা সুযোগ পেয়েছি। কাজেই খুশি তো হবই।

নিলুফার বলল, এতটা সময় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব?

রাহাত স্ত্রীকে আশ্বস্ত করল, গল্প করতে করতে সময় কেটে যাবে।

নিলুফার আর কোনো কথা বলল না। তিন মাস হয়নি তাদের বিয়ে হয়েছে। সে কীভাবে বলবে যে সেজেগুজে একটা মেয়ে আধাঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে গল্প করতে পারে না। একটা শুকনা হাসি দিয়ে বলল, ঠিক আছে।

এরমধ্যে মিরপুর রোড দিয়ে একটার পর একটা মিছিল যাচ্ছে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এখন তুঙ্গে। আজ পল্টনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচি।

দেড়টা বাজার দশ মিনিট আগে থেকেই যে-কোনো গাড়ি এসে ম্যাগডোলসের সামনে দাঁড়ালেই রঞ্জু এগিয়ে গিয়ে দেখে রাহাত এসেছে কি না। এভাবে একটা পঞ্চাশ বেজে গেল। রঞ্জু ভাবছে দশ-বিশ মিনিট তো দেরি হতেই পারে। কিন্তু ঘড়িতে যখন দুটো বেজে গেল তখনো রাহাতের কোনো খবর নাই। গাড়ি, বেবিটেক্সি, এমনকি রিকশায় করেও মানুষ আসছে চাইনিজ খেতে। সবাই হাসতে হাসতে রেস্টুরেন্টে ঢুকে যাচ্ছে।

নিলুফার বলল, আর কতক্ষণ? আমরা ভেতরে গিয়ে বসতে পারি না?

রঞ্জু বলল, আরেকটু সময় অপেক্ষা করো। রাহাত এখনই চলে আসবে। ভেতরে কোথায় গিয়ে বসব কে জানে! পরে ও এসে খুঁজে পাবে না। এসব রেস্টুরেন্টে এত কম আলো থাকে যে ঠিকমতো কাউকে চেনাই যায় না।

রাহাতের কথার জবাব দিল না নিলুফার। সে প্রচণ্ড বিরক্ত। দুটো বিশ বাজে। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যায়! রঞ্জু এখন রেস্টুরেন্টে ঢোকার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার ধারণা রাহাত এখনই চলে আসবে। রেস্তোরাঁয় আসা লোকদের অনেকেই খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে তুলতে বেরিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার টুথপিক দিয়ে দাঁত খিলাল করতে করতে বের হচ্ছে। নিলুফার একটু দূরে দাঁড়ানো।

দরজা খুললেই ভেতর থেকে খাবারের ঘ্রাণ এসে নাকে লাগছে। ক্ষুধায় পেট চিনচিন করছে রঞ্জুর। খাবারের ঘ্রাণ ক্ষুধাটা উসকে দিচ্ছে। দূরে দাঁড়ানো নিলুফারের দিকে একপলক তাকিয়ে রঞ্জু দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। না-জানি নিলুফারের কতটা খিদে লেগেছে। বেচারার চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দারোয়ান বলল, স্যার কি কাউকে খুঁজছেন?

রঞ্জু বলল, আমার এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি।

দারোয়ান বলল, স্যার, ভেতরে গিয়ে বসেন।

রঞ্জু বলল, না ঠিক আছে। আমার বন্ধু এলে একসঙ্গে ভেতরে যাব।

দারোয়ান আর কোনো কথা বলল না। রঞ্জু নিলুফারের কাছে গিয়ে হাত কচলাতে কচলাতে বলল, স্যরি, তোমাকে অনেকক্ষণ দাড় করিয়ে রেখেছি। বুঝতে পারছি না রাহাতের কী হলো।

নিলুফার বিরক্তির সঙ্গে বলল, চলো আমরা বাসায় ফিরে যাই। তোমার বড়লোক বন্ধু হয়তো ভুলে গেছে অথবা তুমি কী শুনতে কী শুনেছ। প্রায় তিনটা বাজে। আমি আর এক মিনিটও অপেক্ষা করতে পারব না।

