ডাকাতরা রোকেয়া হলের ছাত্রীদের অনেক অত্যাচার করে : হাবুল মিয়া

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মো. আল-আমিন এবং বাশার খান ১২:০১ , জুলাই ০৯ , ২০১৯

হাবুল মিয়াহাবুল মিয়া 
বাবা : আক্কাস আলী প্রধান, গ্রাম : মোহাম্মদপুর (মিজান মার্কেট), পোস্টঅফিস : গৌরীপুর, থানা : দাউদকান্দি, জেলা : কুমিল্লা। ১৯৭১ সালে হাবুল মিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের নাইটগার্ড ছিলেন। ২৫ মার্চের কাল রাতে রোকেয়া হলের স্টাফ কোয়ার্টারে আক্রমণ করে কর্মচারী ও তাদের আত্মীয়স্বজনসহ ৪৫ জনকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।  ভয়াল সেই রাতেও হলের নৈশ্য প্রহরীর দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন তিনি হাবুল মিয়া। পাকিস্তান আর্মির মারধরের শিকার হলেও প্রভোস্টের ভূমিকায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি। প্রত্যক্ষ করেন ২৫, ২৬ ও ২৭ মার্চ হলে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চালানো বর্বর তাণ্ডবের লোমহর্ষক ঘটনাবলী। এরপর নভেম্বর মাসে রোকেয়া হলে মুক্তিবাহিনী প্রবেশ করানোর মিথ্যে অভিযোগে গ্রেপ্তার হন হাবুল মিয়া। পরবর্তীতে ছাড়া পান ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, পাকিস্তানি আর্মি আত্মসমর্পণের পর।

১৯৭১ সালে আপনার বয়স ছিল কত ?

১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ২৮ বছর। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে নাইটগার্ড হিসেবে যোগ দেই ১৯৬১ সালে।

 

রোকেয়া হলের কাছেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন আপনি কোথায় ছিলেন ? কি দেখলে/শুনলেন?

রোকেয়া হলের পাশেই তো রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যোন)। আমি রাতে ডিউটি করতাম। দিনের বেলায় ফ্রি থাকতাম। ৭ তারিখের ভাষণে আমি রেসকোর্স ময়দানে ছিলাম এবং বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনি। বঙ্গবন্ধু ভাষণে বলেন, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই স্বাধীনতার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ ও জগন্নাথ হল মাঠে ছাত্রী-ছাত্রী এবং কর্মচারীদের অনেকেই ৭ মার্চের ভাষণের পর ডামি রাইফেল দিয়ে যুদ্ধপ্রস্তুতি নেন। এ ব্যাপারে আপনার কোনো স্মৃতি আছে?

আমি নিজেই ট্রেনিং নিয়েছি। আমি এবং রোকেয়া হলের স্টাফ গিয়াসউদ্দিনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কর্মচারী ট্রেনিং নিয়েছে। আমাদের ট্রেনিং দিতেন বাকের কমান্ডার। উনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইন্স ক্যাফটোরিয়ায় চাকরি করতেন। তিনি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। কারণ বাকের ভাই পাকিস্তান আর্মিতে অনেক দিন চাকরি করেন। পরে আর্মির চাকরি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।

 

আপনার সঙ্গে আর কে কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন?

আমি, গিয়াসউদ্দিন, দুধ মিয়া ড্রাইভার, কুদ্দুস, হলের দারোয়ান নমী ও মনিরুদ্দিন—অনেকেই ছিলেন।

 

২৫ মার্চ বিকেল ও সন্ধ্যায় রোকেয়া হলের অবস্থা কেমন ছিল?

