একজন নির্মাতা পরোক্ষভাবে নিজেকেই প্রকাশ করেন : আবু সাইয়ীদ

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : রহমান মতি ০৮:০০ , আগস্ট ০৮ , ২০১৯

আবু সাইয়ীদ ১৯৮৮ সালে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আবর্তন’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালনা শুরু করেন। সেটি সে বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। ১৯৯২ সালে নির্মাণ করেন দ্বিতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ধূসর যাত্রা’। সেটিও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
২০০০ সালে তিনি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সেলিম আল দীনের কাহিনী ও চিত্রনাট্য অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটির নাম ‘কিত্তনখোলা’। যার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া বিভিন্ন দেশে-বিদেশে তার চলচ্চিত্র প্রদর্শিত ও পুরস্কৃত হয়েছে।

প্রশ্ন : মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বাইরে ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম নির্মাণের যে চর্চা সেখানে আমাদের অর্জন কেমন?

উত্তর : বাংলাদেশে একজন ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম মেকারের সংগ্রাম বহুমাত্রিক। চলচ্চিত্রে যে সৃজনশীল চিন্তার চর্চা থাকতে হয় আমাদের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে তা একেবারেই অনুপস্থিত। এই ধরনের চলচ্চিত্রে প্রেমের গল্প ছাড়া অন্য কিছুই সেভাবে ভাবা হয় না। একটি প্রেমের গল্পকে উপস্থাপনের জন্য এমন সব উপকরণ থাকে, যা প্রায় সব চলচ্চিত্রে একই। আর সেজন্য কমার্শিয়াল চলচ্চিত্রকে ফর্মুলা চলচ্চিত্রও বলা হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এইসব ফর্মুলা চলচ্চিত্রকেই চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এটা এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব। সেকারণে এ ধরনের চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা ওঠা দর্শকের পক্ষে ইনডিপেনডেন্ট চলচ্চিত্রকে চলচ্চিত্র হিসেবে নেয়াটা কঠিন হয়ে যায়। আবার দেখুন: এক ধরনের দর্শক বা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট মানুষ তথাকথিত জীবনঘনিষ্ঠ বা বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্রকেই ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম মনে করে থাকেন। আমি যখন ১৯৮৮ সালে ‘আবর্তন’ শিরোনামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করি তখন অনেক দর্শকই এ চলচ্চিত্রটিকে গ্রহণ করেননি। কারণ তখন মনেই করা হত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু মানেই মুক্তিযুদ্ধ, খেটে খাওয়া মানুষ, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি। ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মের ধারণা নির্দিষ্ট আবর্তে ঘুরপাক খাওয়া কোনো কাজের কথা নয়। এটিও এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব। বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থাকতে হবে ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মে। আরো গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। সার্বিক বিবেচনায় যদি আপনি অর্জনের কথা বলেন, আমাদের অর্জন অনেক তা আমি বলব না। তবে ইনডিপেনডেন্ট চলচ্চিত্রের এক ধরনের চর্চা হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে আমরা একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারবো এটা বলা যায়। তবে কতটা সময়ে তা নির্ভর করবে আমরা নিজেদেরকে চলচ্চিত্র বোঝাপড়ার দিক থেকে কতটা প্রস্তুত করতে পারলাম।

 

প্রশ্ন : বাংলাদেশে একটা প্রজন্ম চলচ্চিত্র নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে কি না? গান নাচ থাকলেই তাকে চলচ্চিত্র বলা হবে এ ধারণার পেছনে কী কারণ?

উত্তর : যদি আপামর দর্শকের দৃষ্টিতে বলেন তাহলে একরকম। আবার যদি বলেন যারা চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত তাদের কাছে একরকম। আপনি সামগ্রিক না কি পার্টিকুলার দর্শকের কথা বলছেন সেটাই কথা। সবাই সব চলচ্চিত্র গ্রহণ করবে না। দর্শক চলচ্চিত্রকে কিভাবে দেখে সেটা আপনাকে চিন্তা করতে হবে। অনেকে হয়তো ইউরোপীয় ধারার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বা আমেরিকান কমার্শিয়াল সিনেমা, যেখানে একটা অ্যাপ্রোচ আছে সে সিনেমাগুলোতে প্রভাবিত হচ্ছে। ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মের পাইওনিয়ার ভারত বা বাংলাদেশ নয়। আমেরিকা থেকে আসা তাই সেখানকার দর্শক আপগ্রেড থেকেই যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের দর্শকের এক ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। এখানে ফিল্মের ধারণাতেও অনেক গ্যাপ আছে। তারপরেও কিছু দর্শক আছে যারা ফিল্মটাকে তাদের চিন্তার ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করেন।

 

প্রশ্ন : আপনার চলচ্চিত্র-যাত্রা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র থেকে শুরু। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন। বাংলাদেশে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পৃষ্ঠপোষকতা কম কেন?

