শেষ পর্ব আমি জাতীয়তাবাদ অতিক্রান্ত : সৈয়দ জামিল আহমেদ

শ্রুতিলিখন : মাসুদ আল-হাসান ০০:১০ , জুলাই ০৫ , ২০১৯

গত পর্বের পর থেকে

সুতরাং ওই জায়গা থেকে পোস্ট-ন্যাশনালিস্ট ডিসকোর্সে কী আছে সেটা আমাদের দেখার প্রয়োজন আছে। ক্রাইটেরিয়া হতে পারে ক্লাস নিয়ে, ক্রাইটেরিয়া হতে পারে জেন্ডার নিয়ে, ক্রাইটেরিয়া হতে পারে বয়স নিয়ে, যেকোন ব্যাপারেই ক্রাইটেরিয়া হতে পারে, শুধু ধর্ম ছাড়া, কারণ ধর্ম আমাদের অন্য স্থানে নিয়ে যায়, এর ব্যাপারটি ভিন্ন। এই ভিন্ন ক্রাইটেরিয়া, এই সীমারেখার বাইরে আমরা কেনো চিন্তা করতে পারি না! এই সীমারেখাগুলো খুব গণ্ডগোলের—মমতা ব্যানার্জী যেটা করে এবং আমাদের দেশে যা হয়, সবকিছু ওই একই জিনিস, শেষ পর্যন্ত আমরা-তোমরা। তবুও বিএসএফ গুলি করবেই।

আমাকে কি বলা হবে আমি জাতীয়তাবাদ বিরোধী? না, আমি জাতীয়তাবাদ বিরোধী না, আমি জাতীয়তাবাদ অতিক্রান্ত। কিন্তু সর্বশেষ প্রযোজনা জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা জাতির ধারণাকে শক্তিশালী করে কিনা সেই প্রশ্ন অনেক সময় আমি পেয়ে এসেছি। এই স্থানটি পরিস্কার করা দরকার।

জাতীয়তাবাদের যে ধারণা আমাদের সত্তর দশকে ছিলো, অনেকে বলেন বাহাত্তরের চেতনা ধারণ করেন ইত্যাদি— আবার উদাহরণ দিতে গেলে হিমশিম খান। আমার কাছে মনে হয়, বাহাত্তরের চেতনার একটি কমপ্লিট দলিল আমার কাছে মনে হয়, যেটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাংলাদেশের চেতনা সেগুলো পরিষ্কারভাবে সংবিধানের তিনটি অনুচ্ছেদ—৮, ৯, ১২-তে বলা হয়েছে। অন্য অনুচ্ছেদেও থাকতে পারে। আমার কাছে এই কয়টা আপাতত মনে পড়ছে, যে—ধর্ম কোনোভাবে পাবলিক স্পেসে আমার পরিচয় নির্মাণ করবে না। এখানে আবার একটি গণ্ডগোল আছে, আমাদের পাহাড়িদের কোনো জায়গা দেওয়া হয়নি, সেই ধারণায়। জাতীয়তাবাদের ধারণা নির্মাণ করা হয়েছে বাংলা ভাষা এবং বাঙালিদের সংস্কৃতির ভিত্তিতে—এটা গণ্ডগোলের, তবে অন্যদিকে আরেকটি ব্যাপার ঘটেছে—খুব পরিষ্কারভাবে ধর্মকে প্রত্যাখ্যান করে সেক্যুলার একটি চিন্তা নিয়ে যে জাতির বিকাশ ঘটেছিলো, সেই জাতি এখন ইফতারকে পার্টি বানিয়ে ফেলেছে। আমি দেখেছি আমাদের সময়ে, সত্তর কিংবা আশির দশকে কেউ ইফতার পার্টি দেয়নি। আপনারা দেখেন, কীভাবে ইসলাম অন্যভাবে আমাদের মধ্যে বিরাজ করছে—রাষ্ট্র আপনাকে ছুটি দিচ্ছে, আপনি একজন সরকারি কর্মচারী এবং রোজা রেখেছেন এজন্য ৯টা থেকে ৫টার বদলে আপনি সাড়ে ৩টায় ছুটি নিচ্ছেন। দেড় ঘণ্টা কম অফিস করছেন, সারা দেশ দেড় ঘণ্টা কম কাজ করছে, কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, রোজা তো আমিও থাকি—কোরআন হাদিসের কোন স্থানে আল্লাহ তায়ালা কিংবা নবীজি কি বলেছেন যে, যখন রোজা রাখো তখন কাজ কম করতে হবে? কোথাও বলা হয়নি, আমার কথাগুলো বুঝুন, অযথা তর্ক করবেন না। আমি কোরআন হাদিস পড়ে বলছি। বোখারি তিরমিজি কিংবা কোনো সহিহ হাদিসে আমি পাইনি যে, রোজা থাকলে কাজ কম করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সবখানেই বলা হচ্ছে আপনি সাধারণত যেমন পরিশ্রম করেন সেটাই করেন এবং এই স্বাভাবিক জীবনের মধ্যে একমাস সংযম করেন। সারাদিন কাজের পাশাপাশি নামাজ রোজা ঠিকমতো পালন করুন। আপনি যদি কম কাজ করেন, মানে ফাঁকি দেন তাহলে সংযম করছেন কোথায়? এগুলো হলো জাতীয়তাবাদের ডিসকোর্সের মধ্যে গণ্ডগোল, যেগুলোতে আমরা পড়ে গেছি। আমি কাউকে কষ্ট দেওয়া জন্য এগুলো বলছি না, আমার মতামতের জায়গা থেকে আমি প্রশ্ন উত্থাপন করছি। আপনার পাল্টা প্রশ্ন থাকলে আপনি করুন। আমি ভুল বললে বলুন আমার কোন স্থানে ভুল হয়েছে। তবে অবশ্যই যুক্তি দিয়ে।

