ভালো প্রযোজকের মৃত্যু হয়েছে : মীর শামছুল আলম বাবু

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : রহমান মতি ০৮:০০ , জুলাই ৩১ , ২০১৯

মীর শামছুল আলম বাবুবাংলাদেশের চলচ্চিত্রের তথ্যভাণ্ডার ও  সংগ্রহের অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব মীর শামছুল আলম বাবু। চলচ্চিত্র নিয়েও লিখেছেন সমান তালে। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে প্রকাশিত তার চলচ্চিত্র বিষয়ক দু’টি বই ‘কুশলী চিত্রগ্রাহক বেবী ইসলাম’ এবং ‘চিত্রসম্পাদক বশীর হোসেন’ বেশ আলোচিত।
তিনি কথা বলেছেন চলচ্চিত্রের একাল-সেকাল ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে।

প্রশ্ন : বাংলা চলচ্চিত্রের আগেই উর্দু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছেউর্দু থেকেই বাংলা চলচ্চিত্রের যাত্রা, তারপর স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শুরু। এ ইতিহাসের ভেতর দিয়ে আমরা কি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বাধীন ভাষা তৈরি করতে পেরেছি?

মী. শা. বা. : প্রথম কথাটার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। বাংলা চলচ্চিত্র গোড়া থেকেই ছিল। হীরালাল সেনের ছবি বা নবাব পরিবার যে ছবিগুলো নির্মাণ করেছে, যেমন ‘সুকুমারী’, ‘দ্য লাস্ট কিস’ এগুলো বাংলা ছবি। এরপরে যে ছবিগুলো নির্মিত হয়েছে ‘সালামাত’, ‘ইন আওয়ার মিডিস্ট’ এগুলোও কিন্তু বাংলা। আর যদি সবাক পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্রের কথা বলি তাহলে এই ভূখণ্ডের প্রথম ছবি হলো ‘মুখ ও মুখোশ’—এটাও বাংলা ভাষার ছবি। এর আগে কলকাতার প্রমথেশ বড়ুয়া, নীতিন বসু—তাদের ছবিও বাংলা ছবি—তখন পুরোটাই একটা দেশ। তার মানে বর্তমান বাংলাদেশের ছবির যাত্রা উর্দু থেকে নয়, বাংলা থেকেই শুরু হয়েছে। তবে এফডিসি থেকে প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ ছিল উর্দু—তিনটি বাংলা ও একটি উর্দু ছবি দিয়ে এফডিসির শুরু— তবে উর্দুটাই আগে সমাপ্ত হয়—ঐ ছবিটা শৈল্পিক ছিলো। উর্দু ছবির জোয়ারটা তখন ছিলো বাণিজ্যিক কারণে। উর্দু ছবি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান দু’খানেই চলত, বাজার বড়। বাংলা ‘রূপবান’ সেই জোয়ারটা ভেঙে দেয়। আমরা ঐ সময়ে বাংলা চলচ্চিত্র দিয়েই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের স্বকীয় ভাষা নির্মাণ করেছিলাম। 

 

প্রশ্ন : ভারতীয় চলচ্চিত্রের অনুকরণ কী প্রভাব ফেলেছে?

মী. শা. বা. : ভারতীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে তো আমাদের মিল থাকবেই। কাহিনীতে চিরায়ত প্রেম, ধনী-গরিব দ্বন্দ্ব এসব তো দুই দেশেই ঐতিহ্য। এসবের প্রভাব থাকবেই। এর বাইরেও আমরা কিছু ছবিতে বাংলাদেশি জীবন তুলে ধরতে পেরেছিলাম, যার ধারাবাহিকতা পরে থাকেনি।

 

প্রশ্ন : এফডিসি-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রে বিষয়ভিত্তিক বা বক্তব্যধর্মী ছবির একটা জোয়ার ছিল, যেমন ছুটির ঘণ্টা, ‘অশিক্ষিত, ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী একটা সময় পর এ ধরণের ছবির নির্মাণ কমে যায়। কমার কারণটা কী?