উত্তর : শুধু স্বল্পদৈর্ঘ্যই নয়, বাংলাদেশে সমগ্র ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মের পৃষ্ঠপোষকতাই কম। এখানে যে নির্মাতারা টিকে আছেন বা টিকে ছিলেন তারা নিজস্ব প্রাণশক্তির জোরেই সেটা পেরেছেন। তবে আমি মনে করি স্বল্পদৈর্ঘ্যে স্ট্রাগলটা বেশি। নতুন এবং তরুণরা সাধারণত স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্মাণ করে থাকেন, তাদের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সত্যিই কঠিন। আশি-নব্বই দশকে শর্টফিল্মের একটা দর্শক ছিল। তখন শর্টফিল্মের প্রদর্শনী হত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিভিন্ন জেলা শহরে। কিন্তু এখনকার সময়ে তেমনটা হচ্ছে না।

 

প্রশ্ন : মহাভারতের গল্পে আপনি ‘রূপান্তর’নির্মাণ করেছেন। দ্রোণাচার্য একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে নিচ্ছে। তারপর মধ্যমা দিয়ে তীর চালনা করার নিয়ম শুরু হচ্ছে। সেখানে চলচ্চিত্রটির গল্পেই পরিচালক তার চলচ্চিত্রের নাম ‘গুরুদক্ষিণা’থেকে পরিবর্তন করে ‘রূপান্তর’রেখেছেন। তো সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আপনার এই যে নিজের রূপান্তরের ভাবনা, এক ভাবনা থেকে আরেক ভাবনায় চলে যাওয়া, এটা একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালকের জন্য কতটা জরুরি এবং আজকের পরিচালকদের মধ্যে এটা দেখতে পান কি না?

উত্তর : খুবই জরুরি। শুধু নির্মাতার জন্য নয়, একজন মানুষের জন্যও জরুরি। আমি যে রিয়েলিটির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সেটা যদি আমাকে একসময় অনুভব করায় যে আমি ভুল পথে হাঁটছি তাহলে অবশ্যই আমাকে নতুন পথ খুঁজে নিতে হবে। এই নতুন পথই তখন হবে আমার চিন্তা ও কর্মের পথ। এইভাবে প্রতিটি মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়। এভাবেই নতুন ভাবনার উদ্ভব ঘটে। বর্তমানে ইনডিপেনডেন্ট চলচ্চিত্রের পরিচালকেরা এক্ষেত্রে কোন পর্যায়ে আছে সেটা আমি বলতে পারব না, তবে নিশ্চয়ই তারা সাহসী। তারা ভাবতে পারেন এবং নিজের পথ খুঁজে নিতে পারেন বলে আমার ধারণা।

 

প্রশ্ন : আপনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে আপনার চলচ্চিত্রে বিভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন। তাদেরকে নিয়ে  চলচ্চিত্র কম নির্মাণ হওয়ার কারণ কী?

উত্তর : আসলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করতে গেলে অনেক জানাশোনার বিষয় আছে। তাছাড়া এ বিষয়ে নির্মাতার আগ্রহ থাকতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের কাজে বেশকিছু জটিলতা আছে এবং এক ধরণের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়। তবে সবকিছুর উপরে হচ্ছে নির্মাতার আগ্রহ। একজন নির্মাতা তার আগ্রহের উপর ভিত্তি করেই কাজ করবেন এটাই স্বাভাবিক। 

 

প্রশ্ন : নাট্যকার সেলিম আল দীনের ‘কিত্তনখোলা’নাটক থেকে আপনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। নাটক থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের যে প্রক্রিয়া এখানে দৃশ্য তৈরি করা থাকে, সংলাপ দেয়া থাকে। সবকিছু একটা সাজানো অবস্থায় থাকে। নাটকে স্ক্রিপ্টের কাজ অনেকটাই নাট্যকার দিয়ে দেন। নাটক থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ তুলনামূলক সহজ?