মার্চে আমি প্রভোস্ট বাংলোতে নাইট ডিউটি করতাম। ২৫ মার্চ রাতে খাবার-দাবার শেষে রাত ১০টায় ডিউটিতে যোগ দেই। রাত ১২টা সময় পাকিস্তানি আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে আক্রমণ করে। প্রথম হামলা চালায় ইকবাল হলে (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। রাত ১টার কিছুক্ষণ আগে আর্মির গাড়ি রোকেয়া হলের গেট ভেঙ্গে প্রবেশ করে। এরপর আর্মির একটা দল প্রভোস্ট বাংলোতে প্রবেশ করে। আমি দৌড়ে গিয়ে আখতার ইমাম ম্যাডামকে ডেকে ওঠাই। আর্মি এসে আমাদেরকে বারবার বলতে থাকে, লাইনে দাঁড়াও, লাইনে দাঁড়াও। আমাদের সকলকে লাইনে দাঁড় করায়। সেখানে আমি, হলের স্টাফ আলী আক্কাস, মনিরুদ্দিন দারোয়ান ও দুধ মিয়া ড্রাইভারসহ আমরা ৬/৭ জন ছিলাম। তখন আখতার ইমাম ম্যাডাম ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি আর্মিকে বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে অফিসার কে? আমি এই হলের প্রভোস্ট প্রফেসর আখতার ইমাম। আমি অফিসার, তাই অফিসারের সঙ্গে কথা বলবো।’ ওরা শুধু তর্ক করতে থাকে। এরপর আর্মি আমাদেরকে জিজ্ঞেস করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে যে ছাত্রীরা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়েছিল—তারা কোথায়? আমরা বলি, সব ছাত্রী যার যার বাসায় চলে গেছে। কিন্তু আর্মি আমাদের কথা বিশ্বাস করতে চায় না। আমাদের দিকে মেশিনগান তাক করে এবং বলে, তোমরা সবাই জয়বাংলার লোক। পরে আমরা প্রাণ বাঁচাতে কাকুতি-মিনতি করে বলি, আমাদেরকে মেরো না। আমরা মুসলিম লীগের লোক। কিন্তু আর্মি আমাদের কথা বিশ্বাস না করে গালি দিতে থাকে। তখন আখতাম ইমাম ম্যাডাম বলে, ‘ওদের গুলি করো না। ওরা জয়বাংলার লোক না, মুসলিম লীগের সমর্থক।’ একথা শুনে মেশিনগান তাক করা আর্মি কিছু শান্ত হয়। আমরা প্রাণে রক্ষা পাই। যাওয়ার সময় আর্মির কয়েকজন প্রভোস্টের রেডিওটা নিয়ে যায়।

 

হলের ছাত্রীরা কোথায় ছিল তখন ?

ইকবাল হলে আক্রমণের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা গার্ডরা হলে থাকা ৭ জন ছাত্রীকে দ্রুত বের করে নিয়ে এসেছিলাম। এরপর হাউস টিউটরের স্টোররুমে তাদেরকে রেখে লাইট নিভিয়ে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দেই। এভাবে তারা রক্ষা পায়।

 মুক্তিযুদ্ধকালীন রোকেয়া হলের প্রভোস্ট আখতার ইমাম

২৫ মার্চ দিনের বেলায় আপনি কোথায় ছিলেন ? রাতে আক্রমণ হতে পারেএরকম কোনো আভাস কি পেয়েছিলেন ?

পরিস্থিতি ভালো ছিল না। কিন্তু রাতেই আক্রমণ করা হবে—টের পাই নাই। কেউ কিছু বলেও নাই। সন্ধ্যার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক জায়গায় গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেট দেয় ছাত্র ও কর্মচারীরা। আমি কয়েক জায়গায় গাছ কেটে ফেলে রাখি। কিন্তু কোনো কাজ হয় নাই। আর্মি সব গাছ সরিয়ে আক্রমণ করে। ট্যাঙ্ক নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে।

 

আর্মির দলটি প্রভোস্ট বাংলো থেকে চলে যাওয়ার পর আপনারা কি করলেন? কোথায় গেলেন ?

এরপর আখতার ইমাম বলেন, তোমরা যেভাবে পারো যার যার জান বাঁচাও। আমি আমার নিজের জানই বাঁচাতে পারবো কিনা জানি না। এরপর আমরা হাউস টিউটরদের পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের খোপগুলোতে গিয়ে আশ্রয় নেই। সারা রাত ওখানেই কাটাই। পাঁচতলা থেকে জগন্নাথ হলের ঘটনা দেখা যাচ্ছিল। শেষ রাতে দেখি কি, জগন্নাথ হলের সব লাশ একজায়গায় স্তুপ করতেছে। সার্চ লাইটের আলোতে সব দেখা যাচ্ছিল। যাদেরকে দিয়ে লাশ টেনে এনে স্তুপ করেছিল—কিছুক্ষণ পর তাদেরকেও লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারে।

 

রোকেয়া হলের স্টাফ কোয়ার্টারে কী ঘটেছিলকোনো খবর পেয়েছিলেন?