মী. শা. বা. : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আমি মোটা দাগে দুই ভাগ করব। এক—স্বাধীনতা পূর্ব, অন্যটি—স্বাধীনতা পরবর্তীকাল। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে আমাদের দেশে রাজনীতিতে বিশৃঙ্খলা আসে। বিশৃঙ্খলা গতিশীল হয় এবং সেটার প্রভাব আমাদের চলচ্চিত্রে পড়তে শুরু করে। মারপিটকে প্রাধান্য করে ছবি নির্মিত হয়। বক্তব্যধর্মী ছবিও তৈরি হত। এরপর আমাদের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্ব চলে আসে। এরশাদের সময় আমাদের এখানে মিক্সড কালচার চলে আসে। ঐ কালচারে ‘হুর-এ-আরব’, ‘আবেহায়াত’ জাতীয় ছবি নির্মিত হয়। আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত হতে থাকি। যার ফলে বক্তব্যধর্মীতা কমে যায়।  

 

প্রশ্ন : চলচ্চিত্রে শিষ্য বা অনুসারী তৈরি করতে পারাটা গুরুত্বপূর্ণ কিনা? একটা সময় পরে এই প্রসেসটা মিসিং হয়েছে কী?

মী. শা. বা : গুরুত্বপূর্ণ। একটা সময় জহির রায়হান, আমজাদ হোসেনরা তাদের ছাত্র রেখে গেছেন, যারা পরে চলচ্চিত্রে নাম করেছেন। চিত্রগ্রাহক, সম্পাদকের দিক থেকেও অনেকে অনুসারী রেখেছেন। কিন্তু তারেক মাসুদ, মোরশেদুল ইসলাম, আবু সাইয়ীদ তারা কিন্তু তাদের শিক্ষাটাকে সেভাবে ট্রান্সফার করতে পারেননি। খান আতা চেয়েছেন সি বি জামান তৈরি হোক। কাজী জহির, জহির রায়হান চেয়েছেন আমজাদ হোসেন তৈরি হোক। হুমায়ূন আহমেদ কি চেয়েছেন তার পরের প্রজন্ম তৈরি হোক? তারপর একটা সময়ে গ্যাপ তৈরি হয়েছে, তাই আর শিষ্য বা অনুসারী সেভাবে তৈরি হয়নি। 

 

প্রশ্ন : এক সময় চিত্রালী সবচেয়ে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা ছিল। তাদের সংগঠন ছিল চিপাসস নামে যেখানে দর্শক মতবিনিময় করতেন নির্মাতাদের সঙ্গেএখন এটা ডিজিটাল চাহিদায় ভার্চুয়াল হয়ে গেছে। তখনকার পদ্ধতিকে মাথায় রেখে যদি প্রশ্ন করি আজকের চলচ্চিত্র সমালোচনা কোন পর্যায়ে আছে?

মী. শা. বা.: সেই সময় ‘চিত্রালী’, ‘সিনেমা’, ‘পূর্বাণী’ পত্রিকাগুলো বের হত। তখন চলচ্চিত্র সবচেয়ে বিনোদনের বড় মাধ্যম ছিল তাই নিউজও বেশি হত। এখন ছবি নির্মাণ কম। বিকল্প মাধ্যম বেশি—ইন্টারনেটে বিনোদনের আরো বেশি সহজলভ্য মাধ্যমের ব্যাপ্তি বেড়ে যাওয়ায় চলচ্চিত্র নির্মাণের সম্ভাবনা কমে গেছে। চলচ্চিত্র কমে যাওয়াতে সমালোচনার চর্চাটাও কমে এসেছে। এখন এটা হতাশাজনক অবস্থায় আছে। 

 

প্রশ্ন : ডিজিটাল সময়ে রাজনৈতিক বক্তব্যধর্মী কিংবা যেকোনো সামাজিক সমস্যা তুলে ধরা ছবিতে সেন্সর বোর্ড ছুরি-কাঁচি চালায়। আগে ‘দাঙ্গা’, যন্ত্রণা’, ত্রাস’, ‘পাগলা বাবুল’, ‘বিক্ষোভ’, বিদ্রোহ চারিদিকে’র মতো ছবি তৈরি হত। এখন একেবারে সে স্বাধীনতা দেয়া হয় না। সেন্সর ব্যবস্থা কি তবে সংকুচিত হয়ে গেছে? 

