সম্পর্ক : আল মাহমুদ

সংকলক : রাহুল দাশগুপ্ত ১০:৩০ , জুলাই ১১ , ২০১৯

আলোকচিত্র : এস এম সাইফুল ইসলাম, ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত

জীবনানন্দ দাশ

আমি শিশিরের সাথে তাদের বাড়িতে গেলে সে জীবনানন্দ দাশের ‘মহাপৃথিবী’ বইটি আমাকে উপহার দিল। আমি বইটিকে হাতে নিয়ে রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে উলটেপালটে দেখতে এবং পড়তে লাগলাম। প্রথম কবিতাটিই আমাকে কামড়ে ধরল। অদ্ভুত এক বাচনভঙ্গি। বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছোবার আগেই বইয়ের সবগুলো কবিতা পড়া শেষ। এক নতুন উত্তেজানয় কাঁপছি, যেন এক অনাস্বাদিত লবণ চেখে জিভ আমার  লোভে সিক্ত হয়ে উঠেছে। ঘরে ফিরে বিছানায় গড়িয়ে পড়ে কবিতাগুলো আবার পড়ে নিলাম। তৃপ্তি মেটে না, আবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়া, আবার পড়া। আশ মিটতে চায় না। হঠাৎ মনে হল, এ ধরনের বক্তব্য আমারও আছে, আমিও লিখতে পারি। আনন্দে সারা শরীর কেঁপে উঠল। কাগজ কলম বের করে টেবিলে উবু হয়ে লিখতে শুরু করলাম। শুরু হল অন্য এক জীবন। অন্য এক অন্তহীন অভিজ্ঞতা।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

...সেই দুর্ভাগ্য ও দুঃখ-কষ্টের দিনগুলোতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাসায় মাঝেমধ্যে যেতাম। যদিও কবিতার ব্যাপারে আমার পক্ষপাত ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি বেশি। কিন্তু অকপটে স্বীকার করি, মুক্তিযুদ্ধের নয়টি মাস সুনীল ও তাঁর স্ত্রী আমার কাছে ছিলেন আশ্রয়দাতা আত্মীয়ের মতো।

...বাংলাদেশের কবিদের আগমনে শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্ভবত একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেখানে আমাকে ও দেবারতি মিত্রকে পাশাপাশি বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এ সময় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এসে সহসা আমাদের দু’জনের মধ্যে বসে পড়ল। অনেকটা গোঁয়ারের মতো। এতে আমি ও দেবারতি উভয়েই বিরক্তিবোধ করলেও সুনীল গাঙ্গুলির আচরণ ছিল অভদ্রতাপূর্ণ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ব্যাপারে এ দেশে একটি কথা চালু আছে যে, তিনি আকাশের মতো উদার। কেউ কেউ তাঁকে ‘সুনীল আকাশ’ বলে থাকেন। কিন্তু তাঁকে ভেতর থেকে যতটা গভীরভাবে জানতে পেরেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে, তাঁর চরিত্রে সংকীর্ণতা এবং সাম্প্রদায়িকতা বাসা বেঁধে আছে। হয়তো দেবারতি মিত্রের সাথে আমার সম্পর্কের পিছনে কোনো সত্যিকারের হৃদয়ানুভূতি ও কবিসুলভ সহানুভূতির কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সুনীল গাঙ্গুলির মতো লোকেরা সেটা ভালো চোখে দেখেননি। চাননি।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়