রঞ্জু বলল, আমার শোনায় কোনো ভুল হয়নি। কিছু একটা সমস্যা হয়তো হয়েছে। পাঁচটা মিনিট সময় দাও, আমি ভেতরে গিয়ে দেখি ওর অফিসে একটা ফোন করা যায় কি না।

রঞ্জু রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকল। আলো-আঁধারির মধ্যে কাটা চামচের টুং টাং শব্দ, মানুষের হাসি ঠাট্টা, বেয়ারাদের ব্যস্ততা এবং খাবারের সুঘ্রাণ আর নিলুফারের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রঞ্জুকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। ম্যানেজারের কাছে গিয়ে কাচুমাচু করে একটা ফোন করতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা এগিয়ে দিল। রঞ্জু পকেটে হাত দিয়ে ফোনবুকটা খুঁজে পেল না, তাড়াহুড়ো করে আসার সময় মনে হয় ফেলে এসেছে। রাহাতের ফোন নম্বরটা সেখানে লেখা আছে। মানিব্যগ বের করে দেখল কোনো ভিজিটিং কার্ড আছে কি না। কার্ড পাওয়া গেল না, তবে এই ফাঁকে মানিব্যাগে কত টাকা আছে গুনে দেখল। খুচরাসহ মোট তিনশ পঁচানব্বই টাকা। নিলুফারের সামনে মানিব্যাগ খুলে টাকা গুনতে সংকোচ হচ্ছিল তার। একবার ভাবছিল রাহাত আসেনি তো কী হয়েছে! তারা দুজন একটা টেবিলে বসে খেয়ে চলে যাবে। কিন্তু এই টাকায় তো সেটা সম্ভব না। বেরিয়ে এসে অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে নিলুফারের সামনে দাঁড়াল রঞ্জু।

নিলুফার বলল, বন্ধুকে পাওনি তো? আমি আর একমুহূর্ত এখানে থাকব না।

এরপর নিলুফার হনহন করে হেঁটে গিয়ে একটা রিকশা ঠিক করে উঠে পড়ল। এই প্রথম নিলুফারকে এতটা রাগতে দেখল রঞ্জু। তিনটা দশ মিনিটে চরম লজ্জা আর নবপরিণীতা স্ত্রীর কাছে অপমানের গ্লানি নিয়ে রিকশায় নিলুফারের পাশে উঠে বসল রঞ্জু। রিক্সাটা গ্রীন রোডের দিকে মোড় ঘোরার আগ পর্যন্ত সে রেস্টুরেন্টের দিকে তাকিয়ে থাকল দেখার জন্য, এরমধ্যে যদি রাহাত এসে পড়ে। কিন্তু রাহাত এল না। রিকশা এগিয়ে যাচ্ছে, সে মুখ ভোঁতা করে অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। গ্রীন রোড দিয়ে একের পর এক মিছিল যাচ্ছে পল্টনের দিকে। মিছিলের কারণে রিকশার গতি থেমে গেল। মিছিল থেকে স্লোগান আসছে ‘স্বৈরাচারের কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও,’ ‘নূর হোসেনের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’।

রঞ্জু রিকশা থামিয়ে মিছিলের এক কর্মীকে জিজ্ঞেস করল নূর হোসেন বিষয়ে। জানতে পারল সকাল ১১টার দিকে জিপিও’র কাছে নূর হোসেন নিহত হয়েছে পুলিশের গুলিতে। তার বুকে-পিঠে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।’

রঞ্জুদের রিকশা মিছিলের পেছনে পেছনে ধীর গতিতে এগোচ্ছে। নিলুফার রিকশার হুড ধরে বসে আছে। রঞ্জু স্লোগান শুনতে শুনতে সিদ্ধান্ত নিল, রাহাতের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখবে না সে।

 