মী. শা. বা. : আমরা আসলে এখন সেলফ-সেন্সরশিপের মধ্যে আছি। বলা হয় আমরা গণতান্ত্রিক অবস্থার মধ্যে আছি। কিন্তু পত্র-পত্রিকার লোকজন জানেন কোন খবরটা ছাপলে তাদের সমস্যা হবে না। সুতরাং গণতন্ত্রে সেভাবে মত প্রদানের স্বাধীনতা নেই। চলচ্চিত্রে কাজী হায়াতের ছবির কথা বললে—তখনকার সময়ে ছিল। তখন সামাজিক সমস্যার বিরুদ্ধে কিছু একটা করার চিন্তা ছিল। এখন এটা আর নাই। মানসিকভাবে হীনমন্য করে দেয়ার সমস্যা তো আছেই যার জন্য সেন্সর সেভাবে করা হয়। 

 

প্রশ্ন : বড়পর্দায় চলচ্চিত্রকে উপভোগ করার মাধ্যমে কী ধরনের তফাত থাকে অন্য মাধ্যমের সঙ্গে? যদি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলেন।

মী. শা. বা. : ইবনে মিজানের ‘তিতুমীর’ ছবিতে ৫০০০ লোক একত্রে অভিনয় করেছে। ঐ ৫০০০ লোককে যখন বড় পর্দায় দেখাবে, কেমন উপভোগ্য মনে হবে বোঝাই যায়। ‘ওরা এগারো জন’ ছবিতে অনেক মুক্তিযোদ্ধা একসঙ্গে শত্রুকে আক্রমণ করতে যায়—সেটার আলাদা ফিলিংস হবে বড়পর্দায় দেখার সময়। একজন দর্শক যখন সিনেমা হলে ছবি দেখতে যায়, ধীরে ধীরে সিনেমা হলের লাইট অফ হয়, অন্ধকার নেমে আসে। তার সমস্ত চিন্তা থেকে বেরিয়ে আড়াই ঘণ্টার জন্য সে উপভোগ্য একটা মানসিকতা থেকে ছবিটা দেখে। নাটক ড্রয়িংরুম কেন্দ্রিক বিনোদন, মঞ্চ-নাটক প্রতিটা দর্শকের আলাদা আলাদা পারসেপশন থেকে দেখা—প্রত্যেকটি শিল্পের সঙ্গে সিনেমার কম্পোজিশনগত একটা তফাৎ আছে। 

 

প্রশ্ন : আমাদের বাণিজ্যিক ছবিতে রিপিটেশন একটা বড় সমস্যা। জসিম কেনো এত বেশি লটারি জিতবে, কেনো তার নাম এত বেশি রাজু থাকবে। ইলিয়াস কাঞ্চন কেনো এত পারিবারিক ভুল বোঝার শিকার হবে। এগুলো নিয়ে অনেক ট্রল হয়। বাপ্পারাজ কেনোই বা এত ব্যর্থ প্রেমিক হবে। এসব কি আমাদের ঐতিহ্যগত সমস্যা নাকি আলাদাভাবে ভাবতে চাননি পরিচালকরা?

মী. শা. বা. : চলচ্চিত্র বানাতে অনেক টাকা লাগত। টাকাটা যারা দিত, মানে প্রযোজকরা, তারা লাভের চিন্তা করত। যেমন ‘অবুঝ মন’-এর প্রযোজক সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে ছবিটা বানিয়েছেন, এখন উনি মনে করবেন এটা আরো বেশি টাকার ব্যবসা করুক। ঠিক একইভাবে ইলিয়াস ভাই যখন ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ করলেন—ঐ ক্যাটাগরিতে আরো ছবি করানো হলো তাকে দিয়ে। আনোয়ার হোসেনের হার্ট অ্যাটাকের অভিনয় যখন জনপ্রিয় হতে থাকল ওটাও হতে থাকল পর পর। মূল কারণটা হচ্ছে প্রযোজক সেটা চায়। রুবেল মানেই মারপিটের সিনেমা, কারণটা হচ্ছে দর্শক তাকে সেভাবেই চায়। সোজা কথা দর্শক খাইত। আরেকটা হলো পরিচালক ও অভিনেতাদের দোষ। পরিচালকরা ইমেজটাকে ভাঙতে চেষ্টা করত না। রাজ্জাক রোমান্টিক নায়ক, তাকে ছবিতে মেরে ফেললে ছবি চলবে না, এই হচ্ছে ভয়। রাজ্জাক নিজেই শেষ পর্যন্ত মরে যাবার অভিনয় করলেন তারই পরিচালিত ‘অনন্ত প্রেম’ ছবিতে। ‘সীমানা পেরিয়ে’র দুইটা ভার্সন ছিল। যেখানে শেষে এমন একটি দৃশ্য ছিলো : দ্বীপ থেকে ফেরার পর বুলবুল আহমেদকে গুলি করে মারে জয়শ্রী’র জমিদার বাবা কাফে খান। প্রযোজক এ দৃশ্যটি বাদ দিতে বলেন, ‘হ্যাপি এন্ডিং’ না হলে ছবিটা চলবে না, এই ভয়ে। সো ব্যবসার ভয়টা এসবের বড় কারণ। 

 

প্রশ্ন : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস কি পাঠ্যপুস্তকে আসা উচিত না? 