রোকেয়া হলের স্টাফ কোয়ার্টারটি ছিল হল থেকে একটু দূরে। আলাদা গেট ছিল। বর্তমান শামসুন্নাহার হলের অফিস ভবনের স্থানে ছিল স্টাফ কোয়ার্টার। ওখান থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছিল। কিন্তু জানের ভয়ে কেউ যেতে পারি নাই। বৃহস্পতিবার সারা রাত পাঁচতলার খোপের মধ্যেই ছিলাম। পরদিন শুক্রবার সারা দিন গেল। এরপর সেদিনও ভয়ে কেউ খোপ থেকে বের হই নাই।

 

শনিবার সকালে কারফিউ শিথিল করা হয়।

শনিবার সকাল ৮টায় কারফিউ শিথিলের ঘোষণা আসে। প্রভোস্ট আখতার ইমাম তখন আমাদেরকে ডেকে বলেন, জান নিয়া যেখানে পারো আশ্রয় নাও। এরপর আমি স্টাফ কোয়ার্টারে যাই। গিয়ে দেখি, সব মেরে ফেলছে। আমার চাচা চুন্নু মিয়াকেও মেরে ফেলছে। তিনি হলের মালী ছিলেন। সব লাশ গর্ত করে ফেলে রাখছে।

 

কোয়ার্টারের বাসাগুলোর কী অবস্থা দেখলেন?

দরজা-জানালা সব ভাঙা। গুলিতে ছিন্নভিন্ন। প্রত্যেক রুম রক্তে কালো হয়ে গেছে। আলী আক্কাস চিৎকার দিয়া কয়, হাবুল রে, আমার সব মাইরা ফালাইছে। আলী আক্কাসের স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে মেরে ফেলছে। তার বাসায় একটা কাজের ছেলে ছিল—তাকেও মারছে।

 

আলী আক্কাস বেঁচে গেলেন কীভাবে?

উনি তো হলের মেইন গেটে ডিউটিতে ছিলেন। তাই বেঁচে গেছেন। কোয়ার্টারের বাসায় ছিল পরিবারের সবাই। সবাইকেই গুলি করে মারে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। হলের হেড দারোয়ান নমীসহ তার পরিবারেরও সবাইকে ফেলে ফেলছে। শুনেছি, নমী নাকি নিজেকে হিন্দু বলার সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে গুলি করে। হলের মালী আব্দুল খালেকের স্ত্রী ফুল বানুকে দেখলাম—বেঁচে আছে। সারা শরীরের রক্ত। রানে গুলি খাইছে ফুল বানু। ওর কোলে একটা ১ বছরের শিশু আছে। ফুল বানুরে টেনে কোলে তুলে নিয়ে হলের গেটে নিয়ে যাই। এরপর ছাত্রসহ কিছু লোক এসে এদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে ভর্তি করে। যারা নিহত হইছে, তাদেরকে শুক্রবার দিনের বেলায় মাটিচাপা দিছে বর্তমান শামসুন্নাহার হলের গেটে। ঐ রাতে খালি হলের স্টাফ তনু, তার বউরে লইয়া পেছন দিয়ে জানালা ভেঙ্গে পালাতে পারছিল। তাই তনু ও তার বউ বেঁচে গেছে। বাকিরা কেউ বাঁচতে পারে নাই।

 

আখতার ইমাম কী শনিবার স্টাফ কোয়ার্টারের অবস্থা দেখতে গিয়েছিলেন ?

না। উনি বাইর হইলেই তো গুলি করতো। জানের ভয়ে স্টাফ কোয়ার্টারে যান নাই।

 

এরপর কী করলেন?

