কোনো পেইন্টিং কোনোদিন শেষ হয় না : মনিরুল ইসলাম

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : নিঝুম জান্নাতুন নাহার ০৮:০০ , মে ২৯ , ২০১৯

চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলামের জন্ম জামালপুরের ইসলামপুরে। তার পৈতৃক ভিটা চাঁদপুরে। বাবার চাকরিসূত্রে কিশোরগঞ্জে শৈশব পার করেছেন। তিনি ঢাকা চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে চারুকলার পাঠ শেষে ১৯৬৬ সালে এখানেই শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর ১৯৬৯ সালে স্পেন সরকারের বৃত্তি নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য সে দেশে গমন করেন। এরপর থেকে স্পেনেই স্থায়ীভাবে বাস করে শিল্পচর্চা করছেন। স্পেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার বহু একক ও যৌথ প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিনি ছাপচিত্রের জন্য বিখ্যাত। এচিংয়ে তিনি একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছেন, যা স্পেনে ‘মনিরোর বিদ্যালয়’ বলে পরিচিত। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননার পাশাপাশি তিনি দেশে একুশে পদক, শিল্পকলা একাডেমী পদকসহ বিভিন্ন পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। 

প্রশ্ন : আপনার শিল্প চর্চার কোনো ঘরানা আছে? বা প্রিয়?

উত্তর : আমার কোনো পছন্দনীয় ঘরানা নাই, আমি সব ধরনের শিল্পকর্ম পছন্দ করি। সেটা স্টিল লাইফ হতে পারে, পোর্ট্রেট হতে পারে। এখনকার সময়ের একজন শিল্পীর করা পোর্ট্রেট ছাড়া তার ভেতরের কিছু দেখা যায় না। ইন্টারনেটে আমি কিছু কাজ দেখি, এত সুন্দর ডিটেইলড, এত নিখুঁত কিন্তু সেই পোর্ট্রেটে কোনো প্রাণ নাই। তার কাজের দক্ষতা আছে কিন্তু সেই কাজে কোনো প্রাণ নাই।

 

প্রশ্ন : পারফেকশনের দিকটা কীভাবে দেখেন?

উত্তর : পারফেকশন বলে আসলে কিছু নাই। ন্যাচারেরও কোনো পারফেকশন নাই। সময়ের সাথে সাথে রঙ বদলে যায়। তাই শিল্পের ক্ষেত্রে বলা যায় পারফেকশন বলে কিছু নাই। কোনো পেইন্টিং কোনোদিন শেষ হয় না। আমাদের এই উপমহাদেশের শিল্পীদের কাছে রিয়েলিটি খুবই ক্রুয়েল। যতই উন্নত হোক, আমরা দিন শেষে গরীব দেশ।

এখন আমি যতই চেষ্টা করি, আমার কাজে পারফেকশন আনতে পারি না। একজন শিল্পীর আসলে কাজটা কী হওয়া উচিত? শিল্পীর চোখে শিল্প আসলে কী? এক কথায় যদি বলতে বলো, শিল্পকর্ম আমার এই মুহূর্তের চিন্তা। আমার যেই ইমোশন, আমার হতাশা, আমার হ্যাপিনেস যদি আমি একটা ক্যানভাসের সারফেসে ধরে রাখি; সেটা ইমেজই হোক কিংবা অবজেকটিভ বা নন-অবজেকটিভ, সেটা কালারে হোক বা পেন্সিলে হোক সেটা হবে মিডিয়া।

রবীন্দ্রনাথও তো ছবি এঁকেছেন, কিন্তু পেইন্টিং করেন নাই। একটা জায়গায় যেয়ে অনেকদিন বসে থাকছেন। এইসব লোক তো পেইন্টিং করতে পারবেন না। সে কারণেই উনি যা কিছু সামনে পেয়েছেন, তার লেখার টেবিলে, ওয়াটার কালার, কালি, কলম এইসব দিয়েই নিজের মতো করে ছবি এঁকেছেন। কোনো টেকনিক্যাল প্রায়োরিটি নাই সেখানে।

 

প্রশ্ন : একজন শিল্পীর ইনস্টিটিউট বা একাডেমিক শিক্ষা কতটা দরকার হয়?

উত্তর : স্কুলের ক্ষেত্রে দুইটা জিনিস কাজ করে। যেমন ধরো সাদা রঙ এখন সবাই ব্যবহার করে। আমাদের সময় সাদা রঙ ব্যবহার করা নিষেধ ছিল। তখন বুঝি নাই, এখন বুঝি। ধরো একটা স্টিল লাইফে বোতলের একটা অংশ সাদা রাখতে হবে। এইটা করতে কতটা সতর্ক হয়ে কাজ করতে হবে? এই শেখার জন্য স্কুলের ডিসিপ্লিনের ভেতর দিয়ে যাওয়া দরকার। তোমার শেখায় যা কিছুর অভাব আছে যেটা স্কুল তোমাকে সেটাই শেখাবে। তোমার মতোই চিন্তা, তোমার বয়সের কেউ করছে, কেউ সেটা কাজে প্রয়োগ করছে, তোমার সুযোগ আছে তার সাথে কথা বলার, তুলনা করার। এটাই স্কুল। শিক্ষার পদ্ধতিটা এভাবেই চলছে। যে সেটা ধারণ করে রাখতে পারবে মাথায় সেই দিন শেষে টিকে থাকবে। 

 

প্রশ্ন : শিল্পীর ব্যক্তিত্বের উপর আপনি সবসময় গুরুত্ব দেন। ব্যাপারটা কেমন?