মহাখালী নাবিস্কোর পাশে একটা পেট্রলপাম্পে তেল নেওয়ার জন্য গাড়ি দাঁড় করিয়েছে রাহাত। পাম্পের সঙ্গেই বাসস্ট্যান্ড। হঠাৎ রাহাতের চোখে পড়ল রঞ্জু সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। রাহাত গাড়ির গ্লাস নামিয়ে চিৎকার করে ডাকছে কিন্তু রঞ্জু তার ডাক শুনতে পাচ্ছে বলে মনে হয় না। এরমধ্যে একটা বাস এসে দাঁড়ালে রঞ্জু এগিয়ে গেল বাসে উঠবে বলে। রাহাত দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে খোঁড়াতে খোঁড়াতে দৌড়ে গিয়ে রঞ্জুকে পেছন থেকে জাপটে ধরল। ঘটনার আকস্মিকতায় রঞ্জু কিংকর্তব্যবিমূঢ হয়ে রাহাতের দিকে তাকিয়ে বলল, তুই এখানে?

রাহাত বলল, গাড়ির তেল নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছিলাম। তোকে দেখে নেমে এলাম। কেমন আছিস দোস্ত?

রঞ্জু বলল, ভালো আছি। আমাকে জরুরি কাজে একটা জায়গায় যেতে হবে। বাস ছেড়ে দিচ্ছে। আমি আসি...বলে রঞ্জু বাসের দিকে এগিয়ে যায়। বাস মাত্র চলা শুরু করেছে। রঞ্জুকে এগিয়ে যেতে দেখে বাসের হেলপার জোরে বডিতে থাপ্পড় মেরে বাস থামায়। রাহাত দ্রুত রঞ্জুর হাত টেনে ধরে বলল, আজ তুই কোথাও যেতে পারবি না। আমি অনেকবার তোকে ফোন করেছি। ইচ্ছা করে তুই ফোন ধরিস না। কেন ধরিস না সেটা আমি জানি। আমার কিছু কথা তোকে শুনতে হবে। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তো দিবি। তারপর তোর যা খুশি তাই করবি।

রঞ্জু বলল, অন্য আরেকদিন তোর সাথে দেখা করব। আমার কাজটা জরুরি। আমাকে যেতে দে।

রাহাত বন্ধুর কোনো কথাই আজ শুনতে রাজি না। জোর করে একরকম টেনে হিচড়ে রঞ্জুকে গাড়িতে নিয়ে উঠাল। তার পর রঞ্জুর প্রবল আপত্তির মুখে ড্রাইভারকে বলল সোজা তার অফিসে যেতে। রঞ্জু প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে গাড়িতে বসে আছে। মহাখালি বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু হলো ভয়াবহ ট্রাফিক জ্যাম। পিঁপড়ার মতো সারি সারি গাড়ি ধীর গতিতে এগোচ্ছে। রঞ্জু সেদিনের অপমানের কথা ভাবতে ভাবতে কখন রাহাতের অফিসে পৌঁছে গেছে বুঝতে পারেনি।

 

রাহাত তার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, আমি যে কথাগুলো বলার জন্য বারবার তোকে ফোন করছিলাম সেগুলো বলে তোকে ছেড়ে দেব। তুই যেখানে যাবি আমার ড্রাইভার তোকে নামিয়ে দিয়ে আসবে।

রঞ্জু বলল, আমাকে নামিয়ে দিতে হবে না। আমি নিজের মতো করে চলে যেতে পারব। কী বলবি তাড়াতাড়ি বল। আমার জরুরি আছে।

রাহাত বলা শুরু করল, তোর নিশ্চয় মনে আছে সেদিন ছিল ১০ জানুয়ারি। সারা দেশে এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন চলছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচি দিয়েছিল সেদিন। এরকম একটা দিনে আমাদের প্রোগ্রাম করাটাই ছিল ভুল সিদ্ধান্ত।

রঞ্জু বলল, তুইই প্রোগ্রামটা ঠিক করেছিলি। রাতে তোর কী সমস্যা ছিল বলে দুপুরে প্রোগ্রাম সেট করেছিল, যেকারণে আমাকে ছুটি নিতে হয়েছিল। যা হোক, সেদিনের বিষয় নিয়ে আমি কোনো কথা শুনতে চাই না।