হল থেকে বেরিয়ে গ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা হই। হেঁটে যাই ডেমরা পর্যন্ত। হাজার হাজার মানুষ হেঁটে গ্রামে যাচ্ছে। পথে অনেকে আমাদেরকে মুড়ি-গুড় ও পানি খাইয়েছে। পরে নৌকায় ও হেঁটে দাউদকান্দির মোহাম্মদপুরে গিয়ে পৌঁছি।

 

হলে আবার যোগ দিলেন কবে?

কিছু দিন পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন খবর পাঠায় যে, সবাই চাকরিতে যোগ দাও, নইলে চাকরি থাকবে না। আমি, আমার চাচা কুদ্দুস, গিয়াসউদ্দিন, মনিরুদ্দিন, আলী আক্কাস, দুধ মিয়া—বেঁচে থাকা সব স্টাফ হলের ডিউটিতে যোগ দেই।

 

আপনারা যোগ দেয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি কেমন দেখেছেন?

পরিস্থিতি ভালো ছিল না। মুক্তিযোদ্ধারা একবার কলাভবনে বোমা ফাটায়। সেই বোমা নিয়ে যেতে আমি সহযোগিতা করেছিলাম।

 

হলে তখন কোনো ছাত্রী ছিল?

না। ছাত্রী পরে আসে।

 

৯ নভেম্বর দিবাগত গভীর রাতে রোকেয়া হলে ডাকাতি হয়। অনেক ছাত্রী নির্যাতনের শিকার হয়। আপনি সেদিন কোথায় ছিলেন?

সেই রাতেও আমি হলে ডিউটিতে ছিলাম। গভীর রাতে হঠাৎ করেই কতগুলি লোক অস্ত্র ও দা নিয়ে হলে প্রবেশ করে। ডাকাতরা প্রভোস্ট বাংলোতেও আক্রমণ করে। সব কিছু লুট করে নিয়ে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে প্রভোস্ট আমাদের দোষারোপ করে বলে যে, তোমাদের সহযোগিতায় ডাকাতরা হলে ঢুকেছে। প্রভোস্ট আরও বলে যে, হলে তোমরা মুক্তিবাহিনী ঢুকাইছো। সকালে শাহবাগ থানার পুলিশ ডেকে এনে আমাদেরকে অ্যারেস্ট করিয়ে দেন। অথচ এই ডাকাতি করেছিল পুরান ঢাকার পাতলা খাল লেনের বিহারী গুন্ডারা। পরে কয়েকজন ডাকাত ধরাও পড়েছিল।

 

ঢাকায় পাকিস্তানি আর্মির কড়া পাহারা। বিশ্ববিদ্যালয়েও আর্মির শক্ত অবস্থান ছিল। এই অবস্থায় আর্মির ইন্ধন ছাড়া রোকেয়া হলে ডাকাত দলের প্রবেশকীভাবে সম্ভব?

এ ঘটনা আমাদেরকেও অবাক করেছিল। ধারণা করতে পারি, ডাকাতির ব্যাপারে পাকিস্তানি আর্মির যোগসাজশ থাকতে পারে।

 ১৯৭২ সালের ২০ এপ্রিল খনন করা হয় রোকেয়া হল বধূভূমি। উদ্ধার করা হয় শহিদদের মাথা খুলি, কঙ্কাল, হাতে থাকা ঘড়ি, হাতের চুড়ি ও চুল। ছবি  দৈনিক আজাদ, ২১ এপ্রিল ১৯৭২

ঐ রাতে হলে ছাত্রী ছিল কত জন?

ছাত্রী ছিল ২৫ জনেরও বেশি।

 

২৫ মার্চের ঘটনার পর হলে ছাত্রীরা আসতে এবং থাকতে সাহস করলো কীভাবেএ ব্যাপারে আপনি কিছু জানেন ?

ঐ যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আশ্বাস দিছে যে, কিছু হবে না। তোমরা আসো।

 

ডাকাতির পর মেয়েরা কী করলেন?

সব মেয়ে সকালেই চলে যায়। পুরো হল খালি। এরপর শুধু রিনা নামে একটি মেয়েই মাঝেমধ্যে আসতো।

 

ছাত্রীরা কি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন সে রাতে?