উত্তর : একজন শিল্পীর মাঝে দুইটা জিনিস থাকা উচিত, একটা হল তার ব্যক্তিত্ব। যেমন পিকাসো, যে সকালে একটা বাচ্চার ছবি আঁকছে, বিকালে ষাঁড় লড়াইয়ের ছবি আঁকছে আর রাতে আঁকছে কিউবিজমের ছবি। কিন্তু সবগুলো কাজ দেখেই উপলদ্ধি করা সম্ভব এটা পিকাসোর কাজ। ওর সাইন দেয়ারও দরকার নাই।

এইযে এখন এত ভালো আর্টিস্ট আছে, তাদের একটা জিনিসেরই অভাব সেটা হল পার্সোনালিটি। তারা নিজের একটা সত্তা তৈরি করতে পারে নাই। যেটা তৈরি করা কঠিন।

আমরা যেই পৃথিবীতে এই মুহূর্তে অবস্থান করছি সেখানে থ্রি মিলিয়ন আর্টিস্ট আছে যারা সবাই গুড আর্ট সৃষ্টির কথা ভাবছে। কিন্তু আর্টিস্ট সৃষ্টির ক্ষেত্রে খেয়াল কর সেখানে একটা গ্যাপ আছে। ফভিজম বা কিউবিজম এগুলা সৃষ্টির মাঝে একটা গ্যাপ আছে।

 

প্রশ্ন : সমসাময়িকতা বা ইজম শিল্পীকে কীভাবে প্রভাবিত করে? শিল্পের গ্লোবালাইজড ব্যাপারটা কী?

উত্তর : আমরা যেমন আর্ট কলেজে যেয়েই সবাই বিমূর্ততার প্রাকটিস করা শুরু করি। কেউ কেউ মনে করি বিমূর্ততার চর্চা না করলে আমরা বোধহয় পিছিয়ে পড়ছি। অনেকে আছে মনে করে তাকে সমসাময়িক শিল্পধারা চর্চা করতে হবে। যেই ধারণাটা ভুল। একবিংশ শতাব্দীতে এখন সবই আর্ট ওয়ার্ক। অনেকে আছেন যে গয়্যার থেকে ভালো কাজ করে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ নাই, তাকে নতুন কিছু করতে হবে। এমন কিছু করে লাভ নাই যেটা সবাই ‘এটা তো করে গেছে’ এই চোখে দেখবে। দালি বা পল ক্লী যেমন একটা করে ইজম করে গেছে।

আর্টের একটা বেসিক কম্যুনিকেশন থাকা উচিত। আমি এখন কলসী কাঁখে বধূ স্পেনে বসে আঁকি তাহলে অবশ্যই সেটা কোনো অর্থ তৈরি করে না। আমরা আর্টিস্টরা ফিল্ম স্টার না, আমাদের নাম করার কোনো বিষয় নাই। আমাদের ফিল্ম হল আমাদের ক্যানভাস। যা করার ক্যানভাসে কর।

 

প্রশ্ন : আমাদের দেশের চারুকলার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত কী?

উত্তর : আর্ট ইজ আ মোস্ট ক্রুয়েল লাইফ। এটা শিখে তোমার জবটা কি? ৬ বছর পড়াশোনার পর জীবনের পরের গন্তব্যে তাকে সার্ভাইভিংটা জরুরী। সেটা জীবনে বেঁচে থাকার তাগিদে করতে হয়। সেটা হতে পারে আর্ট রিলেটেড কিংবা নন আর্ট রিলেটেড। জয়নুল আবেদিন স্যার বলছিলেন টেলিভিশনে চলে যেতে। তখন টেলিভিশনে অনেক টাকা স্যালারি দিত। ঐ সময়ে আমাদের বেতনের দ্বিগুন।

 

প্রশ্ন : আপনি স্পেনে গিয়ে শুরুতে কী করছিলেন?

উত্তর : আমি ’৬৯ সালে স্পেনে যাওয়ার পর ’৭০-৭১ সাল দুই বছর ফ্রেস্কো শিখি। কিন্তু আমি কখনই পরবর্তীকালে ফ্রেস্কো করি নাই। তখনই যা দুই একটা করছিলাম। প্রিন্ট মেকিংও ওখানে করেছিলাম যদিও শেখার শুরুটা এখানেই। দুই একটা ড্রাই পয়েন্ট করছি। 


প্রশ্ন
: পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকেন?

উত্তর : আমি খুব একটা ইন্টেলেকচুয়াল লোক না। বইটই পড়ি না। মেট্রিক পাস করেছি ৩ বারে। ’৬১ সালে এসে আমি এখানে ভর্তি হই। ’৬৬ সালে রেজাল্ট হওয়ার আগেই আমি মাস্টার হয়ে যাই।

 

প্রশ্ন : ক্যানভাসের বাইরে ইন্সটলেশন বা কোনো অনুষ্ঠানের কাজ করেছেন কখনো?