মী. শা. বা. : অবশ্যই। একটা চলচ্চিত্র মনস্ক প্রজন্ম তৈরির জন্য অবশ্যই চলচ্চিত্রের ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে থাকা উচিত। আমরা আসলে সংরক্ষণ-প্রিয় জাতি না। আমরা অনেকে দাদা, নানাদের নাম জানি না। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী—এ ধরণের নামগুলোতে কিন্তু একসঙ্গে বাবা-ছেলের নাম জানা যায়—তারা সেভাবেই অভ্যস্ত। আমরা ‘নদী শিকস্তি’ জাতি, ভাঙন দেখা জাতি, তাই স্থায়ী কিছু করতে চাই না। নদী বসত-ভিটা ভেঙে নিয়েছে, আবার অন্য কোথাও ঘর তুলব, কিছুদিন পর আবার সেটাও ভাঙবে। এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা। চলচ্চিত্রের ইতিহাস পাঠ্য করা অবশ্যই দরকার। 

 

প্রশ্ন : এক সময় ‘নতুন মুখের সন্ধানে’-র মাধ্যমে চলচ্চিত্রে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শিল্পী তুলে আনা হত। এখন সেটা নাই। চলচ্চিত্র নির্মাণ কীভাবে বাড়বে, উন্নয়ন কীভাবে ঘটবে, এই জিনিসগুলোকে পাশ কাটিয়ে দেখা যাচ্ছে সাংগঠনিক ব্যস্ততা, নেতৃত্ব, নির্বাচন এসব নিয়ে ব্যস্ততা বেশি। এর প্রকৃত কারণ কি?

মী. শা. বা.: আগে যারা ছিলেন, যেমন খান আতা, জহির রায়হান, চাষী নজরুল ইসলাম, এ জে মিন্টু, সবাই কিন্তু চলচ্চিত্র কেন্দ্রিক চিন্তা করতেন। এখন এ কাজ করে জীবনধারণ করা সম্ভব না, যার ফলে একটা পরিবর্তন এসেছে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে পূর্ববর্তী যারা ছিল তারা আবার মোহটা ছাড়তে পারে না। পুরনো ধ্যান-ধারণার জন্য তারা নতুনদের ওয়েলকাম করতে পারে না। আগে মেধাবী শিল্পী খুঁজে বের করার মতো পরিচালক ছিল। যেমন, এহতেশাম কাউকে দেখলেই বুঝতেন তাকে দিয়ে কাজ করানো সম্ভব কিনা। তাই বিনিয়োগ করতে পারতেন। আমি নিজে দেখেছি, শাবনাজের দাঁতে সমস্যা ছিল—এহতেশাম স্যুটিং শুরুর আগেই ডাঃ অরূপ রতন চৌধুরীর কাছে নিয়ে গিয়ে ঠিক করে নিয়ে আসেন। এটাকে বলে গ্রুমিং। এখন যা হয়—তা এখন নোংরামি। যার জন্য কাজের কাজ না করার লোক বেশি, তারা নেতৃত্ব, আড্ডা এসব নিয়ে থাকে। 

 

প্রশ্ন : আমরা কি চলচ্চিত্রে প্রযোজকের মৃত্যুই বেশি ঘটিয়েছি?

মী. শা. বা. : অনেক প্রযোজক অতীতে টাকা ঢেলেছে, টাকা তুলেছে। এখন প্রযোজক আসে স্বার্থ উদ্ধার করতে। আগে শত শত প্রোডাকশন হাউজ ছিল কাকরাইলে, গুলিস্তানে—ষাট, সত্তর দশকে বেচারাম দেউড়ি, সদরঘাটে। সবার সঙ্গে সবার কথা হত। এখন বাজে চর্চা বেশি হয়। আমার মতে ভালো প্রযোজকের মৃত্যু তো হয়েছেই। 

 

প্রশ্ন : অশ্লীল সময়টা দেশের চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস, তবে নেতিবাচক দিকযাকে বাদ দেয়া যাবে না। তখন চলচ্চিত্রে সিনিয়র অনেকে ছিলেন তারা থাকতে চার/পাঁচ বছর একটা সময় চলচ্চিত্র থেকে মাইনাস হয়ে গেল, তাদের এ সাহসটা কীভাবে হলো?