এবার আসি জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে, হ্যাঁ সেখানে জাতীয়তাবাদকে দেখানো হয়েছে। আমি যদি জাতীয়তাবাদ অতিক্রান্ত হই তাহলে আমার সর্বশেষ প্রযোজনায় এটা কেনো? এর উত্তর হলো, জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা জাতীয়তাবাদি ডিসকোর্সকে প্রশ্ন করে। এবং বলে আমরা সেই ক্রাইটেরিয়া ভুলে গেছি যেটা আমাদেরকে বলে মানুষ—মহাল্লাবাসিদের আমরা ভুলে গেছি— আমরা মানুষকে ভুলে গেছি এবং মহল্লাবাসিরা কীভাবে বিভ্রান্ত হয় সেটা না চিন্তা করে, তারা বদিউর মওলানা কিংবা পাঠানের ডিসকোর্সের জায়গা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নাটকের মাধ্যমে আমি এই ব্যাপারগুলোকে বুঝতে চাচ্ছি, আমি প্রশ্ন করছি, আমি মনে করি যে নাটক এভাবে প্রশ্ন করে, আপনাকে বুঝতে চায় এবং তার জন্য প্রশ্ন উত্থাপন করে, একটি নির্দিষ্ট ধারণা কখনো সবসময় পোষণ করে রাখে না, যেমন বাংলাদেশ বলতে শুধু এই একটি নির্দিষ্ট ধারণাকে বোঝায় বা ‘জাতীয়’ শব্দটির অর্থ শুধু এই।

এবার প্রশ্ন হবে, এই যে আমি আমার কাজের এতো ব্যাখ্যা দিচ্ছি, আমার কাজ নিয়ে, জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে, তার মানে থিয়েটারে যা উপস্থাপিত হয়েছে সেটাতে কোনো ঘাটতি ছিলো কি, যেটার কারণে এতো প্রশ্ন আসছে? এবং আমাকে ব্যাখ্যা করে বোঝাতে হচ্ছে যে আমি এটা কোন জায়গা থেকে করেছি, কী দেখাতে চেষ্টা করেছি, কী বলতে চেয়েছি।

এর উত্তর হলো আমি শুধু আমার জায়গা থেকে সত্যটাকে নির্মাণ করে গিয়েছি। আমার কাছে যে প্রশ্নগুলো এসেছে সেখানে আমি বলিনি, এটা এই বা এটা এরকম, আমি বলেছি আমি কী মনে করি এবং আমার মতামত। শিল্পের অনেক রকম অর্থ এবং অনেক রকম ব্যাখ্যা থাকতে পারে। আমি কখনই বলছি না এটার ব্যাখ্যা দর্শক আরেক রকম দিতে পারবেন না, দর্শকের স্বাধীনতা অসীম। আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছে আমার মতামত নিয়ে, আমি সেটা বলছি। আমি মনে করি না যে আপনি কোনো শিল্পের পরম অর্থ উপলব্ধি করতে পারবেন যদি সৃজনকর্তার অর্থ বুঝতে না পারেন। ক্লাস ফাইভে আমাদের প্রশ্ন আসতো, ‘সোনার তরীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী বলতে চাহিয়াছেন?’ আমার ভয় লাগতো, আমি বুঝতাম না ব্যাপারটা। কিন্তু এখন কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দিতাম, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সোনার তরীতে কী বলতে চাহিয়াছেন সেটা রবীন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করুন, আমাকে কেনো জিজ্ঞেস করছেন’। আমি শুধুমাত্র বলতে পারি আমার কাছে কী মনে হয়েছে।

সুত্র : বটতলা’র আলাপ–৪ : সৈয়দ জামিল আহমেদ এর থিয়েটার ভাবনা, প্রেক্ষিত বাংলাদেশের থিয়েটার

ছবি : ব্রাত্য আমিন

আরো পড়ুন :

আমি যখন কাজ করতে বসি নিয়মের ধার ধারি না : সৈয়দ জামিল আহমেদ

আমি মনে করি চরম সত্য বলে কিছু নাই : সৈয়দ জামিল আহমেদ

জাতীয়তাবাদী নাট্য ভাবনা : সৈয়দ জামিল আহমেদ

//জেডএস//

x