উত্তর : একবার বিচিত্রার শাহাদত চৌধুরী আমাকে নিয়ে গেলেন। বললেন, আইয়ুব খান আসবে চাঁদপুরে, গেট বানাইতে হবে। এটা ১৯৬৫-১৯৬৬ সালের ঘটনা। তখন প্রেসিডেন্ট আসবে সেটা একটা বিরাট ঘটনা। তখন আর্ট কলেজ থেকে সবাই মিলে যেয়ে আমরা গেট বানাই। তখন অবস্থা এমন না গেলে আর্ট কলেজ বন্ধ করে দেবে। আমি শিক্ষক হই ’৬৬ সালে।

 

প্রশ্ন : দেশে এলেন কবে? এসে কী করলেন?

উত্তর : ’৭৯ সালে দেশে আসার পরে আমি এচিংয়ের উপর প্রথম ওয়ার্কশপ করাই। মোট ২টা করাইছিলাম। আমি ওখানে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই ’৭১ সালে যুদ্ধের পরে। তখন দেশে এসে থিতু হওয়ার মতো উপায় ছিল না। আমরা আর্টিস্টরা একটু ইগো মেইনটেইন করি। নিজের সুবিধাটা একটু বেশি দেখি। সমাজসেবী হইলে তো আর্টিস্ট হওয়া যাবে না।

 

প্রশ্ন : আপনার মননভূমিতে স্পেন কেমন শিল্পচর্চার জন্য?

উত্তর : স্পেন চমৎকার একটা যায়গা। কোয়ালিটি লাইফ। আর্টিস্টদের জায়গা। মানুষগুলো ভীষণ অমায়িক। ৭০ বছর সেখানে মুসলিমদের উপনিবেশ ছিল এবং স্প্যানিশরা গর্বিতভাবে স্বীকার করে যে, তারা মুসলিম ব্লাড ধারণ করে। অন্য কোনো ইউরোপিয়ান তা স্বীকার করবে না। ওদের শিল্প চর্চায় এখনো মুসলিমদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কাজ করে। কারণ মুসলিমরা তাদের সর্বোচ্চ সৃষ্টিশীলতা প্রদর্শন করছে সেখানে। ওখানে থাকতে থাকতে আমার একটা সার্কেল তৈরি হয়। আমার সীমাবদ্ধতাগুলো কমে আসতে থাকে। আমি শুরুতে ওদের ভাষা জানতাম না। স্পেন যুগে যুগে শিল্পের ইতিহাসে অনেক শিল্পীকে সৃষ্টি করেছে। ওরা মানুষ হিসেবে খুব সহজ মনের। রশীদ চৌধুরীর পরে আমিই বাংলাদেশি ছিলাম ওখানে। ওরা আমাকে শিল্পী হিসেবে যথেষ্ট কদর করত। ধীরে ধীরে ওখানে আমি অনেক সম্মাননা পেতে শুরু করি। ওয়াটার কালারে কাজ করতে শুরু করি, বেঁচে থাকার জন্য। আমি এখানেও ওয়াটার কালারের ক্লাস নিয়েছি। নাজলী লায়লা, অলোকেশ ঘোষ এরা আমার স্টুডেন্ট। স্পেন এখন গরীব দেশ। যদিও ৫০ হাজার বাংলাদেশি থাকে, তবে শিল্পী কেউ নাই। শিল্পীরা গরীব দেশে যায় না।

এখন যারা ছবি আঁকছে তারা পাকিস্তান আমলের জটিলতা উপলদ্ধি করতে পারবে না। আমি কোনোদিন বিদেশে যাবো ভাবতে পারি নাই। এখন অনেকেই দেশের বাইরে যাচ্ছে, শিল্পী হিসেবে ঘুরতে কিংবা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে। আমাদের সময় সেটা সম্ভব ছিল না।

 

প্রশ্ন : শৈশবের কথা মনে পড়ে?

উত্তর : কতগুলো বিষয় আমি সব সময় এভোয়েড করি। তার মাঝে একটা হল পুরোনো কোনো কিছুতে ব্যাক করা। আমি আমার ছোটবেলার সেই নদী নরসুন্দর সেখানেও ফিরতে চাই না। আমরা ছোটবেলায় যেভাবে বড় হয়েছি তার কিছুই আর এখন নাই। নদী শুকায়ে মাঠ হয়ে গেছে। আমার স্মৃতিতে কিছু সুন্দর ছবি আছে, আমি সেটাই রাখতে চাই।

 

প্রশ্ন : শিল্পীদের বোহেমিয়ান ব্যাপারটা কেমন?

উত্তর : আর্ট থেকে এখন ইমোশন চলে গেছে। এখন ভাবনা থেকেই শিল্প সৃষ্টি করা সম্ভব। এখন আর আর্ট বোহেমিয়ানদের হাতে নাই। এটা এখন অনেকটাই ইন্টেলিজেন্স।

//জেডএস//

x