মী. শা. বা. : কালচারে পরিবর্তন ছিল বড় কারণ। সামরিক আইনের সমস্যা ছিল। ভালগারিজমকে এক সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রোমোট করা হয়। অনেকে হয়তো জানেও না প্রথম অশ্লীলতা বা কাটপিস দেয়া হয় ‘জন্মদাতা’ ছবিতে। একজন গুণী গীতিকারের পরিচালনা ও এদেশের সবচেয়ে বড় অভিনেতার ঐ ছবিতেই সেসব হয়েছে ছবির প্রযোজকের কারণে। সে একজন প্রদর্শকও—তখন কেউ প্রযোজকের বিরুদ্ধে স্ট্যান্ড নেয়নি—তার সাহস আরো বাড়তে থাকে। পরে নব্বই দশকের শেষে এটা সংঘবদ্ধভাবে শুরু হয়। কাজ পাবার জন্য প্রযোজকদের পেছনে যারা ঘুরত তারাই অশ্লীলতা বেশি করত। প্রতিবাদ করার জন্য প্রথমদিকেই স্ট্যান্ড না নেয়াতে সাহসটা ঐ প্রযোজকরা পেয়েছিল—সেজন্য সিনেমায় ব্যাপক আকারে অশ্লীলতা ঢুকে পড়ে। 

 

প্রশ্ন : দেশের চলচ্চিত্রে কোন ঘটনাকে আপনার ব্যতিক্রমী বলে মনে হয়? 

মী. শা. বা. : আমি ফেসবুকে অনেকের প্রোফাইলে সালমান শাহ’র ছবি দেখেছি। যারা তার ছবি হলে গিয়ে দেখেছে—তাদের ছাড়াও যাদের জন্মও তখন হয়নি—তাদেরও প্রোফাইলেও দেখি। আসলে তখন একটা শূন্যতা ছিল সেটা সালমান পূরণ করতে পেরেছিলেন। সালমান হঠাৎ মারা যাবার পর তার বয়সটা ওখানেই থেমে গেছে। সে চিরসবুজ থেকে গেছে আর মানুষ যেহেতু তারুণ্য পছন্দ করে, তাই তাকে মনে রেখেছে। অভিনয়, ফ্যাশন, স্মার্টনেস তো ছিলই। আর এখন আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তার প্রচার এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের কাছে আসছে। এটাই ব্যতিক্রমী। 

 

প্রশ্ন : শাকিব খান বর্তমানে ইন্ডাস্ট্রির সুপারস্টার। তার পরে তারকা তৈরি করতে পারব কী আমরা? এ ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ কী?

মী. শা. বা. : শাকিব যতটা না মেধার জন্য তারকা—তার থেকে বেশি, আর কেউ নেই বলে তারকা। তার উঠে আসাটা আমার দেখা। তার আজকের পজিশনে আসার জন্য অবশ্যই পরিশ্রম ছিল। কিন্তু ব্যাপারটা হয়ে গেছে এককেন্দ্রিকতন্ত্র। বিষয়টা সুখকর না। ভারতে ৫০০’র মতো টিভি চ্যানেল আছে তারপরেও ছবি দেখার কালচার সেখানে আছে। আমাদের এখানে কালচারটা এখন আর সেভাবে নেই। তবে শাকিব খানের পরের শূন্যস্থান—প্রকৃতির নিয়মে হয়তো সেটা পূরণ হবে। হয়তো কেউ আসবে যাকে আমরা এখনো চিনি না। 

 

প্রশ্ন : একেকটা প্রজন্ম নিজেদের সময়কে সেরা মনে করে। আসলে আমাদের চলচ্চিত্রের সেরা সময় কোনটি?

মী. শা. বা. : আমি স্বাধীনতার আগের প্রায় শ’খানেক ছবি দেখেছি। সত্তরের, আশির, নব্বইয়ের, বর্তমানের ছবিও দেখেছি। সময়ের ছবি বললে বলব, সময়ের চাহিদায় নির্মিত হয়েছে। মানুষ যখন যেমন ছিল, ছবিও তেমন ছিল। তবে অধিকাংশ ভালো ছবি আশির দশকের আগে হয়েছে। ষাটের দশকে একটা কালচারাল আবহ ছিল, তারপরে লৌকিকতা আসল, আশির পরে বাণিজ্যিকতা বেশি আসল। স্বাধীনতার আগেরটা নান্দনিক, পরেরটা রোমান্টিক ও নান্দনিকের মাঝামাঝি, তারপর আশি-নব্বইয়ে বাণিজ্যিক—এরপরতো পুরোদমে শুরু হয় অবক্ষয়।

//জেডএস//

x