রাহাত কিছুটা উচ্চস্বরে বলল, তোকে শুনতে হবে। সেদিন আমি মতিঝিলে একটা কাজ শেষ করে বেশ আগেভাগেই ম্যাগডোনালসের দিকে আসছিলাম। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে গাড়ি আটকা পড়ে যায় জ্যামে। বিভিন্ন দিক থেকে মিছিল আসছে। দুই/চার ঘণ্টায় জ্যাম ছাড়ার কোনো সম্ভাবনা নাই দেখে গাড়ি ছেড়ে হাঁটতে থাকি। সচিবালয় পার হয়ে একটা রিকশা নিয়ে ম্যাগডনালসে পৌঁছে যাব। একপর্যায়ে মিছিলের মধ্যে ঢুকে পড়ি আমি। ঠিক তার কয়েক মিনিটের মধ্যে জিপিওর সামনে জিরো পয়েন্টে মিছিলের উপর গুলি চালায় পুলিশ। নূর হোসেনসহ তিনজন শহিদ হয় পুলিশের গুলিতে। অসংখ্য মানুষ আহত হয়। আমার পায়েও একটা গুলি এসে লাগে। অল্পের জন্য আমি প্রাণে বেঁচে যাই।

রাহাত নিজের মতো করে কথা বলে যাচ্ছিল। রঞ্জুর তা শোনার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। রাহাতের পায়ে গুলি লেগেছে শুনে রঞ্জু চমকে উঠল, কী বললি! তোর পায়ে গুলি লেগেছে!

হুঁ।

কী বলছিস এসব! তারপর কী হলো?

রাহাত বলল, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অল্প সময়ের মধ্যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। কে বা কারা আমাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায় জানি না। গুলিটা হাঁটুর নিচে লেগে হাড্ডি ছিন্নভিন্ন করে বেরিয়ে যায়। ডাক্তাররা জানায় হাঁটুর নিচ থেকে পা কেটে ফেলতে হবে। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আমার বড়ভাই সব ব্যবস্থা করে এয়ার অ্যম্বুলেন্সে ব্যাংকক নিয়ে যায়।

কথাগুলো বলতে বলতে রাহাতের গলা ভারী হয়ে আসছিল। একটু থেমে রাহাত পানির গ্লাসে চুমুক দেয়। রঞ্জু লক্ষ করে রাহাতের চোখে অশ্রু টলমল করছে।

রঞ্জু বলল, এত কিছু ঘটে গেছে অথচ কেউ আমাকে কিছুই জানায়নি।

ধরা গলায় রাহাত বলল, কে জানাবে! কেউ তো কিছু জানে না। অল্পসময়ের মধ্যে এতসব ঘটে যায়।

রঞ্জু বলল, ব্যাংককে কি সার্জারি...।

নিজেকে একটু সামলে নিয়ে রাহাত বলল, সার্জারি করে পায়ের অর্ধেকটা কেটে ফেলতে হয়। তিন মাস পর নকল পা নিয়ে দেশে ফিরে আসি।

এরপর রঞ্জুকে কাছে ডেকে ডান পা থেকে প্যান্ট খানিকটা উপরে তুলে নকল পা দেখায় রাহাত। রঞ্জু এবার আর নিজেকে সংবরণ করতে পারে না। বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে। দুজনেরই কপোল ভিজে ওঠে অশ্রুতে।

রাহাত বলল, আমি জানি সেদিন তোর বউয়ের সামনে তুই অপমানিত হয়েছিস। সেকারণেই সত্যটা জানানোর জন্য বারবার তোকে ফোন করছিলাম। আর কখনো ফোন করে তোকে বিরক্ত করব না।

রঞ্জু কোনো কথা বলে না। গভীর আলিঙ্গনে বন্ধুকে আরও আপন করে নেয়।

 

ছয় মাস পরের ঘটনা। রাহাতের বনানীর বাড়িতে রঞ্জুদের দাওয়াত। বাড়ির কাছাকাছি আসার পর নিলুফার হাসতে হাসতে বলল, তোমার বন্ধু আজ আবার ভুলে যায়নি তো!

 

(গল্পটি লেখকের প্রকাশিতব্য ‘ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনার গল্প’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া)

 

//জেডএস//

x