ডাকাতদের দ্বারা অনেক ছাত্রীই অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। সকালে মেয়েরা আমাদেরকে কাঁদতে কাঁদতে এ সব বলে। তবে লজ্জায় সব কথা ভেঙ্গে বলেনি।

 

রিনা আসতো ! কিন্তু কেন ?

সে পাকিস্তানি আর্মির সঙ্গেই আসতো প্রায়ই। শুনেছি— রিনাকে নাকি আর্মি ধর্ষণ করেছিল। তাকে ক্যান্টনমেন্টেও নিয়ে রেখেছিল। এরপর থেকে সে আর্মির সঙ্গে চলাফেরা করতে শুরু করে। মনে হয় রিনা জানের ভয়ে তাদের সঙ্গে চলাফেরা করেছে।

 

আপনাকে গ্রেপ্তার করার পর কোথায় নিয়ে গেল?

প্রথমে শাহবাগ থানায়। এরপর আমাকে ঢাকা জেলে পাঠায়। সেখানে গ্রেপ্তার ছাত্রদের সাথে আমাকে থাকতে দেয়।

 

থানায় কোনো টর্চার করা হয়েছিল?

প্রথমদিকে পুলিশ অনেক মারধর করেছিল আমাকে। মারধর করে বলতো, ঢাকার কোনো মুক্তির নাম জানি কিনা। কিন্তু কিছু বলি নাই। আমার জিজ্ঞেস করেছে—ডাকাতি কি মুক্তিবাহিনী করেছে ? আমি বলেছি, ওরা ডাকাত। কাউকে চিনি না।

 

ছাড়া পেলেন কবে?

১৬ ডিসেম্বর যখন দেশ স্বাধীন হয়—বিকেলে জেলের গেট কারা যেন খুলে দেয়। জেলের গেটে এসে দেখি সব বন্দি একসঙ্গে বের হচ্ছে। কার আগে কে বের হবে এই নিয়ে গেটে খুব ভীড়। আমি তো খুব লম্বা। লোকজনের কাধের উপর দিয়ে ধাক্কাধাক্কি করে বের হয়ে আসি।

 

জেল থেকে বেরিয়ে কোথায় গেলেন?

প্রথমেই হলে আসি। এসে দেখি সবাই মুক্তির আনন্দ করছে। হলের হাউস টিউটর সাহেরা খাতুন খুব ভালো লোক ছিলেন। উনি তার বাসায় নিয়ে আমাকে পেট ভরে ভাত খাওয়ান। এরপর আমাকে ১০০ টাকা দিয়ে বলেন, হাবুল, আপাতত বাড়ি চলে যা। পরে দেখা যাক। কিছুদিন পর বাংলাদেশ সরকার দেশ চালাতে শুরু করলেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খবর পাঠালো, তোমরা সবাই চাকরিতে যোগ দাও। আমরা এসে আবার হলের ডিউটিতে যোগ দিলাম। এ সময় আমার জেলে থাকাকালীন বকেয়া-বেতন দিয়ে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

 বর্তমান শামসুন্নাহার হলের গেটে রোকেয়া হলে শহিদ ৪৫ জনকে মাটিচাপা দেয়া হয়েছিল। বধ্যভূমির স্মৃতিচিহ্ন দেখাচ্ছেন হাবুল মিয়া

১৯৭২ সালে ২০ এপ্রিল রোকেয়া হলে শহিদদের বধ্যভূমি খনন করে মাথার খুলি ও কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। আপনি তখন কোথায় ছিলেন ?

বর্তমান যে শামসুন্নাহার হলের গেট, ওখানেই ছিল বধ্যভূমি। এই বধ্যভূমি খনন কাজে আমিও ছিলাম। হাড়, কঙ্কাল ও মাথার খুলিগুলো নিয়ে এসে সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে আবার কবর দেয়া হয়। সেদিন এই গর্ত থেকে হলের স্টাফ গিয়াসউদ্দিনের ভাই নাসিরউদ্দিনের হাতের ঘড়িটি পাওয়া যায়। ঘড়ি হাতের হাড়ের সঙ্গে ছিল। এ দৃশ্য দেখে সবাই কান্নাকাটি করেছিল তখন।

(সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ৫ এপ্রিল ২০১৯)

//জেডএস//

x