একবার শক্তি আমাদের নিয়ে ক্যানিংয়ের দিকে যাত্রা করেছিলেন। তিনি গাড়ির মধ্যেই মদ্যপান করছিলেন, তার হাতেই মদের বোতল ছিল। আমি অবস্থা দেখে বুঝতে পেরেছিলাম গন্তব্যে গিয়ে শক্তি মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। আমি সহসা তাঁর হাত থেকে বোতলটি কেড়ে নিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছিলাম। বোতলটি শূন্য হয়ে গিয়েছিল প্রায়। কিন্তু শক্তিবাবু এতটা ক্ষুণ্ন হয়েছিলেন যে, আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দেন এবং এর জের বহুদিন পর্যন্ত আমাকে ভুগতে হয়েছে। শক্তি আমার সম্বন্ধে ছিলেন ঈর্ষাকাতর। আমার কবিতা সম্বন্ধে সুযোগ পেলেই অযথার্থ মন্তব্য করতেন। অথচ এই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ই মুক্তিযুদ্ধের কিছুদিন আগে ‘পূর্ব বাংলার শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বলে যে সংকলন বের করেছিলেন, তাতে আমার কবিতাকে এতটাই প্রাধান্য দিয়েছিলেন যে, আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি শক্তির ব্যাপারে কোনো অবস্থাতেই অসহিষ্ণু হতে পারিনি, কারণ পশ্চিমবঙ্গের কবি বলতে আমি এখনও শক্তিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকি। তার ধারেকাছে কাউকে বিবেচনা করতে পারি না। শক্তি কবিতা লিখেছেন অনেক। কিন্তু ভালো কবিতার সংখ্যা তাঁর অপেক্ষাকৃত কম। ওই কমের মধ্যেই তার বৈদূর্যমণির মতো আলোকচ্ছটা ঠিকরে পড়ত।

ঢাকা শহর

পৃথিবীর কত শহর তো আমি ঘুরেফিরে বেড়ালাম। কিন্তু পঞ্চাশ দশকের ঢাকা মহানগরীর মোহ আমাকে কোথাও দীর্ঘস্থায়ী হতে কিংবা প্রবাস যাপন করতে লুব্ধ করেনি। আজও করে না। যে শহর জীবিকা দেয়, সে শহরের প্রতিটি গলি, ঘুপচিও আমার কাছে প্রিয় মনে হয়। ঢাকা ছাড়া কোথাও গিয়ে এক সপ্তাহ থাকতে আমি হাঁসফাঁস করে উঠি। মনে হয়, ঢাকাই আসলে আমার চিরপ্রিয়তমা মহানগরী। এখন এর মেট্রোপলিটন রূপ, যানজট,  বোমাবাজি, রাজনৈতিক খেয়োখেয়ি, সন্ত্রাস, কোনো কিছুই এ মহানগরীর গৌরবকে, নিরপেক্ষতাকে, অসাম্প্রদায়িকতাকে এবং ধ্যানমগ্নতাকে বিবর্ণ করতে পারেনি।

বুদ্ধদেব বসু

আমি যখন ‘কবিতা’ পত্রিকার জন্য বুদ্ধদেব বসুকে লেখা পাঠাই সেই সময়কার একটি ঘটনার কথা আমার এখনও মনে আছে। আমি হঠাৎ একদিন স্থির করি, কবিতা পাঠাব। কারণ বুদ্ধদেবই ছিলেন সেকালে সাহিত্যের সবচেয়ে নিরপেক্ষ সম্পাদক। আমি লেখা পাঠিয়ে কেন জানি নিশ্চিত ছিলাম যে, ছাপা না হলেও বুদ্ধদেবের একটা জবাব পাওয়া যাবে। আমি কবিতা পত্রিকা থেকে যে উত্তরের অপেক্ষা করছিলাম, অকস্মাৎ তা একদিন এসে হাজির হল।  আমি সিক্ত, কম্পিত হাতেই চিঠিটা নিলাম। প্রীতিভাজনেষু, তোমার একটি বা দুটি কবিতা ছাপা যাবে মনে হচ্ছে। বুদ্ধদেব বসু।

শামসুর রাহমান

...শামসুর রাহমানের সাথে আমি কখনও গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পারিনি। মনের ভেতর থেকে তা চাইওনি এবং এর জন্য আমার কোনো আক্ষেপও নেই। তা ছাড়া পরবর্তী জীবনে শামসুর রাহমানের সুচতুর বন্ধুদের সাথেও আমার কোনো ঘনিষ্ঠতা কাঙ্ক্ষিত ছিল না। আমি লক্ষ করেছি, তারা সব সময় চেষ্টা করেছেন শামসুর রাহমানের জীবনের আলোকে আলোকিত হয়ে নিজের সার্থকতা পেতে। শামসুর রাহমান তখন কলকাতার বড়ো-বড়ো সাহিত্য পত্রিকায় নিয়মিত লিখছেন। তিনি তখন বন্ধুদের ঈর্ষা জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলেন।