উত্তর : একদিকে যেমন সহজ আবার অন্যদিকে জটিলও। একটি নাটকের পাণ্ডুলিপিতে অনেক কিছু পাচ্ছি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো অনেককিছুকে বাদ দিতে হয় এবং অনেক কিছুকে যুক্ত করতে হয়। শুধু নাটক নয় কোনো উপন্যাস থেকে চিত্রনাট্য লেখার সময় সংযোজন-বিয়োজনটা ঠিকমতো হওয়া চাই। কী কী বাদ দিতে হবে আর কী কী রাখতে হবে এই সিদ্ধান্ত নেয়াটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি বলেন যে, তিনি সাহিত্যকর্মটি হুবহু অনুসরণ করে চলচ্চিত্র বানিয়েছেন তাহলে বুঝতে হবে তার সাহিত্য ও চলচ্চিত্র বোঝাপড়ার মধ্যে কোনো সমস্যা আছে। আমার ‘কিত্তনখোলা’চলচ্চিত্রে অনেক চরিত্র বাদ দেয়া হয়েছে আবার অনেক চরিত্রের পরিধি ছোট করে আনা হয়েছে। আবার নাটকের শেষ দৃশ্য ও চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্য একেবারেই আলাদা। হুমায়ূন আহমেদের ‘জনম জনম’ উপন্যাস নিয়ে ‘নিরন্তর’ নামে যে চলচ্চিত্রটি আমি নির্মাণ করেছি সেখানে তিনি কিন্তু তিথির প্যারালাল আরো কয়েকটি চরিত্র নির্মাণ করেছিলেন কিন্তু আমি শুধুমাত্র তিথিকে কেন্দ্র করেই চলচ্চিত্রটি বানিয়েছি। এই যে বাদ দেয়া বা সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা, সেটাও খুব দরকারি। হুমায়ূন আহমেদের অনেক লোভনীয় সংলাপ বাদ দিয়ে আমি নতুন করে সংলাপ লিখেছি। নাসরীন জাহানের উপন্যাস থেকে ‘শঙ্খনাদ’ নির্মাণ করেছি সেখানেও তাই ঘটেছে। চন্দ্রানীর মতো চরিত্রকে বাদ দেয়া হয়েছে। এ চলচ্চিত্রে শুধু একটি দৃশ্যে একটি বেদেনী চরিত্র আছে। সংযোজন-বিয়োজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে যেতে গেলে মোডিফাই করাটা জরুরি।

 

প্রশ্ন : আপনার চলচ্চিত্রে হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি যেমন যাত্রাপালা, বাঁশি, গ্রামীণ খেলাধুলা, নদী এসবের চিত্রায়ণ আছে। একজন পরিচালকের মধ্যে তার সংস্কৃতির বোধ থাকা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ? এটা কি চলচ্চিত্র নির্মাণে সহায়তা করে?

উত্তর : সাংস্কৃতিক বোধ বা সংস্কৃতির সাথে যোগাযোগ অবশ্যই একজন পরিচালকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র বিষয়বস্তু নয়, আঙ্গিক গঠনেও এ সকল উপকরণ সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা যে ভুখণ্ডের প্রতিনধিত্ব করেন সেই ভূখণ্ডের লোকসংস্কৃতির সাথে তার যোগাযোগ আছে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক সময় অনেকের ক্ষেত্রে এমনটা নাও ঘটতে পারে। যে নির্মাতা বরাবরই শহরে বসবাস করেন তাহলে তার সাথে এই সংস্কৃতির যোগাযোগ নাও থাকতে পারে। তাই এটিকে একজন নির্মাতার জন্য অনিবার্য ধরে নেবার কোনো কারণ নেই। আমাদের আবহমান সংস্কৃতি আমাদের চলচ্চিত্রে জায়গা নিক সেই চেষ্টা আমাদের করা উচিত। কিন্তু চলচ্চিত্রে এর স্থূল ও আরোপিত উপস্থাপনকে নিরুৎসাহিত করাও উচিত।

 

প্রশ্ন : ‘বাঁশি’চলচ্চিত্রে কবি জীবনানন্দ দাশের প্রসঙ্গ আছে‘বাংলাদেশের রূপবৈচিত্র্য ভবিষ্যতে থাকবে কি না’ এমন কথা একটি চরিত্র বলছে সেখানে এবং টলস্টয়ের ‘little girl wiser than menগল্পের প্রসঙ্গ আছে, ব্যাখ্যা করা হয়েছে কিভাবে সংঘাত থেকে সম্প্রীতিতে আসা যায়। এই যে বক্তব্যধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি, এ ধরনের কাজ এখন কম হচ্ছ কেন?

উত্তর :  অন্যদের কথা বলাটা আমার জন্য উচিত নয়। তবে একটি চলচ্চিত্রে বক্তব্য থাকতেই হবে আমি তা মনে করি না। বরং বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্রের নামে আমাদের দেশে যা বলা হয় তাতে আমার কোনো আগ্রহ নেই। বিষয়বস্তুই নির্ধারণ করবে চলচ্চিত্রের শেষটা কি হবে। আমাদের দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ‘বাঁশি’ চলচ্চিত্রে এক ধরণের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে তবে অবশ্যই তা উচ্চকিত নয়। ‘শঙ্খনাদ’ অনেকটা রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হওয়ার পরেও ঐ অর্থে কোনো বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি। প্রতিটি চলচ্চিত্রেই কিছু একটা বলার বা তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে। মূল ব্যাপারটা হচ্ছে, একজন দর্শক চলচ্চিত্রটি থেকে কিভাবে বক্তব্যটি গ্রহণ করলেন।

 

প্রশ্ন : ‘নিরন্তর’চলচ্চিত্রে শাবনূরকে নেয়ার কী কারণ ছিল? তার অভিনয়ে আপনি সন্তুষ্ট ছিলেন কি না?