...এ সময় সবচেয়ে বড়ো ঘটনা হল আমার কাব্যের স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির স্বীকৃতি পাওয়া। আমাকে সবাই, বিশেষ করে আমার বন্ধু শহীদ কাদরী একজন গ্রাম্য লোক বলে প্রচার করতে উদ্যোগী হয়। তিনি ভেবেছিলেন আমি এতে খুব ক্ষিপ্ত হব। কিন্তু আমি সহজেই আমার গ্রাম্যতাকে মর্যাদা হিসেবে ঘোষণা করলাম। বললাম, আমি তো গ্রামের লোক। এতে তাঁর এবং তাঁর প্রকৃত গুরু শামসুর রাহমানের প্রতিক্রিয়া কী হয়েছিল আমি তা এখন ভুলে গেছি। আমার গ্রাম্যতাকেই আমার উদ্ভাবনার সূতিকা বলে মেনে নেওয়ায় তৎকালীন আরবান কবিকুলের আরোপিত নাগরিকতা ও মূর্খতাকে আমি পাশ কাটিয়ে যেতে পেরেছি। বাংলাদেশে কবিতার ইতিহাস হল ষড়যন্ত্র, হিংস্রতা ও প্রতিভাকে অস্বীকারের ইতিহাস। এতে প্রকৃত কত কবি যে কাব্য রচনা ত্যাগ করে অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন তার কে হিসেব রাখে! অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে আমি একজন কবির নাম উল্লেখ করব, যিনি সাহিত্যের নিয়ম পূর্ণ করেও পূর্ণতার সম্মান এই হিংস্র দেশ থেকে আদায় করতে পারলেন না। অথচ কথাশিল্পী হিসাবে তিনি যদি গণ্য হতে চাইতেন তাহলে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী খুঁজে পাই না। জানি না তিনি কবি হতে চেয়েছিলেন কেন? তিনি তো গদ্যেই মহাকাব্য রচনা করেছেন। তাঁর নাম, আলাউদ্দিন আল আজাদ।

জসীমউদ্দীন

তিনি বাংলাদেশকে বুঝতে পারতেন। যা কিছু বাংলার এবং বঙ্গদেশের অন্তরালে সম্পৃক্ত তাতেই জসীমউদ্দীনের অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। অসংখ্য গ্রাম্য গান তিনি সংগ্রহ করেছিলেন সে সময়ে। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে গাথা ও কাহিনি সংগ্রহ করে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচ জোগাতেন। আবহমানকাল যে জীবনের সাথে তিনি পরিচিত ছিলেন তার নিহিত সৌন্দর্যকে তিনি অবলোকন করেন। সব কিছুর মধ্যে দেখতে পেলেন এক প্রেমময় ও আধ্যাত্মিক গরিমা। তাঁর সমগ্র রচনায় তাঁর অভিজ্ঞতা ও আন্তরিকতা মাটির প্রদীপের মতন জ্বলে উঠেছে।

আমাকে আমার সাহিত্য শুরু করার প্রথম দিন থেকে বলা হয়ে এসেছে যে, আমি গ্রামবাংলাকে আমার রচনার বিষয়বস্তু করে আসলে জসীমউদ্দীনের লাইনে অগ্রসর হয়েছি। সন্দেহ নেই, জসীমউদ্দীন আমার অতি প্রিয় কবি। কিন্তু আমার সব সময় মনে হয়, আমি জসীমউদ্দীনের কবিতার বিষয়বস্তুকে অনুসরণ করিনি। জসীমউদ্দীনের বিষয়বস্তুর সাথে আমার কোনো পরিচয় নেই। এমনকি আমি জীবনানন্দ দাশের কাব্যে সামান্য অভিভূত হলেও আমি নিশ্চিত ভাবে জানতাম, যে বাংলাদেশের কথা বলতে চাই সেটা শুধু আমারই বাংলাদেশ। সে বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে গ্রাম ছাড়া আর কিছু নেই।