উত্তর : আমি চেয়েছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেতা, অভিনেত্রী বলে যারা পরিচিত তারাও আমার চলচ্চিত্রে কাজ করুন। ‘কিত্তনখোলা’-তে যেমন আমি মৌসুমীকে কাস্ট করেছিলাম কিন্তু পরে তিনি লোকেশনে গিয়েও কাউকে না বলে চলে এসেছেন। একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণভাবে তাকে কয়েকদিন থাকতে হবে হয়তো সেজন্য তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছিলেন। এরপর আমি শাবনূর, ইলিয়াস কাঞ্চন ও ফেরদৌসের সাথে কাজ করি। শাবনূর বেশ আন্তরিকতার সাথে কাজটি করেছেন। দেশে-বিদেশের সকল দর্শক তার কাজে সন্তুষ্ট। 

 

প্রশ্ন : ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ বা গণ-অর্থায়ন থেকে এখন চলচ্চিত্র হচ্ছে। তানভীর মোকাম্মেল একটি নির্মাণ করেছেন। খন্দকার সুমন নামে তরুণ পরিচালক ‘সাঁতাও’নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। আপনি করেছেন তাদের আগে। প্রযোজক সংকটের এই কালে গণ-অর্থায়ন কতটুকু সাহায্য করে?

উত্তর : আমি ‘একজন কবির মৃত্যু’ নামে গণ-অর্থায়নে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি, ‘সংযোগ’ চলচ্চিত্রের অনেকটা শ্যুটিং সম্পন্ন করেছি। আমি যখন গণ-অর্থায়নে চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করি তখন এক ধরণের ভয় কাজ করেছে, শেষ পর্যন্ত সফল হবো তো! শুধু আমার না, অনেকেরই সাফল্য নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু এখন সংশয় অনেকটাই কেটে গেছে। বাংলাদেশে বেশকিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র গণ-অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে আমার ‘একজন কবির মৃত্যু’ দেখার পরে সেখানকার পরিচালক উজ্জ্বল বসু গণ-অর্থায়নে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। গণ-অর্থায়নে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুধু অর্থের যোগান দেয় না, অর্থকে স্বাধীনও করে। এই প্রক্রিয়ায় একজন চলচ্চিত্র পরিচালক অনেক স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ অনেক বেশি পান। গণ-অর্থায়নে না হলে ‘একজন কবির মৃত্যু’ সাধারণ একজন প্রযোজকের টাকায় নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না। এখনো গণ-অর্থায়নে চলচ্চিত্রের কাজ বিস্তর আকারে শুরু হয়নি, তবে আমি আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে হবে এবং আমাদের চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

 

প্রশ্ন : আপনার সম্প্রতি নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ড্রেসিং টেবিল’দেখে অনেক দর্শক হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে আপনার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর সাথে এটার দূরত্ব অনেক। আপনি এ সমালোচনাকে কিভাবে দেখবেন।

উত্তর : আমি জনপ্রিয় কোনো চলচ্চিত্র পরিচালক নই। ধরে নেয়া যায় পাঁচশো থেকে এক হাজার দর্শক আছে যারা আমার সব চলচ্চিত্র দেখেছেন এবং আমার চলচ্চিত্র নিয়ে তাদের এক ধরণের মূল্যায়নও আছে। আমি তাদের কারো মতকে ইগনোর করতে পারি না। ব্যক্তিজীবনে তো অনেক উত্থান-পতন থাকে, আমাকেও এসবের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর প্রভাব বা অন্য কোনো বাস্তবতার প্রভাব কোনো একটি কাজে পড়বে এটা খুবই স্বাভাবিক।

 

প্রশ্ন : অনেক সময় বলা হয়, একজন পরিচালকের ব্যক্তি জীবনের ছাপ বা অভিজ্ঞতা তার চলচ্চিত্রে পড়ে। ব্যাপারটিকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করেন?

উত্তর : একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা পরোক্ষভাবে একটি চলচ্চিত্রে নিজেকেই বা নিজের চিন্তাকেই প্রকাশ করে থাকেন। একটি চলচ্চিত্রের ভেতরে ঐ চলচ্চিত্রের পরিচালকের মানসিক গঠন, চিন্তা-চেতনা, আদর্শ, দর্শন, চিন্তার অসাড়তা, বিকৃতিও প্রকাশ পায়। এটা স্বাভাবিক। 

//জেডএস//

x