প্রথম কবিতা

কীভাবে যেন একটা ঘোরের মধ্যে কয়েক লাইন লিখে ফেললাম। দ্রুত হাতে শব্দ কেটে নতুন শব্দ যোগ করে খাড়া হয়ে গেল আমার কবিতার খসড়া। বারবার নিজের লেখা লাইনগুলো পড়তে লাগলাম। যতবার পড়ি ততবারই ব্যবহৃত শব্দের বদলে আরও অর্থবহ নতুন শব্দ নিজের অজান্তেই আমাকে প্ররোচনা দেয়। হঠাৎ মনে হল, শব্দের বুঝি অদ্ভুত গন্ধ আছে, যা কেবল কবিরাই টের পায়। আমার মধ্যেও সেই অলৌকিক ঘ্রাণশক্তি অনুভব করে আমি মেতে উঠলাম। মনে হল, আমি অসংখ্য শব্দের প্রকৃত এবং অন্তর্নিহিত অর্থ জানি। জানি কোন শব্দের ভিতর আমার ধারণানুযায়ী কতটা প্রচলিত অর্থ ধরানো যায়। আর কতটা অতিরিক্ত অর্থ শব্দের সাহিত্যিক বাঁধন থেকে উপচে পড়ে। সেই উপজে পড়া শব্দার্থই যে কবিতার আত্মা তা আমি আমার সেই কৈশোর ও যৌবনের বয়ঃসন্ধিতেই কীভাবে যেন ধরতে পেরেছিলাম। কিছুদিনের মধ্যে আমার কবিতার খাতায় চার-পাঁচটি কবিতা লেখা হয়ে গেল। আমার সমগ্র মনোযোগ এখন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা পড়া ও শহরের যেখানে যার কাছে কবিতার বই পাওয়া যায় সেটাই সংগ্রহ করার দিকে ঝুঁকে পড়ল।

কবিতা ও রাজনীতি

আমাদের দেশে কবির প্রধান বিপদ হল রাজনীতি, রাজনীতিবিদদের দ্বারা কবিকে দলীয় পক্ষপুটে টেনে আনা। রাষ্ট্র কবির পৃষ্ঠপোষকতা করুক এটা কবি মাত্রেরই আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু দলীয় রাজনীতি কবিকে বৃত্তবদ্ধ রাখুক, এটা কবিতার জন্য আদ্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। রাজনৈতিক বৃত্তে আবদ্ধ কবিমাত্রই আক্ষেপের রোগে আক্রান্ত থাকেন। এ রোগ যক্ষ্মার চেয়েও ক্ষয়কারী এবং কর্কটের চেয়ে উৎকট। এদেশের সর্বাধুনিক চিন্তার উদ্গাতা সব সময় কবিরাই হয়েছে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই যে, নির্বোধ রাজনীতি সব সময়ই কবিকে আশ্রয়দাতা ছদ্মবেশে নিরাশ্রয় এবং জনগণ ও সমাজ থেকে অনিকেত রাখতে চেয়েছে। কবিকে দিয়ে এমন কথা বলাতে চেয়েছে যা কোনো অবস্থাতেই কবির জিহ্বা থেকে নিঃসৃত হতে চায় না। অথচ শাসক ও রাষ্ট্রক্ষমতার অধিকারীরা নির্বোধ বলে তা সর্বপ্রথম যিনি উপলব্ধি করেন তিনি কবি। রাজার নৈকট্যপ্রাপ্ত রাজকর্মচারীরা নির্বুদ্ধিতার প্রশংসাকারী। এটাই তাদের জীবিকা। কবি চিরকালই  জীবিকা বিষয়ে উদাসীন।পুনর্মুদ্রণ

//জেডএস//

x